মার্কসবাদীদের চোখে জীবনানন্দ

রণেশ দাশগুপ্ত
জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্বন্ধে একটা জোর প্রচার, তিনি জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণকে অস্বীকার করেছেন, তিনি অবিপ্লবী। অথচ মার্কসবাদের দৃষ্টিতে ইতিবাচকতা দাবি করে জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণের অনিবার্যতা। মার্কসবাদ হচ্ছে বিপ্লবী দর্শন। মার্কসবাদ একটি অগ্রসর উদ্দেশ্যভিত্তিক মানবীয় জীবনদর্শন। এই উদ্দেশ্য শোষণমুক্ত মানবসমাজ। সুতরাং কোনভাবেই ব্যক্তিজীবনকে ভেসে চলতে বলতে পারেনা মার্কসবাদ। ইতিহাসে বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের অব্যাহত ধারায় আসে ব্যক্তিজীবনের উদ্দেশ্যপ্রবণতা। বিশ্বজগতের একটা বিশেষ গতিধারা আছে। এই গতিধারা অবিশ্রান্ত বিকাশের স্বন্যাত্মক অগ্রগতির ধারা, পরিমাণগত থেকে গুণাত্মক পরিবর্তনে উত্তরণ।

দুটি প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করা দরকার সর্বপ্রথম ।

প্রথমত, রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ কি সত্যই ব্যক্তিজীবনে কোন অগ্রসর উদ্দেশ্য থাকার বিরোধী ছিলেন ।

দ্বিতীয়ত, তিনি কি স্বদেশে ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে কোনো মানবিক সামাজিক উত্তরণকে আমল দিতে চাননি?

মার্কসবাদের দৃষ্টিতে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও লেখাকে ইতিবাচকরূপে গণ্য করতে হলে এই দুটি প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর কারণ এই যে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা সম্বন্ধে একটা জোর প্রচার, তিনি জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণকে অস্বীকার করেছেন, তিনি অবিপ্লবী। অথচ মার্কসবাদের দৃষ্টিতে ইতিবাচকতা দাবি করে জীবনের অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণের অনিবার্যতা। মার্কসবাদ হচ্ছে বিপ্লবী দর্শন। মার্কসবাদ একটি অগ্রসর উদ্দেশ্যভিত্তিক মানবীয় জীবনদর্শন । এই উদ্দেশ্য শোষণমুক্ত মানবসমাজ। সুতরাং কোনভাবেই ব্যক্তিজীবনকে ভেসে চলতে বলতে পারেনা মার্কসবাদ । ইতিহাসে বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের অব্যাহত ধারায় আসে ব্যক্তিজীবনের উদ্দেশ্যপ্রবণতা। বিশ্বজগতের একটা বিশেষ গতিধারা আছে। এই গতিধারা অবিশ্রান্ত বিকাশের স্বন্যাত্মক অগ্রগতির ধারা, পরিমাণগত থেকে গুণাত্মক পরিবর্তনে উত্তরণ । শ্রেয় থেকে শ্রেয়তার উত্তীর্ণ হওয়া। সমাজবিপ্লব এই অবিশ্রান্ত উত্তরণেরই অবিশ্রান্ত প্রকাশ। মানবমানবীর অগ্রসর উদ্দেশ্যের সম্মতি আসে এখান থেকেই । নবজাত নক্ষত্র আর নবজাত চরিত্রের মানবমানবীর সত্তার বিকাশের সাযুজ্যরয়েছে এখানে।

মার্কসীয় দর্শনের এই ধারা স্বভাবতই কোন কবিকে ইতিবাচক বলে নির্দিষ্ট করলে তাঁর কবিতার মধ্যে উদ্দেশ্যহীনতা ও উত্তরণহীনতার প্রাধান্যের পরিবর্তে থাকা চাই অগ্রসর উদ্দেশ্য ও উত্তরণের প্রবণতা।

জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধেও এই বিচার প্রযোজ্য।

জীবনানন্দ দাশ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে সংশয়ের ধোঁয়া সৃষ্টি করে রেখেছে মার্কসবাদের বিরোধীরা। এরাই প্রচার করে এসেছে, কবির কোন অগ্রসর উদ্দেশ্য ছিল না, তিনি বিপ্লবের প্রয়োজনবোধের বিপরীত জগতে বাস করতেন।

এই ধোঁয়া থেকে জীবনানন্দ দাশকে বের করে আনতে হবে তাঁকে মার্কসীয় দৃষ্টিতে ইতিবাচক কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে।

এখানে প্রথমে আমরা দেখতে চেষ্টা করবো কবির লেখাতে অগ্রসর উদ্দেশ্যের প্রকাতা উদ্দেশ্যহীনতাকে কিভাবে পিছনে ফেলে এসেছে।

একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করা যাক,

একবার যখন দেহ থেকে বার হয়ে যাব।

আবার কি ফিরে আসবনা এই পৃথিবীতে?

আবার যেন ফিরে আসি

কোনো এক শীতের রাতে

একটা হীন কমলালেবুর করুণ মাংস নিয়ে

কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার কিনারে।

 

(কমলালেবু- বনলতা সেন)

এখানে উল্লেখ করা দরকার, বনলতা সেন' কাব্যের সেই 'অন্ধকার' কবিতার পরেই এ কবিতাটি, যেখানে কবি বলেছেন, 'কোনোদিন জাগবনা আমি কোনো দিন। আর'। 'কমলালেবু' কবিতাটি "অন্ধকার" এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ। নেতির বিরুদ্ধে ইতি। "কমলালেবু' কবিতাটি যে ব্যতিক্রম নয় তার আরও প্রমাণ:

শস্যের ভিতরে রৌদ্রে পৃথিবীর সকাল বেলায়

কোনো এক কবি বসে

অথবা সে কারাগারে ক্যাম্পে অন্ধকারে;

তবুও সে প্রীত অবহিত হয়ে আছে

এই পৃথিবীর রোদে এখানে রাত্রির গছে নক্ষত্রের তরে

তাই সে এখানকার ক্লান্ত মানবীয় পরিবেশ

সুস্থ করে নিতে চায় পরিচ্ছন্ন মানুষের মতো,

সমভবিতব্যতার অন্ধকারে দেশ।

মিশে গেলে, জীবনকে সকলের তরে ভাল ক'রে

পেতে হলে এই অবসন্ন ম্লান পৃথিবীর মতো

অম্লান, অক্লান্ত হয়ে বেঁচে থাকা চাই।

একদিন স্বর্গে যেতে হতো।

(পৃথিবীতে অন্যান্য কবিতা)

জীবনানন্দ দাশ নিজেকে আত্মকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন মানব বলে প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করেছেন বলে যে ধারণার সৃষ্টি হয়ে রয়েছে এবং যে ধারণাকে মার্কসবাদের বিরোধীরা কাজে লাগাতে চেষ্টা করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও চেষ্টা করবে, উপরোক্ত উদ্ধৃতি তার প্রতিবাদ ।

বিচ্ছিন্ন আত্মবোধ যে তাঁর কাছে বরং ধিক্কারই পেয়েছে তারও প্রমাণ দাখিল করা যেতে পারে এখানেই:

 

প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের আত্মবোধের দ্বীপের মতো

কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানব সাগরে।

(তোমাকে-বেলা অবেলা কালবেলা)

ব্যক্তির ক্ষয়রোধও মানবকে যে ক্ষয়ের মধ্যে ফেলে দিতে পারে না সে সম্বন্ধে দিয়েছেন তিনি সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি:

যতদিন পৃথিবীতে জীবন রয়েছে

দুই চোখ মেলে রেখে স্থির

মৃত্যু আর ব্যঞ্জনার কুয়াশার পারে

সত্য সেবা শান্তি যুক্তির

নির্দেশের পথ ধরে চলে

হয়তো বা ক্রমে আরো আলো

পাওয়া যাবে বাহিরে-হৃদয়ে,

মানব ক্ষয়িত হয়না জাতির ব্যক্তির ক্ষয়ে।

ইতিহাসে ঢের দিন প্রমাণ করেছে ।

(যতদিন পৃথিবীতে-ঐ)

নৈরাশ্যবাদকে ছড়িয়ে দিয়েছেন জীবনানন্দ দাশ এ ধরনেরও একটা ধারণাকে মার্কসবাদ বিরোধীরা ছড়িয়ে এসেছে। অপরদিকে যেহেতু মার্কসবাদীরা পুরানো জীর্ণ পৃথিবীর খোলস সরিয়ে একটা নতুন পৃথিবী তৈরি করতে চায় ইতিহাসের গতিপরিণতির বৈপ্লবিক বিশ্লেষণ থেকে উপকরণ নিয়ে এবং বিশ্বপ্রকৃতির বিকাশের মধ্যে থেকেও কবিতার মধ্যে তারা সংগ্রহ করে আশাবাদকে, সেই কারণে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যেও তারা নৈরাশ্যের বদলের আশাবাদকে খুঁজবে এটাও স্বাভাবিক। জীবনানন্দ দাশ নিরাশ করেননি মার্কসবাদীদের।

 'বনলতা সেন' কাব্যের 'অন্ধকার' কবিতা পড়ে মনটা মুষড়ে যায়, কিন্তু 'বেলা অবেলা কালবেলা' গ্রন্থের 'অন্ধকার থেকে কবিতায় সমস্ত নৈরাশ্য কেটে যায়। "অন্ধকার থেকে' কবিতা ব্যতিক্রম নয়। তার প্রমাণ:

আমার আকাশ কালো হতে চায় সময়ের নির্মম আঘাতে,

জানি, তবু ভোরে, রাত্রে, এই মহাসময়েরই কাছে

নদী ক্ষেত বনানীর ঝাউয়ে ঝরা সোনার মতন

সূর্য তারা বীথির সমস্ত অগ্নির শক্তি আছে।

হে সুবর্ণ, হে গভীর প্রবাহ,

আমি মন সচেতন; আমার শরীর ভেঙে ফেলে

নতুন শরীর কর-নারীকে যে উজ্জ্বল প্রাণনে

ভালোবেসে আড্ডা আনো শিশিরের উৎসের মতন,

সজ্জন স্বর্ণের মতো শিল্পীর হাতের থেকে নেমে,

হে আকাশ, হে সময়গ্রস্থি সনাতন,

আমি জ্ঞান আলো গান মহিলাকে ভালোবেসে আজ;

সকালের নীল কী পাখিজল সূর্যের মতন ।

(একটি কবিতা-বেলা অবেলা কালবেলা)

 

কিংবা,

নিখিল ও নীড় জনমানবের সমস্ত নিয়মে

সজন নির্জন হয়ে থেকে

ভয় প্রেম জ্ঞান ভুল আমাদের মানবতা রোল

উত্তর প্রবেশ করে আরো বড়ো চেতনার খোপে

অনন্ত সূর্যের অন্ত শেষ করে দিয়ে।

বীতশোক অশোক সঙ্গী ইতিহাস,

এ-ভোর নবীন বলে মেনে নিতে হয়,

এখন তৃতীয় অঙ্ক অতএব আগুনে আলোয় জ্যোতির্ময় ।

(উত্তর প্রবেশ-সাতটি তারার তিমির)

আরও আছে,

আমাদের হাড়ে এক নির্ঘুম আনন্দ আছে জেনে

পঙ্কিল সময় স্রোতে চলিতেছি ভেসে,

তা নাহলে সকলি হারায়ে যেতো ক্ষমাহীন রক্তে-নিরুদ্দেশে।

(কবিতা-সাতটি তারার তিমির)

আরও আছে,

বড় বড় সভ্যতার মর্মে ক্লান্তি আসে;

বড় বড় নগরীর বুকভরা ব্যথা;

ক্রমেই হারিয়ে ফেলে তারা সব সংকল্প স্বপ্নের

উদ্যমের অমূল্য স্পষ্টতা।

তবুও নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল, সূর্য মানে।

এখনো নারীর মানে তুমি কত রাধিকা ফুরালো।

(মিতভাষণ-সাতটি তারার তিমির)

আর,

দূরে কাছে কেবলি নগর ঘর ভাঙ্গে;

গ্রামপতনের শব্দ হয়:

মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে নিয়েছে পৃথিবীতে;

দেয়ালে তাদের ছায়া তবু ক্ষতি, মৃত্যু, ভয়,

বিলম্বতা বলে মনে হয়।

এ-সব শূন্যতা ছাড়া কোনো দিকে আজ

কিছু নেই সময়ের তীরে ।

তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানিতুল চিন্তাসংকল্পের

অবিরল মরুভূমি ঘিরে

বিচিত্র বৃক্ষের শাখে স্নিদ্ধ এক দেশ

এ পৃথিবী এই প্রেম, আন, আর হৃদয়ের এই নির্দেশ ।

(পৃথিবীলোক-মহাপৃথিবী)

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনানন্দ দাশের কাব্যবিচারে নেমে উপরোক্ত আশাবাদকে আমরা অসংখ্য ঢেউয়ের মতো উদ্বেলিত দেখতে পাবো ।

তবু মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে জীবনানন্দ দাশের মধ্যে যে দ্বন্দ্বও রয়েছে সেটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে হবে, কারণ জীবনানন্দ দাশও তো একটা ক্রান্তিকালের ইতিহাসের নানা ধারায় প্রসারিত বৈচিত্র্যের একটি বিশেষ সৃষ্টি, যার মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, যদিও আক্ষেপ নেই। সংশয় রয়েছে? আমরা বলবো যাচাই করে নেওয়ার কঠোরতা রয়েছে।

জীবনানন্দ দাশ তাঁর কোন কোন কবিতায় বলেছেন, 'আমাকে জাগিওনা, আমাকে ঘুমোতে দাও। কিন্তু জীবন কি কবিকে কোনদিন ঘুমোতে দিয়েছে? দেয়নি, দিতে পারে না, কবিও তা জেনেছিলেন এবং বারংবার বলেছিলেন সেকথা । কোন কোন সময়ে ক্লান্ত হয়ে জৈবিক প্রয়োজন থেকেই যেন ঘুমোতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘুমোতে পেরেছেন কি? ঘুম আসেনি। উদাহরণ:

গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে

এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেকদিন জেগে থেকে

ঘুমের সাধ ভালবেসে ।

(অবসরের গান-ধূসর পাণ্ডুলিপি)

আরও,

ঘাসের ভিতরে নীল শাদা ফুলফোটে হেমন্তরাগে;

সময়ের এই স্থির একদিক তবু স্থিরতর নয়;

প্রতিটি দিনের নতুন জীবাণু আবার স্থাপিত হয়।

(লোকেন বোসের জার্নাল)

স্তিমিত- স্তিমিত আরো করে দিয়ে ধীরে

ইহারা উঠিবে জেগে অফুরন্ত রৌদ্রের অনন্ত তিমিরে।

(রিস্টওয়াচ-সাতটি তারার তিমির)

আমাদের মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি/কাঁচের গেলাসে উজ্জ্বল শব্দরী। সমুদ্রের দিবালোকে আরক্তিম হাঙ্গরের মতো তারপর অন্য গ্রহ নক্ষত্রেরা আমাদের ঘড়ির ভিতরে যা হচ্ছে হতেছে অথবা যা হবে সব এক সাথে প্রচারিত করে। সৃষ্টির নাড়ির পরে হাত রেখে টের পাওয়া যায়/অসম্ভব বেদনার সাথে মিশে রয়ে গেছে অমোঘ আমোদ/তবু তারা করে নাকো পরস্পরের ঋণশোধ ।

(আবহমান-মহাপথিকী)

আরও,

কী যে উদয়ের সাগরের প্রতিবিম্ব জ্বলে ওঠে রোদে।

উদয় সমাপ্ত হয়ে গেছে নাকি সে অনেক আগে ?

কোথাও বাতাস নেই, তবু

মর্মরিত হয়ে ওঠে উদয়ের সমুদ্রের পারে।

কোনো পাখি

কালের ফোকরে আজ নেই, তবু, নবসৃষ্টি মরালের মতো কল

স্বরে কেন কথা বলি; কোনো নারী

নেই, তবু আকাশ হংসীর কণ্ঠে ভোরের সাগর উতরোল ।

(তবু)

এই কবিতাগুলিতে জীবনের উপকরণগুলি পরস্পর বিরোধী। কিন্তু এ যে উপলাহত নদী। উপল না থাকলে নদী শব্দিত হতো না। কিন্তু সময়ের দিকে এগিয়ে চলা তো স্তব্ধ হয়নি । অবশ্য কোন কোন কবিতায় মনে হয় পরস্পর বিরোধিতা কি অচলতা এনেছিল? যেমন,

এখন শীতের রাত্রে অনুপম ত্রিবেদীর মুখ জেগে ওঠে।

. . . তান্ত্রিক উপাসনা মিস্টিক ইহুদী কাবালা

ঈশার শবোথান-বোধিদ্রুমের জন্ম মরণের থেকে শুরু করে

হেগেল ও মার্কস; তার ডান আর বাম কান ধরে

দুই দিকে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো; এমন সময়

দুপকেটে হাত রেখে ভ্রূকুটিল চোখে নিরাময়

ওদের চেয়েও ভালো লেগে গেল মাটি মানুষের প্রেম;

. . . কোথায় যে আঁচলের খুঁট;

 

কেবল উত্তরপাড়া ব্যাণ্ডেল কাশীপুর বেহালা খুরুট—

ঘুরে যায় স্টালিন, নেহেরু ব্লক অথবা রায়ের বোঝা বয়ে,

ত্রিপাদ ভূমির পারে আরো ভূমি আছে এই বলির হৃদয়ে?

তাহলে তা প্রেম নয়, ভেসে গেল ত্রিবেদীর হৃদয়ের জ্ঞান

জড় ও অজড় ডায়ালেকটিক মিলে আমাদের দুদিকের কান

টানে বলে বেঁচে থাকি-ত্রিবেনীকে বেশি জোরে দিয়েছিল টান।

(অনুপম ত্রিবেদী)

কিন্তু এ কবিতার মূল সুরটি হচ্ছে যেন গভীর বেদনায় ভরা বিজ্ঞানীর কৌতুক। প্রেমের জন্যে আত্মহত্যাকে একটা স্খলন বলেই করি সব সময় মনে করেছেন। জীবনের দ্বন্দ্বাত্মক মহাস্রোত ধারা থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়াকে বারংবার কবি যাচাই করে দেখেছেন। তাঁর লাশকাটা ঘরে' কবিতাটি একই সুরে লেখা। এই জন্যেই কি দ্বন্দ্বাত্মক গতিবাদের দর্শনকে নিয়ে তিনি কৌতুক করেছেন?

প্রেম সম্বন্ধে এখানে তিনি সাবধানী অভিভাবকের ভূমিকায় নেমেছেন।

কিন্তু প্রেম সম্বন্ধে এই সাবধানতাও কবির পক্ষে কয়েকটা বিশেষ মুহূর্তের ভাবনার ব্যাপার। 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' গ্রন্থের সুদীর্ঘ প্রেম কবিতা পড়লে বুঝতে পারা যাবে, প্রেম পদস্খলনের ব্যাপার নয়। প্রেমই জীবনকে ব্যাপ্ত করে আছে। প্রেম একটি স্রোতস্বিনীর মতো বয়ে চলেছে কবির লেখায় সে হচ্ছে যৌবনের স্রোতস্বিনী, নবজীবনের স্রোতস্বিনী।

ডানে বাঁয়ে ওপরে নিচে সময়ের

চলন্ত তিমিরের ভিতর তোমাকে পেয়েছি।

শুনেছি বিরাট শ্বেতপক্ষিসূর্যের

ডানায় উড্ডীন কলরোল,

আগুনের মহান পরিধি গান করে উঠছে ।

(সময়ের তীরে বেলা অবেলা কালবেলা)

আরও আছে,

এইখানে স্মৃতি,

এখানে বিস্মৃতি; প্রেম

ক্রমাগত আঁধারকে আলোকিত করার প্রমিতি।

(অনেক নদীর জল বেলা অবেলা কালবেলা)

এখানে যে বৈপরীত্য—এটা জীবনের দ্বন্দ্বাত্মক অগ্রগতিধারারই প্রকাশ।

বস্তুতপক্ষে, অনুপম ত্রিবেদী কবিতার ডায়ালেকটিক বা বিপরীত পারস্পরিকতা যে সাময়িক বিমূঢ় অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে, তা নিতান্তই সাময়িক। জীবনানন্দ দাশের ডায়ালেকটিক বা বিপরীত পারস্পরিকতা একটা অগ্রসর গতিবাদেরই পরিপোষক।

'সাতটি তারার তিমির' কাব্যগ্রন্থের সময়ের কাছে কবিতাটি এই দ্বন্দ্বাত্মক গতিধারারও প্রকাশ, যা লেনিনকে অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে সামনে আনতে দ্বিধা করেননি:

মানুষেরা বার-বার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে:

নব-নব ইতিহাস সৈকতে ভিড়েছে;

তবুও কোথাও সেই অনির্বচনীয়

স্বপনের সফলতা-নবীনতা-শুভ্র মানবিকতা ভোর?

নাচিকেতা তারাই লাওসে এগুেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী

হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?

অন্ধকারে ইতিহাস পুরুষের সপ্রতিভ আঘাতের মতো মনে হয়

যতই শান্তিতে স্থির হয়ে যেতে চাই,

কোথাও আঘাত ছাড়া-তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।

হে কালপুরুষ তারা, অনন্ত দ্বন্দ্বের কোলে উঠে যেতে হবে

কেবলি গতির গুণগান গেয়ে- সৈকত ছেড়েছি এই স্বচ্ছন্দ উৎসবে,

নতুন তরঙ্গে রৌদ্রে বিপ্লবে মিলন সূর্যে মানবিক রণ

ক্রমেই নিস্তেজ হয়, ক্রমেই হয় মানবিক জাতীয় মিলন?

নব নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ করে মানুষের চেতনার দিন

অমেয় চিন্তায় খ্যাত হয়ে তবু ইতিহাস ভুবনে নবীন

হবেনা কি মানুষকে চিনে তবু প্রতিটি ব্যক্তির ষাট বসন্তের তরে।

সেই সব সুনিবিড় উদ্বোধনে আছে আছে আছে' এই বোধির ভিতরে

চলেছে নক্ষত্র, রাত্রি, সিন্ধু, রীতি মানুষের বিষণ্ণ হৃদয়,

জয় অন্তসূর্য, জয়, অলথ অরুণোদয়, জয় ।

8

জীবননান্দ দাশের অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থের অসংখ্য কবিতাতে রাত্রি, তিমির, অন্ধকার যেন কাদার মতো থকথকে হয়ে আছে, যা পার হয়ে যেতে হয় 'পরস্পর' কবিতার রূপকথার রাজ্য পৌছতে হলেও। জীবনানন্দ দাশের কবিতাতে রাত্রির প্রাচুর্য কি তাহলে সাদা রং দিয়ে ছবি আঁকার জন্য কালো পটভূমি?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ কবিকে জীবনের কোন রঙিন স্বপ্নেরই গীতিকার হয়ে থাকতে দেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কামানের ছায়ায় লেখা তাঁর কবিতাগুলি পড়ে পড়ে আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়, কত রূঢ় হতে পারতেন কবি অন্যায়কে আঘাত করার জন্যে সে কথা ভেবে। কবি সমস্ত সত্যের কবি হয়ে চেয়ে সমগ্র জৈবিক অনুভূতিতে এই পৃথিবীকে, দেশকে, নারীকে, বুঝতে চেয়েছেন। সেজন্য 'ধূসর পাণ্ডুলিপির' 'পিপাসার 'গান' অথবা 'বনলতা সেন' এর 'ঘাস' কবিতার মতো কোন কোন কবিতায় মানবদেহের পার্থিবতার বা বস্তুসত্তার বা স্বভাবসত্তার প্রায় শেষ কথাই বলে ফেলেছেন গ্রীক অণুদার্শনিকদের মতো: অণুদার্শনিকের ভাষায় নয়, কবিতার ভাষায়।

কিন্তু এই অন্ধকার অথবা জৈবিকতা অথবা স্বভাবত্ত্ব অথবা অনুকাব্যিকতা কি প্রকৃতপক্ষে আলোর রং নিয়ে জীবনের ছবি আঁকবার জন্যে অন্ধকার পটভূমি নয়?

'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থের 'হাওয়ার রাত' কবিতাটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে। প্রাণের স্পন্দনে স্পন্দিত এমন শক্তিময় কবিতা আমাদের বাংলা কাব্যে বিরল।

গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল অসংখ্য নক্ষত্রের রাত।

যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে

তারাও কাল জানালার ভিতর দিয়ে অসংখ্যা মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে;

যে রূপসীদের আমি এশিয়ায়, মিশরে, বিনিশায় মরে যেতে দেখেছি

কাল তারা অতিদূরে আকাশের সীমানার কুয়াশায় কুয়াশায় দীর্ঘ বর্ণা হাতে

করে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন-

মৃত্যুকে দলিত করার জন্য?

জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করবার জন্য?

প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তর তুলবার জন্য?

 

এই 'হাওয়ার রাত' কবিতার পাশে একই কাব্যগ্রন্থের 'বেড়াল' কবিতাটিতে জীবনানন্দ দাশ অন্ধকারকে নিয়ে যে খেলা করেছেন সেটিও এখানে উল্লেখযোগ্য:

হেমন্তের সন্ধ্যায় জাফরান রঙের সূর্যের নরম শরীরে

শাদা থাবা বুলিয়ে খেলা করতে দেখলাম তাকে।

তারার অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো

থাবা দিয়ে লুফে আনল সে

সমস্ত পৃথিবীর ভিতর ছড়িয়ে দিল।

তর্ক হতে পারে, এ দুটি কবিতাই প্রকৃতি নিবন্ধ। তা ঠিক। প্রকৃতি নিবন্ধতা জীবনানন্দ দাশের সমগ্র কাব্যের একটি বিশেষত্ব হতে পারে। পাখি সে সিন্ধু সারসই হোক, শকুন হোক, পেঁচা হোক, ডাহুক হোক, শালিক হোক, হাঁস হোক এরা হচ্ছে কবির কাছে জীবনের স্পন্দনের প্রতীক। তবু কোন কোন সময়ে এরা প্রকৃতির বিস্তারকে কবির মানসিক পরিমণ্ডলকে ছাড়িয়ে অসীমতায় স্থাপন করেছে। 'বনলতা 'সেন' কাব্যগ্রন্থের উপরোক্ত দুটি কবিতাতে তারই আভাস।

কিন্তু যেমন, 'বনলতা সেন' কাব্যে, তেমনি 'ঝরাপালক' থেকে 'বেলা অবেলা কালবেলা' পর্যন্ত সমস্ত গ্রন্থেই, 'রূপসী বাংলা'তে তো নিশ্চয়ই-মানবীয় পরিমণ্ডলকে প্রধান করে দেখতে চাইলেও আমরা হাতের কাছেই দেখতে পাবো। সে মানবীয় পরিমণ্ডল কোন আত্মনিবদ্ধ কবির ভাবপ্রক্ষেপণের ছায়া নয়, সে হলো ইতিহাসের বিকাশমান মানবসমাজ আগেই দেখাতে চেষ্টা করেছি, জীবনানন্দ দাশ বিচ্ছিন্নতা ও অমানবিকতার প্রচারণাকে রূঢ় আঘাত করেছেন। এখানে বিষয়টিকে স্পষ্ট করার জন্য কিছুটা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দাখিল করছি:

গভীর, গভীরতর রাত্রির বাতাসে

 

লোকার্নো হেক্ষর্সাই মিউনিখ অতলত্তের চার্টারে

ইউ,এন,ও-য়ের ভিড়ে আশা দীপ্তি ক্লান্তি বাধা ব্যাস কূটবিষ

আরো ঘুম রয়ে গেছে হৃদয়ের জীবনের, নারী

শরীরের জন্যে আরো আশ্চর্য

বেদনা বিমূঢ়তা লাঞ্ছনায় অবতার রয়ে গেছে; রাত

এখনো রাতের স্রোতে মিশে থেকে সময়ের হাতে

দীর্ঘতম রাত্রির মতন কেঁপে মাঝে মাঝে বন্ধ সোক্রোতেস

কনফুচ লেনিন গ্যেটে হোল্ডেরলিন রবীন্দ্রের রোলে

আলোকিত হতে চায়; বেলজেনের সবচেয়ে বেশি অন্ধকার

নিচে আরো নিচে টেনে নিয়ে যেতে চায় তাকে;

পৃথিবীর সমুদ্রের নীলিমায় দীপ্ত হয়ে ওঠে

তবুও ফেনার ঝর্ণা,-রৌদ্রে প্রদীপ্ত হয় মানুষের মন।

সহসা আকাশ পথে বনহংসী-পাখির বর্ণালি

কি রকম সাহসিক চেয়ে দেখে, সূর্যের কিরণে

নিমেষেই বিকীরিত হয়ে ওঠে :- অমর ব্যাথায়

অসীম নিরুৎসাহে অন্তহীন অবক্ষয়ে সংগ্রামে আশায়

ইতিহাস পটভূমি অনিকেত না কি? তবু অগণন অর্ধসত্যের

উপরে সত্যের মতো প্রতিভাত হয়ে নব নবীন ব্যাপ্তির

স্বর্গে সঞ্চারিত হয়ে মানুষ সবার জন্যে শুভ্রতার দিকে

অগ্রসর হতে চায় অগ্রসর হয়ে যেতে পারে।

(পৃথিবী সূর্যকে ঘরে-বেলা অবেলা কালবেলা)

এ কবিতাটিতে মহাবিপ্লবী লেনিনকে কবি কোন সাধকদের মধ্যে রেখেছেন সেটা বিশেষভাবে চিন্তা করার বিষয়। লেনিনকে এর আগের একটি কবিতার স্তবকেও আমরা একইভাবে পেয়েছিলাম।

লেনিনকে জীবনানন্দ দাশ মানব-জীবনের অন্যতম শিল্পী শ্রেষ্ঠ হিসেবেই দেখেছিলেন।

আরেকভাবেও জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি নিবন্ধতা বিকিরণের মানবিকতায় উৎসাহিত হয়েছে সেটা লক্ষ্য করা যেতে পারে:

নক্ষত্রেরা মানুষের আগে এসে কথা কয় ভাবি;

পল অনুপল দিয়ে অন্তহীন নিপলের চকমকি ঠুকে

ঐ সব তারার পরিভাষার উজ্জ্বলতা;

আমার লক্ষ্য ছিলো মানুষের সাধারণ হৃদয়ের কথা

সহজ সঙ্গের মতো জেগে নক্ষত্রকে

কী করে মানুষও মানুষীর মতো করে রাখে।

(সারাৎসার-বেলা অবেলা কালবেলা)

আরেকভাবে:

আশ্চর্য বনের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী,

ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে

সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে

গিয়েছি অনেকদিন, দেখিয়াছি ধূপ জ্বাল, ধর সন্ধ্যাবাতি

ঘোড়ের মতন শাদা ভিজে হাতে এখুনি আসিবে কিনা রাতি

বিনুনি বেঁধেছ তাই কাঁচা পোকাটিপ তুমি কপালের পরে

পরিয়াছ. . . তারপর ঘুমায়েছ, কল্কাপাড় আঁচলটি করে।

পানের বাটার পরে, নোনার মতন নম্র শরীরটি পাতি

নির্জন পালছে তুমি ঘুমায়েছ।

(রূপসী বাংলা)

 

এই রূপসী বাংলা শুধু বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণের বাংলা নয় । এ বাংলা ছোট ছোট ঘরের বাংলা, মানবমানবীর বাংলা। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের বাংলা, যেখানে ঝড় আসে। কিশোরীদের নিয়ে রচিত গীতিকবিতার বাংলা। সেই নারীদের বাংলা, যাদের হাত চাল ধুতে ধুতে শিঠে শাদা হয়ে গেছে। এখানে স্বাধীনতারও ডানার ঝাপটা।

আমার সোনার খাঁচা খুলে দাও,

আমি যে বনের হীরামন

(রূপসী বাংলা)

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় আমরা শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস পাই না, যদিও মানুষের সমগ্র ইতিহাসে তিনি যেন লিফটে ওঠা নামার মতো অতীতে বর্তমানে ইচ্ছামতো বিচরণ করেছেন। 'ইতিহাস যান' কবিতাটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য ।

তবে মানুষের ইতিহাসকে তিনি দ্বন্দ্বাত্মক অগ্রগতিধারার ছাঁচে ঢেলেই প্রবাহিত করে দেখেছেন। এর পিছনে বিশ্বজগতের সেই গতিধারাকে ছন্দিত দেখেছেন তিনি যাকে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের 'প্রকৃতি ডায়ালেকটিক্স বা দ্বন্দ্ব মিলনাত্মক গতিধারা অঙ্গের বক্তব্যের সঙ্গে মেলাবার চেষ্টা করা যায়। মার্কসবাদী হিসেবে তাঁর কবিতা তিনি লেখেননি । অথবা একজন বিঘোষিত বস্তুবাদী হিসেবে তিনি প্রকৃতি ডায়ালেকটিক্সকে সামনে আনেননি। সমাজবিপ্লবের চাবিকাঠি হিসেবে শ্রেণী সংগ্রামকে তিনি বোঝেনওনি দেখতেও পাননি। কিন্তু মার্কসবাদীরা জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে সমাজবিপ্লবের অন্যতম উপকরণ হিসেবেই গ্রহণ করবে। কারণ তাঁর কবিতার মধ্যে রয়েছে লোভ ও নীচতাকে অতিক্রম করে মানুষের এগিয়ে চলার তাগিদ। মার্কসবাদীরা যে নতুন জগৎ গড়ে তুলতে চাইছে তার অঙ্গীকার জীবনানন্দ দাশের কবিতায় উপস্থিত। কাঁটার ঝোপে ফুলের মতো?

সৌমিত্র শেখর (সম্পা.), রণেশ দাশগুপ্ত রচনাবলি, ১ম খণ্ড, 'আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ', ঢাকা: বাংলা একাডেমী ঢাকা, ২০১২

লেখক পরিচিতি

জুন, ১৯৯৭। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায় রণেশ দাশগুপ্ত (১৫ জানুয়ারি, ১৯১২–৪ নভেম্বর ১৯৯৭)-কে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে তৈরি হয় জাতীয় কমিটি। আহ্বায়ক ছিলেন কবীর আনোয়ার। তাঁরা, ১৮৪ জন কবি-সাহিত্যিক-গায়ক-শিক্ষাবিদ মিলে আবেদন পত্র পাঠান প্রিয় রণেশদার কাছে— ফিরে আসুন রণেশদা।

না, ফেরা হয়নি অসুস্থ রণেশদার। তবে ফিরেছিলেন তাঁর প্রিয় ঢাকায়, কফিন-বন্দি হয়ে। অখণ্ডিত আর খণ্ডিত উপমহাদেশে হেঁটেছিলেন আজীবন। আর হাঁটতে হাঁটতে জুড়ে দিয়েছিলেন আমাদের। অবিরাম হেঁটে চলা থেমে গিয়েছিল নভেম্বরের চার তারিখে। বাঁকুড়া খ্রিশ্চান কলেজে পড়তে পড়তে অনুশীলন দলের সাথে যোগাযোগ, খুব বেশি কাল থাকতে পারলেন না সেখানে। রাজরোষে বাঁকুড়া ছাড়া, ভর্তি হলেন কলকাতার সিটি কলেজে, যেখানে এক সময় পড়াতেন দাদা জীবনানন্দ দাশ। ও-কলেজও ছাড়াতে হল। চলে যেতে হল বড়িশালে জ্যাঠামশাই সত্যানন্দ দাশের কাছে। সর্বানন্দ ভবনে পুলিশ আর খোঁচরদের হানায় বিব্রত জ্যাঠামশাইদের ছেড়ে, লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে ঢাকা। আর সেই থেকে ঢাকাইয়া, ছিলেন ঢাকার প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৮ সালে সত্যেন সেন ও শহীদুল্লাহ কায়সারের সাথে মিলে গড়ে তোলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট উদীচী। মুজিব হত্যার অব্যবহিত পরে আসেন কোলকাতা, তারপর এখানেই রয়ে যাবেন আমৃত্যু। কেমন ছিলেন রণেশদা? প্রায় অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে একটা ঘরে কাগজপত্র আর বইয়ের স্তূপের মধ্যে চৌকির উপর পা তুলে পড়েন, লেখেন, আর এন্তার ভাবেন। বৃষ্টি পড়লে চৌকি সমেত সরে যান পাশের ঘরে। কেউ এলে গপ্পো করতে করতে ঝকমক করে ওঠে চোখ দুটো।

আজীবন যিনি মেলাতে চেয়েছেন এই উপমহাদেশকে, বাঙালি পাঠকের সাথে পরিচিত করেছেন বন্ধু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজকে। চলে যাবার সময় কী রেখে গেলেন সকলের জন্যে? দিস্তে-দিস্তে-কাগজ, একটা ভাঙা-তোরঙ্গ আর এন্তার ভাবনা।


প্রকাশের তারিখ: ০৪-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org