|
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামমুজফ্ফর আহ্মদ |
মুসলিম লীগের শাসন মোটেই সুশাসন ছিল না। প্রতিবাদ হল ছাত্র ও যুব শক্তির তরফ থেকে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক, তসদ্দুক [হোসেন], [মোহাম্মদ] তোয়াহা প্রভৃতি ছাত্র ও যুবনেতা। তাঁরা ঢাকায় কনফারেন্স করলেন, তাতে [শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবও যোগ দিলেন। তিনি সম্ভবত আবুল কাশেম সাহেবের ছাত্র ও যুবলীগের তরফ হতে এসেছিলেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মি: জিন্নাহ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, ছাত্রদের তরফ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। মি: জিন্নাহর মুখের সামনে তারা বলল যে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করতে হবে। এই বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা গুলির মুখে প্রাণও দিল। |
বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝির পরে কবি নবীনচন্দ্র সেনরা যখন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন তখন পশ্চিমবঙ্গের ছেলেরা তাঁদের 'বাঙাল' বলে খ্যাপাত। আমি যখন ১৯১৩ সালে কলকাতায় পড়তে এসেছি তখনো পশ্চিমবঙ্গের ছেলেরা আমাদের বাঙাল নামে ডাকত। তবে, কবি নবীন সেনদের আমলের মত নয়। আমাদের কেউ কেউ আবার ঠাট্টা করে বলতেন, 'ওঁরা তো বঙ্গদেশ হতে এসেছেন।' এটাও ভদ্রভাষায় 'বাঙাল' বলা ছিল। সত্যই কোন সময়ে পূর্ববঙ্গের একটা অংশকে বাঙাল নগর বা বাঙাল দেশ বলা হত। আর আজ বাংলাদেশের সেই দেশ সত্য সত্যই স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গণ-প্রজাতান্তিক বাংলাদেশ হয়ে গেল। আরো আশ্চর্যের কথা পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি মানুষ এই স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে ওঠার জন্য মনে-প্রাণে কামনা করলেন বা কার্যত সংগ্রামও করলেন। পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বলা বন্ধ হয়ে যাবে এ কথা সেদিন তাঁরা একবারও ভাবেননি। সেদিন এক বন্ধু বলেছিলেন যে কয়েকজন পেনশনভোগী বৃদ্ধ এক জায়গায় আড্ডা দিতে বসে ঠাট্টার ছলে বলছিলেন তাঁরা এখন পশ্চিমা বাঙালি হয়ে গেছেন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারত বিভক্ত হল আর তার একটি অংশের নাম হল পাকিস্তান। এই পাকিস্তানও আবার পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানে বিভক্ত হল। শাসন প্রতিষ্ঠা হল মুসলিম লীগের। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। শুরু হতে 'আনসার' নামধারী ভলান্টিয়ারদের এবং মুসলিম লীগ শাসনের নানা রকম জুলুম আরম্ভ হল। এই জুলুমের কারণে বা মনস্তাত্ত্বিক কারণেও হাজার হাজার হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে চলে গেল। মুসলিম লীগের শাসন মোটেই সুশাসন ছিল না। প্রতিবাদ হল ছাত্র ও যুব শক্তির তরফ থেকে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন শামসুল হক, তসদ্দুক [হোসেন], [মোহাম্মদ] তোয়াহা প্রভৃতি ছাত্র ও যুবনেতা। তাঁরা ঢাকায় কনফারেন্স করলেন, তাতে [শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবও যোগ দিলেন। তিনি সম্ভবত আবুল কাশেম সাহেবের ছাত্র ও যুবলীগের তরফ হতে এসেছিলেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মি: জিন্নাহ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, ছাত্রদের তরফ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। মি: জিন্নাহর মুখের সামনে তারা বলল যে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করতে হবে। এই বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা গুলির মুখে প্রাণও দিল। আমি আজ ১৯৪৮ [১৯৫২] সালের ভাষা-শহিদের কথা স্মরণ করছি। তাদের প্রাণের বিনিময়ে উর্দু ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষাও রাষ্ট্রভাষা রূপে পাকিস্তানে গৃহীত হয়েছিল। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাঁরই আন্দোলনের ফলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি হয়েছিলেন এই লীগের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট (প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)। ছাত্রনেতা শামসুল হক হয়েছিলেন এর প্রথম সম্পাদক। আবার টাঙ্গাইলের এসেম্বলি আসনে উপনির্বাচনে এই শামসুল হকের নিকটেই মুসলিম লীগ প্রথম পরাজয় বরণ করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি আজ বেঁচে নেই। তাঁর সঙ্গে বর্তমান মন্ত্রী শামসুল হক সাহেবকে অনেকেই ভুল করতে পারেন। এই লীগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির কোন সম্পর্ক ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান হতে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি লাহোরে গিয়ে 'জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে যখন তাঁর উপর থেকে বহিষ্কারের আদেশ উঠে গেল তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তানে এসে এই (আওয়ামী মুসলিম) লীগে যোগদান করেন। কিছুদিন আন্দোলনের পর আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম হতে মুসলিম কথাটা উঠে যায় এবং লীগের নাম হয় আওয়ামী লীগ। এই লীগের আন্দোলনে কমিউনিস্টদের অবদান ছিল। রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে যে সাতজন বন্দিকে গুলিতে প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁরাও কমিউনিস্ট ছিলেন। ছাত্রনেতা ও কমিউনিস্ট ফণী গুহের জেলেই মৃত্যু হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ- সোহরাওয়ার্দি সাহেব- প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ হতে বের হয়ে এসে ন্যাশন্যাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের (এখনকার বাংলাদেশ) বাইরে থেকে (আমি ভারতের নাগরিক) এই সব আমি লক্ষ্য করেছি। অবশ্য এই সময়ে আমরা কমিউনিস্টরাও ভারতে কংগ্রেস সরকারের জেলে দিন কাটাচ্ছিলাম। সঠিক তথ্য পরিবেশন করার জন্যই আমি এখানে এই কথাগুলি বললাম। এই পুস্তিকাতে সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোন তথ্য সঠিক নয় ধরা পড়লে পরের মুদ্রণে তা শুধরে দেওয়া হবে। আমি সব সময় সঠিক তথ্য পরিবেশন করার পক্ষপাতী। কারণ বহু বৎসর পর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ছাত্র হয়তো এ পুস্তিকা হতেই তথ্য আহরণ করবে। গত ৫৯ বছর ধরে আমি কলকাতার বাসিন্দা। কলকাতার সঙ্গে আমার একটা দৃঢ় নাড়ির যোগ জন্মেছে। কিন্তু বাংলাদেশের কথাও আমি ভাবি। পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার হতে মুক্ত হবার জন্য বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে সংগ্রাম চালিয়েছে তার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে কম। আমি বাংলাদেশের যোদ্ধাদের জন্য নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি একজন অক্ষম অসমর্থ বৃদ্ধ। যদি আমার শরীরে শক্তি থাকত তাহলে আমিও বাংলাদেশের মুক্তিফৌজে যোগ দিতাম। আজ যাঁরা গণ-প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের কর্ণধার হয়েছেন তাঁদের আমি অভিনন্দন জানাই। তাঁদের সঙ্গে আমার মতের মিল আছে কি নেই সে কথা আমি ভাবি না। আমার মনে এই বিশ্বাস আছে যে বাংলাদেশ একদিন পৃথিবীতে একটি আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
প্রকাশের তারিখ: ০১-আগস্ট-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |