|
জে ডি বার্নালের ইতিহাসে বিজ্ঞান – একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা (পর্ব ৪)শ্যামাশীষ ঘোষ |
উত্তর আমেরিকায়, স্থানীয় পুঁজিপতিদের উত্থান ঘটছিল; ডুপন্ট, অ্যাস্টর, রকফেলার এবং মরগ্যানরা শীঘ্রই সম্পদ এবং শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পুঁজিবাদের দূর্গে পরিণত করবে। অন্যদিকে, রাশিয়ায় স্বৈরাচার এবং সামন্তবাদের ধ্বংসাবশেষ, ব্রিটিশ, ফরাসি এবং জার্মান পুঁজিপতিদের তীব্র শোষণের সাথে মিলিত হয়ে উন্নয়নকে আটকে রেখেছিল। প্রাচ্যে, ভারত প্রত্যক্ষ এবং চীন পরোক্ষ শোষণের জন্য রয়ে গিয়েছিল। |
আঠারো এবং উনিশ শতকে মানুষ অবশেষে সমৃদ্ধি এবং সীমাহীন অগ্রগতির রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল; সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি জাঁকজমকপূর্ণ কিন্তু অস্থির সংস্কৃতির। শিল্প সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। সপ্তদশ শতকের পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের নতুন পদ্ধতিগুলি মানুষের অভিজ্ঞতার সমগ্র ক্ষেত্রে প্রসারিত হয়। একই সময়ে সেগুলি সঞ্চারিত হয়েছিল উৎপাদনের পদ্ধতির রূপান্তরে– শিল্পবিপ্লবে। এর ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ এবং তার অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের সঙ্গে। বণিক এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকের থেকে এটি পরিণত হয় অর্থলগ্নিকারক এবং বড় শিল্পের প্রভাবের অধীনে। সপ্তদশ শতকের শেষেই মঞ্চ প্রস্তুত ছিল এই নতুন পুঁজিবাদী উৎপাদনের প্রগতির। ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র কোনে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইতিমধ্যেই কমবেশি পরিমাণে সামন্ত সীমাবদ্ধতার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলেছিল; নতুন নৌবিদ্যার কারণে উন্মুক্ত হওয়া বিশ্বের সর্বত্র ক্রমবর্ধমান বাজারে পণ্য সরবরাহ এবং লাভের জন্য উৎপাদনে অর্থলগ্নি করতে সক্ষম ছিল। উৎপাদন তখনও ছিল হস্তশিল্প এবং পারিবারিক, কিন্তু বণিক এবং পুঁজিপতি উৎপাদকরা ক্রমশ একে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে আর হস্তশিল্পী, কৃষকেরা পরিণত হয় মজুরী শ্রমিকে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে সাফল্যের কারণে এই প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায় এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে; এর ভিত্তি ছিল নতুন পুঁজি সৃষ্টির ক্ষমতায়ন, উনবিংশ শতকে সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদের প্রাধান্য প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে, কিন্তু এর ফলে সামনে আসে এক মৌলিক অস্থিরতা, যার থেকে এটি বেরোতে অক্ষম। বাজারের তেজী ভাবের পরেই আসত ক্রমবর্ধমান দুর্গতির মন্দা এবং সীমাবদ্ধ বাজার দখলের লড়াই আন্তর্জাতিক বৈরিতার জন্ম দিত। তবে এই ব্যবস্থার খোলাখুলি ভাঙন বিংশ শতকের আগে শুরু হয়নি। এই সময়কালের ইতিহাসে অবশ্য বিজ্ঞানের ভূমিকা শুধুমাত্র উৎপাদন প্রনালীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। অর্থ বিনিময়ের ভিত্তিতে একটি নতুন আকারের সমাজ তৈরি হচ্ছিল যার বৈশিষ্ট্য ছিল, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এই সমাজের, প্রয়োজন ছিল নিজেকে প্রকাশ এবং ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এক নতুন কেতার ধারণা। তা দিয়েছিল, নতুন বিজ্ঞানের পদ্ধতি এবং ফলাফল। অষ্ঠম এবং নবম অধ্যায়ে এই পুরো সময়কালের আলোচনা বার্নাল করেছেন দুটি প্রধান ভাগে – সময়ক্রমে এবং বিজ্ঞানের কয়েকটি শাখায় এর অগ্রগতির বিস্তৃত পর্যালোচনায়। সময় বিভাগের প্রথমটি হল রূপান্তরকালীন পর্যায় ১৭৬০ পর্যন্ত শিল্প বিপ্লবে পৌঁছানোর সময়। দ্বিতীয়, ১৭৬০ থেকে ১৮৩০, পর্যায়টি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের মত রাজনীতিতেও বৈপ্লবিক – ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব এবং আমেরিকা ও ফ্রান্সে রাজনৈতিক বিপ্লব। তৃতীয় পর্যায়, ১৮৩০ থেকে ১৮৭০, যাকে পুঁজিবাদের পূর্ণ বিকাশের সময় বলা হয়। চতুর্থ পর্যায়, ১৮৭০ থেকে ১৮৯৫, যা প্রত্যক্ষ করেছিল আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের শুরু এবং বিজ্ঞানে বিংশ শতকের মহান বিপ্লবের আগের ক্রান্তিকাল। আবার, বিজ্ঞানের অগ্রগতির কয়েকটি ক্ষেত্রে বার্নাল বিশদ আলোচনায় ঢুকেছিলেন, যেগুলির অতি সংক্ষিপ্ত উল্লেখই সম্ভব এই পরিসরে। সেগুলি হল তাপ এবং শক্তি; প্রকৌশল এবং ধাতুবিদ্যা; বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্ব; রসায়ন এবং জীববিজ্ঞান। শিল্প বিপ্লবের উৎসস্থল ছিল ব্রিটেন। প্রাথমিক জ্বালানি এবং কাঠামোগত উপাদান হিসাবে কাঠের অভাব থেকেই জ্বালানি হিসাবে সস্তা কয়লার এবং পরে ঢালাই লোহার ব্যবহার শুরু হয়। কাপড়ের জন্য চাহিদা বাড়ছিল; অন্তহীন সুযোগ আসে হাতের কাজের বদলে মেসিনারির ব্যবহারে। ১৭৮৫ সালে পরের যুক্তিসংগত ধাপ এসেছিল একে চালানোর জন্য ওয়াটের ষ্টীম ইঞ্জিনের ব্যবহারে। পুঁজি প্রথমে এসেছিল আগের শতকের বণিকদের লাভের থেকে, নতুন-আবিষ্কৃত দেশগুলির দাসেদের পরিশ্রম বা ভারতের প্রায় খোলাখুলি লুণ্ঠনের থেকে। একদিকে তাদের সস্তা পণ্য যেখানে যেখানে পৌঁছেছিল সেখানকার স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। অন্যদিকে আরো শ্রমিকের এবং খাদ্যের চাহিদা তৈরি করেছিল। এই চাহিদাই অর্থকরী শস্যের কৃষিতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। কৃষিতে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সাথে খামারে ফসলের উৎপাদনের জন্য শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে থাকে, একটি বড় অংশের মানুষকে শহরে টেনে আনে। আধুনিক শিল্পকেন্দ্র ছড়িয়ে পড়েছিল ব্রিটেন থেকে সারা বিশ্বে। ফ্রান্সে, অনুরূপ প্রক্রিয়া জন্ম দিয়েছিল ফরাসী বিপ্লবের। প্রকৌশলের সমস্ত নতুন বিজয়ের সাথে একটি ধোঁয়াময় ময়লা, অপরিচ্ছন্নতা এবং কদর্যতা এসেছিল যা পূর্ববর্তী কোনও সভ্যতা তৈরি করতে পারেনি। এই পরিবেশেই বিজ্ঞান তার ক্রিয়াকলাপ এবং গুরুত্বের বর্তমান মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। বিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে তার সামাজিক প্রভাব থেকে পৃথক করার জন্য প্রয়োজন ছিল "বিশুদ্ধ বিজ্ঞান" এর একটি ধারণা তৈরি করা এবং একে শিল্পের জন্য লাভজনক হয়ে উঠতে সক্ষম করা। আইনের এবং অর্থনীতির কড়া নিয়মের অধীনেই পুঁজিবাদীর অবাধ ক্ষমতার স্বীকৃতি এসেছিল। বৃহৎ একচেটিয়া উদ্যোগ জন্ম নিয়েছিল। পুঁজিপতিরা বিজ্ঞানকে সাগ্রহে ব্যবহার করেছিল যখন এটি মুনাফা বাড়ানোর জন্য তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করেছিল। বিজ্ঞানকে লাভজনক করার প্রক্রিয়ায় পুঁজিপতিরা বৃহৎ আকারের সামাজিক উৎপাদন পদ্ধতির পথ দেখিয়েছিল। একই সাথে তারা এমন একটি শ্রমিক শ্রেণিকে অস্তিত্বে এনেছিল, যাদের কাছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কঠোর পরিশ্রম, নিরাপত্তাহীনতা এবং অভাবের। এটি ছিল পুঁজিবাদের উত্থানের সময়, তার সাথী অত্যধিক সম্পদ এবং চরম দারিদ্র্য। ১৮৪৮ সালে মার্কস পূর্বাভাষ দিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ ইতিমধ্যেই অধিকারচ্যুত শ্রমিক শ্রেণির জন্ম দিয়েছে, যার চূড়ান্ত ক্ষমতা পুঁজিবাদের শাসনের অবসান ঘটাবে। বিজ্ঞানের নতুন শক্তি, শ্রমিক শ্রেণির জন্য, পুঁজিবাদের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব করে তুলবে, এই দৃষ্টিভঙ্গি মার্কস প্রথম Communist Manifesto তে স্পষ্টভাবে বিবৃত করেছিলেন। উনিশ শতকের শেষভাগে, শুরু থেকেই বিজ্ঞাননির্ভর রাসায়নিক এবং বৈদ্যুতিক শিল্পগুলি, চেহারা নিতে শুরু করে। আরেকটি পরিবর্তন ছিল নতুন কয়লাভিত্তিক ভারি শিল্পের দ্রুত প্রসারণ, উন্নত খননবিদ্যা এবং পরিবহণ পদ্ধতির সাথে, এবং লোহা ও ইস্পাত উৎপাদনের আমূল নতুন পদ্ধতির সাথে। ফরাসি বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ওজন এবং পরিমাপের সংস্কার এবং মেট্রিক সিস্টেম প্রতিষ্ঠা। খাল এবং রেলপথ তৈরি থেকে ভূতত্ত্বের প্রতি একটি নতুন আগ্রহ এসেছিল। বিজ্ঞানের এই সক্রিয় অগ্রগতির মধ্যে, পুরানো এবং নতুন, দুটি মহান সাধারণীকরণ উনিশ শতকের প্রধান অবদান হিসাবে গণ্য হয়। একটি, পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, শক্তি সংরক্ষণের মতবাদ; অন্যটি, জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, বিবর্তন। শক্তি সংরক্ষণের মতবাদকে গাণিতিক রূপ দেওয়া হয়েছিল এবং তাপগতিবিদ্যার বিজ্ঞান হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিল। তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রটি দেখিয়েছিল প্রকৃতির যে শক্তিগুলি পূর্বে পৃথক হিসাবে বিবেচিত ছিল – যান্ত্রিক, শব্দ, তাপ, আলো, বিদ্যুৎ এবং চৌম্বকত্ব – সমস্ত একই ইউনিটে পরিমাপযোগ্য – শক্তির – যার পরিমাণ মহাবিশ্বে বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়না। ১৮৫৯ সালের শেষের দিকে Origin of Species প্রকাশনার মাধ্যমে জৈব বিবর্তনের ধারণাটি আনেন চার্লস ডারউইন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের মহান ডারউইনীয় সংশ্লেষণে পরিণত হয়েছিল। যাজক এবং জমিদারদের কাছে এর অর্থ ছিল বিশ্বের ঐশ্বরিক আদেশের অবসান। বিবর্তনতত্ত্ব একটি বৈজ্ঞানিক, মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। ডারউইন আঘাত করেছিলেন একেবারে মানবপ্রকৃতির ঘরেই। ডারউইনের তত্ত্বকে সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল পুঁজিবাদের নিজস্ব অবাধনীতির তত্ত্বের সাথে মানানসই করে – পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যৌক্তিকতা, নির্মম শোষণ, যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত করা, উচ্চতর লোকদের দ্বারা নিকৃষ্টদের বিজয়। শ্রেণি বা বর্ণের আধিপত্যের যুক্তিসঙ্গত এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্বে তাদের ধারাবাহিকতাকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য নতুন অজুহাত প্রয়োজন ছিল। ডারউইনবাদ এটি সরবরাহ করেছিল, যদিও ডারউইন নিজে তা চাননি। বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, তাঁর বিদ্যুৎ পরিবাহীর আবিষ্কারের দ্বারা, আক্ষরিক অর্থে আকাশের বিদ্যুতকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানে এই সময়ের প্রধান অর্জন ছিল ম্যাক্সওয়েলের আলোর তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্বের প্রণয়ন। এটি পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে– বিদ্যুৎ, চৌম্বকত্ব এবং আলোকবিজ্ঞানের– পরীক্ষা এবং তত্ত্বের ফলাফলগুলিকে একটি বিস্তৃত তত্ত্বে একত্রিত করেছিল এবং তাদের একটি সহজ গাণিতিক সূত্র দিয়েছিল। এর থেকে আবার, ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণগুলি ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক প্রকৌশলের তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠন করেছিল। তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব ফ্যারাডের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছিল যে প্রকৃতির সমস্ত শক্তিকে সম্পর্কিত দেখানো উচিত এবং তাপগতিবিদ্যার সূত্রগুলির সাথে একত্রে একে পদার্থবিজ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট চূড়ান্ততা বোঝায় বলে মনে করা হয়েছিল – এই ধারণা অবশ্য বিংশ শতাব্দীতে ভেঙে পড়েছিল। যাইহোক, এর কেন্দ্রীয় ধারণা – তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের– হার্টজ পরীক্ষামূলক প্রদর্শনের দিকে পরিচালিত করেছিলেন; এসেছিল ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফিতে প্রয়োগ। শিল্প বিপ্লবের সময়ে নতুন বড় বৈজ্ঞানিক অবদান ছিল যৌক্তিক এবং পরিমাণগত রসায়নের ভিত্তিস্থাপন। এটি আনুষঙ্গিক ছিল শতাব্দী জুড়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প টেক্সটাইলের। প্রিস্টলি এবং ল্যাভয়সিয়ার বিজ্ঞান এবং শিল্পের দ্রুত বিকাশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আশা এবং অগ্রগতির উত্থানকে চিত্রিত করেছিলেন। এই আন্দোলন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে বিজ্ঞান, যা ইতালিতে দীর্ঘকাল সুপ্ত ছিল, জাতীয় প্রতিভার পুনরুজ্জীবন দেখিয়েছিল, গালভানি, ভোল্টা এবং আভোগাদ্রোর অবদানে। কুড়ি বছর পরে ডালটন পরমাণুর পরিপ্রেক্ষিতে একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। পাস্তুর, মূল্যবান রেশম কীট-এর একটি রোগের উপর তার প্রথম সফল আক্রমণ করেছিলেন। ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার উপায় এবং আরও ভাল, এর থেকে প্রতিরোধের উপায় প্রকাশ পেয়েছিল। রসায়নে এই সময়ের মধ্যে একটি প্রধান সাধারণীকরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল, মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণী, যা মৌলিকভাবে বিভিন্ন ধরণের মৌলের অস্তিত্বের সীমা নির্ধারণের জন্য উপস্থিত হয়েছিল। রাসায়নিক গবেষণার কেন্দ্রটি অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটেন থেকে ফ্রান্স হয়ে স্থানান্তরিত হয়েছিল জার্মানিতে, পরবর্তী শতাব্দীতে যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। উনিশ শতকের শেষের দিক একই সময়ে একটি সমাপ্তির এবং একটি শুরুর, নিউটনীয় যুগের মহান বৈজ্ঞানিক অভিযানের একটি নীরব সমাপ্তি এবং বিংশ শতাব্দীর ঝড়ো বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রস্তুতি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অগ্রগতির উপকারিতা সম্পর্কে দরিদ্ররা কী ভেবেছিলেন তা ১৮৭১ সালের প্যারী কমিউনে দেখা গিয়েছিল। কার্ল মার্কসকে আরামকেদারা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির চেতনা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তবুও, অনেকেই উপলব্ধি করেছিলেন যে উনিশ শতকের সমৃদ্ধির মূলে নিদারুণভাবে কিছু অন্যায় ছিল। শিল্পী, কবি এবং লেখকরা নতুন শিল্প নগরগুলির ভয়াবহতার বিরুদ্ধে, সৌন্দর্যের সর্বজনীন অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, সম্পদের অশ্লীল প্রদর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আমরা প্রথমবারের মতো যুদ্ধে বিজ্ঞানের একটি বৃহৎ আকারের প্রয়োগও দেখতে পাই: সাবমেরিন, টর্পেডো, উচ্চ বিস্ফোরক এবং বড় বন্দুক, যুদ্ধের যান্ত্রিকীকরণ। উত্তর আমেরিকায়, স্থানীয় পুঁজিপতিদের উত্থান ঘটছিল; ডুপন্ট, অ্যাস্টর, রকফেলার এবং মরগ্যানরা শীঘ্রই সম্পদ এবং শক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পুঁজিবাদের দূর্গে পরিণত করবে। অন্যদিকে, রাশিয়ায় স্বৈরাচার এবং সামন্তবাদের ধ্বংসাবশেষ, ব্রিটিশ, ফরাসি এবং জার্মান পুঁজিপতিদের তীব্র শোষণের সাথে মিলিত হয়ে উন্নয়নকে আটকে রেখেছিল। প্রাচ্যে, ভারত প্রত্যক্ষ এবং চীন পরোক্ষ শোষণের জন্য রয়ে গিয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের দার্শনিকেরা, নিউটন প্রদত্ত বিশ্বচিত্র মেনে নিয়েছিলেন। ভাববাদী বার্কলে, প্রতিষ্ঠিত ধর্মের স্বার্থে, ঈশ্বরের দৃষ্টি ছাড়া এই বিশ্বের সকল বাস্তবতা এবং বিজ্ঞান অস্বীকার করেছিলেন। সংশয়বাদী হিউম এই প্রমাণ করতে আরো সফল হলেন যে, আমরা কোনোকিছুই নিশ্চয়তার সঙ্গে জানতে পারি না। ফরাসি বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন ফরাসি দার্শনিক ভলটেয়ার এবং রুশো। কান্ট বিজ্ঞানের অর্জন এবং বিবেকের অভ্যন্তরীণ আলো একটি ব্যবস্থায় ঢালাই করার চেষ্টা করেছিলেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে, মধ্য শতাব্দীর আশাবাদী বস্তুবাদ, মাখ এবং অস্টওয়াল্ড-এর নব্য-পজিটিভিজমের দিকে ঘুরে গিয়েছিল, যাঁরা বিজ্ঞান থেকে বস্তুকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এবং সংবেদনপুঞ্জ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেছিলেন। নীহারিকা থেকে মানব মস্তিষ্ক পর্যন্ত বিশ্বের কাঠামো প্রকাশে বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলি যে বিশাল সাফল্য অর্জন করেছিল এবং বিবর্তনতত্ত্বে ক্রমাগত অগ্রগতির যে বিশাল চিত্র উপস্থাপিত হয়েছিল তা সত্ত্বেও, এই সময়ের শেষের দিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত হতাশাবাদী হয়ে ওঠে। তত্ত্বের মহান সাধারণীকরণ সত্ত্বেও, বিজ্ঞান, শতকের শেষের দিকে আগের চেয়ে বেশি বিশেষায়িত হয়ে উঠেছিল বা পরেও তাই ছিল। আলেকজান্ডার স্পিরকিনের একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, “এই সংকীর্ণ পেশাদারিত্ব ছাড়া প্রগতি সম্ভব নয় এবং একই সঙ্গে দরকার দর্শনের সমন্বয়কারী যুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে থেকে আন্তঃসম্পর্কিত একটি বিস্তৃত পন্থা, যা এই বিশেষীকরণের ফলে উদ্ভূত ফাঁকগুলি ক্রমাগত বোজাতে পারবে। অন্যথায় এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হবে যেখানে উন্নয়নশীল বিজ্ঞানের নানা ফ্রন্টে বিজ্ঞান দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে, সমগ্রভাবে মানবসমাজের জ্ঞানের পরিধিও বিস্তৃত হবে, কিন্তু একজন মানুষ হিসাবে বিজ্ঞানী তথ্যের এই সাধারণ প্লাবনের মধ্যে ক্রমশ পিছিয়ে পড়বেন”। উনিশ শতকে বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান সুসঙ্গত এবং ঐক্যের চিত্র থেকে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেছিলেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাধারণ কাঠামো সুরক্ষিত ছিল, এবং যে অদ্ভুত ঘটনাগুলি এই ধ্রুপদী চিত্রের সাথে মানানসই নয় বলে মনে হয়, তা নিঃসন্দেহে ব্যাখ্যাযোগ্য হয়ে উঠবে যদি কেবলমাত্র পর্যাপ্ত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কেউ তার মোকাবিলা করতে পারে। বিজ্ঞানীরা অনুভব করেছিলেন যে সমাজের শৃঙ্খলা পুরোপুরি উপলব্ধ না হলেও, উপলব্ধির পর্যায়ে রয়েছে এবং অসীম বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বস্তুগত অগ্রগতির একটি যুগ আসন্ন। অবশ্যই, দিগন্তে মেঘ ছিল: শ্রম সমস্যা, সাধারণ অস্ত্রশস্ত্রের একটি অপ্রীতিকর বৃদ্ধি; কিন্তু শান্তিপূর্ণ একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতি বজায় রাখা যে সকলের উপকারে আসবে তা উপলব্ধি করে তাঁরা আশা করেছিলেন মেঘগুলি কেটে যাবে। প্রকাশের তারিখ: ১০-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |