|
২০২৪: সামনে বড় লড়াইটিম মার্কসবাদী পথ |
ভারতীয় রাষ্ট্র দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে বি-ধর্মনিরপেক্ষকরণের দিকে। অতীতের হিন্দু উপাসনাস্থল পুনরাবিষ্কারের হিড়িক। ‘হিন্দু’ অতীত পুনরুদ্ধারের জোয়ার। অতীত খুঁড়ে হিন্দু রাজত্বের অস্তিত্ব স্থাপনের নতুন চেষ্টা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় যারা স্লোগান দিয়েছিল– ‘ইয়ে তো আভি ঝাঁকি হ্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ্যায়’– তা যে নিছক জোশ বাড়ানোর কথা ছিল না, এখন তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। |
২০২৩ দেখেছে মানবতার মৃত্যু! গাজায় প্রতি পনের-মিনিটে একটি শিশুর মৃত্যু! প্যালেস্তাইনে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইজরায়েল। বেপরোয়া ঢঙে চলেছে সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এক বেনজির বর্বরতার সাক্ষী গোটা বিশ্ব। সাতাশ ডিসেম্বর, গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসে ৮২-দিনের তথ্য: এই সময়ে ২৮,১১০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এরমধ্যে ২১,১১০ জনকে হাসপাতালে সনাক্ত করা গিয়েছে। বাকি প্রায় ৭,০০০ জন নিখোঁজ, যাঁরা ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে রয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ৮,৮৮০, আর মহিলা ৬,৩০০ জন। পৃথক আরেকটি রিপোর্টে ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস ওই দিনই জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ২৯,১২৪। এরমধ্যে ১১,৪২২টি শিশু, আর ৫,৮৮২ জন মহিলা। ইউরো-মেডের হিসেব ধরলে, প্রতি দশ-মিনিটে একটি শিশুর মৃত্যু! ১৯ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে খোলা আকাশের নিচে। ইজরায়েলের বোমাবর্ষণে গুঁড়িয়ে গিয়েছে ৩০৫টি স্কুল। সঙ্গে ১৩৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৫৬টি ক্লিনিক, ৫৫টি অ্যাম্বুলেন্স, ২৩টি হাসপাতাল। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ৪৮১ জন স্বাস্থ্যকর্মী, ১০১ জন সাংবাদিক। জখমের সংখ্যা ৫৬,১২২। প্রতি মুহূর্তে দীর্ঘতর হচ্ছে এই মৃত্যু-মিছিল। প্যালেস্তিনীয় জনগণের এই দুর্ভোগের জন্য কেবলমাত্র ৭ অক্টোবর হামাসের হামলাকে দায়ী করা উচিত নয়। বেলফোর ঘোষণার পর থেকে এক শতাব্দী ধরে তাঁরা নিপীড়নের শিকার। ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, যেখানে হামাসের কোনও অস্তিত্ব নেই, সেখানেও হামলার মুখে প্যালেস্তিনীয়রা। এমনকি হাসপাতাল, ছিন্নমূল উদ্বাস্তু শিবির-ও নিরাপদ নয়। পুরো উদ্বাস্তু শিবিরই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে! মিশে গিয়েছে মাটিতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন মৃত্যুর কিনারায়। ইজরায়েলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিস্ময়ের বিষয় হলো ইজরায়েলের আগ্রাসনের পক্ষে মোদী সরকারের পুরোদস্তুর সমর্থন। হামাসের প্রত্যাঘাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরব হয়েছেন মোদী। টুইট করে বলেছেন: ‘এই কঠিন সময়ে আমরা ইজরায়েলের পাশে আছি।’ সাধারণ রীতি অনুযায়ী বিদেশমন্ত্রকের বিবৃতির জন্য পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি। বেছে নিয়েছেন অনলাইন কূটনীতির পথ। নিরপেক্ষতার কোনও ভান না রেখে নিজের এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) থেকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর ভারত কোন পক্ষে। এমনকি ইজরায়েলের আগ্রাসনের মুখেও যুদ্ধ বিরতি চায়নি মোদী সরকার! মানবতার খাতিরে যুদ্ধবিরতি, সমস্ত সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং অবিলম্বে মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়ে অক্টোবরে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সাদামাটা প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকেছে। পরে ডিসেম্বরে, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভারত অনিচ্ছার সঙ্গে ভোট দিয়েছে। এটা না করলে ভারত আরও একঘরে হয়ে যেত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য-দেশের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল যুদ্ধবিরতির পক্ষে। বস্তুত, এশিয়ার প্রতিটি দেশই ‘পক্ষে’ ভোট দিয়েছে। বিপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল, অস্ট্রিয়া-সহ মাত্র ১০টি দেশ। ভোটদানে বিরত ছিল জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, ইউক্রেনের মতো ২৩টি দেশ। মোদী সরকারের এবারে কিছু করার ছিল না। অন্তত ২১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকার অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসরি পক্ষ নিয়েছে, যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেকই ইউরোপের দেশ। নজর করার মতো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান পর্যন্ত পক্ষে ভোট দিয়েছে। এমনকি এশিয়ার ফিলিপাইন্স পর্যন্ত। ২০২৩ মানে দ্বিতীয় দফার মোদী সরকারের চূড়ান্ত বছর। ভারতীয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার আরও একটি বছর। সংসদ গিয়ে উঠেছে নতুন ভবনে। এবছর সংসদের শেষ অধিবেশন দেখেছে বিরোধী দলের ১৪৬ জন সাংসদের সাসপেন্ড। বিরোধী শূন্য সংসদে তিনটি ফৌজদারি বিল পাস। ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকারকে দূরে সরিয়ে রাখার কথা বলা হলেও, আসলে যা করা হচ্ছে তা ঔপনিবেশিকতার আরও কঠোর রূপ। নতুন ফৌজদারি আইনগুলিতে এমন অনেক বিধি রয়েছে, যেখানে একটি পুলিশ-রাষ্ট্রে নাগরিকদের মৌলিক রক্ষাকবচগুলি তুলে নেওয়া হয়েছে। যা বেআব্রু করেছে সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে মোদী সরকারের অভিপ্রায়কে। সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে দেশ এখন নির্বাচনী-স্বৈরতন্ত্রে। গণতন্ত্রের উপর এই হামলার পথ ধরে আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে সমস্ত স্বাধীন সংস্থা, সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের উপর। উপেক্ষা করা হচ্ছে বিচার ব্যবস্থাকেও। যার স্বাধীন চরিত্র আজ প্রশ্নের মুখে। বড়সড় প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছে সংবিধান। অন্য কাউকে দেয়নি। গণতন্ত্র মানে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন। এখন নির্বাচন কমিশনই যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রের সমূহ সর্বনাশ। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের সমীক্ষায় ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ ভারত এখন আর ‘মুক্ত গণতন্ত্রের’ দেশ নয়। আমরা এখন ‘আংশিক-মুক্ত গণতন্ত্রের’ দেশ। সুইডেন-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভি-ডেমের সমীক্ষায় ভারত এখন নির্বাচন-ভিত্তিক স্বৈরতন্ত্রের দেশ। ভারতীয় রাষ্ট্র দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে বি-ধর্মনিরপেক্ষকরণের দিকে। অতীতের হিন্দু উপাসনাস্থল পুনরাবিষ্কারের হিড়িক। ‘হিন্দু’ অতীত পুনরুদ্ধারের জোয়ার। অতীত খুঁড়ে হিন্দু রাজত্বের অস্তিত্ব স্থাপনের নতুন চেষ্টা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় যারা স্লোগান দিয়েছিল– ‘ইয়ে তো আভি ঝাঁকি হ্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ্যায়’– তা যে নিছক জোশ বাড়ানোর কথা ছিল না, এখন তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। রামজন্মভূমির পর জ্ঞানব্যাপী মসজিদ। মথুরা ইদগাহ। কুতুব মিনার। এবং তাজমহল। আপাতত হিট লিস্টে। নতুন বছর শুরু হবে অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে, যা তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায়। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে সংখ্যালঘুরা রয়েছেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে। তাঁদের জীবনজীবিকায় কঠোর বিধিনিষেধ। মুসলিমদের ওপর হামলার প্রতীক হয়ে উঠেছে বুলডোজার। মে মাস থেকে ভয়াবহ জাতিগত সংঘর্ষের সাক্ষী মণিপুর। সাতমাস পরেও মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে আড়াআড়ি বিভাজন। উপত্যকা ও পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর বাফার জোন। এই পরিস্থিতির জন্য এক এবং একমাত্র দায়ী বিজেপির মুখমন্ত্রী, আর তাঁর বিভাজনের রাজনীতি। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌছতে ব্যর্থ কেন্দ্র। মারাত্মক আক্রমণের মুখে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলির রাজ্যপালরা রাজ্য সরকারের কাজকর্মে হয়ে উঠেছেন আরও আগ্রাসী। অস্বীকার করছেন বিধানসভায় পাস হওয়া আইন। জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিভাজন এবং সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জের আবেদনগুলি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্টের ‘অস্বস্তিকর রায়’ সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর ফেলবে গুরুতর প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভারতের সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলির অন্যতম। জিডিপি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে মোদী সরকার দাবি, বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে ভারতীয় অর্থনীতি। কিন্তু মাথাপিছু-জিডিপি ধরলে, ভারতের স্থান জি-২০ দেশগুলির মধ্যে একেবারে নিচে। ২০২৩ সালে ছিল ২৬০০ ডলার। ঘটনা হলো এই বৃদ্ধিতে বাড়েনি কর্মসংস্থান। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই)-র সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে, এবছর অক্টোবরে বেকারত্বের হার ছিল ১০.০৫ শতাংশ, গত একুশ মাসে সর্বোচ্চ। যেখানে তরুণদের মধ্যে এই হার ছিল ২৩.২২ শতাংশ। মোদীর গ্যারান্টি ‘তৃতীয়বারের মেয়াদ মানে, ২০২৮ সালের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।’ অন্যদিকে, ছত্তিশগড়ের নির্বাচনী সভা থেকে ‘আরও পাঁচ বছর দেশের ৮০ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার’ মোদীর ঘোষণা। তাঁর কথায়, ‘মোদীর গ্যারান্টি ভারতের জনগণের জন্য’। মোদীর অমৃত কাল! একদিকে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে, আবার ৮০ কোটি গরিব-ও থাকবে! ধনী দেশ, গরিব মানুষ! বিশ্ব ক্ষুধা সূচক-এ আরও তলানিতে। চার-ধাপ নেমে ১২৫টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১১১। অর্থাৎ, বিশ্বের অন্যতম ‘ধনী’ দেশে জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশের কাছে পুষ্টির মতো মৌলিক অধিকারটিও অধরা। কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক আঁতাত আরও প্রকটভাবে দেখা গিয়েছে এবছর। হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ সংস্থার বেআব্রু করা আদানি গোষ্ঠীর কর্পোরেট জালিয়াতি এবং শেয়ার দর বাড়ানোয় কারচুপি এখন আন্তর্জাতিক খবর। বিপরীতে, মোদী সরকার গৌতম আদানিকে রক্ষা করতে অনড়। ধান্দার ধণতন্ত্রে এই গুরুতর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করতে অস্বীকার। আদানির ওপর আক্রমণকে দেখা হয়েছে হিন্দুত্ববাদী ব্যবস্থার অধীন ভারতের ওপর আক্রমণ হিসেবে। বৃহৎ পুঁজিপতিদের প্রতি মোদী সরকারের অনুগ্রহে আয় ও সম্পদের বৈষম্য পৌঁছেছে এক নতুন উচ্চতায়। অক্সফামের রিপোর্টে অসহায় আর্তনাদ। ধনীশ্রেষ্ঠ ১ শতাংশের হাতে দেশের ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ, যেখানে আয়ের দিক থেকে নিচের দিকে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে মাত্র ৩ শতাংশ! ২০২৪, সামনে বড় লড়াই, যা নির্ধারন করবে দেশের ভবিষ্যত।
প্রকাশের তারিখ: ৩১-ডিসেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |