নয়া উদারবাদী জমানায় শ্রমিকশ্রেণি

প্রভাত পট্টনায়েক
পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির লড়াইকে নয়া উদারবাদ যে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলছে সেটা নয়, বরং বর্তমানে যে বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তা হ’ল এতদসত্ত্বেও নয়া উদারবাদকে এখন ক্রমশ বর্ধমান শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গী আন্দোলনের মুখোমুখি হ’তে হচ্ছে। ব্রিটেনে এই বছরে অনেকগুলি রেল ধর্মঘট হয়েছে, গত গ্রীষ্মে ব্রিটেন গত কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তম রেল ধর্মঘট প্রত্যক্ষ করেছিল। এমনকি এখনো রেল কর্মীরা প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোকে  ‘খুবই তুচ্ছ’ ব’লে বলে প্রত্যাখান করেছে এবং ডিসেম্বর- জানুয়ারী মাসে ব্যাপক ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নয়া উদারবাদী জমানা দুনিয়ার যেসব দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সর্বত্রই সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে শ্রেণি ভারসাম্য শ্রমিকশ্রেণির বিরুদ্ধে পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক শ্রেণি ভারসাম্যের এহেন  পরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, এই জমানার বৈশিষ্ট্য হ’ল এখানে পুঁজি যেমন গোটা দুনিয়া জুড়ে গতিশীল, শ্রম কিন্তু তেমন গতিশীল নয়, বরং সে জাতিরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যেই  আবদ্ধ। এই অবস্থায় এক দেশের শ্রমিকশ্রেণিকে অন্য দেশের শ্রমিকদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার সুযোগ গতিশীল পুঁজির কাছে খোলা থাকে, যে সুযোগ সে ইচ্ছেমতো কাজে লাগায়। যদি এক দেশের শ্রমিকরা ধর্মঘটের পথে নামে, তবে পুঁজির কাছে একটা বাড়তি অপশন থাকে যে সে তার উৎপাদন ব্যবস্থা অন্য দেশে স্থানান্তরিত করতে পারে। পুঁজির এই হুমকির মুখে সব দেশের শ্রমিকরা তাদের জঙ্গীপনায় রাশ টানতে বাধ্য হয়। 

পক্ষান্তরে, শ্রমিকরা যদি আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত হ’ত, যেখানে কোনো ধর্মঘট  শুধুমাত্র একটি দেশের মধ্যে না থেকে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ার পাল্টা প্রচ্ছন্ন হুমকি পুঁজির সামনে হাজির করতে পারতো এবং পুঁজির হুমকি তার উদ্দিষ্ট ত্রাস সৃষ্টির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতো। কিন্তু হায়, শ্রমিকশ্রেণি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত নয়। তাই পুঁজির হুমকি কার্যকর হয়। কিন্তু একথা যদিও সত্য যে শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক ভাবে সংগঠিত হলেও, পুঁজি তার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নতুন কোনো লোকেশনে স্থানান্তরিত করতে পারে, কিন্তু সেকাজ নানা কারণেই পুঁজির পক্ষে অত সহজ হবেনা। কিন্তু বাস্তব হ’ল এই যে সারা দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন দেশে বর্তমানে উৎপাদন  পরিকাঠামো ছড়িয়ে রয়েছে এবং শ্রমিকশ্রেণি আন্তর্জাতিকভাবে সঙ্ঘবদ্ধ নয়, এই বাস্তব পরিস্থিতি পুঁজির স্বার্থের পক্ষে কাজ করে এবং প্রত্যেক দেশের শ্রমিকদের দমিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

পুঁজির কেন্দ্রীভবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হ’ল শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গীপনাকে দমিয়ে রাখা। উপরে আমরা যে পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করলাম, সেটা তারই একটি নমুনা মাত্র। কেন্দ্রীভূত পুঁজির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে সে তার বিভিন্ন কাজকর্ম দুনিয়ার নানা ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখে। শ্রমিকদের আন্দোলন জঙ্গী চেহারা নিলে এমন আশঙ্কা থাকে যে পুঁজি তার উৎপাদন ইত্যাকার কাজকর্ম অন্য অঞ্চলে বা অন্য কোনো শাখায় স্থানান্তরিত করতে পারে। নয়া উদারবাদী বিশ্বায়ন পুঁজির কেন্দ্রীভবনের প্রবণতাকে দুনিয়া জুড়ে প্রসারিত করেছে। ফলে শ্রমিকদের জঙ্গী আন্দোলনে কার্যকরভাবে লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। 

দ্বিতীয় কারণটিও ঐ একই উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থের বিরুদ্ধেই ধাবিত। পুঁজির কাজকর্ম যতই উন্নত দেশগুলি (metropolis) থেকে প্রান্তসীমায় অবস্থিত কিছু দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে (মূলত সস্তা মজুরীর কারণে), ততই উন্নত দেশের শ্রমিকদের দর কষাকষি করার এবং প্রত্যাঘাত করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু প্রান্তসীমায় অবস্থিত দেশগুলিতে যে বিপুল শ্রমের মজুত বাহিনী রয়েছে, তার পরিমাণ কিছুমাত্র হ্রাস পায়নি। ফলতঃ, এই দেশগুলির শ্রমিকদের আপেক্ষিক শক্তি বৃদ্ধি পায়নি। 

একথা আজ সর্বজন স্বীকৃত যে প্রান্তিক দেশগুলিতে  শ্রমের বিপুল মজুত বাহিনী থাকার কারণে উন্নত দেশের শ্রমিকশ্রেণির ক্ষমতার পায়ে শেকল পরিয়ে দিয়েছে। কারণ পুঁজির বিশ্বায়নের দৌলতে উভয় প্রান্তের শ্রমিকরা এক অদৃশ্য সম্পর্কে সম্পর্কিত। নয়া উদারবাদ এই পরিস্থিতিকে সুনিশ্চিত করেছে। পূর্বতন যুগের পুঁজিবাদ দুনিয়াকে দুটি অংশে ভাগ করে রেখেছিল—  যেখানে এক অংশ থেকে পুঁজি ও শ্রম অন্য অংশে চলাচল করতে পারতো না, ফলে উন্নত দেশের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে প্রান্তিক দেশগুলির জীবনযাত্রার মানের অনেক ফারাক ছিল। নয়া উদারবাদী জমানায় সেই ফারাক বজায় রাখা সম্ভব নয়। অথচ নয়া উদারবাদ বরাবর এই আশ্বাসবাণী শুনিয়ে এসেছে যে পুঁজি স্থানান্তরণের ফলে প্রান্তিক দেশগুলির অর্থনীতির যে দ্রুত বৃদ্ধি হবে, তাতে শ্রমের মজুত বাহিনীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। নয়া উদারবাদী মতাদর্শ  স্বীকার না করলেও একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে প্রান্তিক দেশগুলিতে শ্রমের বিপুল মজুত বাহিনীর উদ্ভবের পেছনে কারণ হচ্ছে দীর্ঘকালীন উপনিবেশিক ও আধা-উপনিবেশিক শোষণ ও বঞ্চনা। নয়া উদারবাদী জমানায় নাকি এই মজুত বাহিনীর আয়তন কমে আসবে! 

বলাবাহুল্য, এই প্রতিশ্রুতি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বরং এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রান্তিক দেশগুলিতে শ্রমের মজুত বাহিনী হ্রাস পাওয়ার বদলে নয়া উদারবাদী জমানায় তা আরও  ফুলেফেঁপে উঠেছে। নয়া উদারবাদ মানেই হচ্ছে বেকারত্বের আরও বৃদ্ধি, যদিও তার প্রকাশ যে সবসময়ে কর্মচ্যুত শ্রমিকের মাধ্যমেই হবে এমন কোনো মানে নেই, প্রতি শ্রমিকের কাজের দিনের হ্রাসের মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হতে পারে।  

নয়া উদারবাদের দু’টি বৈশিষ্ট্যের কারণে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। প্রথম বৈশিষ্ট্যটি হল ক্ষুদ্র উৎপাদক  এবং কৃষকদের রাষ্ট্র যে সহায়তা প্রদান করে, তা প্রত্যাহার করে নেওয়া, যাতে ক’রে ক্ষুদ্র উৎপাদন-ক্ষেত্রটি বৃহৎ পুঁজি এবং বড় কৃষি-বাণিজ্য গোষ্ঠির জবরদখলের সম্মুখে উন্মুক্ত করে দেওয়া যায়। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে পণ্য ও পরিষেবা যাতে আরও বেশি সহজে দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চলাচল করতে পারে  তার জন্য অর্থনীতিকে উন্মুক্ত ক’রে দেওয়া। এর ফলে আমদানি করা পণ্য ও পরিষেবা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্য ও  পরিষেবার বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে, তাই প্রত্যেক উৎপাদকই বাধ্য হয় বাজারে টিঁকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবিত টেকনোলজি তাদের উৎপাদন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করতে।  পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নতুন উদ্ভাবিত টেকনোলজির লক্ষ্যই হ’ল শ্রমের মজুরীকে ক্রমাগত হ্রাস করা। এর মানে হচ্ছে শ্রমের উৎপাদনশীলতার হারের ক্রমান্বয় বৃদ্ধি এবং তারফলে কর্ম সংস্থানের হারের ক্রমাবনতি। অতঃপর নিজেদের পেশা থেকে উৎখাত হয়ে যে কৃষক ও কারিগররা কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি দিয়েছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তারা কর্মপ্রার্থীর তালিকা আরও লম্বা ক’রে তোলে। কিন্তু সেখানে কাজ তো নেই, উপরন্তু  কর্ম সংস্থানের সুযোগ প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে। অতএব শ্রমের মজুত বাহিনীর আপেক্ষিক আয়তন ক্রমেই স্ফীত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি সব দেশের শ্রমিকশ্রেণির শক্তিকে দুর্বল ক’রে তোলে। 

তৃতীয় যে কারণে দুনিয়া জুড়ে সর্বত্রই শ্রমিকশ্রেণি শক্তিহীন হয়ে পড়ে,তা হ’ল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রগুলির বেসরকারীকরণ। বেসরকারী সংস্থার কর্মীদের থেকে রাষ্টায়ত্ত সংস্থার কর্মীরা অতিঅবশ্যই বেশি সঙ্ঘবদ্ধ, যার প্রমাণ মেলে এই দুই ক্ষেত্রের কর্মীদের ট্রেডইউনিয়নভুক্তির হিসেব দেখলে। উদাহরণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব যে সেখানে সরকারী ক্ষেত্রের (শিক্ষাক্ষেত্র সহ) কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশই ইউনিয়নভুক্ত, অথচ বেসরকারীক্ষেত্রে সেই সংখ্যাটা হচ্ছে মাত্র ৭ শতাংশ। এর নির্গলিতার্থ হচ্ছে বেসরকারীকরণ শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গীপনা দমিয়ে দেয়, এইভাবে অর্থনীতির সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের শ্রেণি-মেজাজের অধঃপতন ঘটে। এই কারণেই বিশেষত ফ্রান্সে সরকারী ক্ষেত্রের আধিপত্যের ফলে এখনো শ্রমিকদের জঙ্গী আন্দোলন দেখতে পাওয়া যায়। ভারতে একদা সরকারী ক্ষেত্রের যথেষ্ট উপস্থিতির কারণে শ্রমিকশ্রেণির গৌরবময় সংগ্রামের যে উজ্জ্বল ইতিহাস ছিল, ক্রমান্বয় বেসরকারীকরণের ফলে সেইরূপ সংগ্রাম  সংগঠিত করা আজকাল কষ্টসাধ্য হ’য়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে এখানে ট্রেডইউনিয়নের কাজের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ক্ষুদ্র উৎপাদন সংস্থাগুলি।
পুঁজির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির লড়াইকে নয়া উদারবাদ যে ক্রমাগত দুর্বল করে তুলছে সেটা নয়, বরং বর্তমানে যে বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে তা হ’ল এতদসত্ত্বেও নয়া উদারবাদকে এখন ক্রমশ বর্ধমান শ্রমিকশ্রেণির জঙ্গী আন্দোলনের মুখোমুখি হ’তে হচ্ছে। ব্রিটেনে এই বছরে অনেকগুলি রেল ধর্মঘট হয়েছে, গত গ্রীষ্মে ব্রিটেন গত কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তম রেল ধর্মঘট প্রত্যক্ষ করেছিল। এমনকি এখনো রেল কর্মীরা প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোকে  ‘খুবই তুচ্ছ’ ব’লে বলে প্রত্যাখান করেছে এবং ডিসেম্বর- জানুয়ারী মাসে ব্যাপক ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা শুধু একা নন, পোষ্টাল কর্মীরা, নার্সদের সংগঠন, আম্বুলেন্স কর্মীরা এবং আরও অনেকে হয় ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করেছে অথবা অচিরেই লড়াইয়ে নামতে চলেছে। চারিদিকে এই সংগ্রামের বিস্ফোরণ এমনি সংকটজনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে শাসক কনজারভেটিভ দলের চেয়ারম্যান বলেছেন ,আমরা সেনাপাঠিয়ে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবাগুলি’ সচল রাখার চেষ্টা করব। ওদিকে জার্মানীতে বন্দর কর্মীরা, গণপরিবহনের কর্মীরা, উড়ানের নিরাপত্তা কর্মীরা, নির্মাণ কর্মীরা এবং রেল কর্মীরা হয় ধর্মঘটে নিয়োজিত অথবা অচিরেই লড়াইয়ে নামতে চলেছে। একই কথা ইয়োরোপের অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অন্য কথায় বলতে গেলে নয়া উদারবাদী জমানায় শ্রমিকশ্রেণির যে আপাত মুহ্যমানতা দেখা দিয়েছিল, সেই অবস্থার লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

শ্রমিকদের মধ্যে জঙ্গী সংগ্রামের যে উত্থান দেখা যাচ্ছে, পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যমগুলি সাধারণভাবে তার কারণ হিসেবে মুদ্রাস্ফীতিকে চিহ্নিত করেছে, যা আবার ইউক্রেন যুদ্ধ অথবা কোভিডের কারণে উদ্ভুত যোগান শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটার কারণে উদ্ভুত হয়েছে। বলাবাহুল্য  এইসব কারণ নয়া উদারবাদের অন্তর্নিহিত কার্য-কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। 

এই ব্যাখ্যা দুটি স্বতঃসিদ্ধ কারণেই যথেষ্ট নয়। প্রথমত, কোভিড অথবা ইউক্রেন যুদ্ধ কোনোটাই নয়া উদারবাদী কাজকর্মের বহিস্থ কারণে ঘটেনি। ইউক্রেন যুদ্ধের উৎপত্তির কারণ খুঁজলে দেখা যাবে যে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা এই যুদ্ধের উৎপত্তির মূল কারণ। এই সাম্রাজ্যবাদকেই নয়া উদারবাদ তোষণ করে চলে, তাকেই ঠেকনা দেয়। এমনকি কোভিডের ঘটনাও নয়া উদারবাদের বহিস্থ কারণ নয়। এই রোগ এতটা প্রসারিত ও তীব্র হতে পারতো না যদি এই রোগের প্রতিষেধকের ওপরে পাশ্চাত্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হ’ত। এছাড়াও ল্যান্সেটের একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট দেখিয়ে দিয়েছে যে কোভিডের উৎপত্তি ও প্রসার যে গবেষণাগার থেকে ঘটে, সে গবেষণাগারটি সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বাবধানে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। 

সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি যে নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের কর্মকান্ডের বহিস্থ কোনো কারণে ঘটেনি তার  দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এইরূপঃ পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, যখনই পুঁজিবাদ সংকটের মধ্যে পড়ে,  সেই সংকটের সমাধানের জন্য সে যে পদক্ষেপ নেয় তাতে প্রায়শই এক নতুন ধরণের সংকট সৃষ্টি হয়। নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের প্রবণতা হচ্ছে অতি-উৎপাদন, কারণ তাতে বিশ্ব জোড়া সামগ্রিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে শুধু নয়, প্রত্যেক দেশের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতেও মোট উৎপাদিত পণ্যে উদবৃত্তের ভাগ বেড়ে যায় এই সমস্যার সমাধানে জন্য পুঁজিবাদী দুনিয়ার নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুদের হার প্রায় শূণ্যের কাছকাছি বেঁধে রেখেছিল এবং “quantitative easing”-এর নামে বিপুল টাকা অর্থনীতিতে ঢেলেছিল। একজন পুঁজিপতি বিশেষ কোন পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সেই পদক্ষেপে কী কী ঝুঁকি রয়েছে সেগুলির মূল্যায়ন করে। খুব কম সুদে বিপুল অর্থের সহজ সংস্থান কর্পোরেটদের কাছে প্রায় কোনো ঝুঁকি ছাড়াই তাদের মুনাফাকে বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ এনে দেয়। এই কারণে বহু আমেরিকান কর্পোরেশন প্রথম সুযোগেই তাদের মুনাফার হার বাড়িয়ে নেয় যার ফলে সাম্প্রতিক মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে। মুদ্রাস্ফীতি মাথা চাড়া দেওয়ার আরও কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে কিন্তু এই মূল কারণটিকে যেন আমরা বিস্মৃত না হই। শ্রমিকদের জীবনযাপনের মানের ওপর এই প্রত্যক্ষ আক্রমণই তাদের ক্রোধ ও ক্ষোভকে এইরূপ আগ্নেয় ক’রে তুলেছে। শ্রমিকদের জীবনধারণের মানের ওপর এই আক্রমণ আসলে সংকটের কানাগলিতে আটকে পড়া নয়া উদারবাদের নিজেকে উদ্ধার করার এক মরিয়া প্রয়াস।


সূত্র: পিপলস ডেমোক্র্যাসি, ডিসেম্বর ০৫-১১-২০২২। 
ভাষান্তরঃ নন্দন রায়


প্রকাশের তারিখ: ০৫-জানুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org