|
হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিশ্বজোড়া নেটওয়ার্কইনগ্রিড থেরওয়াথ |
ভারতে আরএসএসের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা মনে করে যে, শুধুমাত্র হিন্দুরাই একমাত্র এবং সত্যিকারের ভারতীয়। বিভিন্ন স্কুলে এবং অনলাইনে তাদের হিন্দুত্বের মতাদর্শ ছড়ানোর কাজে বিপুল টাকা খরচ করা হচ্ছে। এমনকি মতাদর্শ ছড়াতে টাকা খরচ করা হচ্ছে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় অভিবাসীদের মধ্যেও। |
ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা কি দেশের মধ্যে খুঁচিয়ে তোলা জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাত বিদেশেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন? গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্রিটেনের লেস্টার শহরে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা থেকে সেটাই মনে হচ্ছে। বিবিসির খবর অনুসারে, এই হিংসার ঘটনা সম্পর্কে ২ লক্ষ টুইটের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি করা হয়েছিল ভারতে টুইটার ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে (যারা এই টুইটগুলি করেছেন তাদের একাধিক টুইটার অ্যাকাউন্ট রয়েছে)। এরা সকলেই হিন্দুত্বের সমর্থক এবং এদের হিন্দুত্ব হিন্দুদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। (১) হিন্দুত্ব শব্দটি প্রচার করেছিলেন রাজনীতিবিদ বীর (বিনায়ক দামোদর) সাভারকার (১৮৮৩–১৯৬৬) তাঁর লেখা ‘এসেনসিয়ালস অফ হিন্দুত্ব’ বইটিতে (১৯২৩)। এই বইটা হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী আধা সামরিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস, ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার কর্পস) অন্যতম প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক। মুসোলিনির ইতালিয় ফ্যাসিস অফ কমব্যাট–এর আদলে ১৯২৫ সাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরএসএস। এরাই এখনকার হিন্দু জাতীয়তাবাদের পূর্বসূরী। ভারতে ও ভারতের বাইরেও আরএসএস–এর অধীনে আরও একগুচ্ছ সংগঠন রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন এবং ছাত্র সংগঠন, মহিলা শাখা ও প্রকাশনা সংস্থা। ভারতে আরএসএস নিষিদ্ধ হয়েছিল দুবার। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যার পর। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের সংগ্রামের জনক মহাত্মা গান্ধীকে খুন করেছিল দীর্ঘদিনের এক আরএসএস কর্মী। দ্বিতীয়বার আরএসএস নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৭৫–৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সময়ে। তখনই আরএসএসের নেতৃত্ব বিদেশে শাখা সংস্থা গঠন করে বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয় অভিবাসীদের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৬ সালে ব্রিটেনে আরএসএসের সমর্থকেরা গঠন করে ফ্রেন্ডস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল (এফআইএসআই)। হিন্দুত্বের মতাদর্শ প্রচার ছিল এই সংগঠনের লক্ষ্য। এখনও ইউরোপ মহাদেশে, বিশেষ করে প্যারিসে সক্রিয় রয়েছে এফআইএসআই। ভারতে আরএসএসের নিজস্ব রাজনৈতিক শাখা হল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি, ইংরেজিতে ইন্ডিয়ান পিপলস পার্টি)। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিনের আরএসএস সদস্য। তিনি পরে হন বিজেপির সংগঠক এবং ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনার কাজে নেতৃত্ব দেন। হিন্দু কে? প্রাথমিকভাবে হিন্দুত্ব হল জাতভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (এথনোন্যাশনালিস্ট)। ধর্ম কিংবা দর্শনের বদলে হিন্দুত্ব অনেক বেশি ভাবিত জনসংখ্যার বিন্যাস এবং ভৌগোলিক এলাকার বিষয়ে। এই হিন্দুত্বের অনুগামীরা মনে করে ভারত হিন্দুদের দেশ এবং সব হিন্দুকেই তারা ভারতীয় বলে ভাবে, সেই হিন্দু অন্যত্র বাস করলেও তারা ভারতীয়। যারা হিন্দু নয় তারা ভাল হলে বড়জোর অতিথি, আর যারা জঘন্য অ–হিন্দু তারা হল বাইরে থাকা আসা দখলদার। এই সব দখলদারদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের ওপর নজর রাখতে হবে, কিছু কিছু অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করতে হবে, এবং দরকার পড়লে তাদের বহিষ্কার করতে অথবা এমনকি নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে। এই মতাদর্শের মূল শিকার মুসলিম (জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ), খ্রিস্টান (জনসংখ্যার ২.৩ শতাংশ), দলিত, আদিবাসী লোকজনেরা — এবং এমনকী যেসব হিন্দু মহিলা পিতৃতান্ত্রিক নিয়মনীতি মানেন না তারাও এই হিন্দুত্বের মতাদর্শের শত্রু। জাতীয়তাবাদীরা হিন্দু–মুসলিম বিয়ের বিরোধী। এধরনের বিয়েকে তারা বলে ‘লাভ জিহাদ’ এবং তারা মনে করে, এধরনের বিয়ের লক্ষ্যই হল হিন্দু মেয়েদের মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা যাতে তাদের সন্তানেরা মুসলিম হিসাবেই বড় হয়। মানসিক রোগীসুলভ এধরনের ভ্রান্ত কষ্টকল্পনা মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসা ও তাদের ব্যাপক হারে কালিমালিপ্ত করার বিষয়টিতে উৎসাহ যুগিয়েছে। ভারতীয় অভিবাসীরা (বিশ্বের ১১০টি দেশে ছড়িয়ে থাকা এদের সংখ্যা ৩ কোটি) সঙ্ঘ পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন এবং বিশেষ করে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। সঙ্ঘ পরিবার হল আরএসএস–এর সঙ্গে সম্পর্কিত হিন্দুত্বপন্থী সংগঠনগুলির একটা নেটওয়ার্ক। অনেক আগেই আরএসএস একথা বুঝতে পেরেছিল যে, যদি সংগঠনের শক্তি বাড়াতে হয় তাহলে অভিবাসী ভারতীয়দের তাদের সংগঠনে টেনে আনতে হবে। এই অংশের মধ্যে ছিল অনেক আইটি–র ছাত্র ও ইঞ্জিনিয়ার (২), এবং ১৯৯৬ সালে আরএসএস চালু করে দ্য গ্লোবাল হিন্দু ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক (জিএইচইএন) এবং আরএসএসের গুরুত্বপূর্ণ ভার্চুয়াল বৈঠকগুলিতে যাতে জিএইচইএন–এর সদস্যরা যাতে যোগ দিতে পারে তা নিশ্চিত করা হয়। বিজেপির ডিজিটাল আর্মি ভারতের সাংবাদিক স্বাতী চতুর্বেদী বিজেপির ‘ডিজিটাল আর্মি’ সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতে ও ভারতের বাইরে বিজেপি সমর্থকদের নিয়ে গড়া ট্রোল বিগ্রেডের অস্তিত্ব রয়েছে। এছাড়া পার্টির আধিকারিকদের অধীনে সক্রিয় নানা ধরনের নেটওয়ার্কও (bots) রয়েছে যেগুলি পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করতে পারে। (৩) ফ্রান্সের বিদেশ দপ্তরের ২০১৮ সালের একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে বিজেপির মধ্যেই রয়েছে আইটি সেল এবং ওই রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যারা সরকারের সমালোচক তাদের কীভাবে অনলাইনে হেনস্থা করা হয়। (৪) এই সব প্রচার ও ভীতি প্রদর্শনে টার্গেট করা হয় সংখ্যালঘুদের, মহিলাদের (বিশেষ করে সমকামী মহিলা, নীচু জাতের কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘু মহিলাদের) এবং সাংবাদিকদের। টুইটারে এই ধরনের ট্রোলিংয়ে যে সব শব্দ ব্যবহার করা হয় সেগুলির মধ্যে রয়েছে সিকুলার ( ‘sickular’), (এই শব্দটি ইংরেজি sick/secular শব্দের মিশ্রিত রূপ)। এতে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে সেকুলারজিম বিষয়টা একটা রোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। এছাড়া ট্রোলিংয়ে ব্যবহার করা হয় ‘presstitute’ শব্দটি (press/prostitute এর মিশ্রিত রূপ)। তবে শুধুমাত্র ‘মতাদর্শ’ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় না কেন ভারতে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলি (এবং রাজনীতিতে জারিত ব্যক্তিরা) অন্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। অথবা কেন অন্য দেশে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের তাদের বিদেশভূমেও ভারতীয় চিন্তাভাবনা কিংবা সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি আমদানি করতে হবে। এর আসল কারণ হল, অভিবাসীরা সঙ্ঘ পরিবারের অর্থ ও প্রভাবের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং এর বিনিময়ে অন্য দেশে পরিযায়ী হিসাবে চলে যাওয়া ভারতীয়দের সমর্থন করে থাকে সঙ্ঘ পরিবার। ২০০১ সালে ভূমিকম্পে ভুজ শহর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এবং ২০০২ সালে তীব্র মুসলিম–বিরোধী হিংসাকাণ্ডের পর, (বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন থেকে) ভারতীয় অভিবাসীদের চাঁদার বন্যাস্রোত বয়ে যায় গুজরাটে। তবে এই টাকা প্রধানত ব্যবহার করা হয়েছিল হিন্দুত্ব–পন্থী স্কুল তৈরির কাজে এবং লক্ষ্য ছিল, আদিবাসী জনতাকে ‘পুনরায় হিন্দুত্ব’–এর বৃত্তে টেনে আনার জন্য স্কুলগুলিকে ব্যবহার করা হবে। এছাড়া ১৯৯২ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা অযোধ্যায় ১৬ শতকের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল। সেই অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের প্রচারের কাজে অর্থ যোগানোর জন্যও চাঁদার স্রোত এসেছিল অভিবাসীদের কাছ থেকে। ২০০২ ও ২০০৪ সালে এনজিও সবরঙ কমিউনিকেশনস অ্যান্ড পাবলিশিং এবং আওয়াজ সাউথ এশিয়া ওয়াচ সংগঠন (৫) তাদের রিপোর্টে এবং ব্রিটেনের ব্রডকাস্টার চ্যানেল ৪ তাদের একটি তথ্যচিত্রে অভিবাসীদের মাধ্যমে সঙ্ঘ পরিবারকে কীভাবে বেআইনি পথে অর্থ যোগানো হয়, তা প্রকাশ্যে এনেছিল। এবং একইসঙ্গে ওই রিপোর্ট ও তথ্যচিত্র ইংরেজিভাষী দেশগুলির অভিবাসী ভারতীয় এবং ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের মধ্যে কাঠামোগত, স্তরবিন্যস্ত ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের আসল চেহারাটাও উন্মোচিত করে দিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ভিত্তিক ইন্ডিয়ান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিলিফ ফান্ড (আইডিআরএফ), যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে, তারাও সঙ্ঘ পরিবারের জন্য টাকা তোলে। যদিও এই সংগঠনটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক এবং কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভুক্ত নয় এমন সংস্থা হিসাবেই নথিবদ্ধ। আইডিআরএফ–এর মধ্যে রয়েছে ৭৫টি সংগঠন যার ৬০টিই সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৫ ও ২০০২ সালের মধ্যে আইডিআরএফ স্বীকৃত উপায়েই ১৮৪টি সংগঠনকে অনুদান দিয়েছে ৫০ লক্ষ ডলারের বেশি অর্থ। তবে আইডিআরএফে অনুদান দেওয়া ৮০ শতাংশ লোকই টাকাটা নির্দিষ্ট কোন খাতে খরচ করতে হবে তা উল্লেখ করে দেননি এবং তার ফলে ( মোট সংগৃহীত অর্থের ৭৫ শতাংশই) গেছে সঙ্ঘ পরিবার অনুমোদিত সংগঠনগুলিতে। সবরঙ তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে যে, ‘১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইডিআরএফ তার শক্তি বাড়িয়েছে পরিকল্পিতভাবেই এবং আরএসএস বিদেশি তহবিল যোগাড়ে যে সমস্ত উদ্যোগ নিয়েছে সেই উদ্যোগের মূল অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠেছে আইডিআরএফ’ (৬)। বার্মিংহাম ভিত্তিক সেবা ইউকে সংগঠনও একই ধরনের। আওয়াজ সাউথ এশিয়া ওয়াচের রিপোর্ট হল, ভুজ–এর ভূমিকম্পের পর সেবা ইউকে চাঁদা তুলে সংগ্রহ করেছিল ২.৩ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে ১.৯ মিলিয়ন পাউন্ড গেছে সেবা ভারতী গুজরাট–এর তহবিলে। এরা আবার এই টাকার এক তৃতীয়াংশ খরচ করে বিশেষত উপজাতি এলাকায় গড়ে তুলেছিল হিন্দুত্ব–প্রচারের স্কুল। যদিও ওই টাকা তোলা হয়েছিল ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত গ্রামগুলি পুনর্গঠনের জন্য। আওয়াজ দাবি করেছে, সেবা ভারতীর মাথা সংগঠন হল সেবা ইন্টারন্যাশনাল। সেই সেবা ইন্টারন্যাশনাল–এর সংগ্রহ করা তহবিলের টাকা পৌঁছেছিল আরএসএস–এর সহযোগী সংগঠনগুলিতে, যে সংগঠনগুলি আবার ‘[একটি গুজরাটি] গ্রাম থেকে সহিংস উপায়ে সব মুসলিম পরিবারকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার দুষ্কর্মে অভিযুক্ত। ওই গ্রামে এর আগে [মুসলিম]দের অধিকারে থাকা সব বাড়ি ও জমি অবৈধভাবে দখল করার অভিযোগও রয়েছে আরএসএসের সহযোগী ওই সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে।’ বহু শিক্ষাবিদ এই সব নেটওয়ার্ক নিয়ে সমীক্ষা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছেন বিজয় প্রসাদ যিনি লিখেছেন ‘ইয়াঙ্কি হিন্দুত্ব’–এর কথা। রয়েছেন থমাস ব্লম হাসনেন যিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ভূমিকা খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন (ভিএইচপি হল আরএসএস–এর ধর্মীয় শাখা) এবং রয়েছেন আমিনা মহম্মদ আরিফ যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভিএইচপির উত্থানের ইতিহাস নথিবদ্ধ করেছেন। এতদসত্ত্বেও, বিশ্বজোড়া হিন্দুত্বের এই কাঠামো এখনও অস্পষ্টই রয়ে গেছে। হিন্দুত্বের শাঁসালো টাকার থলি যারা হিন্দুত্বের পক্ষে যারা অনুদান দেন তাদের মধ্যে সম্পদশালীরাও রয়েছেন। সুভাষ ও সরোজিনী গুপ্তা (প্রকাশক), রমেশ ভুতাদা (ব্যবসায়ী ও সঙ্ঘ পরিবার অনুমোদিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন হিন্দু স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রেসিডেন্ট) এবং তাঁদের ছেলে ঋষি— এরা সকলে তাদের ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে হিন্দুত্ব–অনুগামী সংগঠনগুলিকে লক্ষ লক্ষ ডলার দিয়েছেন। (৭) এর ফলে স্থানীয়স্তরে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের সম্মান বেড়েছে। ক্রমশ এরা হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক শক্তি (এরা রিপাবলিকান পার্টিকে সমর্থন করেন), এবং এসবের কারণে ভারতে এদের যোগাযোগও বেড়েছে এবং এতে তাদের যেমন পার্থিব লাভও হয়েছে, তেমনি প্রতীকি সুবিধাও তারা পেয়েছেন। সাউথ এশিয়ান সিটিজেনস ওয়েব তাদের ২০২২ সালের রিপোর্টে জানিয়েছে, ২৪টি মার্কিনি সংগঠন— যেগুলির মধ্যে পড়ে দাতা সংগঠন, থিঙ্কট্যাঙ্ক, পলিটিক্যাল ফোকাস গ্রুপ, এবং উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান এবং যাদের মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার— তাদের সঙ্গে ভারতের সঙ্ঘ পরিবারের যোগাযোগ রয়েছে এবং আমেরিকায় তারা হিন্দুত্বের মতাদর্শ প্রচার করে, বিশেষত তাদের শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। (৮) ব্রিটেন সম্পর্কেও একই কথা সত্যি। ব্রিটেন রয়েছেন অত্যন্ত প্রভাবশালী উদ্যোগপতি এবং বড় বড় অনুদান দাতারা। যেমন ব্যবসায়ী মনোজ লাডওয়া, হিন্দুজা গ্রুপের এসপি (শ্রীচাঁদ) ও গোপীনাথ হিন্দুজা। রয়েছে সম্পদশালী, শিক্ষিত, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যাদের যোগাযোগ রয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এবং অভিবাসী অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে। এমনকি হিন্দুত্ববাদী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যেও ভবিষ্যতের এলিটদের দলে টানার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমী দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশে অন্য দেশের রাজনৈতিক কার্যকলাপে আর্থিকভাবে কিংবা অন্য কোনওভাবে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি বেআইনি। বিশেষ করে যদি সেই টাকা মানবাধিকার খর্ব করার মতো কাজে ব্যবহার করা হয়। অথচ আরএসএস, বিজেপি এবং তাদের অধীনস্থ ভারতীয় সংস্থাগুলি ঠিক সেই কাজই করে চলেছে। তাই ভারতের বাইরে, সঙ্ঘ সতর্ক থাকে যাতে বাইরে থেকে আপাতভাবে তাদের কাজগুলি নিরীহ ধরনের বলে প্রতীয়মান হয়। (বিশেষ করে আমেরিকায়) এখন আওয়াজ উঠেছে যে বিশেষ বিশেষ সংগঠনকে নজরদারির তালিকায় রাখতে হবে, কিংবা তাদের এমনকী সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। এই আবহে হিন্দুত্বের সমর্থকেরা চেষ্টা করছে তারা নিজেরা ক্ষতিকর নয় এমনটা প্রমাণ করতে। এবং তারা তা করতে চাইছে এই দাবি করে যে, তাদের কাজকর্ম বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যে সব হিন্দু সাংস্কৃতিক কিংবা শিক্ষামূলক কাজে আগ্রহী এই ধরনের দাবি তাদের কাছে টেনে আনতে সাহায্য করে, এবং তারা তাদের সংগঠনগুলি গড়ে তোলে রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃশ্যপটের বৈধ অংশ হিসাবে। এর ফলে কর কর্তৃপক্ষের হাত থেকেও তাদের রেহাই পেতে সুবিধে হয়। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নজরও তারা এড়িয়ে যায়। ২০২২ এর আগস্টে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত ভোপালে তাদের আন্তর্জাতিক সদস্যদের একটি সম্মেলনের শেষে অভিবাসীদের কাছে আর্জি জানান, ভারত যাতে সমৃদ্ধ ও বিশ্বগুরু ( বিশ্বের নেতা) হয়ে উঠতে পারে সেজন্য যেন তারা কঠোর পরিশ্রম করেন। যারা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারক–বাহক, তাদের কাছে এর মানে হল আরও টাকা তোলা, আরও রাজনৈতিক লবি করা এবং ইসলামকে দানব হিসাবে প্রতিপন্ন করা। ইনগ্রিড থেরওয়ার্থ প্যারিসের সাংবাদিক এবং পলিটিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি। তাঁর পিএইচডির বিষয় ভারতীয় অভিবাসীরা। তথ্যসূত্র: সূত্র: লে মঁদে, ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ প্রকাশের তারিখ: ২৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |