সামন্তবাদী অর্থনীতি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হস্তচালিত প্রযুক্তিবিদ্যার ভিত্তিতে ঐতিহাসিকভাবে বুর্জোয়া সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠিত হয়। ঠিক এই সময়েই শোষণের নতুন রূপ নিয়ে পুঁজিবাদী উৎপাদনের উদ্ভব। দৃশ্যপটে হাজির হয় পুঁজিবাদের মজুরি গোলামী।
পুঁজি ও শ্রমের বিরোধ গোড়া থেকেই। পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রগতির হাতিয়ার হলো শ্রমিক। এখানে পুঁজিপতিদের ওপরে শ্রমিকের স্থান। পুঁজিবাদী উৎপাদনের গোলাম শ্রমিকরা শুরু থেকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অবতীর্ণ হয় এবং তাকে তার গোলামীর প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করে।
শ্রেণীবিভক্ত সমস্ত সমাজব্যবস্থায় মজুরি-শ্রম ছিল। কিন্তু সর্বশেষ ক্ষেত্রে মজুরি-শ্রমের শোষণই সমাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে। মার্কসের ভাষায়, ‘মজুরি-শ্রম ছাড়া উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন হতে পারে না। উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদন ছাড়া কোনো পুঁজিবাদী উৎপাদনই হতে পারে না। সুতরাং পুঁজি না থাকলে পুঁজিপতিই হতে পারে না।’
পুঁজিবাদী শোষণ কখন থেকে শুরু হয়েছে এবং সর্বহারাও কখন থেকে সমাজের দৃশ্যপটে এসেছে, সঠিকভাবে তা নিরূপণ করা কঠিন। কারণ সমাজ পরিবর্তনের এক একটা পর্বের প্রক্রিয়া চলে দীর্ঘকাল ধরে। তবে সামন্তবাদ যখন ভেঙে পড়ছে, তখনই তারই মাটিতে মজুরি-শ্রমের ওপর পুঁজির শোষণের ওপর ভর করেই জন্ম নেয় বুর্জোয়া ব্যবস্থা।
ষষ্ঠদশ শতাব্দী থেকেই কার্যত পুঁজিবাদের যুগ শুরু। এই সময় থেকেই পুঁজিবাদের স্থায়ী রূপ নেবার দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও অবশেষে বিজয় পরিলক্ষিত হয় ইউরোপে। ইউরোপই পুঁজিবাদের জন্মভূমি। পুঁজিবাদের জন্য উৎপাদনের বিশ্বজনীন চরিত্রের অর্থ দাঁড়ায় মজুরি-শ্রমে শ্রমের রূপান্তর এবং মনুষ্যশক্তির পণ্যে রূপান্তর। ষষ্ঠদশ শতাব্দী নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে যখন মজুরি-শ্রমের প্রক্রিয়া ও সর্বহারার আবির্ভাব ঘটে। শ্রমিকদের বিভিন্ন অংশের ওপর বিভিন্ন রকম শোষণ। কিন্তু অনুন্নত পর্যায়ের মতো উন্নত পর্যায়েও পুঁজির চরিত্র একই রকম। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে কাজের দিন ছিল ভোর পাঁচটা থেকে রাত আটটা। মাঝখানে তিন ঘন্টা তিনবার খাওয়ার জন্য বিরতি। ১৫৬২ সালে আইন করে বিরতির সময় করা হয় গ্রীষ্মে আড়াই ঘন্টা, শীতে দু ঘণ্টা। অষ্টাদশ শতাব্দীতেও এই আইন চালু ছিল। ১৩৪৯ সালে আইন করে মজুরি নির্ধারিত হয়। কাজের দিনের সময় ঠিক করতো রাষ্ট্র এবং মজুরির হার ঠিক করতো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সে, জার্মানিতে ও ইউরোপের অন্যত্র এই ধরনের আইন চালু হয়।
পুঁজির উদ্ভবের সময় থেকেই পুঁজিপতিদের সঙ্গে শ্রমিকদের লড়াই শুরু। শ্রমিক সংগ্রামের সবচেয়ে ব্যাপক ও সক্রিয় রূপ ছিল ধর্মঘট। অবশ্য দাঙ্গা এবং বিদ্রোহও হতো। শ্রমিকরা প্রতিরোধের অন্যান্য পদ্ধতিও গ্রহণ করতেন যেমন এড়িয়ে চলা, জাল পদ্ধতিতে পণ্য উৎপাদন ইত্যাদি। বেকারী, মূল্যবৃদ্ধি ও কারখানার আধুনিকীকরণের মাধ্যমে কর্মসংকোচনের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করেছেন। শ্রমিকরা নিজেদের স্বার্থরক্ষায় ইউনিয়ন গঠনের দিকেও ঝোঁকেন। সর্বহারার শ্রেণীসংগ্রাম বলতে যা বোঝায়, তা তখন ছিল না। কারণ শ্রমিকরা তখনও শ্রেণী হিসেবে গড়ে ওঠেনি। বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত উপায়ে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম মাঝে মাঝে দেখা যেত। লেনিনের ভাষায় শ্রেণী-সংগ্রামের ভ্রুণ ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। পুঁজিবাদের গোড়ার যুগে শ্রমিক সংগ্রামের প্রগতিশীল চরিত্রকে তাই ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই।
পুঁজিবাদের গোড়ার যুগের গোটা ইতিহাসে সর্বহারার অর্থনৈতিক সংগ্রাম সামন্তবাদ ও প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সাধারণ সংগ্রামের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। বুর্জোয়াদের প্রত্যেকটি আন্দোলনে এই শ্রেণীর স্বাধীন বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। এই শ্রেণীই হলো আধুনিক সর্বহারার অগ্রদূত। ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সে বুর্জোয়া বিপ্লবে সর্বহারা সহ সাধারণ মানুষই বুর্জোয়া ক্ষমতা কেড়ে নিতে সাহায্য করে।
শ্রমিকশ্রেণীর গঠন প্রক্রিয়ার নতুন পর্বটি শিল্পে পুঁজিবাদী বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। কারখানার উৎপাদন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে উদ্ভব হতে থাকে শিল্প-সর্বহারার। শ্রমিকশ্রেণীর গঠনের প্রধান শর্ত হলো শিল্পবিপ্লব। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ইংল্যান্ডে এবং পরবর্তীকালে অন্যত্র তা শুরু হয়। পুঁজিবাদী সম্পর্ক গঠনের চূড়ান্ত পর্যায় হলো শিল্পবিপ্লব। সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান ও মর্যাদায় শিল্প সর্বহারারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার যুগের মজুরি-শ্রমিকের চেয়ে ভিন্ন। এখন থেকে সর্বহারার একমাত্র সম্পত্তি হলো তার শ্রমশক্তি। এই শ্রমশক্তি পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করেই একমাত্র সে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। শিল্প বিপ্লব কারখানা, খনি, বাগিচা সর্বত্র ব্যাপকসংখ্যক শ্রমিককে জড়ো করল। অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য দেশের মানুষকে রূপান্তরিত করল শ্রমিকে। পুঁজির আধিপত্য এই জনগণের জন্য এক সাধারণ অবস্থা ও সাধারণ স্বার্থ তৈরি করে দেয়। এরাই পুঁজির বিরুদ্ধে তাই একটা শ্রেণী ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। শ্রমিকরা সংখ্যায় যেমন বেড়ে গেল, তেমনি সামাজিক মর্যাদায়ও গুণগত পরিবর্তন এল।
সব দেশে শিল্প বিপ্লবের গোড়ায় শিল্প-সর্বহারার নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিল যথেষ্ট সংখ্যক নারী, কিশোর ও শিশু। তখন থেকেই বেকারবাহিনী মজুত থাকে। শোষণ নির্যাতনও বেড়ে যায়। ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুরু হবার পর অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় কারখানার শ্রমিক দেখা যায়। ব্রিটিশ শাসক সামন্তবাদী ব্যবস্থা বজায় রেখেই কিছু কিছু পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিকাশ ঘটায়। ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে সত্যিকারের কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার পর্ব নেই। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে বিচ্ছিন্ন বা কেন্দ্রীভূত কোনো উৎপাদন কেন্দ্র ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা শিল্প কার্যকলাপ শুরু করে। চিনি পরিশোধন, নীল উৎপাদন, তুলো থেকে সুতো তৈরি করার মতো কৃষিজাত শিল্পই ছিল প্রধান। তারও কিছুকাল পর ব্রিটিশ পুঁজিপতি ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রথম কারখানা স্থাপন করে। মেশিন ও পরিচালন কর্তৃপক্ষ আনা হতো ইংল্যান্ড থেকে। তাও কৃষিজাত শিল্প। চল্লিশের দশকে বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত কারখানার শুরু কলকাতাতেই। ১৮৫৪ সালে প্রথম চটকল কলকাতায় স্থাপিত হয়। তার মালিক ব্রিটিশ। বোম্বাইয়ে প্রথম সুতাকল স্থাপিত হয়, তার মালিক ছিল ভারতীয়। পরের দশকে কানপুরে ব্রিটিশ মালিকানাধীন সুতাকল ও ১৮৫৯ সালে প্রথম ভারতীয় সুতাকল আমেদাবাদে স্থাপিত হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা ভারতের খনিশিল্পে বিরাট বিনিয়োগ করে। মধ্যযুগীয় শোষণ চাপানো হয় ভারতের শ্রমিকদের ওপর। ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকেই ভারতের শিল্প সর্বহারার প্রথম জন্ম। বেশির ভাগই সুতাকল ও চটকল শ্রমিক। তাও মূলতঃ বোম্বাই ও কলকাতায়। ঔপনিবেশিক, আধা-ঔপনিবেশিক ও অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ দেশগুলিতে শ্রম আইন বলেও কিছু ছিল না। বিদেশী পুঁজিপতিরা স্থানীয় ঠিকেদারদের নিয়োগ করতো যারা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিত। ঠিকেদাররা সব অর্থ আত্মসাৎ করে শ্রমিকদের যে শুধু সামান্য একটা মজুরি দিত তাই নয়, বেত মারা, লাঠি দিয়ে পেটানো এবং লোহার রড দিয়ে মারা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
কঠিন আর্থিক অবস্থা ও অবমাননাকর সামাজিক অবস্থা সদ্যোজাত শ্রমিকশ্রেণীকে পুঁজিবাদী শোষকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পথে নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকরা আরেকটু ভালো অবস্থা পেতে চায়। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ও পরিকল্পিত কোনো সংগ্রাম কোথাও ছিল না। তা ছিল বিচ্ছিন্ন, স্থানীয় এবং কখনও কখনও সে জন্য হিংসাত্মক, অনেক সময় মেশিনপত্রও শ্রমিকরা ভেঙে দিত।
প্রথম ইংল্যান্ডে এবং পরে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের অন্যানা দেশে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিকরা নানা সময়ে ধর্মঘট সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। কাজে আসার বিলম্বের কারণে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরির দ্বিগুণ কাটা হতো। কাজের দিন পনের-ষোল ঘণ্টার। ঊনবিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকে শ্রমিক ধর্মঘটের একটা প্রধান স্লোগান ছিল ১০ ঘন্টার কাজ, উন্নত মজুরি, মধ্যযুগীয় বর্বরতার আইনগুলির বিলোপ ইত্যাদি। ধর্মঘটের সময় শ্রেণী-সংহতি নানাভাবে দেখা যেত। তাতে ধর্মঘটীদের সাহস ও জেদ বেড়ে যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা পুঁজিপতিদের নতি স্বীকারে বাধ্য করতে সক্ষম হন। অর্থনৈতিক এই সংগ্রামগুলির সঙ্গে সাধারণ রাজনৈতিক সংগ্রামের দ্রুত সংযোগ ঘটে। পেটি-বুর্জোয়ার মাঝখান থেকে শ্রমিকশ্রেণীর তখন উদ্ভব সবে শুরু হয়েছে। শিল্পের অগ্রগতির পক্ষে বুর্জোয়াদের একাংশের বাধার বিরুদ্ধে, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ে বুর্জোয়াদের নির্ভর করতে হয়েছে জনগণের ওপর। তারা সাহায্যের জন্য শ্রমিকদের কাছে আবেদন করেছে এবং সফলও হয়েছে। এইভাবে তারাও শ্রমিকদের রাজনৈতিক সংগ্রামে জড়িত করে।
উদীয়মান সর্বহারার শ্রেণীসংগ্রাম যে সময় ব্যাপক হচ্ছিল এবং সাধারণ স্বার্থ সম্পর্কে শ্রমিকশ্রেণীর চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, সে সময় প্রথম শ্রমিক সংগঠনের জন্ম হয় যার নাম ট্রেড ইউনিয়ন। অত্যাচার, দারিদ্র ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে শ্রমিকরা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাঁরা সংগঠন গড়তে শুরু করেন মজুরি বৃদ্ধি ও অন্যান্য আর্থিক দাবির জন্য। শ্রমিক আন্দোলন বিকাশে ট্রেড ইউনিয়নের জন্ম এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রাম কঠোর শ্রমিক-বিরোধী আইনগুলি শিথিল করতে সক্ষম হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা সংগঠন গড়ার অধিকার অর্জন করেন। অবশ্য মাঝে মাঝে দীর্ঘ সময়ের জন্য বেআইনী অবস্থায় ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে কাজ করতে হয়েছে। গোপন অবস্থার মধ্যে কাজ করেও ট্রেড ইউনিয়নগুলি প্রকাশ্য ও গোপন পদ্ধতিতে সংগঠিত আন্দোলনগুলিকে যুক্ত করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং শ্রমিক সংহতিও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সর্বহারার আন্দোলনে এক বিরাট পদক্ষেপ হলেও শ্রমিকশ্রেণীর চূড়ান্ত লক্ষ্যকে আলোকিত করার মতো কোনো তত্ত্ব ছিল না। বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিজয়ের অনেক আগেই পুঁজিবাদী শোষণের সময় থেকেই শোষিত নিপীড়িত মানুষের কাছে নিখুঁত সমাজের কল্পিত আকাঙ্ক্ষা সম্বলিত সামাজিক ধ্যানধারণা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর থেকেই ধীরে ধীরে থমাস মোর-এর (১৪৭৮-১৫৩৫) কাল্পনিক সমাজবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লব কাল্পনিক সমাজবাদের তত্ত্বের বিকাশের রাস্তা প্রশস্ত করে দেয়। বিতর্কের মধ্যে সমাজবাদী ধ্যানধারণা উন্নত হয়। সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের মঞ্চে সর্বহারার আবির্ভাব সমাজবাদী ধারণায় নতুন প্রাণসঞ্চার করে। ১৮৪০ সাল এক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। সমাজবাদী ধ্যান-ধারণার বিভিন্ন ধারায় পুঁজিবাদী শাসন শোষণের বিরুদ্ধে জনগণের সামনে এক আদর্শ সুখী সমাজ কায়েম করার স্বপ্ন তুলে ধরা হয়। কিন্তু শ্রেণীসংগ্রাম, বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি তাতে উপেক্ষিত হয়। অথচ সে সব মহান কাল্পনিকদের সমাজবাদে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের বীজ নিহিত ছিল।
জার্মান শ্রমিকদের এবং প্রবাসী জার্মানদের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে প্যারিসে ১৮৩২ সালে এবং তা ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এটা বেআইনী ঘোষিত হলে গোপনে সংগঠন তৈরি হয়। এখান থেকে নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে গঠিত হয় 'লীগ অব দি জাস্ট'। এখান থেকে ১৮৩৬ সালে প্যারিসে গঠিত হয় কমিউনিস্ট লীগ, তবে পৃথক নামে।
১৮৩০-এর দশকে ইউরোপ জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের বন্যা বয়ে যায়। এর মধ্যে স্মরণীয় ব্রিটেনে চার্টিস্ট আন্দোলন। এই প্রথম শ্রমিকশ্রেণী বুর্জোয়াদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অধিকার আদায় করে। ১০ ঘন্টা কাজের দিন বেঁধে দিয়ে আইন প্রণীত হয়। ১৮৪০ সালে শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম গণরাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল চার্টার অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠে। চার্টিস্ট আন্দোলনকে লেনিন মার্কসবাদের প্রস্তুতি বলে বর্ণনা করেছেন। তিরিশের দশক থেকে চল্লিশের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এসব বিপ্লবী আন্দোলন হলো মার্কসবাদ তথা বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের ভিত্তিভূমি।
লীগ অব জাস্টের কাজকর্ম প্রসারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে মার্কস-এঙ্গেলসকে তাতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৮৪৭ সালে এই আমন্ত্রণ তাঁরা গ্রহণ করেন। এ বছরেরই জুনে লীগের কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে। মার্কস-এঙ্গেলস তাতে উপস্থিত ছিলেন। মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক আবির্ভাবের প্রক্রিয়া তাতে ত্বরান্বিত হয়। কংগ্রেসে খসড়া কর্মসূচী নিয়ে আলোচনা হয়। আগে লীগ অব দি জাস্টের স্লোগান ছিল-'সকল মানুষ ভাই ভাই।' কংগ্রেসে নতুন স্লোগান তৈরি হলো 'সকল দেশের শ্রমজীবী মানুষ এক হও'। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের এটাই হয়ে দাঁড়ালো শাশ্বত আহ্বান। প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন কমিউনিস্ট লীগের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পৃক্তিসাধন হয়। লীগের তাত্ত্বিক পতাকায় খোদাই হলো বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ।
১৮৩০ দশকের বিপ্লবী আন্দোলন চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনে ব্যার্থ হলে ইউরোপে চল্লিশের দশকের শেষে আবার বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি গড়ে উঠতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে মার্কস-এঙ্গেলস লীগের কমিউন গঠন করেন, এগুলি গোপনে কাজ করতো এবং আইনী শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। কমিউনিস্ট লীগের মার্কসবাদী কর্মসূচী তিনটি পর্যায়ে তৈরি হয়। শেষ পর্যায়ে ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৮৪৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে মার্কস-এঙ্গেলস রচনা করেন 'কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার'। সেই থেকে মানবজাতির বিকাশে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের তত্ত্ব অবিচ্ছেদ্য হয়ে রয়েছে। শ্রমিকশ্রেণীর সামনে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে অমোঘ বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক হাতিয়ার হলো কমিউনিস্ট ইশতেহার।
শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৪৮-১৮৪৯ সালের ইউরোপীয় বিপ্লব এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৮ মাসের এই বিপ্লব মার্কসবাদেরও প্রথম ঐতিহাসিক পরীক্ষা, এর অভিজ্ঞতায় মার্কসবাদের আরো বিকাশের প্রয়োজন দেখা দিল। আশার শীর্ষে সবাই আরোহণ করেছিলেন বটে, কিন্তু বিপ্লব ধ্বংস হয়ে গেল। সেজন্য বিপ্লবী আন্দোলনের সাফল্যের নিশ্চয়তা পেল সর্বপ্রধান অগ্রাধিকার। মার্কসের ভাষায় 'বিপ্লব হলো ইতিহাসের ইঞ্জিন'। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী অনুপ্রেরণা ও প্রত্যয় অনেকগুণ বেড়ে গেল।
ইউরোপীয় বিপ্লবের পরাজয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিক্রিয়ার কর্তৃত্ব বাড়িয়ে তোলে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাও দ্রুত অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরনো ব্যবস্থাকে আঘাতের পর আঘাত করে। ১৮৪০-এর দশকে গ্রেট ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব পূর্ণতা অর্জন করে, ইউরোপের অন্যত্র পঞ্চাশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাটের দশকে সবে শিল্প-বিপ্লবের স্রোতে বিরাট বিরাট অগ্রগতি ঘটছে মাত্র। পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটেছে আরও অনেক পরে। শ্রমিক আন্দোলন ও সাধারণ গণ-আন্দোলন পঞ্চাশের দশকে বৃদ্ধি পায় ও পরাজয়ের গ্লানি মুছে শ্রমিকশ্রেণী আবার উঠে দাঁড়াতে শুরু করে। পুঁজিবাদের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকট দেখা দেয় ১৮৫৭-৫৯ সালে। তাতে সর্বহারার শ্রেণীচেতনা আরও শাণিত হয়। দেশে শ্রমিক সংহতিও বাড়ে।
স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থাৎ সর্বস্তরে পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামে সংহতিকে ব্যাপকতর করার প্রয়াস চলে ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকের গোড়ায়। এই অবস্থায় ১৮৬৪ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর লন্ডনের সেন্ট মার্টিন হলে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং মেনস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জার্মান শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মার্কস উপস্থিত ছিলেন। এই সংস্হার দলিল মার্কসের লিখিত এবং সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। সেজন্য গোড়া থেকে তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক দিক থেকে এই সংগঠনের সর্বহারার শ্রেণীচরিত্র বজায় থাকে। আন্তর্জাতিকে এটাই বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের প্রথম বিজয়। মার্কসই এর প্রকৃত নেতা হয়ে ওঠেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের গঠনের পর থেকে সর্বত্র এর বিরাট প্রভাব পড়ে ও এরই অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন দেশে সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৮৬৬ সালে জেনেভা কংগ্রেসে পরবর্তী দশকগুলিতে সর্বহারার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের বিস্তৃত কর্মসূচী গৃহীত হয়। তার মধ্যে দিনে আট ঘণ্টা কাজের দাবি অন্যতম। ১৮৭০ সালের মধ্যে দশটি দেশে প্রথম আন্তর্জাতিকের সংগঠন গড়ে ওঠে। কোথাও গোপনে, কোথাও আধা-গোপনে, কোথাও বা প্রকাশ্যে তাদের কাজ করতে হয়। সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ এর প্রধান আদর্শ। ১৮৬৯ সালে মার্কসবাদের ভিত্তিতে প্রথম রাজনৈতিক দল জার্মানিতে তৈরি হয়। ১৮৬৭ সালে মার্কসের 'ক্যাপিটাল' বইয়ের প্রথম খণ্ডে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সমস্ত বৈশিষ্ট্যের যেমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, তেমনি তাতে সর্বহারার বিপ্লবের অবশ্যম্ভাবিতা ও অনিবার্যতার বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মেলে।
কমিউনিস্ট ইশতেহার প্রকাশিত হবার পর থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত-সবদিক থেকে অগ্রসর হয়। যেখানে এই তিনধারা সার্বিকভাবে যুক্ত হতে পেরেছে, সেখানে শ্রমিক আন্দোলন বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে এবং তার কার্যকরী অগ্রগতি হয়। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দুনিয়ার মধ্যে অনগ্রসর অঞ্চল ও দেশকে উপনিবেশ করার ঝোঁকও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পুঁজিপতি শ্রেণী মুনাফার মেদস্ফীতিতে আরও সমৃদ্ধ হয়। ১৮৭০-৯০ দশকের মধ্যে পৃথিবীর শিল্পোৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। শিল্পোৎপাদনের ধরনেরও বিরাট পরিবর্তন ঘটে। শ্রমিকশ্রেণীও আরও বেশি জঙ্গী, আরও বেশি সংগঠিত ও এবং শ্রেণী-চেতনার দিক থেকে আরো বেশি উন্নত হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহান প্রলেতারীয় আন্দোলনের অসাধারণ দৃষ্টান্ত এবং মানব ইতিহাসে প্রথম সর্বহারার বিপ্লব সংঘটিত হলো- প্যারী কমিউন। ১৮৭১ সালে ঐক্যবদ্ধ, জঙ্গী প্যারিসের শ্রমিকশ্রেণী তা সংগঠিত করে। শ্রমিকশ্রেণী এই প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করে। প্যারী কমিউন নানা দুর্বলতার জন্য বেশিদিন টিকে থাকতে পারে নি। প্রধান কারণ হলো, তখনও ফ্রান্সে ও সারা পৃথিবীতে পুঁজিবাদী বিকাশ তার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে না পারায় শ্রমিকশ্রেণী তার পেটি-বুর্জোয়া ধ্যানধারণা সম্পূর্ণ কাটাতে পারে নি। এ জন্যে সাংগঠনিক ও মতাদর্শগত অনেক দুর্বলতা থেকে যায়। ফলে এই দুর্বলতা ব্যবহার করে অপ্রস্তুত শ্রমিকদের ওপর নৃশংস বর্বরতা চালিয়ে বুর্জোয়ারা পুনরায় ক্ষমতা কেড়ে নিতে সমর্থ হয়। প্যারী কমিউন ব্যর্থ হলেও তা ইতিহাসের গতিপথের তাৎপর্যপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্যারী কমিউন সর্বহারার বিপ্লবী তত্ত্ব মার্কসবাদের আরও বিকাশে অসীম তাৎপর্যবাহী শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়। মার্কস এঙ্গেলসের পরবর্তী সব রচনায় এটাই প্রাধান্য পায়। প্যারী কমিউনের ব্যর্থতার পর কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল সর্বত্র আক্রান্ত হয়। প্রথম আন্তর্জাতিকের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত আক্রমণও শুরু হয় ভেতর থেকে। প্যারী কমিউনের পর ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন যে পর্যায়ে উন্নীত হয়, তাতে প্রথম আন্তর্জাতিকের গুরুত্বও নতুন পরিস্থিতিতে কমে আসে। প্যারী কমিউনের শিক্ষায় নতুন ধরনের সংগঠন, বিশেষত সর্বহারার গণ-রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা বেশি করে দেখা দেয়।
ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রেণীসংগ্রামের পাঠশালা। বিশ্বব্যাপী ট্রেড ইউনিয়নের পতাকায় শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তা শক্তিশালী। ১৮৮৬ সালের মে মাসের মার্কিন শ্রমিকদের বীরত্ব পৃথিবীর ইতিহাসে খোদাই হয়ে রয়েছে। আট ঘণ্টা কাজের দিন করার দাবিতে গোটা আমেরিকা উত্তাল। শিকাগো তার কেন্দ্র। ১লা মে পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক ধর্মঘট করে এই দাবিতে পথে পথে মিছিল করেন। আরও দু দিন তা চলে। ৩ মে পুলিস এক তুচ্ছ অজুহাত তুলে শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে দু জন নিহত ও ৫০ জন আহত হন। পরদিনই চিকাগোর প্রাণকেন্দ্র হে মার্কেটে এর প্রতিবাদে বিরাট সমাবেশে শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রক্তের বন্যায় পুলিস এই হে মার্কেট ভাসিয়ে দেয়। দেশজুড়ে ধর্মঘটীদের ওপর নির্মম অত্যাচার নেমে এল। নামকে ওয়াস্তে বিচার করে সরকার সাতজন শ্রমিক নেতার ফাঁসির হুকুম দেয় এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। পৃথিবীজুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-সমাবেশ ও শ্রমিক-সংহতি ঘোষিত হয়। তখন থেকেই শিকাগোর ঘটনার স্মরণে পৃথিবীর সর্বত্র শ্রমিকশ্রেণী আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস পালন করে আসছে।
প্রথম আন্তর্জাতিক দেশে দেশে সর্বহারার রাজনৈতিক দল গঠনের পথ খুলে দেয়। প্যারী কমিউনের পর তা সর্বত্র কার্যকর হতে থাকে। ১৮৮০ দশকের শেষে সর্বহারার নতুন এক আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু তাতে দুটি ধারা দেখা যায়। মার্কসবাদী ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীরা একদিকে, অন্যদিকে সংস্কারপন্থীরা। উভয় পক্ষ একই সময়ে প্যারিসে শ্রমিক কংগ্রেসের ডাক দেয়। এঙ্গেলসের প্রচেষ্টায় শ্রমজীবী জনগণের আন্তর্জাতিক সোস্যালিস্ট কংগ্রেস শুরু হয় ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই প্যারিসে। আগেকার কংগ্রেস অধিবেশনের তুলনায় এতে উপস্থিতি সর্বাধিক। প্রতিনিধিরা বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের অনুগামী। পরে এই কংগ্রেসই দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক নামে খ্যাত হয়। প্রতিনিধিদের তুমুল করতালি ধ্বনির মধ্যে এই কংগ্রেস থেকে ঘোষিত হয় যে, ১৮৮৬ সালে শিকাগোর শ্রমিকদের বীরত্বপূর্ণ, দুর্ভাগ্য পীড়িত কাজের স্মরণে পৃথিবীর সব দেশে একই সঙ্গে ১লা মে, ১৮৯০ পালিত হবে। ঐদিন ইউরোপের প্রত্যেকটি শহরে মে-দিবস উদযাপনে হাজার হাজার শ্রমিক যোগ দেন। শ্রমিক-আন্দোলনের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। ১লা মে পরিগণিত হয় শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস মে দিবসে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্ব থেকে বিশ্বের সামাজিক বিকাশে গুণগতভাবে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃশ্য দেখা দেয়। পুঁজিবাদ তার বিকাশের সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে মার্কস-এঙ্গেলসের গবেষণার ভিত্তিতে লেনিন এই নতুন দিক চিহ্নিত করেন এবং পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদে উত্তরণ করছে বলে উল্লেখ করেন। এই যুগকে তিনি পুঁজিবাদের পতনের ও সর্বহারা বিপ্লবের বিজয়ের যুগ ফলেও উল্লেখ করেন। লেনিন নতুন যুগে সর্বহারা বিপ্লবের নীতিকৌশলও হাজির করেন আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের সামনে। ১৮৭১ সালের প্যারী কমিউন থেকে ১৯০৫ সালে রুশ বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব পর্যন্ত লেনিন এই নতুন অধ্যায়ের বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা করেন।
বিংশ শতাব্দী শুরু হয় পুঁজিবাদী সংকট ও সাম্রাজ্যবাদীদের ঔপনিবেশিক বাজার দখলের অন্তরদন্দের মধ্য দিয়ে। এর পরিণামে বাধে বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৭)। লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণী কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সংগঠিত হয়ে দ্রুতলয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ কয়েকটি বছর থেকে এগিয়ে চলেন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সফল হয় মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। ভূমিষ্ঠ হয় নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও প্রতি-বিপ্লবী শক্তির প্রতিরোধ চূর্ণ করে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্হা প্রচন্ড শক্তিতে এগিয়ে যায়।
এরই মধ্যে পুঁজিবাদী জগতের সর্ববৃহৎ আর্থিক সংকট দেখা দেয় ১৯২৮-৩০ সালে। ইতালি, জার্মানি ও বিভিন্ন দেশে এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিশক্তির উদ্ভব হয়। তারা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধংস করতে উদ্যত। উপনিবেশ দখলের লড়াইয়ে সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বও চরমে ওঠে। এরই ফলে বাধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৪)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদী নেতৃত্ব শ্রমিক আন্দোলনে বিভেদ সৃষ্টি করে উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে চলে যায় এবং স্ব-স্ব দেশের যুদ্ধরত শাসকশ্রেণীকে সমর্থন করে। এর মধ্য দিয়ে পতন ঘটে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের। লেনিন নতুন পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৯ সালে গঠন করেন তৃতীয় আন্তর্জাতিক। শ্রমিক আন্দোলন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিধর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ওপর জোর দেয়। একেক দেশে একেক রকম পরিস্থিতি। একটা আন্তর্জাতিক কেন্দ্র থেকে যুদ্ধের সময়ে নেতৃত্ব দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও আঘাত করে আন্তর্জাতিককে। যুদ্ধ যখন শীর্ষ পর্যায়ে, তখন তৃতীয় আন্তর্জাতিক আর সচল থাকেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিকতাবাদ তখন নব-পর্যায়ে উন্নীত। ভারতের শ্রমিকশ্রেণীও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং সোভিয়েত শ্রমিকশ্রেণীর সংহতিতে লড়াইয়ে অবতীর্ণ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পরাজয় ঘটে এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন জয়ী হয়। যুদ্ধে বিরাট ক্ষয়ক্ষতি হয় সোভিয়েত ইউনিয়নেয়। কিন্তু দ্রুত পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে সমাজবাদ এগিয়ে যায়। ১৪টি দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঔপনিবেশিক কবল থেকে অনেক, দেশ মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। সমাজবাদ অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রার পথে আজ এগিয়ে চলেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের প্রধান পান্ডা হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে তখনই তারা আটকে রাখতে চেয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হবার পরদিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজবাদকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীরা কাজ শুরু করে দেয়। যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, দেশে দেশে সেই উদ্দেশ্যে তারা জাল বিস্তার করে, ঘাঁটি নির্মাণ করতে থাকে। আজ পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি। পৃথিবীতে যা পারমাণবিক অস্ত্র মজুত আছে, তাতে পৃথিবী নামক গ্রহটির মতো পঞ্চাশটি গ্রহ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া যায়। পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষিদ্ধ করা, পৃথিবীতে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাত না করার প্রতিশ্রুতি সোভিয়েত ইউনিয়ন একতরফাভাবেই দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এই প্রতিশ্রুতি দিতে নারাজ। সোভিয়েতের সমস্ত শান্তি প্রস্তাব নানা ভণ্ডামিতে ভন্ডুল করছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।
যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকশ্রেণী মে দিবসের ইতিহাসের জনক, মে দিবসের শতবর্ষে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব জনমতকে পদদলিত করে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ প্রস্তুতিতে লিপ্ত। এর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও সারা পৃথিবীর জনগণ পৃথিবীর ইতিহাসে অভূতপূর্ব সফল শান্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ। মে দিবসের শতবর্ষে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির পতাকা উড্ডীন করে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ প্রস্তুতির বিরুদ্ধে সর্বত্র ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোই শ্রমিকশ্রেণীর সামনে প্রধান কর্তব্য হিসেবে দেখা দিয়েছে।
লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় মে দিবসের শতবার্ষিকীর প্রাক্বালে ১৯৮৬ সালের ‘মার্কসবাদী পথ’ (৫ম বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা) পত্রিকায়।
প্রকাশের তারিখ: ০১-মে-২০২৬ |