জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা: ঔপনিবেশিক শাসনের বীভৎস চিহ্ন

অর্ণব ভট্টাচার্য
মাঠটা সম্পূর্ণ ভর্তি হয়ে গেলে রেজিনাল্ড ডায়ার গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেন। টানা দশ মিনিটে গুলি চলল ১৬৫০ রাউন্ড। বর্বরতার বলি হলেন এক হাজারেরও বেশী মানুষ। আহত কয়েক শত। তবে ছাড়া পাননি পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মাইকেল ও' ডায়ার। বিপ্লবী উধম সিংএর গুলিতে ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ নিহত হন তিনি। এদিকে মোদি সরকার জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ সংস্কারের নামে সেখানকার প্রবেশপথে বুলেটের চিহ্নগুলিই মুছে ফেলেছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের দমননীতির কুখ্যাত নিদর্শন ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যা। চরম স্বৈরতান্ত্রিক রাওলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে জনজাগরণকে স্তব্ধ করতে ব্রিটিশ শাসক সেসময় যে বর্বর পন্থা নিয়েছিল তার নজির বড় একটা দেখা যায় না। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের একশ বছরেরও বেশী সময় অতিক্রান্ত হলেও ব্রিটিশ সরকার এখনও এর জন্য সরকারf ভাবে অপরাধ স্বীকার করেনি, কেবল দুঃখ প্রকাশ করেছে।

রাওলাট অ্যাক্ট প্রবর্তন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ লগ্নে তৎকালীন বড়লাট চেমসফোর্ড বিচারপতি রাওলাটকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি তৈরি করেন যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষে বিপ্লবী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য, বিস্তৃতি ইত্যাদি বিষয়ে তদন্ত করা এবং বিপ্লবীদের শায়েস্তা করার জন্য আইন প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া। এই কমিটি ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের একটি ইতিহাস এবং এই আন্দোলনের মোকাবিলায় নেমে ব্রিটিশ সরকার কী করেছে তার এক দীর্ঘ বিবরণ তৈরি করে। তাছাড়া এই কমিটি বিপ্লবী কার্যকলাপ দমন করার জন্য একটি আইন তৈরির প্রস্তাব করে ।

কমিটির এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার দুটি বিল তৈরি করে যাতে রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করে তাদের সব অধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সন্দেহ হলেই কোনো ব্যক্তির কোথাও বসবাস করার ওপরে নিয়ন্ত্রণাদেশ জারি করা, তার কাজকর্মের স্বাধীনতা হরণ করা, ইচ্ছেমত খানাতল্লাশি চালানো, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য কারারুদ্ধ করার মত ঢালাও ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে দেবার প্রস্তাব করা হলো বিল-দুটোতে। যাদের বিরুদ্ধে এই সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাঁদের যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তবে সেসব অভিযোগ যাচাই করে দেখার জন্যে একটা কমিটি তৈরি করারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্তের পক্ষে কোনও আইনজীবীর এই কমিটির কাছে কিছু সওয়াল করার অধিকার ছিল না।  স্বাভাবিকভাবেই এই 'আইনবিগর্হিত আইন '-এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

রাওলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শাসকের দমনপীড়ন

কেন্দ্রীয় আইনসভার সব বেসরকারি ভারতীয় সদস্যই একবাক্যে এই দমনপীড়নমূলক বিলের বিরোধিতা করেন। তাদের মধ্যে চারজন এই বিলের প্রতিবাদে সদস্যপদ থেকে  ইস্তফা দেন। কিন্তু সব প্রতিবাদকে নস্যাৎ করে ১৯১৯ সালের ১৮ই মার্চ বিলটা একমাত্র সরকারি সদস্যদেরই ভোটের জোরেই পাস করানো হয়। এভাবেই ২১শে মার্চ থেকে চালু হয় কুখ্যাত রাওলাট অ্যাক্ট।

সরকারী দমনপীড়নকে এভাবে আইনসিদ্ধ করার বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করার উদ্যোগ নিলেন গান্ধীজি।

সংগ্রামের সূচনাস্বরূপ তিনি দেশব্যাপী একদিনের হরতালের ডাক দিলেন। প্রথমে সিদ্ধান্ত হয় যে ৩০ মার্চ হরতাল হবে। দিন বদলে সেটা ৬ এপ্রিল করা হয়। কিন্তু ৩০ তারিখেই অনেক জায়গায় সভা, বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।  দিল্লিতে এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণ করে পুলিস। অমৃতসর সহ বেশ কিছু জায়গায় হিংস্র পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন বিক্ষুব্ধ জনতা।

৩০ মার্চ,১৯১৯ যে গণবিক্ষোভ শুরু হয় তা ৬ এপ্রিলের মধ্যে আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। ব্রিটিশ শাসকের আক্রমণও আরও নির্মম হয়ে ওঠে । পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ার এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করবার জন্য চরম দমনপীড়ন শুরু করেন। গান্ধীজির পাঞ্জাবে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। লাহোর, গুজরানওয়ালা, কাসুর সহ পাঞ্জাবের বিভিন্ন জায়গায় মুখোমুখি সংঘর্ষ বেধে যায়  জনসাধারণ ও পুলিশের মধ্যে। জাতীয় আন্দোলনের দুই বিশিষ্ট নেতা ডাঃ সত্য পাল ও ড. সৈফুদ্দিন কিচলুকে গ্রেপ্তার করা হয়। ক্রুদ্ধ জনগণ বিচ্ছিন্ন ভাবে কোথাও কোথাও ইউরোপীয়দের ওপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু এর অব্যবহিত পরেই ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে যে নারকীয় গণ-হত্যা ঘটালো ব্রিটিশ সরকার, তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: বর্বরতার আখ্যান

জনগণের ক্ষোভ দমন করতে ব্রিগেডিয়ার রেজিনাল্ড ডায়ারের হাতে তুলে দেওয়া হয় অমৃতসর শহরের শাসনভার। নির্বিচারে চলে ধরপাকড়। সভাসমিতি, অনুষ্ঠান সব নিষিদ্ধ ঘোষিত হল। এইসব করেও মানুষকে শায়েস্তা করতে না পেরে ডায়ার অন্য এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করলেন।

১৩ই এপ্রিল বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে 'বৈশাখী' উৎসবের দিন অন্ততঃ দশ হাজার মানুষ সমবেত হন। এই জনসভাটা ব্রিটিশ শাসকের মতে ছিল বেআইনি। কিন্তু লোকজনকে সভার মাঠে আসার সময় একটুও বাধা দেওয়া হয়নি,  সমবেত জনতাকে অবিলম্বে সভা ছেড়ে  চলে যাওয়ার নির্দেশ তো দেওয়াই হয়নি। আসলে ঠান্ডা মাথায় প্রতিবাদী জনতাকে খুনের পরিকল্পনা ছিল ডায়ারের মাথায় । মাঠটা যখন সম্পূর্ণ ভর্তি হয়ে গেল, তখন তিনি গুলি চালানোর নির্দেশ দিলেন। টানা দশ মিনিট ধরে ১৬৫০ রাউন্ড গুলি চলল। প্রাচীর ঘেরা জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রবেশ আর প্রস্থানের একটাই মাত্র সরু পথ । লাঠিচার্জ হলে বা গুলি চললে, সেখান থেকে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যাবার উপায় নেই, লাঠি বা গুলি খেতেই হবে। জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ শাসকের বর্বর জিঘাংসার বলি হলেন এক হাজারেরও বেশী মানুষ। আহত হলেন কয়েক শত। 

তদন্তের সময় ডায়ারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এই রকম ছোট জায়গায় এত মানুষকে প্রথমে ঢুকতে দিয়ে সেখানে পরে গুলি চালানোই বা হলো কেন? আর, গুলি না চালিয়ে কি অন্য উপায়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা যেত না? ডায়ারের সগর্ব উত্তর, আইন-শৃঙ্খলার রক্ষাকর্তা হিসাবে নিজের মান-সম্ভ্রমটা গুলি চালিয়েই তিনি রক্ষা করতে পেরেছেন। শুধু অমৃতসরের মানুষদেরই নয়, সারা পাঞ্জাবকে ভীত- সন্ত্রস্ত করে তোলাই যে তার উদ্দেশ্য ছিল তা সদর্পে জানিয়ে দেন ডায়ার। 

জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার পর দমনপীড়নের কাজে বিন্দুমাত্র শিথিলতা না দেখিয়ে  লাহোর,অমৃতসর সহ পাঁচটি জেলায় সামরিক আইন সরকারfভাবে জারি করা হয়। বেত মারা, নানা অছিলায় গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কোনো কোনো রাস্তা দিয়ে জনসাধারণকে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে বাধ্য করা হয়।

কেবলমাত্র জেনারেল ডায়ারের একার সিদ্ধান্তে এই বর্বরতা ঘটেনি। তার পেছনে ছিল ব্রিটিশ সরকারের পূর্ণ মদত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করতে সভ্যতার শেষ মুখোশটুকু খুলে ফেলতে দ্বিধা করেনি। অবশ্য হত্যাকাণ্ডের সম্বন্ধে একটা লোক দেখানো তদন্ত কমিটি তৈরি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারী ডায়ার বা গভর্নর ও' ডায়ারের কোন গুরুতর শাস্তি হয়নি। কেবলমাত্র ডায়ারকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই গণহত্যার জন্য সাময়িক ভাবে নিষ্কৃতি পেলেও বিপ্লবী উধম সিং এর গুলিতে ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ নিহত হন মাইকেল ও'ডায়ার।

জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংসতা দেশের অগণিত মানুষের সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ভীষণ আলোড়িত করেছিল । ব্রিটিশ শাসকের অনৈতিক, বর্বর ও নির্মম আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। অনেকে মনে করেন যে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড ভারতে ব্রিটিশ রাজত্বের শেষের শুরু। ঔপনিবেশিক শাসকের হিংস্র অমানবিকতার এহেন নজির এদেশের মানুষকে পরাধীনতার জোয়াল ছুঁড়ে ফেলবার লক্ষ্যে ক্রমশ বৃহত্তর গণসংগ্রামের দিকে পরিচালিত করে।

তবে একথা ভেবে ক্ষোভ হয় যে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ সংস্কারের নামে ঐ উদ্যানের প্রবেশপথে বুলেটের চিহ্ন গুলি মুছে ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা অপসারণের এ এক নতুন কৌশল! 


প্রকাশের তারিখ: ১৩-এপ্রিল-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org