|
১০০ কোটি মানুষের নেই স্বাস্থ্যকর খাবারের সামর্থ্যসুচিক্কণ দাস |
এ বছরের জুলাই মাসে নীতি আয়োগের একটি রিপোর্টে ফলাও করে দাবি করা হয়েছিল, বহুমাত্রিক দারিদ্র (মাল্টিডায়মনেসনাল পভার্টি) দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ভারত। ওই রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এদেশের সাড়ে ১৩ কোটি লোককে বহুমাত্রিক দারিদ্র থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা কমেছে ৯.৮৯ শতাংশ। এর অর্থ, ২০১৫-১৬ সালে যেখানে দেশে বহুমাত্রিক বিচারে দরিদ্রের সংখ্যা ছিল ২৪.৮৫ শতাংশ, ২০১৯-২০ সালে তা কমে হয়েছে ১৪.৯৬ শতাংশ। |
১। ‘পেটের ভিতর কবে যে আগুন জ্বলেছে এখনো জ্বলবে!’ কিন্তু তারপর ভারত স্বাধীন হয়েছে আজ ৭৭ বছর। দীর্ঘ এই সাড়ে সাত দশকে ক্ষুধার হাত থেকে কি মুক্তি পেয়েছেন ভারতের গ্রাম-শহরে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি দরিদ্র মানুষ? মুক্তি কি পেয়েছেন তীব্র অনাহার ও অপুষ্টি থেকে? দুবেলা পেটভরে ডাল-ভাত খাওয়ার সুযোগ কি তাঁদের আছে? এক কথায় উত্তর হল, না। স্বাধীনতার সাড়ে সাতদশক পরেও ক্ষুধা, অনাহার ও অপুষ্টির স্থায়ী জগৎ থেকে মুক্তি পাননি এদেশের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ। এখনও পেটে খিদে নিয়ে এবং দু’বেলা গরম ভাতের স্বপ্ন দেখেই তাঁরা রাতে ঘুমোতে যান। আরও বড় কথা হল, গত তিনদশকের নয়া উদারবাদী শাসনে, এবং বিশেষ করে আরএসএস-বিজেপি শাসনের গত প্রায় একদশকে, এদেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বেড়েই চলেছে অনাহার, অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু, রক্তাল্পতা। দেখে মনে হয়, আরএসএস-বিজেপি শাসকচক্র এই দেশকে ঔপনিবেশিক আমলের সেই ফেলে আসা বুভুক্ষার রাজত্বে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটছে অত্যন্ত সচেতন ভাবে। ২। এক নজরে ক্ষুধার্ত ভারত বছর বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান ২০১৪ ৭৬টি দেশের মধ্যে ৫৫ ২০১৫ ১০৪টি দেশের মধ্যে ৮০ ২০১৬ ১১৮টি দেশের মধ্যে ৯৭ ২০১৭ ১১৯টি দেশের মধ্যে ১০০ ২০১৮ ১১৯টি দেশের মধ্যে ১০৩ ২০১৯ ১১৭টি দেশের মধ্যে ১০২ ২০২০ ১০৭টি দেশের মধ্যে ৯৪ ২০২১ ১১৬টি দেশের মধ্যে ১০১ ২০২২ ১২১টি দেশের মধ্যে ১০৭ (সূত্র: কংগ্রেস সাংসদের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির উত্তর) ওপরের সারণি থেকেই স্পষ্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত শাসনকালে আমাদের দেশে ধাপে ধাপে আরও বেশি মানুষ তলিয়ে গেছেন ক্ষুধার অন্ধকারে। ২০২২ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকায় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরে জায়গা পেয়েছে একমাত্র গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত আফগানিস্তান। তাদের ক্রমাঙ্ক ১০৯। এমনকী পাকিস্তান (৯৯) বাংলাদেশ (৮৪), নেপাল (৮১) ও শ্রীলঙ্কার (৬৪) অবস্থানও ভারতের আগে। উল্টোদিক থেকে বলা যায়, ক্ষুধার্ত দেশের তালিকায় ভারতের স্থান আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশগুলির কাছাকাছি। ক্ষুধা সূচকে সেই সব দেশের অবস্থান এরকম— রোয়ান্ডা (১০২), নাইজিরিয়া (১০৩), ইথিওপিয়া (১০৪), রিপাবলিক অফ কঙ্গো (১০৫), সুদান (১০৬), জাম্বিয়া (১০৮), টিমোর-লেসটে (১১০)। স্বাধীনতার সাড়ে সাত দশক পর দেশব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের এমন লজ্জাজনক ছবির পরেও এদেশের শাসক হুংকার দেয়, গর্ব সে বোলো ম্যয় হিন্দু! রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৯-এর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ভারতে সরাসরি খাদ্য ও পরোক্ষ খাদ্যে দানাশস্য গ্রহণ মাথাপিছু ১৭১ কিলোগ্রাম। আফ্রিকার ক্ষেত্রে তা ১৯০ কিলোগ্রাম, কম উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে ২০৫ কিলোগ্রাম, চীন ও ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ৩৬০ কিলোগ্রাম, রাশিয়ার ক্ষেত্রে ৪০৭ কিলোগ্রাম। শিল্পোন্নত ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই পরিমাণ ৪৯৪ কেজি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯০ কেজি। সুতরাং, এটা খুব আশ্চর্যের ব্যাপার নয় যে বিশ্ব খাদ্য সূচকে ভারতের জায়গা হবে একেবারে তলার দিকে। এবং ওপরের সারণি থেকেই স্পষ্ট যে, ধাপে ধাপে এমন পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে আরএসএস-বিজেপি তাদের ভারত শাসনের ৯ বছরে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে কোনও দেশের স্কোর যদি হয় ৫০ বা তার বেশি তাহলে তা হবে চরম আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি। স্কোর ৩৫ থেকে ৪৯.৯ হলে পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। আর স্কোর যদি হয় ২০ থেকে ৩৪.৯ এর মধ্যে তাহলে পরিস্থিতি গুরুতর। ২০২২ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্কোর ছিল ২৯.১। এর মানে এদেশে ক্ষুধাজনিত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। ২০১৪ সালে মোদি যখন প্রথম দিল্লিতে ক্ষমতায় আসে তখন বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্কোর ছিল ২৮.২। তাঁর প্রায় এক দশকের শাসনকালে এদেশে আরও বেড়েছে ক্ষুধার তীব্রতা। অথচ এই পটভূমিতেই দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদি চিৎকার করে বলে চলেছেন, খুব শিগগিরই ভারত হবে ৫ লক্ষ কোটির অর্থনীতি, ভারত হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার। দেশের কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে চাঁদে উপগ্রহ পাঠানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে এদেশের সরকার। এসব দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, কাদের জন্য নরেন্দ্র মোদি কোন্ অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান। ৩। ‘সে মুখ যারা দেখেনি তারা জানে না জ্বালা নিদান যার নেই’ এ বছরের জুলাই মাসে নীতি আয়োগের একটি রিপোর্টে ফলাও করে দাবি করা হয়েছিল, বহুমাত্রিক দারিদ্র (মাল্টিডায়মনেসনাল পভার্টি) দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ভারত। ওই রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এদেশের সাড়ে ১৩ কোটি লোককে বহুমাত্রিক দারিদ্র থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা কমেছে ৯.৮৯ শতাংশ। এর অর্থ, ২০১৫-১৬ সালে যেখানে দেশে বহুমাত্রিক বিচারে দরিদ্রের সংখ্যা ছিল ২৪.৮৫ শতাংশ, ২০১৯-২০ সালে তা কমে হয়েছে ১৪.৯৬ শতাংশ। অথচ এবছরের ১২ জুলাই প্রকাশিত খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে উঠে আসছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ছবি। রিপোর্টটির শিরোনাম, ‘দ্য স্টেট অফ ফুড সিকিওরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্লড, ২০২২’। এটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে, ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেসন অফ দ্য ইউনাইটেড নেশনস (ফাও), দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি), ইউনিশেফ, দ্য ওয়ার্লড ফুড প্রোগ্রাম এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। রিপোর্টে বলা হয়েছে এদেশে মোট জনসংখ্যার ৭৪.১ শতাংশ মানুষই স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না। এর মানে,এদেশের ১০০ কোটি মানুষ এমন খাবার খেতে বাধ্য হন যা তাঁদের শরীরের পরিপূর্ণ পুষ্টি জোগাতে পারে না। রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, এমনকী ২০৩০ সালেও এদেশে ক্ষুধায় কষ্ট পাওয়া লোকের সংখ্যা থেকে যাবে ৬০ কোটি। (India’s triumphs over poverty marred by an alarming hunger crisis, The Hindu, : Jul 21, 2023 by Saatvik Radhakrishna)। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভারতে প্রায় ১০০ কোটি লোক (জনসংখ্যার ৭৪.৯ শতাংশ) স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারেননি। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে হয় যথাক্রমে ৭১.৫ শতাংশ ও ৬৯.৪ শতাংশ (অর্থাৎ ৯৬ কোটি ৬৬ লক্ষ এবং ৯৪ কোটি ৮৬ লক্ষ মানুষ)। স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারেননি ২০২০ সালে ভারতে এমন মানুষের সংখ্যা ফের বেড়ে গিয়ে হয়েছিল ৯৭ কোটি ৩০ লক্ষ যা দেশের জনসংখ্যার ৭০.৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে ২০২০ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ১৩৩ কোটি ১৫ লক্ষ। এবং ওই বছর সমগ্র এশিয়ায় যে ১৮৯ কোটি ১৪ লক্ষ মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার জোগাড় করতে পারেননি, তাদের প্রায় অর্ধেকই ছিলেন ভারতের বাসিন্দা। এর অর্থ একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পৌঁছেও ভারতের ৭০ শতাংশ বা তার বেশি মানুষ বেঁচে থাকেন সারা বছর ক্ষুধাকে সঙ্গী করেই। এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম। ২০১৭ সালে ভারতে দৈনিক মাথাপিছু স্বাস্থ্যকর খাবারের দাম ছিল ২.৮২৪ ডলার, ২০১৮য় ২.৮৩ ডলার, ২০১৯ এ ২.৮৭৭ ডলার এবং ২০২০ সালে ২.৯৭ ডলার। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ২০২০ থেকে ২০২২ এর মধ্যে ফাওএর খাদ্যপণ্যের সূচক বৃদ্ধির হিসাবও। (Hungry nation: 70% Indians cannot afford healthy diet, Taran Deol, 17 Oct. 2022, Down to EarthPortal)। খাদ্যপণ্যের এই দাম বৃদ্ধিকে যদি হিসাবের মধ্যে আনা হয় তাহলে দেখা যাবে এদেশের প্রায় তিন চতুর্থাংশ মানুষ ধারাবাহিক ভাবে ক্ষুধা ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছেন। অন্য একটি হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯-২১ সালে ভারতে প্রায় ৫৬ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষ বা জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্যাভাবে ভুগেছেন। এবং তীব্র খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে ভুগেছেন ৩০ কোটি ৭৭ লক্ষ বা ২২.৪ শতাংশ মানুষ। ২০১৮–২০র হিসাব ধরলে ভারতে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ২৭ কোটি ৮৩ লক্ষ বা জনসংখ্যার ২০.৩ শতাংশ (Starved of data: India’s hungry people go missing from FAO report, Jul 24, 2022, by T K Rajalakshmi)। তথ্য বলছে, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভারতে। এমনকী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যাও এদেশে বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেসনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ২০২০ সালে ২২ কোটি ৪৩ লক্ষ মানুষ বা জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ ক্রনিক ক্ষুধার শিকার হয়েছেন এবং দেশের এক চতুর্থাংশ মানুষ ভুগেছেন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়। যদি সারা বিশ্বের ক্ষুধার্ত এবং খাদ্য অনিশ্চয়তায় ভোগা জনংসখ্যার হিসাব ধরা হয়, তাহলে ওই বছরে তার এক তৃতীয়াংশই ছিল ভারতে। (Modi led BJP Govt Has Made India The Hunger Hotspot of the World, Peoples Democracy, October, 2022) ৪। ক্ষুধা: বহুরূপে সম্মুখে তোমার উৎসা পট্টনায়েক তাঁর নিবন্ধে দেখিয়েছেন, ওই একই সময় পর্বে এদেশে রক্তাল্পতায় ভোগা প্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষত প্রাপ্তবয়স্ক মহিলাদের সংখ্যা বেড়েছে। ৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত মহিলাদের ৫৩ শতাংশই রক্তাল্পতায় ভুগতেন ২০১৫–১৬ সালে। এঁদের মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র রক্তাল্পতায় আক্রান্ত মহিলারা ছিলেন ২৮.৪ শতাংশ। ২০১৯-২০ সালে সেই অনুপাত ৫৩ থেকে বেড়ে হয় ৫৭ শতাংশ। এঁদের মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র রক্তাল্পতায় ভোগা মহিলাদের অনুপাত ছিল ৩১.৪ শতাংশ। ৪৯ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষদের মধ্যেও রক্তাল্পতায় আক্রান্তদের সংখ্যা ওই একই সময়পর্বে ২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। এরই পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে রক্তাল্পতায় আক্রান্তদের সংখ্যা অনেক বেশি এবং যেসব মায়েরা রক্তাল্পতায় ভুগছেন তাদের শিশুদের একই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। উৎসা দেখিয়েছেন, ২০১৫-১৬ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-তে দেখা গেছে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩৬ শতাংশেরই ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম এবং ৩৮ শতাংশের উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। ২০১৯-২০ সালের সমীক্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের শিশুদের অনুপাত সামান্য কমে হয়েছে যথাক্রমে ৩২ ও উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম এমন শিশুদের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশ। স্বাভাবিক উচ্চতার অভাবে ওজন কম এমন শিশুর সংখ্যাও ২১ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। যদিও তাঁর বক্তব্য, সর্বভারতীয় এই ছবির বাইরে গিয়ে যদি রাজ্যভিত্তিক ছবি আলাদা করে দেখা যায়, তাহলে আরও করুণ চিত্র সামনে আসবে। একথা বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না যে, রক্তাল্পতায় আক্রান্ত শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলা, কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজন বা কম উচ্চতার শিশু— এদের অস্তিত্ব থাকার অর্থই হল এরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষুধা ও চরম অপুষ্টির শিকার। পেট ভরে খেতে না পাওয়ার কারণেই শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা রক্তাল্পতায় আক্রান্ত হয়। পেট ভরে খেতে পায় না বলেই শিশুদের ওজন কম হয় বা তাদের শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না। পেট ভরে খেতে না পাওয়া মায়েরাই স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের শিশুর জন্ম দেন। সুতরাং, রক্তাল্পতাই হোক, কম ওজন বা কম উচ্চতাই হোক, সবেরই মূলে রয়েছে সেই সর্বগ্রাসী ক্ষুধা। এবং এই ক্ষুধা এদেশে এখন সর্বগ্রাসী যা এখনকার প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম— দুপক্ষকেই অনাহারে, অর্ধাহারে রেখে ক্রমশ জীর্ণ করে ফেলছে। ৫। ‘ফাটলে, ফুটোয়/ কত কাঁথা কানি গুঁজবে’ নয়া উদারবাদের আমলে ভারতে ক্ষুধার রাজত্ব কীভাবে বেড়ে চলেছে তার প্রমাণ রয়েছে দুটি সমীক্ষায়। এদেশে তিন দশকের নয়া উদারবাদী পর্বের শুরু মোটামুটি ১৯৯০ সাল থেকে। এই পর্বে যে দুটি বছরের জাতীয় নমুনা সমীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলি হল ১৯৯৩-৯৪ ও ২০১১-১২। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশ করা এই তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৩-৯৪ সালের তুলনায় ২০১১-১২ সালে প্রতিদিন মাথাপিছু ২২০০ ক্যালরির কম খাবার খাচ্ছেন এমন মানুষের অনুপাত দেশের গ্রামাঞ্চলে ৫৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৮। ভারতের শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ২১০০। দেখা গেছে শহরাঞ্চলেও দৈনিক মাথাপিছু ২১০০ ক্যালরির কম খাবার খাচ্ছেন এমন মানুষের অনুপাত ১৯৯৩-৯৪ সালের তুলনায় ২০১১-১২ সালে বেড়ে হয়েছে ৫৭ থেকে ৬৫। এর মানে নয়া উদারবাদী পর্বের শুরু থেকেই এদেশে ভুখা মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এবিষয়ে পরের সমীক্ষা হয় ২০১৭-১৮ সালে। সেই বছর দেশে ক্ষুধার চিত্র এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে বিজেপি সরকার তা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুরনো পদ্ধতিতে এনএসএস-এর সমীক্ষাই বন্ধ করে দেয়। তবে ওই বছরের যেটুকু তথ্য ফাঁস হয়েছিল তাতে দেখা গেছে ২০১১-১২ থেকে ২০১৭-১৮র মধ্যে গ্রাম ভরতের মাথা পিছু প্রকৃত ব্যয় কমেছে ৯ শতাংশ । (Hunger and Poverty, Prabhat Patnaik, People's Democracy, October 23, 2022)। অন্যদিকে, ফাও–এর স্টেট অফ ফুড সিকিওরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্লড (এসওএফআই) ২০২২ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না এমন লোকের সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ৩২০ কোটি। এহচ্ছে অতিমারির সময় থেকে খাদ্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধির ফল। মাঝারি থেকে তীব্র খাদ্যসঙ্কটের চেহারাটা বিভিন্ন দেশে কেমন সে সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে এসওএফআই রিপোর্টে। রয়েছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তথ্য। অথচ ২০১৪ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এসংক্রান্ত কোনও তথ্যই প্রকাশ করতে দেয়নি ভারত। ফলে ফাও রিপোর্টের সংযোজনীতে নেই ভারতের তথ্য। এ হল ক্ষুধা ও অপুষ্টিকে আড়ালে রাখার এক কৌশলী পদক্ষেপ। (Starved of data: India’s hungry people go missing from FAO report, Jul 24, 2022, by T K Rajalakshmi)। ক্ষুধার্তকে অন্ন জোগানোর ব্যবস্থা নয়, কৌশলে এদেশের ক্ষুধা, অনাহার ও অপুষ্টির ছবি ঢেকে রাখাতেই শাসকদের মনোযোগ অনেক বেশি। এবং এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাতে দেশের মানুষ জানতে না পারেন সেই কাজেই তারা অনেক বেশি তৎপর। আরও একটা বিষয় এই তথ্যগুলির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। যাঁরা ক্ষুধায়, অনাহারে, অপুষ্টিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তাঁদের আসলে খাবার কেনার পয়সা নেই। খাবার কেনার পয়সা নেই কারণ তাঁদের আয় নেই, স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। আসলে তাঁদের মূল সমস্যা দারিদ্র। ক্ষুধা, অনাহার, অপুষ্টি, রক্তাল্পতা সংক্রান্ত তথ্য তাই একই সঙ্গে দারিদ্রেরও প্রতিফলন। এই সব তথ্য থেকে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব কতটা দারিদ্রে ডুবে আছে এই দেশ। অথচ এলোমেলো মাপকাঠি ব্যবহার সেই তথ্য ঢাকতে চায়। সেজন্যই উৎসা পট্টনায়েক তাঁর ওপরে উল্লিখিত নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন, ‘যেখানে খাদ্যগ্রহণের মাত্রা যথেষ্ট নয়, যেখানে খাদ্যের জন্য মাথাপিছু ব্যয় কমছে, এমন এক দেশের মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির হার বেশ উঁচু, এটা সত্যিই আশ্চর্যের। শুধুমাত্র আয়ের বৈষম্যের তীব্রতা বৃদ্ধি ও জনসংখ্যায় পুষ্টির দারিদ্রের সঙ্গেই এই ছবি সাযুজ্যপূর্ণ হতে পারে।’ ৬। অধিকারের জন্য সংগ্রামই ক্ষুধামুক্তির পথ এই সূত্রে শুধু তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, এখনকার ক্ষুধার্ত ভারত সম্পর্কেও প্রযোজ্য। সরকারি তথ্য বলছে, স্বাধীনতার বছরে ১৯৪৭ সালে এদেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ১০ লক্ষ টন। আর ২০২১-২২ সালে ভারতে রেকর্ড খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়েছে যার পরিমাণ ৩১ কোটি ৫৭ লক্ষ টন। সবুজ বিপ্লবের পর থেকে দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছে। এদেশের মজুত শস্যের ভাণ্ডার সারা বছরই উপচে পড়ে। ফাও জানাচ্ছে, এদেশে ৪০ শতাংশ খাদ্য, ৩০ শতাংশ সবজি ও ফল স্রেফ জমিয়ে রাখার পরিকাঠামোর অভাবে প্রতি বছর নষ্ট হয়। লক্ষ লক্ষ টন চাল-গম সরকারি গুদামে পচে নষ্ট হয় ঠিকমতো সংরক্ষণ ও পরিবহণের পরিকাঠামের অভাবে। বিজেপি সরকারের মন্ত্রীরা সংসদে সগর্বে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্যের কথা প্রচার করেন। অথচ বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে তালিকায় এই দেশের স্থান হয় সবচেয়ে নীচের দিকে, এদেশে মোট জনসংখ্যার ৭৪.১ শতাংশই স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পান না, অর্থাৎ ১০০ কোটি মানুষ এমন খাবার খেতে বাধ্য হন যা তাঁদের শরীরের পরিপূর্ণ পুষ্টি জোগাতে পারে না। এদেশের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, মহিলা, এমনকী শিশুরাও ক্ষুধার কারণে রক্তাল্পতায় ভোগে। খাবারের অভাবে স্বাভাবিক ওজন ও উচ্চতা থেকে বঞ্চিত হয় শিশুরা। এই বৈপরীত্যের পিছনে রয়েছে শাসকের সুকৌশলী ভূমিকা। সরকারি ভাণ্ডারের সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ খাদ্য যাতে গরিব মানুষের কাছে পৌঁছতে না পারে, অত্যন্ত সযত্নে সেই ব্যবস্থাই করে এদেশের শাসকেরা। মূলত গণবন্টন ব্যবস্থাকে কার্যত তুলে দিয়ে এবং নানা অজুহাতে লক্ষ লক্ষ রেশন কার্ড বাতিল করে গরিবকে সস্তাদরের খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়, যাতে খোলা বাজারে বেশি দামে খাদ্যশস্য বেচে লাভ করতে পারে পুঁজির মালিকেরা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, খাবারের অভাবে ভারত ক্ষুধার্ত নয়। ভারত ক্ষুধার্ত কারণ এদেশের ১০০ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কিনে খাবার ক্ষমতা নেই। কারণ তাঁরা দরিদ্র। তাই তাঁরা কষ্ট পান ক্ষুধা, অনাহার ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা থেকে। মন্বন্তর না থাকলেও গরিব ভারতবাসীর মুক্তি মেলেনি ক্ষুধার করাল গ্রাস থেকে। সুতরাং এই মহাভারতকে যদি ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিতে হয় তাহলে ফিরে যেতে হবে অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে। সেখানেই অর্থনীতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে রাজনীতিতে। যে ব্যবস্থা মানুষের মুখে ক্ষুধার অন্ন জোগায়, মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অধিকার সুনিশ্চিত করে, সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে তীব্রতর করার মধ্যে দিয়েই ক্ষুধামুক্তির পথ খুঁজে পাবে ভারত। প্রকাশের তারিখ: ২৯-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |