|
ভারত, চীন চুক্তির প্রেক্ষিতটিম মার্কসবাদী পথ |
বহু দেশই তাদের সমস্ত সম্পর্ক কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরর সঙ্গে রাখার বিপদের কথা উপলব্ধি করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মতো ব্লকগুলি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক দেশই প্রকাশ্যে এই ধরনের ব্লকে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে। পশ্চিম এশিয়ার দুই প্রধান শক্তি সৌদি আরব ও ইরানকে সম্প্রতি এই গ্রুপের সদস্য করা হয়েছে। লাতিন আমেরিকার সঙ্গেই ব্রিকসের প্রতি বাড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির আগ্রহ। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়া ‘পার্টনার দেশ’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যা চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। চারপাশে এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি যখন হচ্ছে, তখন ভারত তার বাইরে থাকতে পারে না। বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছেন ভারতীয় বুর্জোয়ারা। |
২১ অক্টোবর, ভারত সরকার ঘোষণা করেছে সীমান্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর টহলদারি-সংক্রান্ত দিল্লি এবং বেজিঙের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই স্বাগত জানানোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আশা করা যায়, যা পড়শি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে। খুলে দেবে নতুন সম্ভাবনার দরজা। দ্য হিন্দু-র শনিবারের লিড নিউজ: চলতি মাসের শেষেই ‘সমন্বিত-টহলদারি’ শুরু করবে দুই দেশ। ২০২০, গালওয়ান উপত্যকায় সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হয়। যদিও, এই সংঘর্ষ যাতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে না যায় তা নিশ্চিত করতে উভয় দেশই উদ্যোগ নেয়। ২০২০ থেকে, সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে হয় ৩১-দফা আলোচনা। ভারত-চীন সীমান্ত বিষয়ে দুই পক্ষের সেনা কমান্ডাররা যখন সামরিক স্তরে আলোচনা করেন, তখন ওয়ার্কিং মেকানিজম ফর কনসালটেশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন (ডব্লিউএমসিসি)-এর অধীনে হয় কূটনৈতিক স্তরের আলোচনা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে এই আলোচনা পৌঁছয় এক নির্ণায়ক পর্যায়ে, যখন দুই দেশই স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধি করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই অবস্থান স্পষ্ট করেন, যখন তিনি এপ্রিলে বলেন, ‘ভারত ও চীনের মধ্যে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক শুধু আমাদের দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র অঞ্চল ও বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’ যোগ করেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ‘গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ’ (দ্য ইকনমিক টাইমস, ১১ এপ্রিল, ২০২৪)। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, ভারত চায় ‘আমাদের সকল প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক’। চায় না ‘নতুন করে কোনও উত্তেজনা’। বেজিঙের সঙ্গে সীমান্ত আলোচনা নিয়ে মন্তব্য করেন, ‘অগ্রগতি ঘটছে এবং সন্তোষজনক’। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চীনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে জুলাই এবং আগস্টে, দু’মাসের ব্যবধানে দু’-দু’বার দেখা করেন। সেপ্টেম্বরে, রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ব্রিকস+’র জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকের ফাঁকে ইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর হয় ডব্লিউএমসিসি-র বৈঠক। পর-পর দু’টি। যে কারণে জয়শঙ্কর বলেছেন, এই চুক্তিটি একটি ‘অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং অত্যন্ত অধ্যবসায়ী কূটনীতির ফসল।’ যা হতে পারে অন্যান্য দেশগুলির মধ্যে বিরোধ-বিতর্ক মীমাংসার যথার্থ পথ। এই সমস্ত কূটনৈতিক পদক্ষেপই কাজানে ব্রিকসের বৈঠকের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিঙের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের রাস্তা করে দেয়। এই বৈঠকটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গালওয়ানে সীমান্ত সংঘর্ষের পর এই প্রথম দুই নেতা মিলিত হলেন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। ২০১৯, ব্রাসিলিয়াতে ব্রিকসের পর পাঁচবছরে এই প্রথম দুই দেশের প্রধানের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে। উভয়পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও পুনর্গঠনের জন্য পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে। স্বাভাবিক। অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি ভারতীয় বুর্জোয়ারা। এবছর জুলাইয়ের শেষে, মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা অনন্ত নাগেশ্বরন বার্ষিক আর্থিক সমীক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমের দেশগুলিতে ভারতের রপ্তানি বাড়াতে হলে চীনের থেকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি ফিরে দেখা উচিত বলে সওয়াল করেন। সমীক্ষা জানায়, চীনের সংস্থাগুলি এদেশে বিনিয়োগ করলে তা থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন উদ্যোগপতিরা। গতি পাবে উৎপাদন শিল্প। তাদের মাধ্যমে বাড়ানো যাবে ভারতে তৈরি পণ্যের রপ্তানি। তার আগেই মে মাসে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানায়, ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমান ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ৬২.১৭ শতাংশ পড়ে হয়েছে ১,০৫৮ কোটি ডলার, যেখানে একবছর আগে ছিল ২,৮০০ কোটি ডলার (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২২ মে, ২০২৪)। যা ১৭-বছরে সবচেয়ে কম। বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যে সংরক্ষণ নীতি, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারনে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারত পড়ে যায় চ্যালেঞ্জের মুখে। চীনের বিনিয়োগ আনতে পারে অর্থ, প্রযুক্তি এবং আধুনিক পরিচালন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা। উন্নত করতে পারে ভারতে শিল্পকে। কমাতে পারে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিকে। এই পরিস্থিতিই ভারতীয় বুর্জোয়াদের চীনের সঙ্গে ব্যবসার পথ সহজ করার জন্য লবি করতে বাধ্য করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রকের তথ্য বলছে, ভারতে আমদানির শীর্ষে রয়েছে চীন। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-সেপ্টেম্বরের মধ্যে যার পরিমান ছিল ৫,৬২৯ কোটি ডলার। একটি বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়– অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি যে উভয় দেশের জন্যই উপকারী– সেই উপলব্ধি গোটা বিশ্বে ক্রমেই স্বীকৃতি পাচ্ছে। দেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করতে ভারত সরকার ইতিমধ্যেই বৈদ্যুতিক যানবাহন, স্মার্টফোন, সৌর প্যানেল এবং ওষুধের মতো পণ্য উৎপাদনের কিছু শিল্পকে চিহ্নিত করেছে। এই শিল্পগুলির বেশিরভাগের জন্যই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্প্রতিষ্ঠা জরুরি। তবে, উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে চীনা বিনিয়োগের প্রশ্নে ভারতের বর্তমান নেতিবাচক অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। যেমন ২০২৩ সালে একটি ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনকারী চীনের দাপুটে সংস্থা বিওয়াইডি-র একশ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ছিল একটি অদূরদর্শী পদক্ষেপ। বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ব্যাটারি তৈরির প্ল্যান্টটি হলে ভারতের থাকত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে হাতে পাওয়ার সুযোগ। তাছাড়া, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও দুই দেশই নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং গাজা ও পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েলি আগ্রাসন– সম্পদ সরবরাহ, বাণিজ্য রুট এবং দেশগুলির মধ্যে সম্পর্কের উপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বহু দেশই তাদের সমস্ত সম্পর্ক কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরর সঙ্গে রাখার বিপদের কথা উপলব্ধি করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মতো ব্লকগুলি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক দেশই প্রকাশ্যে এই ধরনের ব্লকে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করছে। পশ্চিম এশিয়ার দুই প্রধান শক্তি সৌদি আরব ও ইরানকে সম্প্রতি এই গ্রুপের সদস্য করা হয়েছে। লাতিন আমেরিকার সঙ্গেই ব্রিকসের প্রতি বাড়ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির আগ্রহ। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়া ‘পার্টনার দেশ’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যা চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। চারপাশে এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি যখন হচ্ছে, তখন ভারত তার বাইরে থাকতে পারে না। বিলক্ষণ উপলব্ধি করেছেন ভারতীয় বুর্জোয়ারা। সেকারণে বৈরিতার সম্পর্ক না রেখে ব্লকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এখন স্বাভাবিক চাহিদা। জুলাইয়ের শেষে টোকিওতে ব্রিকসের বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে ভারত-চীন সম্পর্কে কোনও তৃতীয়পক্ষের ভূমিকা খারিজ করে দিয়ে বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, ‘আমাদের একটি সমস্যা আছে ঠিকই, বরং আমি যাকে বলব ভারত ও চীনের মধ্যে একটি ইস্যু রয়েছে... আমি মনে করি এনিয়ে আমাদের দুইয়ের মধ্যেই আলোচনা হতে পারে এবং একটি পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।’ যোগ করেন, ‘ঠিকই, বিশ্বের অন্যান্য দেশের এনিয়ে একটা আগ্রহ থাকতে পারে, কারন আমরা দু’টিই বড় দেশ এবং আমাদের সম্পর্কের অবস্থা বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে ইস্যুটি রয়েছে, তার সমাধানের জন্য আমরা অন্য দেশগুলির দিকে তাকিয়ে নেই (দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২৯ জুলাই, ২০২৪)।’ যা বেজিঙকে দিয়েছে ইতিবাচক বার্তা। ২০২০-তে সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও জোরদার করে। ভারত-চীন বিতর্কিত সীমান্ত সম্পর্কিত রিয়েল-টাইম তথ্য ভাগ করে নেওয়া-সহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করে। এর মধ্যে ছিল আমাদের হিমালয় সীমান্তে সেনাদের গতিবিধি ট্র্যাক করতে ৩১টি সশস্ত্র গার্ডিয়ান ড্রোন কেনার জন্য জন্য ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তি। ভারত মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়াড গ্রুপের সদস্য, যার মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান। এমনকি আরএসএসের মুখপত্র দ্য অর্গানাইজার (পসিবিলিটি অব অ্যান ইন্ডিয়া-চায়না ডিল, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪) পর্যন্ত মন্তব্য করেছে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে এবং তার নীতিগত অবস্থানের অবিশ্বস্ততার পটভূমিতে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি আবার রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাই হবে সরকারের জন্য বিচক্ষণ পদক্ষেপ। এর আগে, মোদী তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর জুলাইয়ের গোড়ায় অর্গানাইজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ভারত কীভাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য পথ তৈরি করছে শিরোনামে নিবন্ধ। তাতে স্পষ্ট বলা হয়, ‘চীনের জিডিপি আমাদের চার গুণের বেশি, এবং দুটি সামরিক বাহিনী কাগজেকলমে এক না’ (মোদী ৩.০: হাউ ইন্ডিয়া ইস সেটিং কোর্স ফর রিলেশানস উইথ চায়না, ১ জুলাই, ২০২৪)। ভারত ও চীনের মধ্যে রয়েছে ৩,৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সীমান্ত। সীমান্তের একটি বড় অংশ সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্কের কারণে। এখন জরুরি হল ভারত-চীন সীমান্ত বিতর্কের সমাধান করার প্রক্রিয়াগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করা। প্রকাশের তারিখ: ২৭-অক্টোবর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |