উত্তরপ্রদেশ: চ্যালেঞ্জের মুখে হিন্দুত্বের সমীকরণ

সুচিক্কণ দাস
আসলে বিজেপি উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত দল। তাদের হিন্দুত্বের সমীকরণটা এরকম: ধর্মীয় পরিচিতি-সত্তাকে জাগিয়ে তুলে, তাকে ব্যবহার করে সমাজের নিচুতলা অর্থাৎ ওবিসি, দলিত, আদিবাসীদের হিন্দুত্বের আওতায় এনে ফেলা এবং এভাবে স্থায়ী ভোট-ব্যাঙ্ক তৈরি করা। এই ফর্মুলাতেই ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের ভোটে সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। এবারের ভোটে ঠিক সেই জায়গাতেই ঘা দিয়েছেন অখিলেশ যাদব। বিজেপির মোকাবিলায় অখিলেশের এবারের ফর্মুলা ছিল পিডিএ- পিছড়ে বর্গ, দলিত ও অল্পসংখ্যক। এই তিন গোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের ওবিসি, এসসি, এসটি, দলিত ও আদিবাসীরা।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন ও তার ফলাফল কোনও মামুলি বিষয় নয়। ভারত ভাবনা, ভারতের তৃণমূল স্তরে গণতন্ত্র, শীর্ষস্তরে সংসদীয় গণতন্ত্র, সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বহুত্ববাদ– এসবের রক্ষায় এক অভূতপূর্ব ভূমিকা রয়েছে এবারের লোকসভা নির্বাচনের। এই নির্বাচন ও তার ফলাফলের তাৎপর্য, দেশের প্রতিটি রাজ্যওয়াড়ি বিশ্লেষণ করা জরুরি। এখানে আমরা উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন ও তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করব।

হিন্দুত্বের গড়েই বিধ্বস্ত হিন্দুত্ব

ভারতে বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্বের রাজনীতির সূতিকাগার ও পরীক্ষাগার হল গুজরাট। দু’দশক ধরে সেখানে সফল পরীক্ষানিরীক্ষার পর হিন্দি বলয়ে প্রথমে উত্তরপ্রদেশকেই টার্গেট করেছিল বিজেপি-আরএসএস। লক্ষ্য ছিল গুজরাটের সমীকরণকে উত্তরপ্রদেশে প্রয়োগ করে হিন্দুত্বের ভোট ব্যাঙ্ককে স্থায়ীভাবে সংহত করা। সেই লক্ষ্যেই গত এক দশক ধরে নানা প্রচেষ্টা চলেছে নরেন্দ্র মোদী, যোগী আদিত্যনাথ ও অমিত শাহের নেতৃত্বে। এবারের নির্বাচনের ফলে স্পষ্ট, গত এক দশকের প্রয়াসকে ছিন্নভিন্ন করে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির একেবারে ভিত্তিমূলে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের ভোটারদের এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। হিন্দি বলয়ে হিন্দুত্ব রাজনীতির এই পিছু হঠার প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী। 

ভোট কমেছে বিজেপির

বিজেপির হিন্দুত্বের ভিতের ফাটল ধরাটা একমাত্রিক নয়, বহুমাত্রিক। 

প্রথমে একনজরে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের কথাই ধরা যাক। এবারের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি এককভাবে ভোট পেয়েছে ৪১.৪ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৪৯.৬ শতাংশ। অর্থাৎ এবার শুধুমাত্র বিজেপির ভোট কমেছে ৮.২ শতাংশ। রাজ্যের যে ৭৫টি আসনে এবার বিজেপি প্রার্থীরা লড়েছিলেন তার মধ্যে ৭২টি আসনেই বিজেপির ভোট কমেছে। এছাড়া শরিকদের নিয়ে ধরলে বিজেপির ভোটের শতাংশ দাঁড়িয়েছে ৪৪.১২ শতাংশ। অন্যদিকে ইন্ডিয়া জোটের প্রাপ্ত ভোটের হার ৪২.৭ শতাংশ (যার মধ্যে এককভাবে সমাজবাদী পার্টির ৩১.৯৮ শতাংশ এবং কংগ্রেসের ১০.৬৪ শতাংশ)। সেই হিসাবে ধরলে এবার বিপুল হারে বেড়েছে বিজেপি বিরোধীদের ভোট। যোগী রাজ্যে লোকসভা ভোটে পরাজিত হয়েছেন ৬ জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। দলের আসন সংখ্যা ৬২ থেকে নেমে এসেছে ৩৩-এ। যোগী মন্ত্রিসভার ১৬ জন মন্ত্রী তাদের বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটে পিছিয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা বারাণসীতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর জয়ের ব্যবধান ৪ লক্ষ ৭৯ হাজার থেকে কমে হয়েছে ১ লক্ষ ৫২ হাজার। জয়ের ব্যবধান কমেছে রাজনাথ সিং-এরও। সবচেয়ে বড় কথা, যে রামমন্দির ছিল এবারের ভোটে মোদীর তুরুপের তাস, যে অযোধ্যায় এত ঘটা করে উদ্বোধন করা হল রামমন্দিরের, সেই অযোধ্যা যে ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেই ফৈজাবাদ কেন্দ্রেই ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিজেপির দুবারের সাংসদ লাল্লু সিং। জিতেছেন সমাজবাদী পার্টির দলিত প্রার্থী অবধেশ প্রসাদ। এমন একটা কেন্দ্রে দলিত প্রার্থীর কাছে হিন্দুত্ববাদী প্রার্থীর পরাজয়ের ধাক্কা বিজেপির হজম করতে অনেক সময় লাগবে।
 
উত্তরপ্রদেশে ‘দুই’ ভারত

একে একে দেখা যাক–

■ উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ১৭টি আসনই সংরক্ষিত। ২০১৪ সালে এই হিন্দুত্বের সমীকরণে ১৭টি আসনই জিতেছিল বিজেপি। ২০১৯ সালেও বিজেপি মোদী হাওয়ায় ১৪টি ও বিজেপি সমর্থিত আপনা দল একটি আসনে জেতে। ২টি আসন জিতেছিল বিএসপি। এবারের ভোটে বিজেপি ১৭টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে জিতেছে মাত্র ৮টি আসনে। অন্যদিকে সমাজবাদী পার্টি ৭টি, কংগ্রেস ও আজাদ সমাজ পার্টি একটি করে আসন জিতে নিয়েছে। এবারের ভোটে এতগুলি নিশ্চিত আসন কেড়ে নিয়ে হিন্দুত্বের গড়েই বিজেপি-র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে সফল ভাবে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে বিরোধীরা।

■ উত্তরপ্রদেশের খরাপ্রবণ বুন্দেলখণ্ড এলাকা। এখানে ওবিসি ও দলিতরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানকার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই এবার জয়ী সমাজবাদী পার্টি। বিজেপি জিতেছে একটি মাত্র আসনে।

■ পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ এবং রোহিলখণ্ড এলাকা বিজেপি ও আরএলডি-র অনেকদিনের শক্ত ঘাঁটি। অথচ এই দুই অঞ্চল থেকে এবার ৯টি আসনে জয়ী হয়েছেন সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসপ্রার্থীরা। এই এলাকায় আবার জাঠেদের আধিপত্য।

■ ২০১৩ - হিন্দু ভোট সংহত করতে ২০১৩ সালে দাঙ্গা লাগানো হয় জাঠ ও মুসলিমদের মধ্যে। দাঙ্গা বাধানো হয় মুজফফরনগর ও কৈরানা এলাকায়। এজন্য যে ভুয়ো গল্পটা ছড়ানো হয়েছিল তা হল, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ায় এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে জাঠদের। এই প্রচারের জেরে দাঙ্গা এবং শেষে বিজেপির ভোট বৃদ্ধি। বিজেপির পিছনে জাঠেরা ঐক্যবদ্ধ। মুসলিমরা একঘরে। ২০২৪-এ এই মুজফফরনগরে আসনে হেরেছেন বিজেপির সঞ্জীব বালিয়ান। জয়ী সমাজবাদী পার্টির হরেন্দ্র সিং মালিক। একইভাবে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের লক্ষ্যে দাঙ্গা লাগানো হয়েছিল কৈরানায়। এবার কৈরানায় জিতেছেন সমাজবাদী পার্টির ইকরা চৌধুরী। ২৮বছরের তরুণী। এবারে মুজফফরনগর ও কৈরানা, দুটি কেন্দ্রেই ভোটপ্রচারে দলে-দলে ভিড় করেছেন সব সম্প্রদায়ের মানুষ। পুরানো বিভেদ ভুলে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতির সুর বেঁধে দিয়েছিল এক বছরের দীর্ঘস্থায়ী কৃষক আন্দোলন।  

■ উত্তরপ্রদেশের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল থেকে বিরোধীরা জিতেছেন ২৫টি আসনে। দক্ষিণ‌, মধ্য ও পূর্ব উত্তর প্রদেশে ৪টি বাদে সব আসনে হেরেছে বিজেপি।

■ অওধ অঞ্চলেও খেরি, ধৌরাহা এবং মোহনলালগঞ্জের মতো কঠিন আসন জিতেছে বিরোধীরা। এরমধ্যে রয়েছেন পরাজিত প্রার্থী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় মিশ্র টেনি, যার ছেলের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের গুলি করে মারার অভিযোগ রয়েছে। কৃষকেরা আগেই বলেছিলেন, এবার ভোটে বিজেপিকে শিক্ষা দেবেন তাঁরা। দিয়েছেন একেবারে নিঃশব্দে।

এভাবে যদি সংরক্ষিত আসন, বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এলাকা-ভিত্তিক আসন, উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল-ভিত্তিক আসনের নিরিখে বিচার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে বিজেপির সযত্নে লালিত হিন্দুত্বের উত্তরপ্রদেশের রঙ বহু জায়গায় বদলে গিয়েছে।

কীভাবে এটা সম্ভব হল? 

এই পরিবর্তনের পিছনে অবশ্যই রয়েছে গভীরভাবে প্রভাবিত করার মতো অর্থনৈতিক কারণ। রেকর্ড বেকারি, চড়া হারে মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে ধারাবাহিকভাবে সারা বছর উঁচু হারে খাদ্যপণ্যের খুচরো মূল্যস্ফীতি, অগ্নিবীরের মতো প্রকল্প, যা বেকার যুবকদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে– এমন সমস্ত ইস্যুই একত্রিত হয়ে ধর্মীয় মৌলবাদের মোড়কে ঢাকা বিজেপির আসল চেহারাটা নগ্ন করে দিয়েছে। তবে কারণ আরও আছে।

হিন্দুত্ব বনাম ‘‌দলিত, পিছড়ে, অল্পসংখ্যক’

আসলে বিজেপি উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত দল। তাদের হিন্দুত্বের সমীকরণটা এরকম: ধর্মীয় পরিচিতি-সত্তাকে জাগিয়ে তুলে, তাকে ব্যবহার করে সমাজের নিচুতলা অর্থাৎ ওবিসি, দলিত, আদিবাসীদের হিন্দুত্বের আওতায় এনে ফেলা এবং এভাবে স্থায়ী ভোট-ব্যাঙ্ক তৈরি করা। এই ফর্মুলাতেই ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের ভোটে সাফল্য পেয়েছিল বিজেপি। এবারের ভোটে ঠিক সেই জায়গাতেই ঘা দিয়েছেন অখিলেশ যাদব। বিজেপির মোকাবিলায় অখিলেশের এবারের ফর্মুলা ছিল পিডিএ- পিছড়ে বর্গ, দলিত ও অল্পসংখ্যক। এই তিন গোষ্ঠীর মধ্যেই রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের ওবিসি, এসসি, এসটি, দলিত ও আদিবাসীরা। হিন্দুত্বের নামে বিজেপি তাদের ছাতার তলায় যাদের জড়ো করেছিল, তারা আদতে সামাজিক ন্যায়ের শক্তি। তাদের একটা সময়ে জিতে নিয়েছিল বিজেপি। সমাজবাদী পার্টি-কংগ্রেস জোট তাদের এই পুরানো শক্তিকেই এবার সফলভাবে পৃথক গঠবন্ধনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। সামাজিক ন্যায়ের পক্ষের শক্তিগুলির নিচুতলার এই জোটই বিজেপির হিন্দুত্বের ভিতে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন এরা বিজেপি শিবির ত্যাগ করল? কেন ধর্মের আঠা আর তাদের বেঁধে রাখতে পারল না? এখানেই চলে আসবে সংবিধান ও সংরক্ষণ ইস্যু। 

বেকার সমস্যা, সংবিধান, সংরক্ষণ

এবারের ভোটে রামমন্দির সহ অন্যান্য ধর্মীয় ইস্যু এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইস্যুকে ছাপিয়ে জীবন-জীবিকার ইস্যু বড় হয়ে উঠেছিল, একথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও একটা ইস্যু বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটা হল সংবিধান ও সংরক্ষণের ইস্যু। উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের ভোটদাতাদের যারা বিশাল একটা অংশ, সেই তফসিলি জাতি, উপজাতি, ওবিসি ও দলিতেরা– সংবিধান ও সংরক্ষণের ইস্যুতে এবার রীতমতো আলোড়িত হয়েছে। তাই বারে বারে প্রধানমন্ত্রী মোদী ও অমিত শাহ সহ বিজেপির সব শীর্ষ নেতাদের প্রচারে গিয়ে বলতে হয়েছে, ‘আমরা সংবিধান বদলাব না। আমরা সংরক্ষণ তুলে দেব না।’ যারা ৪০০ পারের আসন চেয়েছিল সংবিধান বদলে দিয়ে এদেশকে হিন্দু রাষ্ট্র করবে বলে, যারা উচ্চবর্ণের দাবি মেনে অনেকদিন থেকে বলে আসছে সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার কথা, হঠাৎ কেন তাদের মুখে সংবিধান-প্রেমের কথা। আসলে সংবিধান ও সংরক্ষণকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিপুল সামাজিক আলোড়নের ঘূর্ণিপাকে পড়ে বিজেপি দিশা হারিয়েছে। এবং শেষ পর্যন্ত তীব্রতম বিভেদের রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না। 

একথা সকলেরই জানা যে, বিজেপি সমর্থক উচ্চবর্ণের সঙ্গে তফসিলি জাতি, উপজাতি, ওবিসি ও দলিতদের জলচল নেই। তাই ব্যবসা বাণিজ্য করে এদের পক্ষে বড় হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় হোটেল, রেস্তোরাঁ খোলা বা নানা ধরনের ছোটখাটো উদ্যোগ শুরু করা। কারণ উচ্চবর্ণের লোকেরা কোনওভাবেই ক্রেতা হিসাবে পিছড়ে বর্গের ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে না। শুধু নিচু জাতির ভোটটাই বিজেপির উচ্চবর্ণের নেতৃত্বের দরকার। অন্যদিকে তফসিলি জাতি, উপজাতি, ওবিসি ও দলিতদের একটা বিরাট অংশ গরিব। তাদের নিজস্ব জমিজায়গা সীমিত। ফলে গতরে খাটা ছাড়া তাদের কোনও উপায় নেই।

কিন্তু অর্থনীতির চাকা যদি স্তব্ধ হয়ে যায়, তাহলে কি শহরে, কি গ্রামে কাজ জোটে না। বাড়তে থাকে মজুত শ্রমের বিশাল বাহিনী। এই রকম একটা পরিস্থিতিতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ইস্যুটি। সংরক্ষণের আওতায় পড়াশোনা করে সমাজের নীচুতলার ছেলেমেয়েদের একাংশ ওপরের দিকে উঠতে আসতে পারে। এবং তারাই সংরক্ষণের আওতায় থাকা সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন করতে পারে। সেকারণে প্রবল বেকারত্বের মধ্যে পিছিয়ে পড়া অংশের তরুণ তরুণীদের বিপুল প্রত্যাশা থাকে শিক্ষায় ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণকে ঘিরে। এই সংরক্ষণ আবার নিশ্চিত করেছে এদেশের সংবিধান। ফলে সংরক্ষণকে রক্ষা করার মানে দাঁড়ায় সংবিধানকেও রক্ষা করা। আর সংবিধান রক্ষা করার লড়াইয়ে সামিল হলে রক্ষা করতে হয় ধর্মনিরপেক্ষতাকে, ভারতের বহুত্ববাদকে, ভারত ভাবনাকে। এভাবে সংরক্ষণ ও সংবিধান রক্ষার লড়াই ‘সূত্রে মণি গণাইব’ আরও অনেক কিছুর সঙ্গে মালা হিসাবে গাঁথা হয়ে যায়, আর সেই মালা কঠোর ফাঁস হয়ে চেপে বসে বিজেপির গলায়, যা হয়েছে এবারের লোকসভা নির্বাচনে গোটা উত্তরপ্রদেশসহ হিন্দি বলয়জুড়ে। এই বলয়গ্রাস থেকে বিজেপির রেহাই পাওয়া কঠিন। কারণ এর বিপরীত কোনও ভাষ্য গড়ে তোলা সহজ নয়।  

আপনি যদি একদিকে বলেন, সংসদে চারশো সাংসদ পেলে সংবিধান বদলে দেব, আর অন্যদিকে বেকারত্ব বেড়েই চলে, তাহলে সংরক্ষণকে ঘিরে স্বপ্ন দেখা যুবক-যুবতীরা প্রমাদ গোণে। এবং তখন তাদের বুঝিয়ে বলতে হয় না, বিজেপি আসলে তাদের জীবনে কেন বিপদ। ফলে তারা সংবিধান ও সংরক্ষণকে রক্ষা করার জন্য তাড়িত হতে থাকে এবং তা রক্ষা করতে গিয়ে সংবিধান ও সংরক্ষণ বিরোধী বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার দিকে এগোয়। এবার ভোটে গোটা হিন্দি বলয় জুড়ে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। তফসিলি জাতি, জনজাতি, ওবিসি ও দলিতেরা বুঝেছেন বিজেপি সংবিধান বদলে দিলে কোথায় গিয়ে তাঁদের পড়তে হবে। সেকারণেই এবার হিন্দি বলয়ে মোদী ঢেউ ওঠেনি। বরং পিছড়ে বর্গের ভোটাররা হাওয়া জুগিয়েছেন বিরোধীদের পালে। সেকারণে  ঠিক এখানটায় এসেই গোলওয়ালকার কিংবা সাভারকারের বিরুদ্ধে জিতে গেছেন আম্বেদকার। হিন্দি বলয়ে মণ্ডল বনাম কমণ্ডুলের রাজনীতি এবারের ভোটে অন্য চেহারায় ফিরে এসে নরেন্দ্র মোদীর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। 

সামাজিক ন্যায় বনাম হিন্দুত্বের রাজনীতির সংঘাত, আম্বেদকার বনাম সাভারকারের ভারতের ধারণা নিয়ে সংঘাত তাই চলতেই থাকবে প্রত্যক্ষ রাজনীতির ময়দানে। এভাবেই এদেশে হিন্দু রাষ্ট্র গড়ার প্রকল্পটিকে,এমনকী হিন্দি বলয়েও,একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। ঠিক এই উদ্বেগের কারণেই হাওয়া বুঝে নরেন্দ্র মোদীকে দুহাতে সংবিধান আঁকড়ে ধরে গড় করার ছবি দিতে হয়। তবে ইতিমধ্যেই যে শক্তির আবির্ভাব ঘোষিত হয়ে গেছে সামাজিক পরিসরে, তাকে কলসির মধ্যে ফের আটকে ফেলার মতো আলাদিনের কোনও প্রদীপ নেই। সেকারণে এদেশের মাটিতে হিন্দুত্ববাদের পথও আর নিষ্কণ্টক নয়।  

প্রকাশের তারিখ: ১১-জুন-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org