১. ৫ বছরের মধ্যে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরী,
২. তামান্না, অভয়াসহ সকল নির্যাতনের ন্যায় বিচার,
৩. প্রতিটি জেলার পুলিশের নিজস্ব কিন্তু স্বশাসিত ' 'অভয়াবাহিনী' গঠন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ কোনো সাধারণ নির্বাচনী লড়াই নয়। পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর লড়াই। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবে রাজ্যের ৫০% মহিলারও লড়াই তাদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৭ সালের পর ১৯৭৭ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতে মেয়েদের অবস্থান ছিল নিতান্তই প্রান্তিক।কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মহিলা বাম নেতৃত্ব লাগাতার আন্দোলন ও বিশ্ব মহিলা সম্মেলনের চাপে নারী কল্যাণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বড়জোর Women Welfare থেকে উত্তীর্ণ হয়ে Women Development এ পৌঁছাতে কয়েকদশক উত্তীর্ণ হয়ে যায়।
১৯৭৭ এ বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পরে সামাজিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া সমাজে নারী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে নারীর ক্ষমতায়ন শুরু করেছিল।
প্রথমত, গ্রামে গঞ্জে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অসংখ্য স্কুল, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে অবৈতনিক শিক্ষার ফলে মেয়েরা স্কুল যেতে শুরু করে।
দ্বিতীয়ত, বয়স্কদের সাক্ষরতার কর্মসূচির সুবিধা।
তৃতীয়ত, পঞ্চায়েতীরাজ ব্যবস্থায় মহিলা সংরক্ষণের ফলে মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
চতুর্থত, শিক্ষিত মেয়েদের এস এস সি, এম এস সি, পি এস সি-এর মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগের ফলে মেয়েদের সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতায়ন। এছাড়াও এস এস কে, এম এস কে, আই সি ডি এস সহ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজে লাগানো হয়।
পঞ্চমত, স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করা।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক ও আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক ক্ষমতায়নে পর্যবসিত হয়।
সপ্তমত, ক্ষমতায়নের ফলে মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য, পণপ্রথা, গার্হস্থ্য হিংসা সহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি কমতে থাকে।
অষ্টমত, শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে, প্রসূতি মায়েদের জন্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করে অন্যদিকে বিড়ি শ্রমিকসহ বিভিন্ন কারখানায় কর্মরত অসংগঠিত মহিলা শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, ১০০ দিনের কাজসহ সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে।সাধারণ সংখ্যালঘু, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক সমাজের মেয়েদের আত্মবিশ্বাসের সাথে দেখা যাচ্ছিল।
নবমত, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশাখা গাইডলাইন মেনে কমিটি গঠন করা হয়।গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত সহায়তা, ফ্যামিলি কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
সর্বোপরি সংস্কৃতির জগতে নারীদের সাহিত্যে, নাটকে, চিত্রকলা ও চলচিত্রে নারীদের মুক্ত চেতনা ফুটে উঠেছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবে বামফ্রন্ট সরকারের চেষ্টায় মেয়েরা সামাজিক বোঝা নয় তারা সম্পদে পরিনত হচ্ছিল।
২০১১ সালের আগে ক্রমান্বয়ে সমাজ পিতৃতান্ত্রিকতার আবদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে সমাজ মেয়েদের প্রশ্নে সাবালক জাতিতে পরিণত হয়েছিল।
২০১১ সাল থেকে রাজ্যে অদ্যাবধি প্রায় ১৫ বছর ধরে তৃণমূল পরিচালিত একটা সরকার, কেন্দ্রে ২০১৪ সাল থেকে আর এস এস পরিচালিত বিজেপি সরকার চলছে। দেশের মেয়ে বলতে কি চোখে ভাসে! গুজরাটের বিলকিস বানো, কাশ্মীরের আসিফা, উত্তরপ্রদেশের উন্নাও বা মনিপুরী কুকি মহিলার নগ্নতা! রাজধানীর বুকে সর্বভারতীয় কুস্তি সংস্থার সভাপতি তথা বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ শিং-এর দীর্ঘ যৌন নির্যাতনের শিকার আমাদের দেশের গর্ব, বিশ্ববন্দিত মহিলা কুস্তিগীর ধর্নায় পুলিশী নির্মমতার চিত্র! আর এস এস পরিচালিত বিজেপি সরকারের আমলে বিশ্বের দরবারে মানব সূচক উন্নয়ন ইনডেক্সে ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৩০তম তখন লিঙ্গ বৈষম্যে ১০৮টি দেশের মধ্যে ১০২তম। এতেই অনুমান করা যায় কেন্দ্র সরকারের "বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও" স্লোগান কতটা ফিকে।বিজেপি শাসিত রাজ্য হরিয়ানা উত্তরপ্রদেশে রাজস্থান সহ বিভিন্ন রাজ্যে নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি প্রহসনমাত্র। হাথরাসের তরুণীর গনধর্ষক ও খুনীরা সরকারের কাছে পুরস্কৃত হয়। চলমান রাজনীতিতে ৯৪ জন সাংসদ ও বিধায়কের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা থাকাটা এই মনু বাদী বিজেপি সরকারের আমলে বিচিত্র নয়।
এদিকে তৃণমূল আমলে কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার কলকাতা বুকে পার্ক-স্ট্রিট থেকে আর জি কর এর ডাক্তারী পড়ুয়া ছাত্রী,' অভয়া ' নিজের কর্মস্থলে ভয়াবহভাবে ধর্ষন ও খুন দেখে সারা পৃথিবী শিহরিত হয় অন্যদিকে প্রতিবারের মত প্রশাসন সব স্তরের কর্তা ব্যক্তি এমনকি সর্বময়কর্ত্রী পর্যন্ত অপরাধীদের আড়াল করে এমন সব আন্দোলনকে তুচ্ছ করে অপরাধীদের পুরস্কৃত করার দুঃসাহস দেখায়। লিপিবদ্ধ না হওয়ায় পোকসো সহ নারী নির্যাতনের কোনো সঠিক তথ্য সরকারী ওয়েবসাইট ও অমিল। লক্ষাধিক কন্যাশ্রীর রিনিয়াল না হওয়া
নিরাপত্তার জন্য মেয়েদের ঘরে থাকা, পোষাক, কখনো চলাফেরাকে দায়ী করে বিবৃতি নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে পুলিশী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার প্রশ্নে অনীহা দেখায়।এফ আই আর না নেওয়া, টাকার বিনিময়, রাজনৈতিক চাপে নির্যাতিতার মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে।
অস্বচ্ছ, অনিয়মিত ও অর্থনৈতিক লেনদেন এর মাধ্যমে হওয়ায় যথার্থ মেধাবী শিক্ষিত মেয়েরা চাকরী থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যাপকহারে। ১৫-২০ লক্ষ টাকার পরিবর্তে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হয় পরিবারগুলো। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব, অসচেতনতার জন্য বাল্যবিবাহের হার ইদানীং ব্যাপক বেড়েছে, বেড়েছে স্কুলছুট ও নারী পাচার ও শিশুশ্রমের সংখ্যাও।কিশোরী মায়ের সংখ্যায় বাংলা রেকর্ড অবস্থায়।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলো মাইক্রো ফাইনান্সে অত্যাচারে ফেঁসে যাচ্ছে। সারদা নারদার মতো কেসে তৃণমূল ও বিজেপি সরকারের ভূমিকা, পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল সরকারের ব্যাপক সন্ত্রাস, বিধানসভা, লোকসভা, পৌরসভার নির্বাচনে শাসক দলের মহিলা প্রতিনিধিদের যথাযথ ভুমিকা না নিয়ে কাঠপুত্তলীর ভূমিকা বাংলার মেয়েদের রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতায়ন ও ব্যাহত হচ্ছে। বাংলার মেয়েরা ক্রমশ অস্থির, অন্ধকার পথ অতিক্রম করে আবার পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে চলেছে।
গার্হস্থ্য হিংসা, খুন, ধর্ষন, পাচার, পনপ্রথা, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ সব বিভিন্ন সামাজিক ব্যধিতে আক্রান্ত মেয়েদের বেঁচে থাকার জন্য নূন্যতম কোনো আশার আলো নেই। এমতাবস্থায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ, নূন্যতম মজুরির বালাই নেই। ফলে প্রান্তিক মেয়েরা যারা বিড়ি শ্রমিক, চা শ্রমিক, কলকারখানায় শ্রমিক বা কৃষিকাজ বা ভাটার কাজ গিগ কর্মী যারা বিভিন্ন মলে বা দোকানে কাজ করে বা হাজারো অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমিক হিসাবে কাজ তাদের বাধ্য হয়ে কম মজুরিতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। যৌন হয়রানি শিকার হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি এস আই আর এ বাতিল হওয়া নামের অনেকাংশে রয়েছে পিছিয়ে পড়া অংশের। সংখ্যালঘু মুসলমান মেয়েদের বিয়ের আগে, পরে ও স্বামী মারা গেলে যথাক্রমে 'খাতুন', 'বিবি' ও 'বেওয়া' যে পদবী বা সংখ্যাগুরুর বিয়ের পর পদবী পরিবর্তনজনিত কারনে অসংখ্য মেয়েদের ভোটাধিকার হারানোর মুখে।
ফলে বামফ্রন্ট আমলে সব অংশের মেয়েদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন এই সরকারের আমলে সবক্ষেত্রে খর্ব হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ফলে নারী নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে পরাস্ত ও বিজেপিকে রুখতে বাম গনতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির জয় সুনিশ্চিত করতে হবে।
১. বামপন্থীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সব সরকারী পদে স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ করা হবে যাতে শিক্ষিত মেয়েরা কাজ পায়।
২. ভাতাপ্রাপ্ত মহিলাদের ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করে তার মাধ্যমে মেয়েদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের বহুগুণ আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান করা হবে। যাতে মাইক্রো ফাইনান্সের ঋণের জাল থেকে গোষ্ঠীগুলোকো মুক্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার মাধ্যমে সহজ কিস্তিতে ঋণ দান ব্যবস্থা করা হবে, যাতে আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয়।
তামান্না, অভয়া সহ সকল নির্যাতিতার ন্যায়নিচার আনা হবে। নারীর নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি জেলা পুলিশের আওতায় নিজস্ব কিন্তু স্বশাসিত 'অভয়া বাহিনী ' গঠন করা হবে, যাতে অবাধ নিরাপদ পরিবেশ পায়।
গনতান্ত্রিক পরিবেশে মেয়েদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করা হবে।প্রাপ্তবয়স্ক মহিলারা অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে অশিক্ষা এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়তে বদ্ধপরিকর থাকবো আমরা।
গোটা পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য '' নারী নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন " এর বিষয় অত্যন্ত জরুরি। এই প্রশ্নে বাংলায় ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন এ বামপন্থার পুন:রুদ্ধার ও পুনর্জাগরণ অত্যন্ত জরুরি।
প্রকাশের তারিখ: ০৭-এপ্রিল-২০২৬ |