|
১৯৪২ (শেষ পর্ব)ইলিয়া এরেনবুর্গ |
যুদ্ধ আমাদের ইতিহাসকে বুঝতে শিখিয়েছে। অতীতের বীরেরা পাঠ্যপুস্তক থেকে বেরিয়ে ট্রেঞ্চে হাজির হতেন। আমরা লেনিনগ্রাদের সহিষ্ণুতার প্রশংসা করি। আমরা জেনেছি যে পিটার ছাড়া পুশকিন আসতেন না আর সেন্ট পিটার্সবুর্গ না-থাকলে আসত না পুতিলভ কারখানার সেই শ্রমিকেরা যারা পঁচিশ বছর আগে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। |
৪ নভেম্বর, ১৯৪২ আমাদের বিপ্লবের পঁচিশ বছর পূর্তির সময়ে ফ্রণ্টে ওরা কী ভাবছে? রৌদ্রকরোজ্জ্বল শারদ আবহাওয়া। ডাগআউটের চারপাশে রূপোলি বার্চ গাছে রক্তের রং। শেষ কয়েকটা পাতার অলক্ষুণে উজ্জ্বলতা যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। বোমাবর্ষণ বহু গাছকে পঙ্গু করে দিয়েছে। যেখানে একদা গ্রাম ছিল সেখানে এখন বোমার গভীর গর্ত আর চিমনি। মুখগুলোও সব ভিন্ন: যুদ্ধ যেন তাদের নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। আগে তাতে ছিল মাটির কোমলতা আর নমনীয়তা, রাশিয়ার ভূচিত্রের ওপরে মৃদু প্রলেপের মতো, যা প্রশংসা করা সহজ কিন্তু আঁকা কঠিন। কিন্তু এখন মুখগুলো সব যেন গ্র্যানাইট পাথর থেকে কাটা। চোখে সেইসব সৈনিকের দৃঢ় আস্থা যারা সমস্ত কিছুর মধ্য দিয়েই গেছে। রূপকথায় যেমন হয়, গোটা দেশের ওপর দিয়ে তেমন যদি উড়ে যাও, দেখবে, সর্বত্রই শুধু যুদ্ধ। মস্কোর অন্ধকার নিরালোক রাজপথে অন্ধ গৃহের সারি। যুবতীরা কাঠ কাটছে। শিশুরা শহর ছেড়ে উরালের পথে চলে গেছে। জার্মানরা শহরের পর শহর জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। কারখানা অস্থায়ী ব্যারাকে রূপান্তরিত হয়েছে। যেসব তরুণীরা পিয়ানো বাজাত আর ফরাসি কবিতা পড়ত তারা এখন বুলেট তৈরি করছে। তাদের চোখের দিকে তাকালে ফ্রণ্টের কোনো সৈন্যের দৃঢ়তার অভিব্যক্তিই দেখা যাবে। পোলতভার শিশুরা সাইবেরিয়ায় পৌঁছেছে। লেনিনগ্রাড থেকে থিয়েটার উঠে গেছে উজবেকিস্তানে। দু'মাস কোনো চিঠি পাননি বলে এক বৃদ্ধা মা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন। একটা তিন বছরের ছেলে ঘুমন্ত চোখ রগড়াচ্ছিল আর মা-কে জিজ্ঞেস করছিল যে বাবা কোথায়? শুধু ফ্রণ্টের সৈন্যরাই যুদ্ধ করেনি, করেছে গোটা দেশ। নিদ্রা থেকে খোয়া গেছে একখণ্ড রাত আর মুখ থেকে রুটি। ডাগআউটের এক সৈন্যের মতোই, রাতে নিজেকে লুকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বেঁচে থাকা। আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অভিযোগকারিণী কোনো তরুণী আর অভিযোগ করে না। সে নিঃশব্দে আহতদের ব্যান্ডেজ বাঁধে। যে সৈনিকদের সে এখন সেবা করে তারা জানে যে তাকে তার স্বামীর কথা জিজ্ঞেস করতে নেই। বহু চমৎকার মানুষকে আমরা হারিয়েছি, আত্মত্যাগী, ঋজু মানুষ। আমাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরগুলোকে আমরা আবার গড়ে তুলব, তারা আগের চেয়ে ভালো হবে কিন্তু সেইসব উজ্জ্বল যুবকদের আর ফেরানো যাবে না যারা এখনও পর্যন্ত কিছুই বানায়নি, নিজেদের জন্য কোনও আশ্রয় অথবা একটা বাড়ি কিন্তু যাদের দেখে মনে হত যে একটা গোটা শহর তারা বানাতে পারে। আমাদের জীবন সৃষ্টি করা কোনো সহজ কাজ ছিল না। আমাদের সে-সক্ষমতা বা সময় ছিল না। কিন্তু এই রুক্ষ, অমার্জিত জীবন ছিল আমাদের নিজস্ব। এক অনবদ্য কবিতার খসড়ার মতো এতে অনেক দাগ আর কাটাকুটি ছিল। আমাদের পা জড়িয়ে গিয়েছিল অতীতের সঙ্গে। যতই হোক, আমরাই প্রথম, যারা দেশকে জেনেছিলাম, আমরাই প্রথম পথ কেটেছিলাম। শিশুদের জন্য আমরা যখন ক্রেশ বানাচ্ছিলাম, তখনই দুঃসংবাদ এল পশ্চিম থেকে। সেখানে তারা বোমারু বিমান বানাচ্ছিল যা একরাতে শত শত শিশুকে হত্যা করতে পারে। নাৎসি জার্মানির পাশব নিঃশ্বাসের স্পর্শ পেয়ে আমরা স্ত্রীদের বললাম, ‘পুরোনো কাপড়েই সামনের শীতটা চালিয়ে নাও।’ আমাদের জঙ্গি বিমান তৈরি করতে হল। পাখির ডানার মতো শিশুদেরও খেলনা দরকার। কিন্তু নাৎসিরা যতক্ষণ পৃথিবীতে থাকবে ততক্ষণ শিশুরা খেলবে কেমন করে? আমরা বেশি খেলনা তৈরি করতে পারলাম না— বদলে আমরা ট্যাঙ্ক তৈরি করলাম। যুদ্ধের আগে দশ বছর ধরে নাৎসিরা আমাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করেছে। তা সত্ত্বেও আমরা স্কুল আর থিয়েটার বানিয়ে চলেছিলাম। মানুষের জন্য শতাব্দীর একপাদ হল অর্ধেক জীবন। ইতিহাসের পক্ষে তা স্বল্প এক মুহূর্ত। যুদ্ধের ঠিক আগে আমরা দেখেছিলাম যে আমাদের বাগানে প্রথম ফল ধরেছে। আমাদের দৃষ্টি ছিল সুখের। তারপরে এল জার্মান আক্রমণ। এক দিনেই তারা বাড়ি, কারখানা, শহর ধ্বংস করে দিল, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম বছরের পর বছর ধরে, নিজেদের বঞ্চিত করে। সবটাই ভবিষ্যতের জন্য। আমরা জানি, কতখানি আমরা হারিয়েছি। যুদ্ধের মাঝেও অবশ্য অনেক কিছু লাভ করেছি আমরা। বিগত ষোলো মাসে আমাদের দেশের মানুষ অবিশ্বাস্যভাবে এগিয়ে চলেছে। তারা বলত যে চিন্তা করার জন্য একজন মানুষের শান্তি আর নিস্তব্ধতা দরকার। বক্তৃতাকক্ষ, লাইব্রেরি আর পাণ্ডুলিপি ভরা ঘরে যুবকদের বেড়ে ওঠা উচিত। অন্ধকার ডাগআউটের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদৃশ্য অতি সামান্য। যুদ্ধের ফ্রণ্ট কোলাহলমুখর, উত্তেজনায় টানটান। তা সত্ত্বেও লড়াইয়ের সামনের সারির লোকজন গুরুতর মনোনিবেশে কঠিন চিন্তা করে চলেছে। তারা বর্তমান ও অতীতের কথা ভাবছে। ভবিষ্যতে বিজয়ীরা যে সুন্দর জীবন গড়ে তুলবে, তার কথাও তারা ভাবছে। যুদ্ধে জনগণের বিস্ময়কর অগ্রগতি ঘটেছে। মৃত্যুর ঠিক পাশাপাশি তাদের বেঁচে থাকা, প্রতিবেশীর মতোই মৃত্যু তাদের চেনা, তারা হয়ে উঠেছে বিজ্ঞ। তারা ভয়কে জয় করেছে, ফলে তাদের উত্থান ঘটেছে আস্থা, অন্তর্লীন আনন্দ আর শক্তির শিখরে। যুদ্ধে না-আছে কোনো মধ্যবর্তী ছায়ার অস্তিত্ব, না-কোনো বিবর্ণ রং। সবকিছুই চরম, ভালো বা মন্দ, কালো অথবা সাদা। যুদ্ধের দিনগুলোতে অনেক কিছু সম্পর্কেই নতুন করে ভাবা হয়, নতুন পর্যালোচনা, নতুন মূল্যায়ন হয়। পঁচিশ বছর আগে, ‘কমরেড’– এই শব্দটাতে আমরা আমাদের জীবনের ভিত্তি গেঁথেছিলাম। আমাদের কাছে এই শব্দের দাবি অনেক। এইটা বলা সহজ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা কঠিন। ‘নাগরিক’– এই ধারণাটা সীমাবদ্ধ, যেন নির্দিষ্ট কারো বিষয় নয়, শুধু অধিকার ও দায়িত্বের গাণিতিক যোগফল। ‘কমরেড’ শব্দটা উষ্ণতা ও উত্তাপ দাবি করে। সীমান্তের লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে এ-শব্দ প্রথমবারের জন্য এক অর্থ বহন করে এনেছে। তা ক্রমশ হয়ে উঠেছে রক্তের মতো; মূর্ত, উষ্ণ এবং আঠালো। যুদ্ধের আগে ‘বন্ধু’ শব্দটা হালকাভাবে ব্যবহার করা হত আর সহজে তা ভুলেও যাওয়া হত। কিন্তু লড়াইয়ের এক বছর পরে তেমনটা আর নয়। লোকে আগে বলত, ‘আমি আর ও একসঙ্গে এক পুড নুন খেয়েছি।’ কিন্তু স্তালিনগ্রাদের এক রাত্রির তুলনায় নুন কিছুই নয়। জাতিসমূহের মধ্যে মৈত্রী আমাদের দেশের এক মূলনীতি। এখন এইটা এক অনুভূতি হয়ে উঠেছে এবং সকলে তা ভাগ করে নিয়েছে। রুশ, কাজাখ, ইউক্রেনিয়ান, জর্জিয়ান সব এক বাহিনীতে লড়ছে। প্রথমে ইতিহাস আমাদের এক করেছিল, পরে সমতার মহান নীতিতে আমরা এক হয়েছিলাম। এখন আমরা রাতে ট্রেঞ্চে এক আর এর চেয়ে আর কোনো দৃঢ় বন্ধন নেই। শুধু এখনই আমাদের দেশের জনসাধারণ বুঝেছে যে দেশকে তারা কতটা ভালোবাসে। আগে তারা ব্যাখ্যা আর প্রমাণের অপেক্ষায় থাকত। বিদেশি জিনিসের প্রতি তারা কখনও অকারণ ঘৃণা, কখনও বা সমান অকারণ তোষামোদির সঙ্গে তাকাত। এখন তারা জানে যে দেশকে ভালোবাসা এই অথবা ওই কারণে নয়। শুধু নিজের দেশ বলেই ভালোবাসা। যুদ্ধ আমাদের ইতিহাসকে বুঝতে শিখিয়েছে। অতীতের বীরেরা পাঠ্যপুস্তক থেকে বেরিয়ে ট্রেঞ্চে হাজির হতেন। আমরা লেনিনগ্রাদের সহিষ্ণুতার প্রশংসা করি। আমরা জেনেছি যে পিটার ছাড়া পুশকিন আসতেন না আর সেন্ট পিটার্সবুর্গ না-থাকলে আসত না পুতিলভ কারখানার সেই শ্রমিকেরা যারা পঁচিশ বছর আগে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ফ্যাসিজমের বর্বরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ার মানুষ যা জয় করেছিল সে-সম্পর্কে আমরা সচেতন হয়েছি। আমাদের দেশে মেষপালকের ছেলে হেগেল পড়ে। কী ভাববে সে নাৎসিদের সম্পর্কে যারা দর্শনকে পশুপালনের স্তরে নামিয়ে এনেছে! ঘৃণা অন্ধ করে দিতে পারে কিন্তু ঘৃণা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। মানুষের ওপরে আমরা বিশ্বাস হারাইনি কিন্তু জেনেছি যে মানুষের মাঝে এক ব্যতিক্রমও রয়েছে, তা হল ফ্যাসিস্ট। একসময়ে ক্ষুধার্ত জার্মানিতে আমরা শস্য পাঠিয়েছিলাম। আমাদের অনেকে জার্মানির ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য আর মনের পুরোপুরি প্রশংসা করতে পারেনি। যুদ্ধ আমাদের মনে ফ্যাসিস্টদের সম্পর্কে ঘৃণাকেই শুধু প্রতিপালন করেনি, তাদের সম্পর্কে অবজ্ঞাও গড়ে তুলেছে। এই অনুভূতির জন্য আমরা গর্বিত হতে পারি, কারণ হিটলারের সৈন্যদল অনেক যুদ্ধ জয় করেছে। তা সত্ত্বেও তাদের জন্য আমাদের প্রগাঢ় অবজ্ঞা রয়েছে। এতে বোঝা যায় যে আমাদের জনগণ কতটা পরিণত। কীভাবে যুদ্ধ করতে হয় তা আমরা জার্মানদের কাছ থেকে শিখতে পারি কিন্তু কীভাবে বাঁচতে হয় তা আমরা তাদের কাছ থেকে শিখব না। আমাদের কাছে তারা সামরিক কৃৎকৌশল জানা দ্বিপদ মাত্র। অনেকেই বস্তুভিত্তিক সংস্কৃতির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অনেকের এটা বুঝতে কঠিন লাগে যে কোনো অর্ধশিক্ষিত স্প্যানিশ চাষি বার্লিনের কোনো অধ্যাপকের চেয়ে বেশি সভ্য হতে পারে। এখন সকলেই তা বুঝেছে। আমরা অনেক ফ্যাসিস্টকে দেখেছি যারা সঙ্গে ডায়েরি রাখে আর বাড়িতে তাদের রাখা আছে টাইপরাইটার আর গ্রামোফোন। এদের বাহ্যিক অবয়ব সভ্য ইউরোপীরদের মতো, তা সত্ত্বেও তারা প্রকৃতপক্ষে স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের যে কোনো অধিবাসীর নৈতিক বোধকে ক্ষুণ্ণ করবে। সীমান্তের যোদ্ধার পরিপক্কতা আমাদের শক্তিশালী করে তুলেছে। আমাদের ক্ষতি বিশাল মাপের। যুদ্ধের দ্বিতীয় গ্রীষ্ম আমাদের অনেক দুঃখ দিয়েছে। আমরা লড়ছি নিজেদের চেষ্টায় এবং স্বল্প আলোর ট্রেঞ্চের মাঝে এর চিন্তা আমাদের পীড়িত করে। তা সত্ত্বেও বলা যায় যে উনিশশো একচল্লিশ সালের বাইশে জুনের তুলনায় আমরা এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সচেতনতা, বোঝাপড়া আর অনুভূতির দিক থেকেও আমরা শক্তিশালী। এখনও বিজয়ের স্বাদ পাইনি আমরা তবে তার জন্য যথেষ্ট যোগ্য হয়ে উঠেছি। পঁচিশ বছর আগে পেত্রোগ্রাদে যা ঘোষিত হয়েছিল, গত শীতে মস্কোর উপকণ্ঠে তার প্রমাণ মিলেছে এবং স্তালিনগ্রাদের রক্ষকদের নৈতিক শক্তি তাকে যথার্থ করে তুলেছে। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই বার্ষিকী আমরা কাটাচ্ছি। পরে যখন জয় আসবে তখন আমরা উৎসব করব। কারণ, আমরা জেনেছি যে এই পঁচিশ বছর বৃথাই কাটেনি। আমরা সেই জনতায় পরিণত হয়েছি যা অজেয়। ১৯৪২-এর আগুনে ১৯১৭ সালের পরীক্ষা চলেছে, রাশিয়া সে-পরীক্ষা সহ্য করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভাষান্তর: দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় সমাপ্ত প্রকাশের তারিখ: ১৮-নভেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |