|
ওপেনহাইমার রহস্য: বিজ্ঞানের শক্তি ও বিজ্ঞানীদের দুর্বলতা (১)প্রবীর পুরকায়স্থ |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তাদের নাগরিকদের একথা বুঝিয়েছিল যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার কারণেই জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। তবে মহাফেজখানা এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে, সেই সময় পরমাণু বোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল জাপানের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেকারণেই জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার জন্য ‘১০ লক্ষ মার্কিন নাগরিকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল’, একথা স্রেফ বোমা ফেলার অপরাধ ঢাকতেই প্রচার করা হয়েছিল। |
নতুন ব্লকবাস্টার ছবি ওপেনহাইমার হিরোশিমা শহরে ফেলা প্রথম পরমাণু বোমার স্মৃতিকে ফিরিয়ে এনেছে। যে সমাজ এই ধরনের বোমা তৈরির অনুমতি দিয়েছিল, এই বোমা ব্যবহার করেছিল এবং এত বিপুল পরিমাণে পরমাণু অস্ত্র মজুতের অনুমতি দিয়েছিল যা এই পৃথিবীকে বহুবার ধ্বংস করতে পারে, সেই সমাজের চরিত্র নিয়েও এই ছবি জটিল সব প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যে সমাজ হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলার অপরাধকে চাপা দিয়ে রেখেছিল এবং বোমা ফেলাকে আমেরিকার একেবারে নিজস্ব স্বার্থে ঘটানো দরকার ছিল বলে দুনিয়াকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল, সেই সমাজের এমন মনোবিকারের সঙ্গে কি কুখ্যাত ম্যাকার্থি যুগ এবং সর্বত্র বেছে বেছে লাল–দের খুঁজে বের করার যুগের সম্পর্ক রয়েছে? প্রথমে পরমাণু বোমার সূতিকাগার ম্যানহাটান প্রজেক্টের ‘নায়ক’ হিসাবে ওপেনহাইমারের উত্থান দেখা গেল। অথচ পরে তাঁকেই ভিলেন বানিয়ে দেওয়া হল এবং তাঁকে ভুলে যাওয়া হল। এই ভোলবদলেরই বা ব্যাখ্যা কী? জাপানে পর পর দুটো শহরে আণবিক বোমা ফেলার ঘটনায় আমেরিকার যে অপরাধবোধ, সেই বিষয়ের সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি হওয়ার প্রসঙ্গটা আমার মনে আছে। ১৯৮৫ সালে ক্যালিফোর্ণিয়ার মনটেরেতে আমি একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। কনফারেন্সের বিষয় ছিল —ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটার কন্ট্রোলস সংক্রান্ত। এই কনফারেন্সের আয়োজক ছিল লরেন্স লিভারমোর ল্যাবরেটরিজ। অস্ত্রশস্ত্র বিষয়ক এই ল্যাবরেটরিতেই তৈরি হয়েছিল হাইড্রোজেন বোমা। ডিনারের টেবিলে একজন পরমাণু বিজ্ঞানীর স্ত্রী একজন জাপানি অধ্যাপককে জিজ্ঞাসা করেন, কেন আমেরিকাকে জাপানে আণবিক বোমা ফেলতে হয়েছিল সেটা কি জাপানিরা বুঝতে পেরেছে? এটা কি জাপানিরা বুঝতে পেরেছে যে এই বোমা ফেলার পরিণামে ১০ লক্ষ মার্কিন সৈন্যের জীবন রক্ষা পেয়েছে? এবং তার ফলে আরও অনেক জাপানি নাগরিকেরও প্রাণ রক্ষা হয়েছে? সব মার্কিনি যে অপরাধের দায় বহন করে চলেছে পরমাণু বিজ্ঞানীর স্ত্রী কি এভাবে সেই অপরাধের দায় থেকে মুক্তি চাইছিলেন? নাকি আণবিক বোমা ফেলা নিয়ে তাঁকে যা বলা হয়েছে এবং তিনি যা বিশ্বাস করেন সেটাই আসলে সত্যি বলে তার সমর্থন চাইছিলেন? তিনি কি একথা বোঝাতে চাইছিলেন যে এমনকী বোমার শিকার হয়েছেন যারা তাঁরাও একই কথা বিশ্বাস করেন? এসব প্রশ্নের সঙ্গে ওপেনহাইমার ছবির কোনও সম্পর্ক নেই। আমি শুধু এই প্রসঙ্গটাকে একটা ভিত্তি হিসাবে উল্লেখ করছি একথা বোঝাতে যে, কেন আণবিক বোমা তৎকালীন সমাজে বহুমুখী ফাটলের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই সময় যুদ্ধ কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছিল শুধু সেকথাই বলতে চাইছি না। আসলে নতুন এই অস্ত্র যুদ্ধের মাপকাঠিটাকেই পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। একইসঙ্গে একথাও বলতে চাইছি যে, আণবিক বোমার কারণে সমাজে এই স্বীকৃতিও এসেছিল যে বিজ্ঞান এখন আর শুধু বিজ্ঞানীদের ভাবনাচিন্তার ব্যাপার থাকবে না, বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের সবাইকে। ল্যাবরেটরিতে তাঁরা যে গবেষণা করেন বাস্তব জগতকে তার পরিণাম ভোগ করতে হয় এবং সেই পরিণামের মধ্যে পড়ে সমগ্র মানবজাতির সম্ভাব্য ধ্বংস —এই কথাটাও বিজ্ঞানীদের সামনে আলোচনার একটা বিষয় হিসাবে হাজির হয়েছিল। একইসঙ্গে একথাও উঠে এসেছিল যে, এটা একটা নতুন যুগ, এযুগ হল বৃহৎ আকারের বিজ্ঞানের যুগ এবং তার জন্য দরকার অনেক, অনেক টাকা! খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, যুদ্ধের পর পরমাণু বোমা–বিরোধী আন্দোলনের একেবারে মূল নেতৃত্ব হিসেবে যে দুজন বিজ্ঞানীর নাম প্রথমেই উঠে আসে, ম্যানহাটান প্রজেক্ট শুরু করার ব্যাপারেও কিন্তু তাদেরই ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। হাঙ্গেরির বিজ্ঞানী লিও সিলার্ড (Leo Szilard) প্রথমে উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন ইংল্যান্ডে। এরপর তিনি চলে যান আমেরিকায়। এরপর আমেরিকা যাতে পরমাণু বোমা তৈরি করে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছে সেই আর্জি জানানোর জন্য তিনি আইনস্টাইনের সহযোগিতা চান। সিলার্ড ভয় পেয়েছিলেন যে নাৎসি জার্মানি যদি প্রথমেই আণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে তাহলে তারা গোটা বিশ্ব জয় করে ফেলবে। সিলার্ড ম্যানহাটান প্রজেক্টে যোগ দেন। তবে তিনি লস অ্যালামসে ছিলেন না। ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর মেটালার্জিক্যাল ল্যাবরেটরিতে। ম্যানহাটান প্রজেক্টের অন্দরে সিলার্ড এই মত প্রচার করেছিলেন যে, জাপানের ওপর বোমা ফেলার আগে বোমার একটা পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হোক। এই বোমা যাতে ব্যবহার করা না হয় সেজন্য আইনস্টাইনও তাঁর আর্জি নিয়ে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কােছ পৌঁছনোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই রুজভেল্টের মৃত্যু হয় এবং প্রেসিডেন্ট পদে বসেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান। ট্রুম্যান ভেবেছিলেন, এই বোমা হাতে থাকলে পরমাণু অস্ত্র হবে আমেরিকার একচেটিয়া অধিকার এবং তার ফলে যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে দাবিয়ে রাখা যাবে। ফিরে যাই ম্যানহাটান প্রজেক্ট প্রসঙ্গে। এমনকি আজকের হিসাবের নিরিখেও এই প্রজেক্টের বিশালত্ব ছিল একেবারে তাক লাগানো। যখন এই প্রজেক্ট চলছিল পুরোদমে তখন এখানে সরাসরি নিয়োজিত ছিলেন ১ লক্ষ ২৫ হাজার জন। এছাড়া সরাসরি কিংবা পরোক্ষে বোমার বিভিন্ন অংশ তৈরির জন্য আরও যে সব শিল্প যুক্ত ছিল তাদের সংখ্যা ধরলে কর্মীসংখ্যা হবে প্রায় ৫ লক্ষ। এই প্রকল্পের খরচও ছিল বিশাল, ১৯৪৫ সালের হিসাবে ২০০ কোটি ডলার (আজকের হিসাবে প্রায় ৩০০০ থেকে ৫০০০ কোটি ডলার)। এতে যুক্ত ছিলেন এলিট গ্রুপের বিজ্ঞানীরা — হান্স বেথে, এনরিকো ফার্মি, নিলস বোর, জেমস ফ্র্যাঙ্ক, ওপেনহাইমার, এডওয়ার্ড টেলার (পরে এই কাহিনির ভিলেন), রিচার্ড ফেইনম্যান, হ্যারল্ড উরে, ক্লাউস ফুকস (যিনি আণবিক বোমার গোপন তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে দিয়ে দিয়েছিলেন) এবং এছাড়াও ছিলেন সোনার মতো দ্যুতিময় সব বিজ্ঞানীরা। ম্যানহাটান প্রজেক্টের নানাবিধ কাজে জড়িয়ে ছিলেন ২৪ জনেরও বেশি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী। তবে এই প্রকল্পের সামান্য অংশই ছিল বিজ্ঞান। ম্যানহাটান প্রজেক্ট দু ধরনের বোমা তৈরি করতে চেয়েছিল। একটা ইউরেনিয়াম ২৩৫এর আইসোটোপ ব্যবহার করে এবং আরেকটি বোমা বানাতে চেয়েছিল প্লুটোনিয়ামকে কাজে লাগিয়ে। ইউ ২৩৫ রেডিও অ্যাকটিভ পদার্থ যা নিজেই ভেঙে যায়। তাহলে ইউ ২৩৮ থেকে আমরা ইউ ২৩৫কে আলাদা করব কীভাবে? আণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায় এমন মানের প্লুটোনিয়ামকেই বা কীভাবে আমরা আলাদা করব? ইউ ২৩৫ এবং প্লুটোনিয়াম— কীভাবে আমরা দুটোই যথেষ্ট পরিমাণে সংগ্রহ করতে পারব? অণুকে ভাঙার জন্য কীভােব আমরা চেন রিঅ্যাকশন ঘটাবো এবং সেজন্য সাব–ক্রিটিক্যাল ফিসাইল মেটেরিয়ালকে একসঙ্গে জড়ো করে কীভাবে ক্রিটিক্যাল মাস তৈরি করব? এসব সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার ধাতু বিশেষজ্ঞ, রাসায়নিক, ইঞ্জিনিয়ার, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ, দরকার সম্পূর্ণ নতুন প্লান্ট তৈরি করা ও নতুন যন্ত্রপাতি জোগাড় করা এবং তা একটা মাত্র জায়গায় নয়, দরকার এমন কয়েকশ প্লান্ট। আর এই সব কিছুই করতে হবে রেকর্ড স্পিডে। বিজ্ঞান –এর এই ‘এক্সপেরিমেন্ট’ এখন আর ল্যাবরেটরির পরিসরে হচ্ছে না, এই কাজ করতে হচ্ছে শিল্পোৎপাদনের মাত্রায়। সেকারণেই দরকার পড়েছিল কোটি কোটি টাকার, দরকার পড়েছিল বিপুল সংখ্যায় মানবিক ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তাদের নাগরিকদের একথা বুঝিয়েছিল যে, হিরোশিমা, এবং তার তিন দিন পর নাগাসাকিতে বোমা ফেলার কারণেই জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। তবে মহাফেজখানা এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এখন এটা স্পষ্ট যে, সেই সময় পরমাণু বোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল জাপানের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেকারণেই জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। ওই সব তথ্য থেকে এটাও এখন প্রমাণিত যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা ফেলার জন্য ‘১০ লক্ষ মার্কিন নাগরিকের জীবন রক্ষা পেয়েছিল’, কারণ ওই বোমা ফেলার জন্যই জাপান আর আগ্রাসন চালাতে পারেনি, — এই যুক্তিরও কোনও ভিত্তি নেই। ১০ লক্ষ মার্কিন নাগরিকের সংখ্যাটা পুরোপুরি প্রচারের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছিল। একেবারে সিরিয়াস হিসাবনিকাশের মতো করেই আমেরিকান জনগণের কাছে এই সংখ্যাটা হাজির করা হয়েছিল। অথচ এই দুটি বোমার শিকার হয়েছিলেন যাঁরা তাঁদের ক্ষয়ক্ষতির আসল চেহারাটা পুরোপুরি সেন্সর করা হয়েছিল। হিরোশিমায় বোমা ফেলার একমাত্র যে ছবিটা তখন পাওয়া যেত তা হল — ব্যাঙের ছাতার মতো সেই মেঘপুঞ্জ— অন্য আরও অনেক ছবির সঙ্গে এই ছবিটাও তুলেছিলেন অ্যানোলা গে বিমানের গানার বা মেশিনগান চালানোর দায়িত্বে থাকা সেনাকর্মী। আণবিক বোমা ফেলার কয়েক মাস পরেও হিরোশিমা ও নাগাসাকির হাতে গোনা যে কয়েকটি ছবি ছাপার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি শুধু ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘরের। বোমায় দগ্ধ কোনও মানুষের ছবি সামনে আনতে দেওয়া হয়নি। পিপলস ডেমোক্রেসি, জুলাই ২৪-৩০,২০২৩
প্রকাশের তারিখ: ০৯-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |