|
১৯৪৩-৪৪, বাংলার দুর্ভিক্ষ: একটি ভূমিকা (১)উৎসা পট্টনায়েক |
সর্বোপরি, ‘ফাটকা ও মজুতদারি’ দুর্ভিক্ষ পর্বের ত্বরিত মুদ্রাস্ফীতির একটা সর্বকালীন বিভ্রান্তিকর ‘ব্যাখ্যা’, যার দ্বারা উপসর্গ পরিবর্তিত হয়ে যায় কারণে। এটাও এক ধরনের ‘পোস্ট হক’ বা ‘ইহার পর উহা, অতএব ইহাই হেতু’ জাতীয় ভ্রান্তি যার মাধ্যমে একটি পরিস্থিতি যা আগে তৈরি হয়নি, বরং দুর্ভিক্ষের সমান্তরালে ঘটেছে, তাকে ভ্রান্তভাবে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটা অনেকটা ‘জ্বর হয়েছে বলেই রোগী মারা গিয়েছে’, ডাক্তারের এমন নিদান দেওয়ার মতোই, যেখানে উপসর্গ কেন দেখা দিল তাকে ধর্তব্যে আনা হয় না। জ্যোতি বসুই স্পষ্ট ভাষায় এবং সঠিকভাবেই প্রত্যাখান করেন সরকারি এই ঘোষণাকে যে মজুতদারির জন্যেই ত্বরিত মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গিয়ে বাজার থেকে ক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ জনগনের আওতার বাইরে চলে গিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। |
১৯৪৩, ব্রিটেনের কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় মজলিস থেকে বের হয় একটি পুস্তিকা। ‘দ্য ম্যান মেড ফেমিন’। লেখক জ্যোতি বোস। বসু নয়। জ্যোতি বসু তখন লিখতেন এই ছদ্মনামে। দিল্লির সাংকৃত্যায়ন-কোসাম্বি পাঠচক্র এটি পুনঃপ্রকাশ করে ২০২২ সালের মে মাসে। অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়েক সেই সংস্করণের একটি ভূমিকা লিখে দেন। মার্কসবাদী পথে তারই ভাষান্তর। বাংলার দুর্ভিক্ষ সম্পর্কিত জ্যোতি বসুর ছোট্ট পুস্তিকাটি সাধারণভাবে রক্ষণশীল ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের তথ্যের উপর নির্ভরশীল হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে খাদ্যশস্যের মজুতদারিকে এর উৎস বলে অভিহিত করার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে একে সঠিকভাবেই ‘মানুষের তৈরি’ দুর্ভিক্ষ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে এখানে। বাংলায় যখন দুর্ভিক্ষের আগুন জ্বলছে, তখন বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত বহু বিশিষ্ট মানুষ ত্রাণের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন এবং সাংবাদিকেরা দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে অর্জন করা অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন তাদের প্রতিবেদনে। বিশিষ্ট লেখকদের মধ্যে অন্যতম ভবানী সেন তাঁর রুরাল বেঙ্গল ইন রুইনস বইয়ে এর অনুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন। এবং টি জে নারায়ণন দ্য হিন্দু-র পাতায় তখন লিখে গিয়েছেন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ইংল্যান্ডে প্রগতিশীল সাংবাদিক হেনরি ব্রেইলসফোর্ড ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের দুর্ভিক্ষপর্বের নীতির কঠোর সমালোচক। অন্যদিকে ভারত থেকে আসা প্রতিবেদনগুলির উপর নির্ভর করে রজনী পাম দত্ত দ্রব্যমূল্যের ত্বরিত বৃদ্ধির উপর বিশেষ নজর দিয়ে দুর্ভিক্ষের গতিপ্রকৃতি অনুসরণ করেছেন। ইতিহাসের ঘটনাবলীর মধ্যে যারা থাকেন তাঁরা তাঁদের স্বচক্ষে দেখা অভিজ্ঞতার যথাযথ বিবরণ দিতে সক্ষম হলেও এর সম্পূর্ণ অভিঘাত কিংবা এর প্রকৃত কারণ সবসময় চিহ্নিত করতে সমর্থ হন না। এগুলি পরবর্তী সময়কালের নিবিড় গবেষণার বিষয়। খুব হিসেবী অনুমানেও ধারণা করা হয় ৩০ লক্ষ মানুষ ১৯৪৩-৪৪ কালপর্বের দুর্ভিক্ষে ক্ষুধার শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন, যদিও অন্য গবেষকরা মনে করেন এই সংখ্যা ৩৫ লক্ষের কাছাকাছি। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা প্রায়ই পোস্ট হক এরগো প্রপটার হক অর্থাৎ ‘ইহার পর উহা, অতএব ইহাই হেতু’ জাতীয় অতিসরলীকরণের প্রচলিত ভ্রান্তির খপ্পরে পড়ে অঙ্গুলির নির্দেশ করেন এমন কিছু বিষয়ের দিকে যার সাথে প্রকৃত ঘটনার কোনো যোগই ছিল না। উত্তর গোলার্ধের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কিছু বিভ্রান্ত পণ্ডিতদেরা এখনও মনে করেন, সেই সময়ে দুর্ভিক্ষ হওয়ার কারণ আগের বছর ঘূর্ণিঝড়ের ফলে খেতের ফসল ধ্বংস হয়ে যাওয়া। দুর্ভিক্ষের ব্যাপকতা তাদেরকে ভাবিত করেনি। কিংবা এই সত্যটিও উপলব্ধি করেনি যে প্রতি বছরই বাংলা ও উড়িষ্যার তটবর্তী অঞ্চলগুলি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়, কিন্তু এমন সাংঘাতিক পরিণামের মুখোমুখি হয় না। বাংলা ও উড়িষ্যার উপকূলে জাপানি সেনার অবতরণের আশঙ্কায় ভীত হয়ে ঔপনিবেশিক শাসকেরা ৮,০০০ মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস করে প্রাথমিক রসদ থেকে বঞ্চিত করার নীতির বাস্তবায়ন করে এবং এই কারণেই লাগোয়া গ্রামাঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডারও অধিগ্রহণ করে নেয়। এটাকে একটা কারণ হিসেবে বলা হয় এবং যদিও সত্যিই এর ফলে স্থানীয়ভাবে দুর্গতির প্রাদুর্ভাব হয়, কিন্তু যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে এবং গভীর ব্যাপকতায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তার নিরিখে এটাকে কারণ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। সর্বোপরি, ‘ফাটকা ও মজুতদারি’ দুর্ভিক্ষ পর্বের ত্বরিত মুদ্রাস্ফীতির একটা সর্বকালীন বিভ্রান্তিকর ‘ব্যাখ্যা’, যার দ্বারা উপসর্গ পরিবর্তিত হয়ে যায় কারণে। এটাও এক ধরনের ‘পোস্ট হক’ বা ‘ইহার পর উহা, অতএব ইহাই হেতু’ জাতীয় ভ্রান্তি যার মাধ্যমে একটি পরিস্থিতি যা আগে তৈরি হয়নি, বরং দুর্ভিক্ষের সমান্তরালে ঘটেছে, তাকে ভ্রান্তভাবে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটা অনেকটা ‘জ্বর হয়েছে বলেই রোগী মারা গিয়েছে’, ডাক্তারের এমন নিদান দেওয়ার মতোই, যেখানে উপসর্গ কেন দেখা দিল তাকে ধর্তব্যে আনা হয় না। জ্যোতি বসুই স্পষ্ট ভাষায় এবং সঠিকভাবেই প্রত্যাখ্যানকরেন সরকারি এই ঘোষণাকে যে মজুতদারির জন্যেই ত্বরিত মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গিয়ে বাজার থেকে ক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ জনগনের আওতার বাইরে চলে গিয়েছে খাদ্যসামগ্রী। বাংলায় ১৯৪২ এর গোড়া থেকেই খাদ্যশস্যের অস্বাভাবিকভাবে ত্বরিত মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। অবশ্য ব্রিটিশ শাসিত ভারতের অন্যত্রও তুলনায় কম ক্ষিপ্রতায় হলেও খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল। খোলা বাজারে মনপ্রতি (১ মন সমান ৮২ পাউন্ড অথবা ৩৭ কেজি) চালের দাম ১৯৪২-এর জানুয়ারিতে কলকাতায় ছিল ৬ টাকা, যা ১৯৪৩ এর এপ্রিলে চারগুণ বেড়ে হয় ২৪ টাকা এবং পরবর্তী ছ-মাসে দ্বিগুণ বেড়ে অক্টোবর মাসে দাঁড়ায় ৪০ টাকায় (ভবানী সেন ১৯৪৫, ১৯৪৭ তা উদ্ধৃত করেন রজনী পাম দত্ত)। এভাবেই দু-বছরেরও কম সময়ে সাত গুণ দাম বেড়ে যায়। তুলনার হিসেবে বলা যায়, মাথাপিছু মাসিক আয় ১৯৪০ সালে ছিল ৫.৩৩ টাকা। ধরে নেওয়া যাক, এই গড় আয়ে একজন মানুষ অন্যকিছু বাদ দিয়ে শুধু ৩০০ গ্রাম চাল ক্রয় করেছেন (এই চাল রান্নার পর ১১০০ কিলো ক্যালোরির পুষ্টি জোগাবে যা বেঁচে থাকার জন্যে যথেষ্ট), কিন্তু তিনি ১৯৪৩ সালে এসে আর যথেষ্ট পরিমাণ চাল ক্রয় করতে সক্ষম থাকছেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রকৃতপক্ষে গড় আয়ের চেয়ে অনেক কম আয় করত। এবং ১৯৪২ সালের গ্রীষ্মের শেষে এসে তারা অপুষ্টি ও খাদ্যহীনতার শিকার হয়। কলকাতা তুলনায় উন্নততর অবস্থায় ছিল খাদ্যশস্যের রেশন ও ন্যায্যমূল্যে বন্টনের ব্যবস্থার সুবাদে। কিন্তু মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল অনেক বেশি যার দরুণ চালের দাম মন প্রতি ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গ্রাম ও শহরের মজুরি শ্রমিক, গরিব কৃষক, হস্তশিল্পী, মৎস্যজীবী এবং পরিষেবা প্রদানকারী জীবিকার মানুষেরা যারা ছিল প্রধানত কিংবা পুরোটাই বাজার থেকে খাদ্যশস্য ক্রয়ের উপর নির্ভরশীল। খাদ্যশস্যের মূল্যের এই হিংস্র ঊর্ধ্বগতি ছিল ১৯৪০ সালে যুদ্ধকালীন অর্থনীতি বিষয়ক ব্রিটিশ সরকারের নিযুক্ত পরামর্শদাতা জন মেইনার্ড কেইনসের গৃহীত ‘মুনাফা স্ফীতি’ নামের সরকারি নীতির ফলাফল। তাঁকে ভারতের অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ধরা হত। কারণ লন্ডনে ইন্ডিয়া অফিসে প্রথম চাকরির সময় থেকে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা যার ভিত্তিতে ১৯১৩ সালে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে তাঁর ‘ইন্ডিয়ান কারেন্সি এন্ড ফিনান্স’ নামে প্রথম বই প্রকাশিত হয়। ইন্ডিয়া অফিস ছেড়ে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর বহু বছর তিনি ছাত্রদের সামনে ভারতের অর্থনীতি বিষয়ে বক্তৃতা প্রদান করেছেন। ১৯১৩ সাল থেকে ভারতীয় মুদ্রা ও অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিটি কমিটির তিনি হয় সদস্য ছিলেন, নয়ত সেখানে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত বই ট্রিটিজ অন মানি, দ্য অ্যাপ্লাইড থিয়োরি অব মানি-তে কেইনস সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো যুদ্ধকালীন সময়ে সামরিক ব্যয়ের চকিত উল্লম্ফন জনিত ঘাটতি স্বেচ্ছা সঞ্চয়ের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। যেহেতু ‘ধনীরা সংখ্যায় নিতান্তই স্বল্প’ এবং ফলে একমাত্র ‘কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া ক্রয়ক্ষমতা হস্তান্তর’-এর মাধ্যমে জনসাধারণের ভোগের পরিমাণে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস ঘটিয়েই যুদ্ধের জন্যে প্রয়োজনীয় বাড়তি সম্পদ বের করে আনা সম্ভব। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলি শ্রমিকদের শ্রমের মজুরি হ্রাস ঘটানোর প্রতিরোধ করবে এবং মজুরির উপর বৃহৎ কর চাপানোও ঠেকাবে, ফলে একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প হল, ইচ্ছাকৃতভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহের বৃদ্ধিকে শ্রম মজুরির চেয়েও বেশি হারে বাড়ানো যাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ব্যয়ে হ্রাস ঘটে যায়। ‘অতএব আমার উপসংহার হচ্ছে, যুদ্ধের সময়ে মুনাফার স্ফীতি ঘটাতে দ্রব্যমূল্য বাড়তে দেওয়া অনিবার্য এবং শ্রেয়’ (কেইনস ১৯৭১ [১৯৩০], পৃষ্ঠা ১৫৫)। কেইনস মনে মনে ভেবেছিলেন, শ্রমিকরা তাঁর ‘মুনাফা স্ফীতি’-র নীতির মধ্য দিয়ে তাদের ভোগের পরিমাণ কমানোর কৌশলটি ধরতে পারবে না। ‘মুনাফা স্ফীতি’ অভিধাটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন এমন একটি পরিস্থিতি বোঝাতে যখন মজুরি আয়ের বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি ঘটানো হবে যা ‘আয়ের স্ফীতি’-র বিপরীতার্থক যেখানে দ্রব্যমূল্য ও মজুরি আয়ে পরস্পরের সাথে সঙ্গতি রেখে বৃদ্ধি ঘটে প্রকৃত আয় অপরিবর্তিত থেকে যায়। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সময়পর্বে কেইনস সংবাদপত্র ও গবেষণা পত্রিকায় বারবার মুনাফা স্ফীতির পক্ষে সওয়াল করে গিয়েছেন। এবং হাউ টু পে ফর দ্য ওয়ার– এ রাডিকেল প্ল্যান ফর দ্য চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকর নামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেন। কিন্তু ব্রিটেনের শ্রমিক নেতারা ততটা স্বল্পবুদ্ধির ছিলেন না যতটা কেইনস ভেবে নিয়েছিলেন, ফলে তাঁরা ইচ্ছাকৃত মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে প্রকৃত আয় কমানোর দুরভিসন্ধি প্রত্যাখ্যানকরলেন তীব্রভাবে। তাঁরা বললেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিকশ্রেণি স্বেচ্ছায় অর্থসাহায্য করবে, কিন্তু প্রকৃত আয় কমানোর অভিপ্রায়ে করা মুদ্রাস্ফীতির ছকের মাধ্যমে তারা সেটা করবে না। তাঁরা বুঝেছিলেন যে কেইনসের প্রস্তাবটি চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল কারণ খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যার দরিদ্রতম অংশটিকেই আঘাত করবে। ব্রিটেনের শ্রমিক সংগঠনগুলির তীব্র বিরোধিতার মুখে কেইনস বাধ্য হন মুদ্রাস্ফীতিকে যুদ্ধে আর্থিক জোগানের পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করার পথ পরিত্যাগ করে দরিদ্রতম নাগরিকদের সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে বাড়তি করের তুলনায় ভারসাম্যমূলক একটি করনীতি গ্রহণ করতে, যা ছিল অনেকটাই প্রগতিশীল। অন্যদিকে, ভারতে কেইনস প্রস্তাবিত মুনাফা স্ফীতি নীতি নিয়ে জনসাধারণ অবহিত ছিল না, বা এ-নিয়ে কোনো আলোচনাও এখানে হয়নি, যার ফলে তাঁর প্রিয় নীতি বিষয়ে অবহিত বিরোধীদের অনুপস্থিতিতে তিনি এখানে খোলা ময়দান পেয়ে গেলেন। ইউরোপে যুদ্ধ দেখা দিতেই ব্রিটেনের সাথে ঔপনিবেশিক ভারত সরকারের এক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। যার সুবাদে জাপানের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির যুদ্ধব্যয়ের পরিমাণ যে অঙ্কেই দাঁড়াক সেটা ভারতীয় বাজেট থেকেই সংস্থান করার কথা হয়। এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রিটেন তা স্টার্লিং-এ মিটিয়ে দেবে, সেটা যবেই হোক। কার্যত এটা দাঁড়াল, ভারত থেকে প্রতি বছর সীমাহীন পরিমাণে বেসামালভাবে বলপূর্বক ঋণ তোলা, যার কোনো সমাপ্তি রেখা নেই। টাকার অঙ্কে ভারত মিত্রবাহিনীর খাতে এবং যুদ্ধ সম্পর্কিত নির্মাণে যা ব্যয় করে তার সমমূল্যের পাউন্ড স্টার্লিং লন্ডনের ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কে খাতায় কলমে যোগ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এক পেনি স্টার্লিংও সেখান থেকে পাওয়া যায়নি। সেখানে এটাও স্পষ্ট ছিল না, কবে এবং কীভাবে ভারতের ঋণ পরিশোধিত হবে। এই সমঝোতার স্বরূপ প্রকাশ্য হতে শুরু করল ১৯৪১ সালের শেষে পার্ল হারবারে বোমাবর্ষণের পর যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিল এবং বর্মার ভেতর দিয়ে জাপ বাহিনীর অগ্রগমন ঠেকাতে প্রতিদিন হাজারে হাজারে মার্কিন সেনা পূর্ব-ভারতে ভিড় জমাতে শুরু করল। অস্বাভাবিক দ্রুততায় সেনা-নিবাস, রাস্তাঘাট ও বিমানপোত নির্মিত হতে থাকল এবং যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের শিল্পে তেজীভাব আসল। ভারতকে হঠাৎ করেই মিত্রবাহিনীর খাওয়া, থাকা ও চলাচলের বর্ধিত খরচের বোঝা এবং যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট শিল্পে হঠাৎ নিযুক্তি বাড়ার ফলে খাদ্যশস্যের চাহিদার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হল। এ ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের সিংহভাগ ঘটল বাংলার প্রান্তিক অঞ্চল থেকে যা সাক্ষী হল অবশিষ্ট ভারতের চেয়ে অধিকতর মুদ্রাস্ফীতির। মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সম্পদ সংগ্রহের নিকৃষ্টতম শিকার হল গ্রামীণ জনগণ। ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার দ্য ম্যান মেড ফেমিন– মূল পুস্তিকাটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির সগ্রহ থেকে সুচিন্তন দাশের সৌজন্যে প্রাপ্ত প্রকাশের তারিখ: ২৫-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |