২১ ফেব্রুয়ারি: স্মৃতি-বিস্মৃতির যুদ্ধ

সৈকত ব্যানার্জী
তাহলে কীভাবে ঝাপসা হল পুরনো সব স্মৃতি? শুধুই কি সরকারের বিরুদ্ধে জায়েজ কিছু রাগ থেকেই? নাকি শ্রেণির চিহ্ন এমনকি ভাষার চিহ্নের থেকেও তাদের কাছে বড় করে তোলা হচ্ছে ধর্মীয় চিহ্নগুলোকে? জাগিয়ে তোলা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক জিগির! অধিকাংশ যুবসমাজকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে রক্তঝরানো ইতিহাস৷ তাই ফিরে-ফিরতি যাদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা, সেই পাকিস্তানমুখী হয়ে উঠতেও সময় লাগছে না তাদের। এমনকি ভাষা আন্দোলনের শহীদ বেদিতেও নামছে আক্রমণ।  শুধু কি বাংলাদেশে? আমাদের ভারতবর্ষেও ধর্মের চিহ্নগুলো কেবল বদলে আক্রমণ নামছে সেই ভাষার ওপরেই। ভাষার গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের নামাবলি। উর্দুর ভাষাগত সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে তাকে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে 'মুসলমানের ভাষা' হিসেবে।

টুকরো  ১

তোড়জোড় চলছেসাজোন গোজন হয়েছে বেশস্কুলে ঢুকে সেসব দেখতে দেখতে একজন ছাত্র (ক্লাস সিক্স হবে) জিজ্ঞাসা করল,  'স্কুল সাজানো হয়েছে কেন স্যার? কী আছে আজ?' বললাম, 'আজ ভাষাদিবস।' একান্ত সরলতায় (এবং ফেব্রুয়ারির অভ্যাসে হয়ত বা) সে আমার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল 'হ্যাপি ভাষা দিবস'। বুঝলাম অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছেঅনেকটা দেরিবিগত কিছুদিনের অভ্যাসে ভ্যালেন্টাইন ডে, রোজ ডে, হাগ ডে, স্ল্যাপ ডে, কিক ডে আরও যাবতীয় 'ডে' দের পাশে সে 'ভাষা ডে'কেও বসিয়ে নিয়েছে একই পংক্তিতেবিকিকিনির হাট ভাষা আন্দোলনের গা থেকে মুছে নিয়েছে যাবতীয় রক্তছাপরক্তের দাগ লেগে থাকলে বিক্রিবাটায় অসুবিধা হবেস্মৃতিরা বিদ্রোহী হয় পাছে, তাই মুছে ফেলা দরকার সমস্ত ক্ষত আর স্পর্ধার চিহ্ন

টুকরো ২

ক্লাসে ব্যাকরণ পড়ানো থামিয়ে দিল এক ছাত্রীর প্রশ্ন, 'স্যার ২১শে ফেব্রুয়ারি যেসব শহীদদের নাম শোনা যায় তারা সবাই মুসলমান কেন? হিন্দুদের নাম শোনা যায় না কেন?' তার গলায় দুঃখের ভাব গোপন ছিল নাবুঝলাম, দেরি হচ্ছে, রাতও ঘনিয়ে উঠছে ক্রমশসময়ের নখ দাঁত বড় ভয়ানককোন পথে বিষ ঢোকে ঠাওর করা শক্ত....

টুকরো ৩ 

চায়ের দোকানে ঠেক চলছে। 'আজ আবার কীসের অনুষ্ঠান ছিল? চারদিকে হঠাৎ 'আমি বাংলায় গান গাই' চলছে সারাদিন!' পরাণবাবু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, 'আরে জানো না! আজ বাংলায় কথা বলতে দেবে না বলে মুসলমানরা গুলি চালিয়েছিলভারতবর্ষটাকে এরা পাকিস্তান বানিয়ে ছাড়বে।' সন্ধ্যা নামছেদোকান ঘরে টাঙানো মানচিত্রটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছেবোঝা যাচ্ছে না ঠিক।  বাইরের পৃথিবীটার মতোই ঝাপসা হয়ে উঠছে স্মৃতির প্রদেশঝাপসা করে দেওয়ার জন্য চলছে প্রস্তুতিইতিহাস ঘোলাটে করে দিতে পারলে কব্জা করা সহজ হবে বর্তমানকে, ভবিষ্যতকেও। 

টুকরো

'তুমি কে আমি কে? রাজাকাররাজাকার।' উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা শহরের রাজপথদীর্ঘ বঞ্চনার অবসান চাইযে কোনো মূল্যে! প্রত্যক্ষ দাবিমুক্তিযোদ্ধা কোটার বদলতাই দরকারে সবাই রাজাকার! কারা রাজাকার? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়ক আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী দলযারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই রুখতে মদত করেছিল পাকিস্তানকে! কয়েক দশক পেরিয়ে এসে সেই রাজাকার পরিচয়ই দর্পভরে গ্রহণ করছে বাংলাদেশের যুবসমাজ! ইতিহাসের রেখাপথ বেঁকেচুরে গিয়ে হয়ে উঠছে ভাঙাচোরা এক জিজ্ঞাসা চিহ্ন। 

গল্পটা পুরোনো৷ একবার মানুষেরা সবাই মিলে স্থির করল এমন এক সিঁড়ি তৈরি করবে যা পৃথিবী ছাড়িয়ে উঠে যাবে সোজা স্বর্গ পর্যন্ত৷ হাতে হাত লাগিয়ে তারা প্রায় তৈরিই করে ফেলল সেই সিঁড়িকাজ যখন প্রায় শেষ, তখন বিপদ আঁচ করল দেবতারাস্বর্গের যে আরামপ্রদ চেয়ারে বসে নিদান দেয় দেবতারা আর মানুষকে নাচায় পুতুলের মত, সেখানে যদি পৌঁছে যায় জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে বাজি লড়তে লড়তে বাঁচা মানুষ, তাহলে শাসনের নিপাট বন্দোবস্ত আর টিকবে কী করে! তাই ফন্দি আঁটল দেবতারাযে মানুষেরা মিলেমিশে কাজ করছিল এতদিন, আচমকা মন্ত্রবলে ভুলিয়ে দেওয়া হল তাদের ভাষা৷ একসঙ্গে কাজ করছে মানুষগুলো, কিন্তু সংযোগ তৈরি করতে পারছে না আরএকজন হাতুড়ি চায় তো আরেকজন কোদাল এগিয়ে দেয়একজন ইঁট গাঁথতে বলে তো আরেকজন গাঁথা সিঁড়ি ভেঙে ফেলে৷ নিজেদের মধ্যে লেগে যায় তুমুল মারামারিশেষ অবধি আর বানানোই হয় না -স্বর্গ-বিস্তৃত সেই সিঁড়িদেবতারা নিশ্চিন্ত হয়। 

ভাষা সেই মাধ্যম যা একের সঙ্গে গড়ে তোলে অন্যের যোগনিজেকে জানায়অন্যকে জানেজুড়ে রাখে আমাদের অতীতের সঙ্গেআর আঙুল ছুঁয়ে রাখে ভবিষ্যতেরতাই ভাষার ওপর আঘাত নামিয়ে আনার চেষ্টা বারবার সংঘটিত করে শাসক১৯৫২-তে যেমন হয়েছিলতৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে, যেখানে অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা সেখানে ঘোষণা করা হয়েছিল 'উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা পথে নেমেছিল ঢাকার ছাত্ররা৷ কেবল বাংলা ভাষার প্রতি আবেগের বশে নয়উর্দু একক রাষ্ট্রভাষা হলে অফিস কাছারি, চাকরির পরীক্ষা সবক্ষেত্রেই বাঙালিরা হবে বঞ্চিততাই মনের টানের সঙ্গে সেখানে মিশে গিয়েছিল পেটের লড়াইওখেয়াল রাখা প্রয়োজন, সেই সময়ে আন্দোলনকারীরা উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকেই কেবল রাষ্ট্রভাষা করতে হবে এমন দাবি করেনিচেয়েছিল 'অন্যতম রাষ্ট্রভাষা' হিসেবে বাংলার স্বীকৃতিভাষা-শত্রুতা নয়, সমন্বয়ভাষা আন্দোলনের সেই উত্তাপ বাড়তে বাড়তে ক্রমশ এগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দিকেজিন্নাহের হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্বের ফাঁকফোকরগুলো বড়ো হয়ে বেরিয়ে এসেছে আরেক দ্বিজাতিতত্ত্ব 'খানদানি মুসলমান' 'বাঙালি মুসলমান'। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমান দেখেছে, তারা অত্যাচারিত হয়ে চলেছে পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে, সমধর্মের চিহ্ন তাদের শোষণ আটকাতে পারেনিতাই তারা চেয়েছে স্বাধীনতামুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশসেই স্বাধীন বাংলাদেশেও তারপর শেষ হয়নি দ্বি-জাতি-তত্ত্বসিরাজুল ইসলাম চৌধুরি 'দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্য-মিথ্যা’ প্রবন্ধে বলতে চাইবেন, এক সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ভেবেছে হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে দেশ গঠিত হলে সেখানে আর শোষিত হবে না মুসলমানপাকিস্তান গঠিত হবার পর সে দেখেছে, বাঙালি মুসলমান শোষিত হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমানের হাতে৷ আর স্বাধীন বাংলাদেশে দুই জাতি হিসেবে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বড়লোক আর গরিব। 

তাহলে কীভাবে ঝাপসা হল পুরনো সব স্মৃতি? শুধুই কি সরকারের বিরুদ্ধে জায়েজ কিছু রাগ থেকেই? নাকি শ্রেণির চিহ্ন এমনকি ভাষার চিহ্নের থেকেও তাদের কাছে বড় করে তোলা হচ্ছে ধর্মীয় চিহ্নগুলোকে? জাগিয়ে তোলা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক জিগির! অধিকাংশ যুবসমাজকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে রক্তঝরানো ইতিহাস৷ তাই ফিরে-ফিরতি যাদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা, সেই পাকিস্তানমুখী হয়ে উঠতেও সময় লাগছে না তাদেরএমনকি ভাষা আন্দোলনের শহীদ বেদিতেও নামছে আক্রমণ। 

শুধু কি বাংলাদেশে? আমাদের ভারতবর্ষেও ধর্মের চিহ্নগুলো কেবল বদলে আক্রমণ নামছে সেই ভাষার ওপরেইভাষার গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের নামাবলিউর্দুর ভাষাগত সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে তাকে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে 'মুসলমানের ভাষা' হিসেবে।  উত্তরাখণ্ডের অজস্র রেলস্টেশনের বোর্ড থেকে উর্দু হরফে লেখা নাম মুছে দিয়ে লেখা হচ্ছে সংস্কৃত হরফ৷ অথচ সমগ্র উত্তরাখণ্ডে সংস্কৃতভাষী চারশোটা মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না, আর উর্দুভাষী মানুষের সংখ্যা সেখানে চল্লিশ লক্ষেরও বেশিআমাদের শেখানো হচ্ছে, হিন্দুর ভাষা নয়, তাই আমাদের ভুলে যেতে হবে খসরুর গজল, গালিবের কবিতা, গুলজার সাহেবের গানশাসক যখনই যে দেশে ধর্মকে হাতিয়ার বানায় সে দেশে তখন ভাষার গা থেকে রক্ত ঝরতে থাকেভাষাই তো আসলে ধারন করে রাখে আমাদের ইতিহাসআমাদের স্মৃতি এবং সত্তাআর স্মৃতিকে ভুলিয়ে দিলে, ইতিহাস বিকৃত করতে পারলে দিশাহীন আমাদের মগজে সহজে নামিয়ে আনা যাবে কার্ফিউ। 

২১শের বাৎসরিক উদযাপনের রমরমার মুহূর্তঅথচ আমার একলা ঘর থেকে এখন সরে যাচ্ছে প্রভাত ফেরির গন্ধসরে যাচ্ছে কোরাসের সুর 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো...'। ঘরভর্তি জঞ্জালের মধ্যে আমি হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছি কতকগুলো অক্ষররক্তমাখাগন্ধ নিচ্ছি তাদের ঘামের। ' মরি বাংলা' আদিখ্যেতা নয়, হাতরে চলেছি স্পর্ধাঅধিকারভাষার গায়ে যদি ঘামের চিহ্ন নাই রইল তবে ভাষার জন্য 'দিবস'এর আয়োজন বৃথাভাষা যদি যুক্তি আর তর্কের, যন্ত্রণা আর স্বাধীনতার হাত না ধরল তবে 'ভাষা দিবস' আর বাজারি 'ভ্যালেন্টাইন দিবস'এর কোন ফারাক থাকে কী করে! ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য তাই এতো এতো আয়োজন৷ চারিদিকে পাতা চলছে বিস্মৃতির ফাঁদভুলে যাও তোমার শ্রেণিআঁকড়ে ধরো ধর্মের চিহ্নভুলে যাও তোমার ভাষাআঁকড়ে ধরো বাজারের হাতভুলে যাও সমস্ত লড়াইয়ের ইতিহাসটিকে থাকো টুকরো খণ্ডিত বর্তমানেনিজেকে ভোলো আর টিকে থাকোঅতীতকে ভোলো আর টিকে থাকোবিক্রি হও আর টিকে থাকো আর বিক্রি হওএর বিরুদ্ধেই এক অসম লড়াইভুলিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে মনে রাখারবিচ্ছিন্ন বিকৃত তথ্যের বিরুদ্ধে ইতিহাসের দ্বান্দ্বিকতারবিস্মরণের বিরুদ্ধে স্মৃতিরমনে পড়ছে মিচেল গণ্ড্রি পরিচালিত চলচ্চিত্র Eternal sunshine of the spotless mind- মস্তিষ্ক থেকে প্রেম আর সম্পর্কের সব স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য চলছে প্রযুক্তি নির্ভর চেষ্টাআর ক্লেমেন্টাইন আর জোয়েল আপ্রাণ ডুব দিচ্ছে নিজেদের গহনতম প্রেমের স্মৃতিতেযত মুছে দেওয়া হচ্ছে স্মৃতি, তত আরও গভীরে ডুব দিয়ে পরস্পরকে আঁকড়ে ধরছে তারাএটাই লড়াইইতিহাসকে না ভোলার, ভাষা আর তার আর্তনাদকে মনে রাখারপ্রতিরোধের উচ্চারণকে মনে রাখারএকুশে ফেব্রুয়ারি তো সেই উচ্চারণেরই দিন। 


প্রকাশের তারিখ: ২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org