|
নেরুদা হত্যা, পিনোচেত এবং সিআইএটিম মার্কসবাদী পথ |
চিলি ছেড়ে মেক্সিকো যাওয়ার ঠিক একদিন আগে নেরুদা যান সান্তিয়াগোর সান্তা মারিয়া ক্লিনিকে। তাঁর গাড়ির চালক ও দেহরক্ষী ম্যানুয়েল আরায়া পরে জানান, ক্লিনিকে কোনও কারণ ছাড়াই নেরুদাকে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। আর তারপরই তিনি অসুস্থ বোধ করেন। এবং ওই সন্ধ্যাতেই তিনি মারা যান। এবছর ফেব্রয়ারিতে ফরেন্সিক বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক টিম চিলির বিচারপতির কাছে যে রিপোর্ট পেশ করেছে তাতেই স্পষ্ট যে ক্যান্সারের কারণে নয়, বিষ প্রয়োগেই কবির মৃত্যু হয়েছে। |
ক্যান্সার না, নেরুদাকে আসলে হত্যা করা হয়েছে। প্রস্টেট ক্যান্সারের কারণে তাঁর জীবনাবসান হয়নি। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর যে কারণ দেখানো হয়েছিল, তা ডাহা ভুল। জেনারেল পিনোচেতের জমানায় তাঁকে আসলে খুন করা হয়েছে। এবছর ফেব্রয়ারিতে ফরেন্সিক বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক টিম চিলির বিচারপতির কাছে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তাতেই স্পষ্ট যে ক্যান্সারের কারণে নয়, বিষ প্রয়োগেই কবির মৃত্যু হয়েছে। ১৯৭১, নোবেল পুরস্কার পান নেরুদা। গার্সিয়া মার্কেজের ভাষায়, ‘বিশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, তা সে যে কোনও ভাষায় হোক না কেন!’ পিনোচেতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের ১২ দিন বাদে নেরুদার মৃত্যু হয়। মার্কিন মদতে এই অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে অপসারিত করা হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সালভাদোর আলেন্দের সোস্যালিস্ট সরকারকে। রাষ্ট্রপতি আলেন্দে-সহ তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। চিলির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন নেরুদা। কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হয়ে ১৯৪৫ সালে চিলির সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭০-৭২, আলেন্দের সোস্যালিস্ট-কমিউনিস্ট পার্টির জোট সরকারের সময় তিনি ফ্রান্সের ছিলেন রাষ্ট্রদূত। পিনোচেতের অভ্যুত্থানের পর তিনি মেক্সিকোতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলেন, চেয়েছিলেন সেখানে একটি গ্রুপে যোগ দিতে, যারা আলেন্দে সরকারের অপসারণের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রচারাভিযান চালাবে। সান্তিয়াগোর বিমানবন্দরে এসে অপেক্ষাও করছিল মেক্সিকো সরকারের পাঠানো বিমান। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পিনোচেত জমানা চায়নি নেরুদা মেক্সিকোর আশ্রয়ে থাকুন, আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলুন। আর সেকারণেই তাঁকে হত্যার নির্দেশ। চিলি ছেড়ে মেক্সিকো যাওয়ার ঠিক একদিন আগে নেরুদা যান সান্তিয়াগোর সান্তা মারিয়া ক্লিনিকে। তাঁর গাড়ির চালক ও দেহরক্ষী ম্যানুয়েল আরায়া পরে জানান, ক্লিনিকে কোনও কারণ ছাড়াই নেরুদাকে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। আর তারপরই তিনি অসুস্থ বোধ করেন। এবং ওই সন্ধ্যাতেই তিনি মারা যান। এই সান্তা মারিয়া ক্লিনিক হলো সেই ক্লিনিক, যেখানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এদুয়ার্দো ফ্রেই মন্তালভাকে ১৯৮২ সালে হত্যা করা হয়েছিল। পিনোচেতের নির্দেশে ফ্রেইকে মাস্টার্ড গ্যাস ও কম ডোজের রাসায়নিক থালিয়াম ইনজেকশন দিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যার ঘটনায় ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে চারজন ডাক্তারসহ ছ’জনকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত। ৩-১০ বছরের জেল হয়েছে তাঁদের। ঘটনা হল, এই একই ক্লিনিকের এই একই ডাক্তার ও নার্সরাই ১৯৭৩ সালে সামরিক দখলে থাকা ক্লিনিকে নেরুদাকে দেখেছিলেন। বলেছেন চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, আইনজীবী এদুয়ার্দো কনত্রিয়াস। শেষে সত্য প্রকাশিত হয়েছে। নেরুদা-হত্যার পঞ্চাশ বছরে। বিচারপতিদের একটি প্যানেল ফরেন্সিক তদন্তে নিশ্চিত করেছে ইনজেকশনের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগেই নেরুদার মৃত্যু হয়েছে। কানাডা ও ডেনমার্কের দু’টি গবেষণাগার নিশ্চিত করেছে যে, নেরুদার শরীরে পাওয়া গিয়েছে বিষাক্ত ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম, যা অসাড় করে দেয় স্নায়ুতন্ত্রকে। এই বিষাক্ত ব্যাক্টিরিয়াই পিনোচেত জমানায় পরে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর। নেরুদার আত্মীয় ও আইনজীবী রদোলফো রেইস বলেছেন, ‘আমরা বুলেটটা খুঁজে পেয়েছি, যা নেরুদাকে হত্যা করেছে। এবং এটি ছিল তাঁর শরীরে। এখন প্রশ্ন হল কে বুলেটটা চালালো? খুব শীঘ্রই আমরা তা খুঁজে বের করব, কিন্তু নেরুদাকে যে হত্যা করা হয়েছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর তা করা হয়েছিল তৃতীয় পক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপে।’ মৃত্যুর সময় যে ডাক্তার নেরুদার সঙ্গে ছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তিনি হঠাৎই নতুন কথা শুনিয়েছেন। ডাক্তার সের্গিও দ্রাপার দাবি করেছেন নেরুদার সঙ্গে ছিলেন প্রাইস নামে একজন। অথচ, ডাক্তার প্রাইসের কোনও রেকর্ড ক্লিনিকে নেই। দ্রাপারের কথায়, নেরুদার সঙ্গে ওই লোকটিকে ছেড়ে দেওয়ার পর আর কখনও তাঁকে দেখেননি। আইনজীবীদের বক্তব্য, লোকটি যে-ই হোক, ‘গুরুত্বপূর্ণ হল ওই লোকটিই নেরুদাকে ইনজেকশন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।’ প্রাইসের চেহারার বর্ণনা অনুযায়ী লম্বা, সোনালি চুল আর নীল চোখের একজন মানুষ, অবিকল সিআইএ’র এজেন্ট মাইকেল টাউনলির মতো দেখতে, যিনি পিনোচেতের জমানায় চিলির সিক্রেট পুলিশের সঙ্গ যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২ সালে ফ্রেইকে হত্যা করেছিল চিলির গোয়েন্দা সংস্থা দিনা, যারা তখন রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। আর্জেন্টিনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং স্পেনে এরকম অনেক হত্যায় অভিযুক্ত দিনা। কিন্তু পিনোচেতের অভ্যুত্থানের মাত্র ১২ দিন বাদেই তারা সেই জৈব অস্ত্র ব্যবহারের মতো জায়গায় ছিল, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সিআআই-এর ভূমিকা। টাউনলি এখন রয়েছেন মার্কিন মুলুকে, মার্কিন প্রশাসনের সাক্ষী সুরক্ষার নিরাপদ আশ্রয়ে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে চিলির রাষ্ট্রদূত ওর্লান্দো লেটলিয়ারের হত্যায় দোষী সাব্যস্ত এই টাউনলি। অজানা এক কারাগারে ৬২ মাস বন্দি ছিলেন। পিনোচেত জমানায় দিনা ছিল গুপ্ত হত্যার মূল পাণ্ডা। দিনা অভিযান চালাত সিআইএ-র সঙ্গে। চিলির ভিতরে-বাইরে। যেমন দিনা’র হত্যার শিকার ৫৪ বছরের স্পেনীয় কূটনীতিক কার্মেলো সোরিয়া যিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে চিলির হয়ে কাজ করছিলেন, এবং আর্জেন্টিনায় নির্বাসিত চিলির জেনারেল কার্লোস প্র্যাটস ও তাঁর স্ত্রী। এসবই তারা করেছে সিআইএ-র সঙ্গে যৌথভাবে। দিনা’র অন্যতম প্রধান কাজ ছিল রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র তৈরি। দিনা’র পক্ষে এর দায়িত্বে ছিলেন এদুয়ার্দো বারিয়োস, যার সঙ্গে টাউনলির ছিল ঘনিষ্ঠতা। অপারেশন কনডোরের মূল পাণ্ডা ছিল দিনা আর সিআইএ। মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিক্সন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কিসিঞ্জাররা মনে করতেন চিলি হতে পারে লাতিন আমেরিকার মডেল। যেমন কিসিঞ্জার বলেছিলেন ১৯৭০ সালে, ‘একটি দেশ কমিউনিস্টদের দখলে চলে যেতে বসেছে সে দেশেরই দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষের জন্য, বিষয়টি শুধু বসে বসে দেখার কোনও যুক্তি থাকতে পারে না।’ প্রকাশের তারিখ: ২৩-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |