|
বামপন্থা মানে প্রশ্নচেতনাকুমার রাণা |
এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি এক ধরনের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি— যা অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করে, সমতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে এবং বিকল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতি উন্মুক্ত। |
বামপন্থা নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। কে বাম কে নয়, এ নিয়ে বাক-প্রতিযোগিতা আরও এগিয়ে গিয়ে মাপতে শুরু করে, কে কতটা বাম, কে অতি-বাম, কে নমনীয় বাম, কে বামপন্থার ছদ্মবেশে আসলে দক্ষিণপন্থী, ইত্যাদি। এতে দক্ষিণপন্থীরা প্রভূত মজা পান: “এইতো বামেদের অবস্থা, নিজেদের মধ্যেই এত ভাগ, তারা আবার মানুষকে একজোট করবে কী করে?” কিন্তু, তাঁরা যাকে আদর্শ বলেন, তার বাইরের কোনো কিছু তাঁদের পক্ষে দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তাঁদের আদর্শ একান্তভাবেই স্বার্থপরতার বাসনা দিয়ে গড়া, তার বাইরের কোনো কিছুকে দেখতে পাওয়া তাঁদের সাধ্যের বাইরে। তাঁদের দৃষ্টি, অতএব, কেবল সেইটুকুই দেখতে পায়, যেটুকু তাঁদের মুনাফা যোগায়, একক ব্যক্তির সমৃদ্ধিই তাঁদের জীবনের ধ্যেয়। ফলে তাঁরা অপরের সঙ্গে যেটুকু সম্পর্কে সম্পর্কিত তা হল নিতান্তই ব্যক্তিস্বার্থের। বিপরীতে বামপন্থা ব্যাপারটাই হল, অপরকে নিয়ে ভাবা, নিজের ক্ষুদ্র চৌহদ্দির বাইরে যে বিপুল জগৎ ও তার বাসিন্দা মানুষ, পশু-পক্ষী, পর্বত ও নদী, অরণ্য ও গুল্ম, ইত্যাদি সমস্ত কিছুর কুশলতার কথা ভাবা। চিন্তার মধ্যে এত বিপুলতাকে ধারণ করতে গেলে বিবিধতা থাকতে বাধ্য— আমরা যে বিশ্বের বাসিন্দা, তার কল্যাণের কথা ভাবতে গেলে তার যাবতীয় বৈচিত্র্য আমাদের মস্তিষ্কে প্রতিফলিত হয়। সে-প্রতিফলন, স্বাভাবিকভাবেই, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবিশেষের ওপর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পড়ে। স্বার্থচিন্তায় অন্ধ দক্ষিণপন্থার পক্ষে এই বিবিধতা দুর্বোধ্য। কিন্তু, আমাদের মানতেই হবে, চিন্তার এই দারিদ্র্য সত্ত্বেও জাগতিক সম্পদের ওপর অধিকারের মধ্য দিয়ে দক্ষিণপন্থা এমন এক ক্ষমতার অধিকারী যে, বামপন্থীদের অনেকেও তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন, স্বার্থমগ্নতা তাঁদেরও দক্ষিণপন্থার গহ্বরে টেনে নেয়। এই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই বামপন্থা তথা এই বিশ্বের অগ্রগমন। সেই চলাচলে বামপন্থা নিয়ে অহরহ চিন্তার অনুশীলন চলতে থাকে। বামপন্থীরা সেই অনুশীলনে নিজের অবস্থান ও সাধ্যমতো যোগ দেন। বর্তমান লেখাটি তেমনই এক সামান্য যোগদান। “বাম” শব্দটি রাজনৈতিক শব্দভাণ্ডারে প্রবেশ করে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে, ১৭৮৯-এর ফরাসি বিপ্লবের সময়। সেখানকার জাতীয় পরিষদের সদস্যদের মধ্যে একটা ভাগ মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন, তাঁরা সভাপতির বাম দিকে বসতেন। আর যাঁরা রাজতন্ত্রের, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাবিন্যাসের পক্ষে, তাঁরা বসতেন ডানদিকে। এই ভাগাভাগি পরবর্তীকালে একটি মতাদর্শগত চিহ্নে পরিণত হয়: সমতা, পরিবর্তন এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের বলা হতে লাগল বামপন্থী, আর যাঁরা শ্রেণিশোষণ ও ঐতিহ্য রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিলেন, তাঁরা দক্ষিণপন্থী। চিহ্নিতকরণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির নিশ্চয়ই গুরুত্ব আছে, কিন্তু বামপন্থার ধারণাটিকে কেবল এই ঘটনার আলোকে দেখা চলে না। এর মর্মগত অর্থের বিচারে বামপন্থা তার নামকরণেরও বহু পূর্ব থেকে মানব সমাজে অস্তিত্ববান। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক শ্রেণিবিভাগ নয়; বরং মানব ইতিহাসে নিহিত এক অবিচ্ছিন্ন নৈতিক প্রেরণা— শাসন, বৈষম্য, অন্যায্যতা এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের বুদ্ধির জগতে বিচলন ঘটানো এক প্রশ্নচেতনা। আমরা এখানে বামপন্থাকে দেখার চেষ্টা করব মূলত এক ধরনের মস্তিষ্কজাত ও নৈতিক আলোড়ন হিসেবে। বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো, এবং তা থেকে উদ্ভুত বৈষম্য ও বঞ্চনাকে মানবিক যুক্তি মেনে নিতে পারে না, সে এই অ-যুক্তির বৈধতা প্রশ্ন করে। এই বুদ্ধিগত বিচলনই প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত নৈতিক অনুসন্ধান থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন ধারাকে একত্রে বাঁধে। ফলে বামপন্থাকে একটি স্থির মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং চিন্তা ও কর্মের এক ভঙ্গি হিসেবে বোঝা দরকার। এই ভঙ্গি মানুষের সঙ্গে মানুষের কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা বিভাজন ও বিভেদ এবং ব্যক্তি-স্বার্থের জন্য মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় ও শোষণকে স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে। বিপরীতে দক্ষিণপন্থার কাছে এই অ-যুক্তিগুলোই যুক্তিসঙ্গত, স্বাভাবিক। বামপন্থার পূর্ব ইতিহাস “বাম” শব্দটি যদিও ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রতিক, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাড়না মানব সমাজের সংগঠিত রূপের মতোই প্রাচীন। যেই মুহূর্তে মানবসমাজ ক্ষমতা, সম্পদ, লিঙ্গ, জাত বা মর্যাদার ভিত্তিতে স্তরবিন্যাসিত হয়েছে, সেই মুহূর্তেই সমালোচনা ও প্রতিরোধের শর্ত তৈরি হয়েছে। যেখানে এক গোষ্ঠী অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে, সেখানে সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার কণ্ঠস্বরও উঠে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায় যে বামপন্থা আধুনিকতার সৃষ্টি নয়; এটি ইতিহাসে বারংবার ফিরে ফিরে আসা নৈতিক অভিমুখ। এটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে অসমতাকে স্বাভাবিক ও প্রকৃতিনির্দিষ্ট বা ভাগ্য হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার এবং যুক্তি দিয়ে এগুলোকে অ-যুক্তি বলে প্রমাণিত করার মধ্য দিয়ে। এই অর্থে, বামপন্থা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চেয়ে বড় একটি ব্যাপার, এটি বিশ্বের প্রতি একটি নৈতিক অবস্থান— যা প্রশ্ন তোলে কেন কেউ শাসন করে আর কেউ শাসিত হয়, কেন কেউ সঞ্চয় করে আর কেউ বঞ্চিত থাকে, এবং কেন কিছু জীবনের মূল্য অন্যদের তুলনায় বেশি ধরা হয়। অভিযোগের রূপান্তর সংগঠিত প্রতিবাদ বা বিদ্রোহে পরিণত হওয়া তাই কেবল আকস্মিক নয়, বরং একটি সচেতন নৈতিক সিদ্ধান্ত। আমাদের সময়ের পুরোধা সমাজশাস্ত্রী রণজিৎ গুহ যেমন বলেছেন, যে-কোনো বিদ্রোহে বিদ্রোহীর চেতনা কেবল নেতিবাচক হিসেবে উঠে আসে না, কেবল অত্যাচারের প্রতিবাদ হিসেবে উঠে আসে না। বরং তা ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-ভুলের চেতনা দ্বারা পরিচালিত হয়। মস্তিষ্কে বিচলন: বামপন্থার মূল বামপন্থার কেন্দ্রে রয়েছে এক ধরনের বুদ্ধিগত অস্থিরতা— বর্তমান অবস্থার প্রতি এক গভীর অসন্তোষ। এই অস্থিরতা কেবল আবেগপ্রসূত নয়; এটি বিশ্লেষণধর্মী। এটি সামাজিক বিন্যাসের যুক্তিসঙ্গতি পরীক্ষা করে এবং তার অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে: কেন পুরুষ নারীর ওপর আধিপত্য করবে? কেন জাত বা বর্ণ একজন মানুষের জীবনের সম্ভাবনা নির্ধারণ করবে? সমতা: এক রাজনৈতিক নৈতিকতা বামপন্থা সাধারণত সকলের সমান সুযোগের দাবির সঙ্গে যুক্ত। তবে এই সমতা কোনো সরল সমীকরণ নয়; এটি এক নৈতিক অঙ্গীকার, যা বলে যে সকল মানুষের মূল্য সমান। এই অঙ্গীকার প্রকাশ পায় বিকাশের পূর্ণ সুযোগ, সামাজিক ন্যায়, লিঙ্গসমতা, জাত ও অন্যান্য বিভাজন বিলোপের সংগ্রামে। উদাহরণ হিসেবে কেবল সম্পত্তির ওপর অধিকারের দিক দিয়েই নয়, মানুষে মানুষে বিভেদের একটি রূপ হিসেবে দেখা দেয় জাত প্রথা। বি. আর. আম্বেদকর যেমন দেখিয়েছেন, “জাত শুধু শ্রমের বিভাজন নয়; এটি শ্রমিকদের বিভাজন।” এই বক্তব্য দেখায়, জাত কোনো নিরপেক্ষ সামাজিক বিন্যাস নয়; এটি এক গভীর শ্রেণিবিন্যাস, যা বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে। এই সমস্ত সংগ্রামের ভিত্তিতে রয়েছে একটি সাধারণ নৈতিক নীতি— কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কাঠামোগতভাবে অধীনস্থ রাখা যাবে না। জাতীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধতা জাতীয় সংকীর্ণতার অযৌক্তিকতা আধিপত্যশীল রাজনৈতিক চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে। মানুষের পরিচয়কে কঠোর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ করা মানবমুক্তির ধারণার বিরোধী। জাতি, যদিও ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত, তা প্রায়ই নৈতিক পরম সত্যে উন্নীত হয়। এটি ঐকান্তিক আনুগত্য দাবি করে এবং মানবসমাজেরই একটি অংশকে চরম বিপন্নতা, এমন কি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। যে পশ্চিমী বিশ্ব, ইউরোপ ও আমেরিকা তথাকথিত সভ্যতার চূড়া ছুঁয়েছে, ইতিহাস দেখায়, তাদের সেই “অর্জন” আসলে সঙ্ঘটিত হয়েছে চরম অসভ্যতার মধ্য দিয়ে: আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন মানগোষ্ঠীর রক্ত ও অস্থির ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের এই জৌলুস। একে ব্যবহার করে তারা পৃথিবী জুড়ে যত রক্তক্ষয় ও প্রাণহাণি ঘটিয়ে চলেছে, ভেনেজুয়েলায়, গাজায়, ইরানে, কিউবায় দক্ষিণপন্থার যে বীভৎস রূপ দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তিই তো অ-যুক্তি। আমাদের দেশে কী চলছে, সকলের জানা। জাতীয়তাবাদের নামে মুসলমানদের উজাড় করা, পাকিস্তানের মানুষ বিপন্ন হলে আনন্দে নৃত্য করা, অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো দূর, তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ চাগিয়ে তোলা সহ মানবিকতা বিরোধী নানা অযুক্তির আয়োজন আমরা অহরহ দেখে চলেছি। প্রকৃতি ও বামপন্থা কেবল মানুষ নয়, মানব চিন্তাজগতের বিস্তারে প্রকৃতিকে ধারণ করাও বামপন্থা। প্রকৃতির ওপর আধুনিক পুঁজিবাদের যে উন্মাদ আগ্রাসন ও তার বিধ্বংসী পরিণতি নিয়ে কথা বলা ও বামপন্থার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। অবিরাম সঞ্চয়ের তাড়না প্রকৃতিকে নিছক সম্পদে পরিণত করেছে, যা পৃথিবীকে পরিবেশগত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে পুঁজির দ্বন্দ্বটির মতাদর্শগত ভিত্তি হচ্ছে হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থ, মালিকী সম্পত্তির মধ্যে দিয়ে যার চরিতার্থতা। এই আদর্শ এমন একটা মোহ সৃষ্টি করতে পারে, যাতে মানুষ তার সমস্ত অস্তিত্বকে বর্তমানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখে— গত কাল কী হয়েছিল, আগামী কাল কী হবে, এই চিন্তা তার মনে স্থান পায় না। আত্মস্বার্থের অন্ধতা মানুষকে তার যাবতীয় মানবিক সংযোগগুলো থেকে বিযুক্ত করে— লোভ হয়ে ওঠে তার অস্তিত্বের একমাত্র শর্ত। যেমন, গত চারশো বছরে, অর্থাৎ পুঁজির শাসনকালে, পৃথিবীতে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে ২৫ শতাংশ; অথচ, তার আগের দশ হাজার বছরে এই হ্রাসের অনুপাত ছিল পাঁচ শতাংশ। বনাঞ্চল ধ্বংসের সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়, নদী, জলাশয়, চারণভূমির ওপর দখলদারি, যার পরিণতিতে গোটা পৃথিবীটাই আজ অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি। প্রকৃতিকে লুণ্ঠন করতে গিয়ে, পুঁজি কেবল অরণ্য, পাহাড়, নদী ও প্রকৃতিস্থ মানুষদের ওপরই আক্রমণ নামিয়ে আনেনি, বরং, ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, সুস্থচিন্তার মানুষদের জীবনাদর্শকেও। এই আদর্শের অনুগামী মানুষ, মার্কসের কথা ধার করে বলতে গেলে, “প্রকৃতির বিরোধিতা করে, প্রকৃতির অংশ হিসেবেই”— বাইরের কোনও শক্তি হিসেবে নয়। সে-মানুষ সম্প্রসারণে বিশ্বাস করে না, যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি এক কণাও সে চায় না। এই বোধ থেকেই তার ভূগোল অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং তার কাছে অনেক বেশি পরিচিত—সে পরিচয় বিশ্বসংসারের সঙ্গে আত্মীয়তার। এই দর্শন তাকে স্থাণু থাকতে বলেনি, এগোতে বাধা দেয়নি, স্থিতিশীল ভূগোলের মধ্যে বসবাস করতে শেখালেও সেই ভূগোলেই তার আটকে থাকা নির্দিষ্ট করে দেয়নি। বরং তাকে শিখিয়েছে, প্রকৃতির বিপুলতা থেকে প্রয়োজনমতো আহরণ করতে করতে এগোতে। সেই আহরণের প্রক্রিয়া উগ্রতাকে এড়িয়ে চলে, প্রকৃতির হানিকারক কর্মকাণ্ডগুলোকে পরিহার করে। প্রকাশের তারিখ: ০৪-এপ্রিল-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |