|
অর্থনৈতিক অধিকার ইস্যুতে ভারতে এখনই জরুরি ভিত্তিতে বিতর্ক শুরু হওয়া দরকারশশী সিং, রাজেশ রঞ্জন |
বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে সাধারণত একগুচ্ছ মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সেগুলিকে সযত্নে রক্ষা করা হয়। তবে আরও একধাপ এগিয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলির সংবিধানে একগুচ্ছ মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকারকে কখনই অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। যদি তেমন কোনও চেষ্টাও হয়, তাহলে সমস্ত দিক থেকে মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এবং এনিয়ে সংশয়ের কুজ্ঝটিকা সৃষ্টি করা হয়। |
মোট দেশজ উৎপাদন (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিডিপি) এর বিচারে ভারতের অর্থনীতির অবস্থান বিশ্বের পাঁচ নম্বরে। তবে বৃদ্ধির এই ছবির আড়ালে ঢাকা পড়ে রয়েছে এক কঠোর বাস্তবতা: সেটা হল চূড়ান্ত স্তরের এক অসাম্য। একদিকে দেশের অতিক্ষুদ্র, সংখ্যার বিচারে অত্যন্ত স্বল্প একটা গোষ্ঠী ধনসম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। অন্যদিকে, তার বিপরীতে বিপুল সংখ্যক দেশবাসী একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এসওএফআই-২০২৩ রিপোর্টে অনুযায়ী, বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ১১১। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা কাউন্সিলের আরেকটি রিপোর্ট থেকেও দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি লোকের আয় মাসে ২৫ হাজার টাকার কম। যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা ধরা হয় তাহলে চিত্রটা আরও মলিন: এদেশে মোট যত লোক বেকার তাদের মধ্যে শিক্ষিত বেকারদের হার ২০০০ সালে ছিল ৫৪.২ শতাংশ। ২০২২ সালে এই হার আরও বেড়ে হয়েছে ৬৫.৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, ২০১৪ সাল থেকে ভারতে প্রকৃত মজুরির তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিই হয়নি। একথা জানিয়েছেন বিখ্যাত উন্নয়ন অর্থনীতবিদ জ্যাঁ দ্রেজ। এরকম একটা পরিস্থিতিতে, সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কিছু কিছু মৌলিক, সর্বজনীন অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করাটা খুবই জরুরি। ভারতের মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রভাত পট্টনায়েক এবং উন্নয়নমলক অর্থনীতির প্রবক্তা জয়তী ঘোষের প্রস্তাব হল, এই ধরনের পাঁচটি অধিকার নিশ্চিত করার উপযোগী প্রতিষ্ঠান খুব সহজেই গড়ে তোলা যায়। সেই অধিকারগুলি হল, শস্তা দামে খাদ্যের অধিকার, চাকরির অধিকার এবং চাকরি না থাকলে বেঁচে থাকার মতো মজুরি পাওয়ার অধিকার, নিখরচায় সর্বজনীন এবং গুণমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার অধিকার, নিখরচায় গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা পাওয়ার অধিকার, এবং বৃদ্ধ বয়সে পেনশন ও বিশেষভাবে সক্ষমদের প্রযোজনীয় সুবিধা পাওয়ার অধিকার। বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানে সাধারণত একগুচ্ছ মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সেগুলিকে সযত্নে রক্ষা করা হয়। তবে আরও একধাপ এগিয়ে গণতান্ত্রিক দেশগুলির সংবিধানে একগুচ্ছ মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকারকে কখনই অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। যদি তেমন কোনও চেষ্টাও হয়, তাহলে সমস্ত দিক থেকে মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এবং এনিয়ে সংশয়ের কুজ্ঝটিকা সৃষ্টি করা হয়। অর্থনৈতিক অধিকারের বিষয়ে এই ধরনের ঘোষিত আপত্তির কারণেই আমাদের সংবিধানেও একগুচ্ছ রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক অধিকারগুলিকে আনুষঙ্গিক বিষয় হিসাবে একেবারে পিছনে ঠেলে দিয়ে সেগুলির জায়গা করে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের নির্দেশাত্মক নীতি (দ্য ডায়রেক্টিভ প্রিন্সিপ্যাল অফ স্টেট পলিসি) অংশের মধ্যে। আদালতে বিচারযোগ্য অধিকার হিসাবে অর্থনৈতিক অধিকারগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে সংবিধান পরিষদে খুবই আগ্রহজনক বিতর্ক হয়েছিল। বাংলা থেকে সংবিধান পরিষদের বিশিষ্ট সদস্য প্রমথরঞ্জন ঠাকুর বিধানসভায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘মহাশয়, এটা মৌলিক অধিকারের একটি তালিকা এবং এগুলিই শুধুমাত্র আদালতে বিচারযোগ্য। আমি বুঝতে পারি না কেন অর্থনৈতিক অধিকারগুলিকেও আদালতে বিচারযোগ্য অধিকারের তালিকায় আনা হবে না। যখন কোনও দেশের সংবিধান রচনা করা হচ্ছে তখন অর্থনৈতিক অধিকারগুলির স্বীকৃতি দেওয়া একটা অপরিহার্য বিষয়। এবং সেগুলিকেও আদালতে বিচারযোগ্য হিসাবেই স্বীকৃতি দিতে হবে।’ অর্থনৈতিক অধিকার দেওয়ার ব্যাপারে মূলত দুধরনের আপত্তি রয়েছে — লিবারাল ও মার্কসবাদী। লিবারালদের যুক্তি হল, যেহেতু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে অর্থনৈতিক অধিকারগুলি পূরণ করা যাবে কিনা, তাই অর্থনৈতিক অধিকারগুলির গ্যারান্টি দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকবে না রাষ্ট্র। এর পাল্টা প্রভাত পট্টনায়েক ও জয়তী ঘোষের বক্তব্য হল, লিবারালদের যুক্তির মধ্যে বড়সড় একটা ফাঁক রয়েছে। কারণ লিবারালরা গণতন্ত্রের দাবি নিয়ে হইচই বাধিয়ে শুধুমাত্র একটা বিশেষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধা দিতে চায় — সেটা হল পুঁজিবাদ। তবে প্রভাত পট্টনায়েক ও জয়তী ঘোষের কাছে সত্যিকারের গণতন্ত্রের মানে হল, নাগরিকদের বুনিয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকতে হবে এবং সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এই অধিকার বিশেষ সুবিধা বা দান হিসাবে দিলে চলবে না, বং তাঁরা যে নাগরিক সেই অধিকারেই এটা তাঁদের পাওনা। অন্যদিকে মার্কসবাদী পরিপ্রেক্ষিত সাধারণ মানবাধিকার বিষয়েই সন্দিহান। তাঁদের মতে, মার্কসবাদ এবং ‘মানবাধিকার’ এর ধারণার মধ্যে একটা মৌলিক ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক’ দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই সংশয়বাদের উৎস হল কার্ল মার্কসের প্রথম দিককার লেখা On The Jewish Question। ওই লেখায় তিনি বলছেন, ‘মানুষের অধিকার… আর কিছুই নয় শুধুমাত্র অহংবাদী মানুষের অধিকার, এ হল সেই মানুষ যে অন্য মানুষদের থেকে এবং তার গোষ্ঠীর মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন।’ তবে পট্টনায়ক ও ঘোষ আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন এই তথ্যের দিকে— মার্কস নিজে একথা মনে করতেন যে, মতপ্রকাশ ও সমিতি গড়ার স্বাধীনতা ছাড়া কোনও রকম রাজনৈতিক কাজকর্মই করা সম্ভব নয়। ওপরে উল্লেখ করা ৫টি অর্থনৈতিক অধিকারকে কার্যকর ভাবে বাস্তবায়িত করতে হলে দুটি উপায়কে কাজে লাগানো যেতে পারে। এগুলি হল সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর। প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ সংগ্রহ করার জন্য এদুটি বিষয় খুবই দরকারি। প্রভাত পট্টনায়েক হিসাব কষে বলেছেন, দেশের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের ওপর মাত্র ২ শতাংশ হারে সম্পদ কর আরোপ করলেই বছরে ৬.৬ লক্ষ কোটি টাকা সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই সম্পদ করের পরিপূরক হিসাবে পূর্ণাঙ্গ উত্তরাধিকার কর চালু করা যেতে পারে। উত্তরাধিকার কর পুঁজিবাদী মতাদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ। যদিও এবিষয়ে সাধারণের ধারণা ঠিক উল্টো। পুঁজিবাদী মতাদর্শের অবস্থান হল, ব্যক্তি সম্পদ সঞ্চয় করেন তার নিজস্ব ব্যতিক্রমী প্রতিভা ও চেষ্টার কারণে। তাই একই রকম প্রতিভা ও সক্ষমতার পরিচয় না দিয়ে সেই ব্যক্তির ছেলেমেয়েরা তাঁর অর্জিত সম্পদের উত্তরাধিকারী হবেন, এর কোনও ন্যায্যতা নেই। সূত্র: ডেকান হেরাল্ড প্রকাশের তারিখ: ২২-সেপ্টেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |