|
অঘোষিত জরুরি অবস্থাটিম মার্কসবাদী পথ |
আমাদের এফআইআর–এর কপি দেওয়া হয়নি, কিংবা আমাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলি সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে এবং বিশদে কিছুই জানানো হয়নি। নিউজক্লিকের অফিস থেকে এবং সংস্থার কর্মীদের বাড়ি থেকে বৈদ্যুতিন ডিভাইজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনও রকম বৈধ প্রক্রিয়া মানা হয়নি। এই ধরনের ব্যাপারে বৈধ প্রক্রিয়া বলতে বোঝায় যা যা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সেগুলির মেমো দেওয়া, বাজেয়াপ্ত করার তথ্যের হ্যাশ ভ্যালু নির্ধারণ করা, এমনকী বাজেয়াপ্ত করা তথ্যের কপি দেওয়া। |
ইউএপিএ ধারায় গ্রেপ্তার প্রবীর পুরকায়স্থ। নিউজক্লিক ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জরুরি অবস্থার দিনগুলিতেও পুরো সময় জেলে ছিলেন তিনি। এখন অঘোষিত জরুরি অবস্থা। এমারজেন্সি-টু। ম্যাকার্থি-যুগ! ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! এবং দ্রুতই তা প্রহসনে পরিণত! নিউজক্লিক বিরুদ্ধতার কণ্ঠস্বর। শ্রমজীবীর লড়াই, গণতন্ত্রের স্বর। পুরকায়স্থের ‘অপরাধ’ তিনি গরিব মানুষের কণ্ঠস্বর। সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিশ্বস্ত সৈনিক। যুক্তিবাদের প্রচারক। কোনও চার্জ ছাড়াই তাই ইউএপিএ ধারায় গ্রেপ্তার। সঙ্গে গ্রেপ্তার প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত অমিত চক্রবর্তী। দিল্লি, গাজিয়াবাদ, গুরগাঁও, নয়ডা, মুম্বাই। মঙ্গলবার ভোর সকালে একসঙ্গে পাঁচ শহরে একশ’র বেশি জায়গায় পাঁচশ পুলিশের হানা। টার্গেট নিউজক্লিক। আটক করা হয় সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, জনবিজ্ঞান কর্মী ডি রঘুনন্দন, সাংবাদিক অভিসার শর্মা, ভাষা সিং, বরিষ্ঠ সাংবাদিক উর্মিলেশ, সুবোধ ভার্মা, লেখিকা গীতা হরিহরণ, সাংবাদিক অনিন্দ্য চক্রবর্তী, কার্টুনিস্ট ইরফান, সমাজকর্মী সোহেল হাসমি, অনুরাধা রমন, সত্যম তিওয়ারি, অদিতি নিগম, সুমেধা পাল, কৌতুকশিল্পী সঞ্জয় রাজাউরাকে। কেড়ে নেওয়া হয় তাঁদের সমস্ত ডিভাইস, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন। অথচ, তল্লাশির সময় দেখানো হয়নি কোনও এফআইএর’র কপি। কিংবা কোনও লিখিত নির্দেশ। এই প্রথম নয়। ২০২১ থেকেই সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লক্ষ্য নিউজক্লিক। ইডি, দিল্লি পুলিশের আর্থিক বিভাগ থেকে আয়কর দপ্তর। প্রতিটি তল্লাশির সময়ই কেড়ে নেওয়া হয় সমস্ত ডিভাইস, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন। মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেলে খতিয়ে দেখা হয় যাবতীয় ই-মেল থেকে ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট থেকে ইনভয়েস। তারপরেও গত দু’বছরে নিউজক্লিক-এর বিরুদ্ধে অর্থ নয়ছয়ের কোনও অভিযোগ আনতে পারেনি ইডি। কোনও চার্জশিট গঠন করতে পারেনি দিল্লি পুলিশের আর্থিক বিভাগ। আয়কর দপ্তর পারেনি তার পদক্ষেপের কোনও ব্যাখ্যা দিতে। স্বাভাবিক। মোদীর ভারতে এটাই দস্তুর। নির্ভীক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর কর্তৃত্ববাদ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারের ওপর নির্লজ্জ আক্রমণ। এই সরকার শুধু একনায়কতান্ত্রিক নয়। ফ্যাসিস্ত। সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কথা বললেই দেশদ্রোহীর তকমা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। নানাভাবে হেনস্তা। বিবিসি, নিউজলন্ড্রি, দৈনিক ভাস্কর, ভারত সমাচার, দ্য কাশ্মীরওয়ালা, দ্য ওয়্যার’র মতো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে দমিয়ে রাখা। সমাজের বিবেক যারা, তারাই এখন নিশানায়। আইনি জালে বেঁধে ফেলার পরিকল্পিত চক্রান্ত। সেইসঙ্গেই, সংবাদমাধ্যম যাতে কোনও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরতে না-পারে সেজন্য তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মতো দমনমূলক আইন। অথচ, যে-সংবাদমাধ্যম বিভাজন, বিদ্বেষের বিষ ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে নেই কোনও পদক্ষেপ। এখানে নবান্ন-ও চায় না কোনও সমালোচনা। চায় শুধু ‘পজিটিভ’ খবর। সরকারের সমালোচনা মানেই নেতিবাচক খবর। হাওড়ার শরৎ সদনে জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী তাই প্রকাশ্যে বলেন, ‘পজিটিভ খবর করুন। বিজ্ঞাপন পাবেন।’ যোগ করেন, ছাপার পরে সেগুলি জেলাশাসক, পুলিশ সুপার ও স্থানীয় থানার আইসি-র কাছে পাঠান। তাঁরা দেখে নেবেন, খবর ‘পজিটিভ’ না ‘নেগেটিভ’। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচকে ভারত এখন ১৮০টি দেশের তালিকায় নিচের দিক থেকে কুড়িটি দেশের মধ্যে। ভারতের স্থান ১৬১। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। আমাদের চেয়ে এগারো-ধাপ এগিয়ে পড়শি দেশ পাকিস্তান (স্থান ১৫০), স্বাধীনতার পর যারা চারবার সেনাশাসনের সাক্ষী। এমনকি ছাব্বিশ-ধাপ এগিয়ে শ্রীলঙ্কা (স্থান ১৩৫)। যে গণতান্ত্রিক কোরিয়া নিয়ে দুনিয়াজুড়ে হইচই, তারাও এগিয়ে উনিশ-ধাপ। ঘটনা হলো, মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক সূচকে ভারতের অবনতি হয়েই চলেছে। ন’বছরে নেমেছে একুশ ধাপ। এখন নীরবতা মানে অপরাধ। ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য। এখন প্রতিবাদ-প্রতিরোধই একমাত্র পথ। এই সংগ্রামে সবার সঙ্গে সঙ্গী মার্কসবাদী পথ-ও। –টিম মার্কসবাদী পথ দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল ৩ অক্টোবর যে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে সেবিষয়ে নিউজক্লিকের বিবৃতি নিউজক্লিক টিম, ৪ অক্টোবর, ২০২৩ (আমাদের এফআইআর–এর কপি দেওয়া হয়নি। কিংবা যেসব তথাকথিত অপরাধের অভিযোগ আমাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে সেগুলি নির্দিষ্টভাবে এবং বিশদে আমাদের জানানো হয়নি। উপযুক্ত প্রক্রিয়া না-মেনেই নিউজক্লিকের অফিস থেকে এবং কর্মীদের বাড়ি থেকে বৈদ্যুতিন ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।) আমরা যেটুকু খবর যোগাড় করতে পেরেছি তা হল নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। নিউজক্লিকের ওয়েবসাইটে নির্দিষ্ট অভিপ্রায় নিয়েই চীনের হয়ে প্রচার চালানোর জন্য এই ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ভারত সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি সেই ২০২১ সাল থেকে নিউজক্লিককে টার্গেট করে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এনফোর্সমেন্ট বিভাগ, দিল্লি পুলিশের ইকনমিক অফেন্স উইং এবং আয়কর বিভাগ নিউজক্লিকের অফিস এবং সংস্থার আধিকারিকদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। অতীতেও সব ডিভাইস, ল্যাপটপ, গ্যাজেট, ফোন ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেলে সব ই-মেল এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে নিউজক্লিকের ব্যাঙ্কের সব স্টেটমেন্ট, ইনভয়েস, কোন খাতে কত খরচ, এবং কোথা থেকে টাকা এসেছে, সেগুলি বারে বারে সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। সংস্থার বিভিন্ন ডিরেক্টরদের এবং সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যদের একাধিক বার ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সরকারের এজেন্সিগুলি। তবুও গত ২ বছরের কিছু বেশি সময়জুড়ে এনফোর্স বিভাগ নিউজক্লিককে অভিযুক্ত করে অর্থ নয়ছয়ের একটা অভিযোগও দায়ের করতে পারেনি। দিল্লি পুলিশের ইকনমিক অফেন্স উইংও ভারতীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধির অধীনে কোনও অপরাধেই নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে একটাও চার্জশিট দায়ের করতে পারেনি। আদালতের সামনে আয়কর বিভাগও তাদের কাজের সমর্থনে কোনও অজুহাতই দিতে পারেনি। গত কয়েক মাসে প্রবীর পুরকায়স্থকে এমনকী কোনও এজেন্সির তরফেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয়নি। নিউজক্লিক সম্পর্কে সবরকম তথ্য, নথি এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত তথ্য তাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও সরকার নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগেরই প্রমাণ দিতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভুয়ো একটি নিবন্ধ তাদের দরকার হয়ে পড়েছিল দানবীয় ইউএপিএ আইন কার্যকর করার জন্য। এবং যেসব স্বাধীন ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর প্রকৃত ভারতের ছবি তুলে ধরে — কৃষকদের, শ্রমিকদের, চাষিদের এবং সমাজের অধিকাংশ সময়ে অবহেলিত অংশের কথা তুলে ধরে— তাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে চাইছে সরকার, চাইছে তাদের গলা টিপে দমবন্ধ করে মারতে। রেকর্ড রাখার জন্য আমরা বলতে চাই: ১। নিউজক্লিক একটি স্বাধীন খবরের ওয়েবসাইট আদালতের ওপর এবং বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য এবং ভারতের সংবিধানের দেখানো পথে আমাদের জীবনের জন্য আমরা লড়াই করব। নিউজক্লিক-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিটির বাংলা ভাষান্তর।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |