বাংলার জনজীবনে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতির অলিন্দে লেখাপড়ার গুরুত্ব ছিল যুগ যুগ ধরে একটা সমান্তরাল মর্যাদা গঠনের রাস্তা হিসেবে। লেখাপড়া সম্পর্কে সমাজের সমস্ত অংশের মানুষের মধ্যে একটা উঁচু দাগের মনোভাব ছিল। সামাজিক উত্তোরণের সম্ভাবনার সাথে যুক্ত ছিল লেখাপড়ার প্রসঙ্গ। সামাজিক, অর্থনৈতিক সারণীতে নীচের দিকে থাকা মানুষও লেখাপড়ার মাধ্যমে সমাজের বুকে মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জোর পেত। বাংলার প্রগতির ইতিহাসের প্রতিটি ধাপে লেখাপড়া যুক্ত হয়েছে মর্যাদার সাথে। প্রাথমিক পাঠ থেকে উচ্চশিক্ষা— উন্নত মানবসম্পদ গড়ার প্রতিটি স্তরে মানুষ নিজ আগ্রহে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার আলোকসন্ধানে। এই আগ্রহকে জাগরিত করার ক্ষেত্রে বাংলার নবজাগরণ, সমাজ সংস্কার আন্দোলন, স্বাধীনতার লড়াই, জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকা বাংলার সামাজিক ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপক অংশের মানুষকে লেখাপড়া সম্পর্কে আগ্রহী করাই শুধু নয়, সমাজের প্রান্তিক মানুষকে শিক্ষাব্যবস্থায় অংশীদার করে তোলার মাধ্যমে মজবুত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে বামফ্রন্টের সরকার। গরিব বাড়ির ছেলেমেয়ের আনাগোনা বাড়তে থাকে স্কুল, কলেজে, মাদ্রাসায়। ফলে প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েও স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেল আর সে-স্বপ্ন-দেখার লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ড গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছিল বাংলার মাটিতে।
যে-স্বপ্ন ধাক্কা খেলো তৃণমূলের পনেরো বছরের শিক্ষাবিমুখ শাসনকাঠামোয়। আরএসএস-এর পরিকল্পনায় বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে বাংলার মানুষের গণচেতনা থেকে শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতাকে না-সরালে উপায় নেই। তৃণমূলকে নিয়োগ করা হয়েছে একদম ভূমিস্তর থেকে বাংলার লেখাপড়ার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে। স্কুল, কলেজ বন্ধ করে, ছাত্রহীন-শিক্ষকহীন ক্লাসরুম তৈরি করে, শিক্ষা বাজেটের বরাদ্দ অনুয়ায়ী খরচ না-করে, সরকারি শিক্ষাখাতে ক্রমাগত বরাদ্দ কমিয়ে, সরকারি মদতে ড্রপ আউট বাড়িয়ে, স্কুলের নিয়োগ সংক্রান্ত একের পর এক দুর্নীতির জাল বুনে, শিক্ষান্তে সৎ পথে ন্যূনতম কাজের সুযোগ না-রেখে তৃণমূল পরিকল্পিত আকারে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে শিক্ষাক্ষেত্র, শিক্ষার সম্ভাবনা, শিক্ষার প্রতি মানুষের ইতিবাচক আগ্রহ, উৎসাহকে। ফলে বাংলার ছেলেমেয়েরা, অভিভাবকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে লেখাপড়া থেকে!

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, প্রাইমারি স্তরে বন্ধ হয়ে যাওয়া একের পর এক স্কুল। মানে লেখাপড়ার প্রথম ধাপ থেকে ব্যাপক অংশের ছেলেমেয়েদের ছিটকে সরিয়ে দেওয়া পরিকাঠামো, শিক্ষক, পরিচর্যার অভাবে। যারা তবু এই বেহাল পরিকাঠামোয় কিছুটা এগোবে তাদেরও ধাপে ধাপে সরিয়ে ফেলা হবে। মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিকে গায়েব, তারপর কলেজের গেটে গায়েব, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢোকার মুখে গায়েব। লেখাপড়ার প্রতিটা স্তরে সরকার পোষিত এন্ট্রি-এক্সিট পয়েন্ট। শব্দটা চেনা? ঠিক, কেন্দ্রের সরকারের নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এই নীতিরই ফর্মুলা প্রস্তুত হয়েছে নাগপুরেই— হেডগেওয়ার, গোলওয়ালকার, সাভারকারের লাইন ধরেই। একই ফর্মুলায় শিক্ষাকে সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে বিজেপির নীতিতে দেশে এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যে, আবার সেই নীতিরই প্রতিলিপি চালানো হচ্ছে আমাদের রাজ্যে। বন্ধ হওয়া সরকারি স্কুলের গা-বেয়েই গজিয়ে উঠছে সরস্বতী বিদ্যামন্দির! খানিক দূরত্বে আবার ঝাঁ চকচকে প্রাইভেট মডেল স্কুল, খোঁজ নিলেই জানা যাবে সেই সব স্কুলের মালিক হয় তৃণমূল অথবা প্রাক্তন তৃণমূল বর্তমান বিজেপি, অল্প কয়েকদিনে হঠাৎ প্রচুর টাকার মালিক হয়ে উঠেছে। অতএব গরিব, মধ্যবিত্ত বেশিরভাগ গিয়ে উঠবে আরএসএসর ক্লাসরুমে আর মোটের ওপর অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলেমেয়ে দ্বারস্থ হবে ওই প্রাইভেট মডেল স্কুলে যার সিলেবাস ঠিক হয়ে এসেছে আরএসএসর মস্তিষ্ক থেকেই। অতএব একদম প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই একটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
এই গোটা প্রকল্পের মাঝে পড়ে রয়েছে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যত। একের পর এক প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসার পরিকাঠামোর অভাবে, সরকারি ফান্ডের অভাবে ক্রমশ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে লেখাপড়া করার। মেয়েদের মধ্যে বাড়ছে বাল্য বিবাহ, নাবালিকা প্রসূতির প্রবণতা। পরিযায়ী শ্রম, শিশু-শ্রম বাড়ছে ব্যাপক হারে। তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে পাড়া, মহল্লা থেকে। শিক্ষার সামগ্রিক পুনরুত্থান ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। আমূল সংস্কারের মাধ্যমে গত পনেরো বছর ধরে চেপে বসা শিক্ষাবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টাতে হবে, পাল্টাতেই হবে। বামপন্থীরা সেই পরিকাঠামোগত, মৌলিক সংস্কারের কথা বলছে। যার প্রথম ধাপ মোট বাজেটে ২০ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা। শিক্ষার প্রতি মানুষের সম্মান, সম্ভ্রম, আকর্ষণ ফেরাতে শিক্ষাপ্রণালীকে আরও উন্নত, অত্যাধুনিক ও আকর্ষক করতে হবে। সেটা শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ ব্যাপক হারে না-বাড়লে সম্ভব নয়। বামপন্থীদের ইশতেহারে সেই দিশা রয়েছে।
ড্রপ আউট আটকানো এখন প্রধানতম কাজ। বাম সরকারের উদ্যোগেই ব্যাপক হারে ড্রপ আউট হওয়া ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে ফেরানো গিয়েছিল পূর্বে। কাজে দিয়েছিল অবৈতনিক শিক্ষার বাস্তবায়ন, মিড ডে মিলের পরিকল্পনা। বিকল্প সামনে রাখছে বামপন্থী মডেলই। সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চয়তার মাধ্যমে ড্রপ আউট হওয়া লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হবে। সর্বজনীন ছাত্রবৃত্তির মাধ্যমে প্রাইমারি থেকে গবেষণা স্তর পর্যন্ত মাসিক স্ট্যাইপেন্ড সহ সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, চা-বলয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নজরুল, আম্বেদকর, বিরসা নামাঙ্কিত আলাদা আলাদা স্কলারশিপের ব্যবস্থা। এছাড়াও পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের প্রতিটি সন্তানের জন্য MILES স্কলারশিপ। এই ধরনের মাসিক স্কলারশিপের ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রী সহ অভিভাবকদেরও আগ্রহী করবে ছেলেমেয়েকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফেরানোয়।
এবার ফেরানোর পর দরকার পরিকাঠামো। কম্পোজিট গ্রান্টের বকেয়া কয়েক কোটি টাকা উদ্ধার করে চালু করা হবে স্মার্ট বাংলা গ্রিড প্রজেক্ট, ২০২৯ সালের মধ্যে রাজ্যের সমস্ত মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে উন্নতমানের অত্যাধুনিক স্মার্ট ক্লাসরুম পরিকাঠমো। ক্লাসে হাই লুমেন প্রজেক্টর সহ সমস্ত ছাত্রছাত্রীর জন্য ‘এডুট্যাব’। সবটা সংযুক্ত ‘বাংলা শিক্ষা ৩.০’ পোর্টালের সাথে, যা আবার ‘সম্পর্ক ড্যাশবোর্ডের’ সাথে যুক্ত থেকে সমস্ত তথ্য পৌঁছে দেবে ডিএম, ডিআই, শিক্ষা মন্ত্রক, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে। প্রাইভেট কোচিংয়ের দৌরাত্ম্য রোধের সোপান হল পাবলিক কোচিং পরিমণ্ডল ও পরিকাঠামো গড়ে তোলা। সরকারি উদ্যোগে সর্বভারতীয় স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশিক্ষণ শিবির প্রতিটি জেলায়৷ ডিজিটাল সিভিল সার্ভিস একাডেমির মাধ্যমে বাংলার মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ ট্রেনিং। স্কুলের পর বিশেষ ক্লাস অঙ্ক ও বিজ্ঞানের ভীত মজবুত করতে। দশম শ্রেণী থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশেষ কারিকুলাম।
ছাত্রীদের জন্য প্রতি ক্যাম্পাসে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন, প্রতি মহকুমায় ‘প্রীতিলতা সেলফ ডিফেন্স ক্যাম্প’, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হেনস্থার রুখতে ‘তিলোত্তমা ডিজিটাল ড্রপ বক্স’, নারী পাচার, বাল্য বিবাহ রুখতে সরকারি উদ্যোগে নজরদারি টিম ‘উড়ান’, সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণ কমিটিতে ছাত্র সহ নির্বাচিত ছাত্রী প্রতিনিধি। মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে স্কুলে জীবনশৈলীর ক্লাস, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যের ক্যাম্প, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকার নিযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, এছাড়াও ছেলেমেয়েদের মনের খবর রাখতে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলে সরকারি অ্যাপ বন্ধু’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো, অত্যাধুনিক ক্লাসরুম, উন্নত গবেষণার ক্ষেত্র, প্লেসমেন্ট সেলের মাধ্যমে কাজের নিশ্চয়তা, স্মার্ট হোস্টেল পরিষেবা। মাদ্রাসার সামগ্রিক উন্নত পরিকাঠামো নিশ্চিত করা। শিক্ষক অধ্যাপকদের শূন্যপদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণ করা। গণপরিবহনে ছাত্রদের জন্য বিশেষ ছাড়। বিনামূল্যে ইন্টারনেট পরিষেবা। উন্নতমানের লেখাপড়ার পরিসর গড়ে বাংলার শিক্ষার সম্প্রসারণের পুরোনো ধারাকে পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য স্থির করেছে বামপন্থীরা। ম্যানিফেস্টোর প্রতিটি পরতে সেই লক্ষ্যই স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমে ড্রপ আউটদের ক্লাসরুমে ফেরানো, তারপর ক্লাসরুমকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করা, সেই ক্লাসরুম থেকে উন্নত মানবসম্পদ গড়ে তোলা, তারপর প্রত্যেককে কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া। শিক্ষার পুনরুদ্ধারের লড়াইতে শিক্ষার পরিবেশ, পরিকাঠামো, মর্যাদা ফেরানোর বিকল্প ভাবনা৷ বাংলার ভবিষ্যত প্রজন্মকে রক্ষা করতে, চলমান প্রজন্মকে ভবিষ্যতের সন্ধান দিতে তাই এই ভাবনার বাস্তবায়ন দরকার, দরকার বামপন্থার পুনরুত্থান সর্বপরি বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পের পুনরুত্থান।
প্রকাশের তারিখ: ১১-এপ্রিল-২০২৬ |