|
আলেন্দে, নিক্সন এবং সিআইএটিম মার্কসবাদী পথ |
এডওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়ে সিআইএ প্রধান হেলম সেই ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল চিলির সেনাপ্রধান জেনারেল রেনে শ্নাইডারকে সরিয়ে দেওয়ার ছক, যিনি ছিলেন সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ত, সেনা অভ্যুত্থান, সামরিক দখলদারি, সংসদে আলেন্দের অনুমোদন ভেস্তে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। রেনেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শেষে বাস্তবায়িত হয় তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। গুরুতর জখম হয়ে তিনি মারা যান। |
শেষ লড়াইয়ে আলেন্দে। বন্ধু ফিদেলের দেওয়া একে-৪৭ নিয়ে। যদিও প্রথমে পারেননি। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে শেষে সফল হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে। ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০। চিলির রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৬.২ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন বামপন্থী প্রার্থী সালভাদোর আলেন্দে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পেয়েছিলেন ৩৪.৯ শতাংশ ভোট। সেসময় চিলির সংবিধান অনুযায়ী, কোনও প্রার্থী ৫১ শতাংশ ভোট না পেলে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম দু’জনের মধ্যে একজনকে বেছে নিত সংসদ। ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল সংসদের সেই নির্ধারিত অধিবেশন। আর আলেন্দের শপথ নেওয়ার দিন ছিল ৩ নভেম্বর। নিক্সনের কাছে ছিল সাকুল্যে আট-সপ্তাহ সময়! দেরি না করে ফল ঘোষণার এগারো দিনের মাথায় ‘চিলির রুপার্ট মার্ডক’ মিডিয়া-টাইকুন, এল মারকুরিও পত্রিকার মালিক অগাস্তিন এডওয়ার্ডের সঙ্গে তড়িঘড়ি বৈঠক করেন নিক্সন নিজে। একেবারে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে। ১৫ সেপ্টেম্বর, ঠিক সওয়া ন’টায়। এইসব তথ্য-প্রমাণ এই প্রথম প্রকাশ্যে এল। আগস্টের গোড়ায় জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের চিলি-সংক্রান্ত বিভাগের অধিকর্তা পিটার কর্নভুল তাঁর দ্য পিনোচেত ফাইল -বইয়ের চিলিয় সংস্করণে তা বেআব্রু করেছেন। চিলিতে সেনা অভ্যুত্থানের ৫০-তম বার্ষিকীতে সমস্ত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি। বাইডেন প্রশাসনের কাছে একই দাবি জানিয়েছেন চিলির রাষ্ট্রপতি গ্যাব্রিয়েল বোরিক। সেদিন নিক্সনের সঙ্গে বৈঠকের আগেই অবশ্য এডওয়ার্ড দেখা করেন সিআইএ প্রধান রিচার্ড হেলমের সঙ্গে। চিলির কোন্ সামরিক কর্তারা অভ্যুত্থানে কতটা সাহায্য করতে পারে, কীরকম আর্থিক সহায়তা-নিশ্চয়তা ওয়াশিংটনের থেকে পাওয়া যেতে পারে, সে নিয়ে দু’জনে কথা বলেন। এডওয়ার্ডের সঙ্গে কথা বলার পরেই নিক্সন ডেকে পাঠান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার, অ্যাটর্নি জেনারেল জন মিশেল এবং সিআইএ প্রধান হেলমকে। সেইসঙ্গেই, আলেন্দের রাষ্ট্রপতি হওয়া ঠেকাতে অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে সিআইএ প্রধানকে ‘৪৮-ঘণ্টার মধ্যে’ ব্লুপ্রিন্ট জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এডওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়ে সিআইএ প্রধান হেলম সেই ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল চিলির সেনাপ্রধান জেনারেল রেনে শ্নাইডারকে সরিয়ে দেওয়ার ছক, যিনি ছিলেন সংবিধানের প্রতি বিশ্বস্ত, সেনা অভ্যুত্থান, সামরিক দখলদারি, সংসদে আলেন্দের অনুমোদন ভেস্তে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। রেনেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শেষে বাস্তবায়িত হয় তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। গুরুতর জখম হয়ে তিনি মারা যান। সেসময়ই নিক্সন সরাসরি টেলিফোন করেন কিসিঞ্জারকে। ২৩ সেপ্টেম্বর, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে। নিক্সন: এসব কী ঘটে চলেছে চিলিতে? কিসিঞ্জার: ঘটনাটি খুবই খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে, কিন্তু আর কোনও কিছুকেই তা প্ররোচিত করেনি। পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল সরকারের অধিগ্রহণ, কিন্তু সেটা ঘটেনি। নিক্সন: আপনি কি বলতে চাইছেন, যদি এমন একটা কিছু ঘটত, যাতে জনগণ খুবই উত্তেজিত হয়ে সরকারের দখল নিতেন? কিসিঞ্জার: এটাই ছিল পরিকল্পনা, কিন্তু ওরা (চিলির সেনাবাহিনী) একেবারেই অযোগ্য। নিক্সন: ওরা আসলে বহুদিন খেলার বাইরে। কিসিঞ্জার: আগামীকাল (২৪ সেপ্টেম্বর, সংসদে) নির্বাচন। তিন তারিখ (নভেম্বর) শপথ অনুষ্ঠান। ওরা সংসদের অধিবেশন ভেস্তে দিতে পারত। কিন্তু ওরা তা করতে পারেনি। এদিকে সময় একেবারেই নেই, সম্ভবত খুবই দেরি হয়ে গেল! কর্নভুলের বেআব্রু করা হোয়াইট হাউসের রেকর্ড থেকেই স্পষ্ট, আলেন্দের রাষ্ট্রপতি হওয়া ঠেকাতে ষড়যন্ত্রের ছক কষেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিক্সন নিজে! ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল সওয়া ন’টায় এডওয়ার্ডের সঙ্গে নিক্সনের গোপন বৈঠকের আগে কিসিঞ্জার সকাল আটটায় প্রাতরাশ বৈঠক করেন পেপসি’র সিইও ডোনাল্ড কেনডল, অ্যাটর্নি জেনারেল জন মিশেল এবং অগাস্তিন এডওয়ার্ডের সঙ্গে। আর নিক্সন-এডওয়ার্ডের বৈঠকের পর ওই সকালেই সাড়ে ন’টার সময় ওভাল অফিসে নিক্সনের সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন কিসিঞ্জার। এর ছ’ঘণ্টা বাদে কিসিঞ্জার, মিশেল এবং হেলমকে ওভাল অফিসে ডেকে পাঠান নিক্সন। এবং আলেন্দের রাষ্ট্রপতি হওয়া ঠেকাতে অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে সিআইএ প্রধানকে ‘৪৮-ঘণ্টার মধ্যে’ একটি ‘গেমপ্ল্যান’ জমা দিতে নির্দেশ দেন। আলেন্দে হত্যার পঞ্চাশ বছর পরেও মার্কিন প্রশাসন গোপন করে চলেছে সেই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ। ‘১৯৭৩ সালে অভ্যুত্থানের আগে, অভ্যুত্থানের সময় এবং পরে’ মার্কিন ‘হস্তক্ষেপের’ সমস্ত গোপনীয় রেকর্ড প্রকাশের জন্য মার্কিন বিদেশমন্ত্রকের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে চিলির সংসদ। আগস্ট মাসের গোড়ায় প্রায় সর্বসম্মতভাবে চিলির সংসদ এব্যাপারে ভোট দিয়েছে। অভ্যুত্থানের ৫০-তম বার্ষিকীতে এইসব গোপন রেকর্ড প্রকাশ করে বাইডেন প্রশাসনের কাছে কূটনৈতিক সৌজন্যের দাবি জানিয়েছে চিলির গ্যাব্রিয়েল বোরিক সরকার। ‘আমরা এখনও জানি না সামরিক অভ্যুত্থানের সকালে তাঁর ডেস্কে বসে রাষ্ট্রপতি নিক্সন কী দেখেছিলেন?’ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ওয়াশিংটনে চিলির রাষ্ট্রদূত হুয়ান গ্যাব্রিয়েল। যোগ করেছেন, ‘আরও অনেক কিছু (গোপন) রয়েছে, যা চিলির জনগণের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত, যা আমাদের ইতিহাসের পুননির্মাণের জন্য জরুরি।’ শেষে প্রায় নিঃশব্দে ২৫ আগস্ট সিআইএ তাদের ওয়েবসাইটে পোস্ট করেছে চিলির সামরিক অভ্যুত্থান নিয়ে দু’টি অতি গোপনীয় ডকুমেন্ট– মার্কিন রাষ্ট্রপতির ডেইলি ব্রিফ– যা গত পঞ্চাশ বছর ধরে রাখা হয়েছিল চরম গোপনীয়তায়। মার্কিন রাষ্ট্রপতির জন্য ডেইলি ব্রিফ হলো যে গোপন নথি প্রতিদিন সকালে দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। একটি ডেইলি ব্রিফ হলো অভ্যুত্থানের দিন– ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, সকালের। অন্যটি ১৯৭৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, যেদিন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আলেন্দে সরকারকে হটানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল চিলির সামরিক বাহিনী। সিআইএ’র এই দু্টি পোস্টের লিঙ্ক দিয়ে মার্কিন বিদেশদপ্তর তুরন্ত দাবি করেছে, ‘স্বচ্ছতা বৃদ্ধির অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে’ মার্কিন সরকার রাষ্ট্রপতির ডেইলি ব্রিফের চিলি-সংক্রান্ত অংশটি প্রকাশ করেছে। ‘অতীতে যেভাবে হাজারো ডকুমেন্ট প্রকাশ্যে আনা হয়েছে’ এদিনও সেভাবে রাষ্ট্রপতির ডেইলি ব্রিফ প্রকাশ করা হলো। সব দেখে ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের চিলি-সংক্রান্ত বিভাগের অধিকর্তা পিটার কর্নভুল বলেছেন, এটি আসলে চিলির অভ্যুত্থানের তোপধ্বনি মাত্র! পঞ্চাশ বছর পর যদি নিক্সন এটা পড়তেন, তাহলে বলতেন, একেবারেই সামান্য! তবে যেটুকু প্রকাশ করেছে, তাতে স্পষ্ট, ‘বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে’ নিক্সন বিলক্ষণ জানতেন, ‘শীঘ্রই একটি সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা’র কথা, ‘যেখানে নৌবাহিনী সরকারকে অপসারণের ছক কষছে, চেয়েছে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সমর্থন’। ওই ব্রিফে একইসঙ্গে বলা হয়েছিল, তবে ‘সোস্যালিস্টরা, বামপন্থীরা, এক্সট্রিমিস্টরা এবং কমিউনিস্টরা আপস না করার প্রশ্নে সমানভাবে অবিচল।’ প্রকাশের তারিখ: ০৯-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |