|
অরণ্য সংরক্ষণ আইনের পরিবর্তন কেন (প্রথম পর্ব)?তপন মিশ্র |
এবারের অরণ্য আইন সংশোধনীতে অরণ্যের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে তা হল, কেবল সরকার অধিগৃহীত অরণ্যই অরণ্য হিসাবে গণ্য হবে। এর অর্থ, সরকার অধিকৃত নয় কিন্তু আগে অরণ্য হিসাবে গণ্য করা হত, এখন সেটি আর অরণ্য থাকবে না। সেই বনাঞ্চলকে যে কেউ যেমন খুশি ব্যবহার করতে পারবে। সেই জঙ্গল সাফ করে যদি অন্য কিছু কাজ হয় তাহলে তার ক্ষতিপূরণ (Compensatory afforestation) করারও দরকার পড়বে না। |
প্রথম পর্ব অরণ্য সংরক্ষণ আইনের সাম্প্রতিক ইতিহাস এদেশে ১৯২৭ সালে বন আইন তৈরির মধ্যে দিয়ে যে ঔপনিবেশিক মানসিকতা প্রকাশিত হয়েছিল তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। প্রথমটি হল, অরণ্যের ওপর বনবাসীদের অধিকার খর্ব করা এবং দ্বিতীয়টি হল অরণ্য সম্পদের যথেচ্ছ লুটের ব্যবস্থা পাকা করা। আশা ছিল, স্বাধীন ভারতে এই আইন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বনবাসীদের উপযোগী এবং সংরক্ষণমুখী এক আইন তৈরি হবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে অরণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ (Corporatisation of Forests)–এর পাকাপাকি ব্যবস্থা। ১৯৭২ সালের স্টকহোম পরিবেশ সম্মেলনের ১ সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক চাপ, অরণ্য থেকে খনিজ সম্পদ এবং কাষ্ঠ সম্পদ সংগ্রহের মরিয়া প্রয়াসের জন্য ক্রমহ্রাসমান অরণ্য আচ্ছাদন রোধ করতে ১৯৮০ সালের অরণ্য সংরক্ষণ আইন সংসদে গ্রহণ করাতে হয়। অরণ্য সংরক্ষণের এই আইনের পেছনে অরণ্যবাসীদের নিরন্তর আন্দোলনও এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সারা দেশে সরকারি সহায়তা ব্যতিরেকে যৌথ বন–পরিচালনার আন্দোলন আরাবাড়ি ছাড়িয়ে সরকারি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ১৯৮০-র অরণ্য (সংরক্ষণ) আইন তৈরির চাহিদার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে, আমাদের দেশে ৪৩ লক্ষ হেক্টর (৪৩০০০ বর্গ কিলোমিটার) বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। এর অর্ধেক পরিমাণ ধ্বংস হয়েছে শিল্প, খনি, জলবিদ্যুৎ, পুনর্বাসন ও কৃষির মতো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এবং বাকি অর্ধেক ক্ষয়ের কারণ অরণ্যে বেআইনি দখল। ১৯৮০ সালের অরণ্য সংরক্ষণ আইন এই ধরণের ব্যাপক অরণ্য ধ্বংসের পরিমাণে অভূতপূর্ব হ্রাস ঘটাতে সক্ষম হয়। বন–উজাড় রোধ করার জন্য এই আইন প্রবর্তন করা হয়েছিল। ১৯৮০ সালের আগে অরণ্য ধ্বংসের বার্ষিক হার ছিল ১,৪৩,০০০ হেক্টর। আইন প্রবর্তনের পর এই হার কমে দাঁড়ায় বার্ষিক ৪০,০০০ হাজার হেক্টর। কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত ফরেস্ট অ্যাডভাইজরি কমিটি (FAC)-র অনুমোদন ব্যতিরেকে অরণ্যভূমিকে অন্য কোনও ভাবে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। ২০১৪ সালে নতুন সরকার আসার পর শুরু হয় পরিবেশ ও অরণ্য রক্ষা সম্পর্কিত সমস্ত আইনের পরিবর্তন। ১৯২৭–এর বন আইনে আমাদের দেশে তিন ধরনের অরণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলি হল: ১) রিজার্ভ ফরেস্ট অর্থাৎ যেখানে বনবাসীদের কোনও অধিকার থাকবে না। ২) প্রোটেক্টেড ফরেস্ট অর্থাৎ যেখানে কেবল অকাষ্ঠল বনজ সম্পদের উপর কিছু অধিকার বনবাসীদের থাকবে। এবং ৩) গ্রামের বা আনক্লাসড বনাঞ্চল অর্থাৎ যেখানে মানুষের সামূহিক অধিকার থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে বনবাসীদের ইষ্টদেবতার নামে কিছু বনাঞ্চল সংরক্ষিত থাকে। ২০১৮ সালের নতুন বন আইনে ১৯২৭-র আইনের সংশোধন করে আগের তিন ধরণের অরণ্যর সঙ্গে আর এক ধরনের অরণ্য নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে। এটি হল উৎপাদক বন (Production forest)। এমনটা নয় যে নতুন করে কিছু অরণ্য এদেশের বনভূমির সঙ্গে যুক্ত করা হল। এই প্রডাকশন ফরেস্টের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, যে কোনও ধরনের বনাঞ্চলকে এই ধরনের বন হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এই বন কেবল বনজ সম্পদ উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট হবে। অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা এবং বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবা (ecological services)–এর ক্ষেত্রে অরণ্যের যে ভূমিকা পালন করার কথা তা বিঘ্নিত হবে। এই অরণ্যভূমি হবে কৃষিভূমির মতো। এই বনাঞ্চল কাঠ, কাগজ তৈরির জন্য কাঠ (Pulp Wood), বিভিন্ন ধরনের অকাষ্ঠল বনজ সম্পদ, ওষধি গাছ ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যাবে। দেশের অরণ্যের পরিমাণে কারচুপি পাঠকদের সুবিধার জন্য বলা দরকার যে, অরণ্যের বাইরে বৃক্ষাচ্ছাদন বাদ দিলে বর্তমান দেশের বনভূমির পরিমাণ ৭.১৩৭ বর্গ কিলোমিটার অর্থাৎ দেশের মোট আয়তনের ২১.৭ শতাংশ এবং এর বাইরে বৃক্ষ–আচ্ছাদন ২.৯ শতাংশ। এই অর্থে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪.৬২ শতাংশ (ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া -২০২১)। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (FAO) এবং ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইন্সটিটিউট (WRI) যে স্যাটেলাইট সমীক্ষা করে, সেই সমীক্ষা অনুযায়ী আমাদের সরকারি হিসাবে অরণ্যের পরিমাণ যে অনেক বেশি করে দেখনো হয় তার ইঙ্গিত রয়েছে। তা সত্ত্বেও অরণ্য সৃজনের মধ্যে দিয়ে ২০৭০ সালের মধ্যে দেশে ‘নেট জিরো’ নির্গমন (বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে পরিমাণ কার্বনের নির্গমন ঘটবে তা শোষণ করবে অরণ্যভূমি )–এর এক অলীক লক্ষ্যমাত্রা সরকার ঘোষণা করেছে। এনডিসির অসত্য প্রতিশ্রুতি Nationally Determined Contribution বা এনডিসি (জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান) ২০১৫ এবং ২০২২–এ অরণ্যের যে অলীক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সেগুলি নিম্নরূপ। নতুন অরণ্য সৃজনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের দেশে ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন টন CO2 শোষণে সক্ষম অরণ্য–আচ্ছাদনের বৃদ্ধি ঘটানো হবে। এই প্রতিশ্রুতি যে কত অলীক তা নিচের হিসেব থেকে বোঝা যাবে। ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া তার স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট, ২০২১-এ বলছে, আমাদের বনাঞ্চলে এখন ৭.২ বিলিয়ন টন কার্বন মজুত রয়েছে। অতএব, প্রায় ৩০–৩১% বনভূমি বৃদ্ধি ( কেবল গাছ লাগিয়ে নয়) প্রয়োজন। আমাদের দেশে এখন বনভূমির পরিমাণ ৮৯.৯ মিলিয়ন হেক্টর (FSI)। যদি তাই হয় তবে এনডিসি-র প্রতিশ্রুতি অনুসারে আমাদের ১১০ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি থাকা দরকার (অর্থাৎ ভারতের স্থলভাগের প্রায় ৪০%)। গাছের সংখ্যার যদি বিচার করা হয় তাহলে ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন টন CO2 শোষণ করতে ১০০ মিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক গাছের প্রয়োজন (প্রতি বছর একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ গড়ে @২৫ কিলোগ্রাম CO2 শোষণের ক্ষমতা রাখে)। তা হলে হিসেব মত ভারতে বনায়নের জন্য (৪০% – ২৪%) অর্থাৎ ১৬% জমি অরণ্য সৃজনের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এই জমি কোথা থেকে আসবে? অতএব যুক্তির বিচারে এনডিসি-র প্রতশ্রুতি অসত্য। সংশোধিত আইনের আসল রূপ জুলাই মাসে লোকসভায় ১৯৮০ সালের অরণ্য (সংরক্ষণ) আইনের সংশোধনীতে যে ধ্বংসাত্মক পরিবর্তনগুলি করা হয়েছে সেগুলি হল – ১। অরণ্যের সংজ্ঞার পরিবর্তন: ১৯৯৫ সালে গোদাবর্মণ বনাম ভারত সরকার মামলায় মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট অরণ্যের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন। সেখানে বলা হয় যে, অভিধানে অরণ্য যেভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, মালিকানা নির্বিশেষে অরণ্যের সংজ্ঞা সেভাবেই নির্ধারণ করা হবে। ভারত সরকার ২০১৮ সালে অরণ্যের কার্বন শোষণ ( Reducing Emission from Deforestation and Degradation of Forest Plus(REDD+) শীর্ষক আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফরেস্ট রেফারেন্স লেভেল (FRL–2018) জমা দিয়েছে। সেখানে যে সংজ্ঞা দেওয়া হয় তা হল মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া সংজ্ঞা। কিন্তু এবারের সংশোধনীতে অরণ্যের যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে তা হল, কেবল সরকার অধিগৃহীত অরণ্যই অরণ্য হিসাবে গণ্য হবে। এর অর্থ হল সরকার অধিকৃত নয় কিন্তু আগে অরণ্য হিসাবে গণ্য করা হত, এখন সেটি আর অরণ্য থাকবে না। অর্থাৎ যে সমস্ত অরণ্য ব্যক্তি বা সামুহিক মালিকানায় থাকল, সেখান থেকে অরণ্য পরিচালনার দিক দিয়ে সরকারের যে আয়টায় ছিল তা আর থাকবে না। সেই বনাঞ্চলকে যে কেউ যেমন খুশি ব্যবহার করতে পারবে। যেহেতু এই অঞ্চল আর অরণ্য হিসাবে পরিগণিত হবে না তাই সরকারি পরিচালন ব্যবস্থা যেমন থাকবে না, তেমনই সেই জঙ্গল সাফ করে যদি অন্য কিছু কাজ হয় তাহলে তার ক্ষতিপূরণ (Compensatory afforestation) করারও দরকার পড়বে না। যদি এখানে অরণ্য অধিকার আইন ২০০৬–এর প্রেক্ষিতে কোনও অধিকার বনবাসীরা ভোগ করেন তাহলে সেই অধিকার থাকবে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। ২। দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা (Line of Actual Control) থেকে দেশের ভিতর ১০০ কিলোমিটার অরণ্যভূমি এই সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এই ছাড়ের আওতায় পড়বে সম্পূর্ণ উত্তর–পূর্ব ভারত, হিমালয়ের বিভিন্ন অংশের বনাঞ্চল এবং সুন্দরবন। উত্তর–পূর্ব ভারত এবং হিমালয়ের বনাঞ্চল বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র হটস্পট। সারা পৃথিবীতে ৩৬টি জৈব বৈচিত্রের হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতে চারটি জীববৈচিত্র্যের হটস্পট রয়েছে। এই হটস্পটগুলি চিহ্নিত হয়েছে সেগুলির উচ্চ প্রজাতি বৈচিত্র, এন্ডেমিক প্রজাতির সংখ্যা এবং এগুলির ক্ষয় হয়ে যাওয়ার প্রবণতা ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে। সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম বাদাবন। অর্থাৎ এই তিনটি অঞ্চলের বনাঞ্চল পরিবেশ রক্ষার দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে বেসরকারি এবং সরকারি যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ কাজ করা যাবে। এক্ষেত্রেও যদি অরণ্য অধিকার আইনের ফলে কোনও অধিকার বনবাসীরা ভোগ করে থাকেন, তাহলে সেই অধিকার থাকবে কিনা তা স্পষ্ট নয়। ৩। একইভাবে নিরাপত্তার নামে দেশের যে কোনও প্রান্তে ৫ থেকে ১০ হেক্টর পর্যন্ত বনভূমি অধিগ্রহণ করে অরণ্য ধ্বংস করার ক্ষমতা সরকার এই সংশোধনীতে যুক্ত করেছে। এখানে বলা আছে যে বাম চরমপন্থীদের শায়েস্তা করতে এই ব্যবস্থা সরকার যে কোনও সময়ে নিতে পারে। —————————— ১। রাষ্ট্রসংঘের ‘মানব ও পরিবেশ’ সম্মেলন ১৯৭২ সালের ৫–১৬ জুন সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭২ সালে স্টকহোমে সম্মেলন আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নেয়। সুইডেন সরকারের পক্ষ থেকে এটির আয়োজনের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। এই সম্মেলনে আমাদের দেশও অংশগ্রহণ করে। প্রকাশের তারিখ: ০৬-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |