ভারতের বুকে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার পর ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ই অক্টোবর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ৭৫ বছর ধরে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকদের আন্দোলন বিকাশে এই পার্টি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। পাশাপাশি জাতীয় মুক্তি আন্দোলন এবং তার মধ্য থেকে বিভিন্ন বৈপ্লবিক ধারাকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পথে প্রবাহিত করেছে। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে পার্টির উপর নেমে এসেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকের নির্মম দমন-পীড়ন।
ব্রিটিশ শাসকদের দমন-পীড়ন
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দশ বছর পার্টির নেতাদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা তিন তিনটি ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে ফেলে। এর প্রথমটি পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২২- ২৩)। এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় সেই সব গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে যাঁরা মস্কো থেকে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরেছেন এবং শ্রমিকশ্রেণি ও শোষিত নিপীড়িত মানুষকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য মার্কসবাদকে একমাত্র পথ হিসেবে চিহ্নিত করে এঁরা সেই মতাদর্শ প্রচার করতে থাকেন। এঁরা ভারতে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে গোপনে হিমালয় পাহাড় অতিক্রম করেন এবং পরে গ্রেপ্তার হন। এঁদের মধ্যে ছিলেন আকবর খান, ফিরোজুদ্দিন মনসুর, আবদুল মজিদ (পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা)। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই সব শ্রদ্ধেয় নেতার সংস্পর্শে আসা এবং তাঁদের সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও দৃঢ় মানসিকতার প্রাথমিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের।
পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলার পর কমিউনিস্ট আদর্শে অনুপ্রাণিতরা ১৯২৫ সালে আবার সংগঠিত হবার উদ্যোগ নেন। এর জন্য কানপুরে এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ব্রিটিশ সরকার এই সম্মেলন বানচাল করার হীন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সম্মেলনের উদ্যোক্তা মুজফ্ফর আহমদ, ডাঙ্গে এবং শওকত ওসমানি সহ বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। এ ঘটনা কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিতি।
পরপর দু'টি ষড়যন্ত্র মামলার পরও কমিউনিস্টদের দমানো যায়নি। তাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোষ্ঠী হিসেবে কাজকর্ম শুরু করেন এবং ১৯২৮ সাল নাগাদ এই গোষ্ঠীগুলিই শ্রমিক ও কৃষক পার্টি নামে বিভিন্ন রাজ্যে প্রকাশ্য মঞ্চ গড়ে তোলে। এই পার্টি ১৯২৯ সালে তাদের প্রথম সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের পুলিস গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেন। চার বছর ধরে মামলা চলে। ফলে দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন অবদমিত তো হয় নি উল্টে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কে আগ্রহ বেড়ে যায়।
শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের বাহক
ভারতের ইতিহাসে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হচ্ছে। দেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা। ঋণের ভারে কৃষক সমাজ জর্জরিত। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ব্যাপক জনসমর্থন পায়। ১৯৩০ সালের লাহোর কংগ্রেসে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব পাশ হয়। পাশাপাশি চলতে থাকে অসহযোগ আন্দোলন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হবার পর যুব সমাজ, শ্রমিকশ্রেণি এবং কংগ্রেসের মধ্যেকার প্রগতিশীলদের মোহভঙ্গ হতে শুরু করে। এমন একটা সন্ধিক্ষণে ১৯৩৩ সালের শেষ ভাগে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার বন্দীরা ছাড়া পান। জেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা দেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করেন এবং তৈরি করা হয় পার্টির কেন্দ্র।
সেই তখন থেকে বহু সংস্কারপন্থী গোষ্ঠী ভারতীয় বিপ্লবের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। এঁদের কেউ কেউ হাতে অস্ত্রও তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাঁরা সকলেই এটা বুঝেছে, জনগণ বিশেষ করে শ্রমিক-কৃষকদের সমবেত না করা গেলে স্বাধীনতার লক্ষ্যপূরণ সম্ভব নয়। এঁদের মধ্যে পঞ্জাবে গদর পার্টি, ভগৎ সিংয়ের হিন্দুস্তান সোস্যালিস্ট রিপাবলিকান আর্মি, বাংলাদেশে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দল সহ উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ, বোম্বাই এবং অন্যত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরা ধীরে ধীরে মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তাই সঙ্গত কারণেই কমিউনিস্ট পার্টি দাবি করতে পারে তারাই দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষকের স্বার্থে, জাতীয় মুক্তির স্বার্থে এই পার্টি সদস্যরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা আর কোন পার্টির সঙ্গে তুলনীয় নয়।
গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
পার্টি তখন উপলব্ধি করেছিল ভারতের মতো একটি ঔপনিবেশিক দেশে যেখানে সংখ্যার দিক থেকে শ্রমিকশ্রেণি ততটা শক্তিশালী নয় সেখানে কৃষকদের সমর্থন ছাড়া, স্বাধীনতা অর্জন বা সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রগতিশীল কংগ্রেস, সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী কংগ্রেসের সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি কৃষকদের সর্বভারতীয় সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। প্রাথমিকভাবে এই সংগঠন ১৯৩৫ সালে কাজ শুরু করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সারা ভারত কৃষক সভা গঠিত হয় ১৯৩৬ সালে। এছাড়া পার্টি ছাত্রদের সংগঠিত করার উদ্যোগও নেয়। ফলস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত হয় এআইএসএফ। এইভাবে গণতান্ত্রিক লেখক সমিতি, মহিলা সংগঠন গড়ে ওঠে।
এখানে মনে রাখা দরকার, অন্যান্য ঔপনিবেশিক দেশের তুলনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ভারতেই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা উন্নত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির প্রয়োজনে ব্রিটিশরাই একাজে সাহায্য করে। বস্ত্র শিল্প অবশ্য তার অনেক আগেই গড়ে ওঠে। ফলে দেশে শ্রমিকশ্রেণির সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাল গঙ্গাধর তিলকের গ্রেপ্তারের পর শ্রমিকরা তীব্র প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। এই ঘটনা একমাত্র লেনিনই অনুধাবন করেছিলেন। বলেছিলেন যে, শ্রেণি হিসেবে শ্রমিকদের আত্মপ্রকাশ ঘটছে এবং নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা তারা অর্জন করবে। সর্বভারতীয় স্তরে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সেই ১৯২১-২২ সাল থেকেই শুরু হয়ে যায় এবং সেখানে কমিউনিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকেন।
কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে তখন সমাজবাদী একটা ধারাও আত্মপ্রকাশ করে, বিশেষ করে যখন অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হয় (১৯৩০-৩২)। এখান থেকেই গঠিত হয় কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টি। ত্রিশের দশকের শেষে এদের সকলেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। তখন পার্টি বে- আইনি ঘোষিত হয়। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ প্রচারে এ ঘটনা পার্টিকে বিরাট শক্তি যোগায়।
লেনিনের প্রভাব
১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইস্তাহারে সাম্যবাদী মতবাদ সূত্রায়িত হয় এবং পরবর্তীকালে তাঁরা তাঁদের দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের বহু লেখার মধ্য দিয়ে এই মতবাদকে আরও বিস্তৃত করেন। পরে শ্রমিক আন্দোলনে বিভিন্ন বিরুদ্ধগামী ধারার মোকাবিলা করে প্রথম আন্তর্জাতিকে এই মতবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে মার্কসবাদ গৃহীত হয়। অবশ্য তখনও বিভিন্ন দেশের সোস্যালিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে সংশোধনবাদী ধারা সক্রিয় থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাকালে সংশোধনবাদের বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে যখন বিভিন্ন দেশে সোস্যালিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে ভাঙন ধরে। দুনিয়ার মজদুর এক হও শ্লোগান বগুনি করে তারা বুর্জোয়াদের পেছনে লাইন দেয়। তখন মার্কসবাদ এবং তার বিপ্লবী উপাদানকে রক্ষা করা জরুরী হয়ে পড়ে। রাশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (আরএসডিএলপি) মধ্যে এই লড়াই সর্বাগ্রে চলে আসে। ফলশ্রুতিতে এই পার্টি বিশ্ববিভক্ত হয়ে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যায় বলশেভিক পার্টিতে আর সংখ্যালঘুরা যায় মেনশেভিক পার্টিতে। বলশেভিকদের নেতা কমরেড লেনিন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মার্কসবাদের বিপ্লবী উপাদানের পক্ষে দাঁড়ান এবং সংশোধনবাদী ধারাকে বিচ্ছিন্ন করেন।
লেনিনের এই লড়াই পশ্চিমী দেশের সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলির বিভিন্ন অংশের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি লেনিন সাম্রাজ্যবাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে একে ধনতন্ত্রের সর্বোচ্চস্তর ও মৃতপ্রায় বলে বর্ণনা করেন। সাম্রাজ্যবাদ, সম্পর্কে লেনিনের এই ব্যাখ্যা ঔপনিবেশিক দেশের জনগণকে আকৃষ্ট করে। সর্বাধিক শোষিত নিপীড়িত এই অংশের মানুষের মধ্যে নতুন এক চিন্তার বিকাশ ঘটে যে, সাম্রাজ্যবাদের বিকাশের যুগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব শুধুমাত্র উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশেই ঘটবে না, অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশেও ঘটতে পারে। সাম্রাজ্যবাদের যুগের দ্বন্দ্বগুলি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে লেনিন। আরও বলেন, এই দ্বন্দ্বগুলি তীব্র হবে এবং বিপ্লবী শক্তির বিকাশের পথ উন্মুক্ত করবে।
এই বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করেই লেনিন রুশ বিপ্লব সংগঠিত করায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই সময় বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়। কিন্তু একমাত্র রাশিয়ায় শক্তিশালী বলশেভিক পার্টি থাকায় ১৯১৭ সালে সেখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপ নেয়। পরবর্তীকালে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং বিদেশী শক্তির উৎসাহে গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও বলশেভিক পার্টি শুধু তাদের বিপ্লবকে রক্ষা করেনি, জারের অধীন থেকে বিভিন্ন উপনিবেশ ও এলাকাকে মুক্ত করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
লেনিন তাঁর কর্মকাণ্ড শুধু রাশিয়ায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। বিশ্বের বিভিন্ন অংশে কর্মরত বিপ্লবী শক্তিকে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশেই তাঁর তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠনের চেষ্টা। তিনি চেয়েছিলেন, এর পেছনে থাকবে বিশ্ব বিপ্লবের ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের দৃঢ় সমর্থনের পরিষ্কার প্রেক্ষাপট। শ্রমিকশ্রেণির ঐক্য, জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের জন্য এই মঞ্চ থেকে লেনিনের আহ্বান ঔপনিবেশিক দেশের লক্ষ লক্ষ শোষিত নিপীড়িত মানুষকে আকৃষ্ট করে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, মহান আক্টোবর বিপ্লব সারা বিশ্বে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের উপর বিরাট প্রভাব ফেলে। তাঁরা মনে করতে থাকেন তাঁদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন যথার্থ সহে বিশ্ব পরিস্থিতির এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের দেশে কমিউনিস্ট পার্টি বিকাশের বিষয়টি দেখতে হবে। অক্টোবর বিপ্লবের আগে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি মার্কস ভারতের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে থাকেন। প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর লেখা চিঠি এ প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তখন তাঁর কোন সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় সমকালীন সংবাদপত্রের সংবাদের ভিত্তিতেই সঠিক প্রেক্ষাপট তিনি বিশ্লেষণ করেন। মার্কসের বিশ্লেষণের পথ ধরে অক্টোবর বিপ্লব জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে অনুপ্রাণিত করে। এমনকি তখন কংগ্রেস নেতারাও এই ঘটনায় সাড়া দেন।
এই সময় বহু ভারতীয় বিপ্লবী তাঁদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জন্য দেশ ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে জার্মানি, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁর সেখান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে দৃঢ় সহযোগী হিসেবে দেখতে থাকেন। এই সময়েই আবার বিরাট সংখ্যক মোহাজির খিলাফৎ আন্দোলনের প্রভাবে দেশ ছেড়ে তুরস্কের অভিমুখে রওনা হন এবং আফগানিস্তানে পৌঁছান। এঁদের অনেকে শেষ পর্যন্ত তাসখন্দে পৌঁছান। সেখানে কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে এসে তাঁরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী তত্ত্ব অনুধাবন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। পরে ভারতীয় বিপ্লব সংগঠিত করার তাগিদে তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। সেই সময় আমেরিকায় ভারতীয় বিপ্লবীরা এদের পার্টি গঠন করেন এবং জেলের মধ্যে মার্কিন কমিউনিস্টদের সংস্পর্শে আসেন। নতুন দিশায় অনুপ্রাণিত হয়ে মস্কোর পথে যাত্রা করেন। বহু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত তাঁরা মস্কো আসেন এবং লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিদেশের মাটিতে ভারতীয় বিপ্লবীদের কয়েকজন তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। শুরুতে সদস্য সংখ্যা ছিল ১০ জন। সম্পাদক ছিলেন মহম্মদ সফিক। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল এম এন রায়ের। এম এন রায় সেখানে পৌঁছানোর আগেই মহম্মদ সফিক 'জমিদার' 'কৃষক' নামে তাসখন্দ থেকে একটি উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করে ভারতে পাঠানো শুরু করেন তাঁদের মতাদর্শ প্রচারের জন্য। এই পত্রিকার ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব কোনভাবেই খাটো করা যায় না। দশ সদস্যের এই কমিটি ১৯২১, ১৯২২ এবং ১৯২৩ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে তাঁদের ইস্তাহার পাঠায় কমিউনিস্ট পার্টির নামেই। এই ইস্তাহার পূর্ণ স্বাধীনতার স্লোগান উত্থাপন করে এবং লক্ষ্যপূরণে শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার উপর জোর দেন। এই ইস্তাহারের প্রভাবে হজরত মোহানি ১৯২১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমিউনিস্টদের গোষ্ঠীগুলি ১৯২৫ সালে কানপুরে মিলিত হয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের কথা ঘোষণা করে। এর পরেই মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার সূচনা। এই ঘটনা গোটা দেশে কমিউনিস্ট আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। সেই সুবাদে কমিউনিস্টরা দৃঢ়ভাবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের পক্ষে দাঁড়াবার সুযোগ পায়। পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়টি যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও তাঁরা প্রচার করতে থাকেন। ষড়যন্ত্র মামলার নিষ্পত্তির পর বেশিরভাগ নেতারাই ছাড়া পান এবং একটি কেন্দ্রীভূত পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, আমাদের পার্টি ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছে, ভারতের শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন সংগঠিত করতে তারা শুধু ভারতে কর্মী পাঠায়নি (এঁদের তিন জন ফিলিপ স্প্রাট, বেঞ্জামিন ব্রাডলি ও হাচিনসন) বহু ভারতীয় ছাত্রকে ব্রিটেনের কমিউনিস্ট আন্দোলনেও তারা যুক্ত করে।
তাসখন্দের সভা অথবা কানপুর সম্মেলন কোন জায়গা থেকেই গৃহীত কোন কর্মসূচী ভিত্তিক দলিলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও সেই সময় পার্টি গঠনের এই উদ্যোগকে কোনভাবেই খাটো করা যায় না। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে অল্পসংখ্যায় হলেও কমিউনিস্ট কর্মীরা তাঁদের মতাদর্শ প্রচারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তাসখন্দে পার্টি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না। তাসখন্দের ঘটনার পর ভারতের জনগণের কাছে 'ভ্যানগার্ডের মাধ্যমে বহু আবেদন প্রচারিত হয়। এই সমস্ত রেকর্ড জাতীয় মহাফেজখানায় সংরক্ষিত আছে।
তত্ত্ব ও প্রয়োগের মেলবন্ধন
এই সময় কমিউনিস্ট পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগে প্রয়াসী হয়। হাজার হাজার উৎসর্গীকৃত কর্মী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং বিপ্লবের জন্য জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত উৎসর্গ করার শপথ নেন। শ্রমিক-কৃষক-ছাত্রদের সামনের সারিতে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ও কর্মীদের আত্মত্যাগ দাবি আদায়ের সংগ্রামে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। এই সংগ্রামগুলির মধ্যে তেলেঙ্গানা, তেভাগা, পুনাপ্রা-ভায়লার, আসাম ও সুরমা উপত্যকায়, পাঞ্জাব, ত্রিপুরা এবং মহারাষ্ট্রের আদিবাসী সংগ্রাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিতে মানুষ সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন। পার্টি সেই সময় কৃষক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতার প্রকৃত ধারণাকে উপস্থিত করতে সমর্থ হয়েছিল এবং জাতীয় মুক্তির আন্দোলন তথা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সংগ্রামে জয়ী হবার পথে শ্রমিকশ্রেণির পাশে কৃষক সমাজ সহযোগী শক্তি হিসাবে কি ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে, তা তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছিল। সুতরাং, এত আত্মত্যাগ আর উৎসর্গীকৃত ভূমিকার বিনিময়ে বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) যে আজ গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তা কোন অকস্মাৎ ঘটনা নয়।
তার মানে এই নয় যে, পার্টিতে কোন উত্থান-পতন ছিল না। পার্টিতে বিচ্যুতি বা বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম যে অনুপস্থিত ছিল, তা-ও নয়। প্রকৃতপক্ষে আমাদের মতো সমাজে যেখানে বেশিরভাগ মানুষই পেটি বুর্জোয়া চরিত্রের এবং একটা বড় অংশের মানুষ এসেছেন কৃষিজীবী পেশা থেকে, সেখানে এ ধরনের বিচ্যুতি জন্ম নিতে বাধ্য এবং তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইও তাই করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মতো আমাদেরও ডান ও বাম দু'ধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধেই সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। এই বিচ্যুতি এক সময় প্রকট হয়ে আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে। প্রাক্ স্বাধীনতার যুগে সংশোধনবাদ আমাদের পার্টিতে প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। আবার স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই, একদিকে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন অন্যদিকে নিজেদের চরিত্রগত কারণেই সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে বুর্জোয়াশ্রেণির আপসের প্রবণতার প্রেক্ষাপটে সংকীর্ণতাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হই আমরাই। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগ থেকে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে ও মার্কসবাদের সপক্ষে লড়াই শেষ পর্যন্ত দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন রক্ষার লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে জন্ম দেয় সি পি আই (এম)'র। সেই সময় এটা ছিল আমাদের কাছে এক কঠিন সংগ্রাম কেননা আমাদের তখন সি.পি.এস ইউ এবং সি পি সি দুইয়েরই আক্রমণের মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। কিন্তু দৃঢ় প্রত্যয় ও অভিজ্ঞতার জোরে আমরা জয়ী হই এবং দেশের বিপ্লবী শক্তিকে সংহত করতে সমর্থ হই। ডান এবং বাম উভয় দিক থেকেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে ভাঙন নিঃসন্দেহে আন্দোলনের ক্ষতি করেছিল কিন্তু আমরা আন্দোলনের বিপ্লবী ভিতকে রক্ষা করতে সমর্থ হই। সেজন্যই বর্তমানে সি পি আই (এম) এক শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছে এবং বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনে অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসাবে প্রতিভাত হচ্ছে। ভুল-ত্রুটি থেকে পার্টি শিক্ষা নিয়েছে এবং সরকারী দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েও যাবতীয় প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করেছে, বিপ্লবী মতাদর্শের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে। বর্তমানে বিশ্বে বড় ধরনের পরিবর্তন সত্ত্বেও আমরা গর্বিত যে, সি পি আই (এম) বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়ে লড়াইয়ে ব্রতী হয়েছে। এর কারণ হলো, বিপ্লবী মতাদর্শ আমাদের শক্তি। সেজন্যই পার্টির ভিত ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে যা প্রতিফলিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গণ- সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও আমাদের রাজনীতির সমর্থনে বিভিন্ন অংশের বিপুল মানুষকে সমবেত করার শক্তির মধ্য দিয়ে। দেশের বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে আমাদের পার্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যদিও নানা কারণে দেশে একটি যথার্থ বিকল্পকে উপস্থিত করাতে এখনও সফল হওয়া যায়নি কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এই কাজে আমাদের প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা অনস্বীকার্য। দেশের বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করছি কংগ্রেস এবং বি জে পি-কে পরাস্ত করার উপযুক্ত শক্তিসমূহের সমাবেশ ঘটাতে, যাতে দেশপ্রেমিক ভারতবাসী মাত্রেই যা চান দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতি রক্ষা পায়।
ঐতিহাসিক অর্থে ৩০ বছর সময় আসলে খুব বেশি সময় নয়। যদিও এই সময়েই আমাদের পার্টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। যদিও জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে আমরা নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে সমর্থ হইনি কিন্তু বর্তমানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধার কাজে ও শ্রেণি শক্তি সমূহের ভারসাম্য বদলানোর সংগ্রামে আমরাই অগ্রণী ভূমিকায়। যাতে শ্রমিকশ্রেণীসহ কৃষক ও পেটি বুর্জোয়া জনগণ জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। এটাই হলো বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার সঙ্গে একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যোগসূত্র। কারণ, সমাজতন্ত্র গড়ার সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা শ্রমিকশ্রেণির উপরেই অর্পিত। এই পরিপ্রেক্ষিতেই স্মরণীয় শহিদদের মনে রাখা, প্রয়োজন যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন শ্রমিকশ্রেণি কৃষকের স্বার্থে এবং কমিউনিজমের জন্য। তাঁরা তাঁদের সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন সংগ্রামের জন্য, দেখিয়েছেন জীবন কত মূল্যবান এবং সেজন্যই জীবনের একটা মূহুর্তও নষ্ট করা উচিত নয়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমরা তাই স্মরণ করি তাঁদের যাঁরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন, যাঁরা দেশের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই তত্ত্বকে নির্দিষ্টভাবে প্রয়োগের সংগ্রামে আমাদের শক্তি যুগিয়েছেন। যেহেতু এই তত্ত্ব একটি উন্নত বিজ্ঞান, একে হৃদয়ঙ্গম করতে মতাদর্শগতভাবে নিজেকে শক্তিশালী করতে হবে যে কোনরকম গোঁড়ামি দূরে সরিয়ে রেখে। তাহলেই আমরা লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমাদের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করানোর জন্য উৎসাহিত করতে পারবো। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মার্কসবাদ- লেনিনবাদ সম্পর্কে শুধু একটি বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হলো, তত্ত্বকে প্রয়োগ করা যাতে অন্য সবার সমানে এমন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যে কমিউনিস্টরা এক ভিন্ন ধাতুতে গড়া, যাঁর প্রধান দায়িত্ব হলো শ্রমিক শ্রেণি সহ অন্যান্য শোষিত মানুষের পাশাপাশি দেশেরও সেবা করা।
পার্টির ৭৫ তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে লিখিত
প্রকাশের তারিখ: ০৪-নভেম্বর-২০২৩ |