ফিরে দেখা: মহান অক্টোবর বিপ্লব

আইজাজ আহমেদ

অক্টোবর বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ পূর্ব দিকে সরে যেতে থাকে এবং আরও সাধারণ ভাবে বলতে গেলে এটা সেই সব জায়গায় আরও ঘনীভূত হয়, যেখানে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলছিল। সাম্যবাদ (কমিউনিজম) ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার আন্তঃসম্পর্ককেই মহান অক্টোবর বিপ্লবের ঐতিহ্য হিসেবে আজও ফিরে দেখা যেতে পারে। 

(এই নিবন্ধ, অক্টোবর বিপ্লবের পরে কী ঘটেছিল তার বর্ণনা দেওয়ার জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিপ্লবটির তাৎপর্য, ঠিক কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই বিপ্লবটি সম্পন্ন হয়েছিল, কীরকম রাষ্ট্র ও সমাজ এই বিপ্লব গড়ে তুলেছিল এবং সর্বোপরি এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে লেনিনের যাত্রাটি ঠিক কীরকম তার কিছু অংশই এই নিবন্ধে রইল। নিবন্ধে সব তারিখ বিপ্লবের আগে অব্দি রাশিয়ায় ব্যবহৃত জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার, চলতি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের থেকে ১৩ দিন পিছিয়ে। যেমন, ১৯১৭-র রুশ বিপ্লবের বার্তা বহনকারী সেদেশের শ্রমজীবী নারীদের মিছিল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৮ ই মার্চ হয়েছিল; কিন্তু, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী সেটি হয় ২৩ শে ফেব্রুয়ারি। তাই ফেব্রুয়ারি বিপ্লব হিসেবেই এর নামকরণ)। 

১৯১৭ সালের মহান অক্টোবর বিপ্লব কেবল রাশিয়ার বিপ্লব নয়, বরং সমগ্র মানব ইতিহাসের এক জলবিভাজিকা। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপ জুড়ে বিপ্লবের যে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, তা উপনীত হয় এই রুশ বিপ্লবে। এই বিপ্লব কেবল পুঁজির শাসনকেই শেষ করেনি, বরং তা সামগ্রিক ভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ, এবং সেই পথ ধরেই শ্রেণি বিভক্ত সমাজের বিলোপসাধনে এক মহান অবদান রেখেছিলো। ১৯১৭ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে তাঁর বেশ কিছু লেখায়, লেনিন রাষ্ট্রের অবলুপ্তির কথাও লিখে ফেলেছিলেন (মূলত সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের বিলোপসাধন। তাঁর মতে এই কাজগুলি দেশের মানুষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি ভেবে রেখেছিলেন)। মানব ইতিহাসের সব বিপ্লবগুলির মধ্যে এটির প্রভাবই আজও সব থেকে সুদূরপ্রসারী। 

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে চলা জারতন্ত্রের পতনের পর বলশেভিক সহ রাশিয়ার বেশিরভাগ বামপন্থী দলগুলি সেদেশে পশ্চিম ইউরোপের ধাঁচের গণতন্ত্রকেই স্থাপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্যদিকে, লেনিন, শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরর পথে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন, যা ইউরোপের ভবিষ্যৎ বিপ্লবগুলির সূচনাপর্ব হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও, রাশিয়াকে সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের দুর্বলতম গ্রন্থি ভেবে, সেই দুর্বলতম গ্রন্থিতে আঘাত করা, এবং সেই গ্রন্থি আলগা হলে গোটা শৃঙ্খলটিই ভেঙে পড়ার ধারণাটি প্রকৃতপক্ষে লেনিনের কৌশলগত ধারণার স্বচ্ছতাও প্রমাণ করে। তাই এই বিপ্লবের প্রভাব কেবল রাশিয়া বা ইউরোপের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না, বরং সারা বিশ্ব জুড়ে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল রুশ বিপ্লব। 


অক্টোবর ১৯১৮ 

দু’ধরণের মানব মুক্তির সংগ্রাম বিংশ শতকের ইতিহাসের বুনিয়াদ রচনা করেছিল: এক, পুঁজিবাদ অতিক্রম করে সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গঠনের সংগ্রাম; দুই, পুঁজিবাদের ফলে উদ্ভুত বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক এখান থেকেই বোঝা যায়, যখন আমরা দেখি, ১৯১৪ সালে উপনিবেশবাদী শক্তিগুলি, তৎকালীন উপনিবেশ এবং পূর্বে তৈরি হওয়া উপনিবেশগুলি (যেমন, আমেরিকা) নিয়ে বিশ্বের ৮৫ শতাংশ জায়গা তাদের দখলে রেখেছে। বলশেভিক প্রকল্প কেবল রাশিয়াকে বদলের উদ্দেশ্যে নয়; বরং, এই দুই শক্তি, যথা পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদের ধ্বংসের লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছিল। 

রাশিয়া নিজে কেবল একটি জার শাসিত দেশই ছিল না, একটি বৃহৎ উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যও বটে। যদিও, ব্রিটেন, বা ফ্রান্সের মত রাশিয়া, তার সীমান্ত থেকে দূরবর্তী দেশগুলি দখলের মত শক্তি অর্জন করেনি। মূলত, তুর্কি ভাষী মুসলিম প্রধান অঞ্চল, যেগুলি রাশিয়া বিপ্লবের সাম্প্রতিক অতীতেই দখল করেছিল। এছাড়াও, ইউরোপ এবং এশিয়ার যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, তা রুশ ভৌগলিক সীমান্ত লাগোয়াই ছিল। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে উপনিবেশবাদী শক্তিগুলির অবসানের সূচনা ব্রিটেন বা ফ্রান্সের উপনিবেশগুলি থেকে হয়নি। তা শুরু হয়েছিল এই বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারাই, যা জার শাসিত বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে মুক্তি দিয়ে ‘ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক’-এর অধীনে একাধিক বহুজাতিক, স্বায়ত্ত্বশাসিত, স্বাধীন সাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেছিল। বিশ্ব ইতিহাসে রাশিয়ার অধীনে থাকা অঞ্চলগুলিই বিশ্বের প্রথম উপনিবেশ, যেগুলি ঔপনিবেশিক আধিপত্য থেকে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক মুক্তির পথে যাত্রা করেছিল। এটাও মনে রাখা দরকার যে, লেনিনের উপনিবেশ ও জাতি সংক্রান্ত প্রশ্নগুলি এই রুশ উপনিবেশগুলির ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে অন্যান্য জায়গার পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সংযোজিত ও সংবর্ধিত হয়। রুশ বিপ্লবের এই বিশেষ ঐতিহ্য, বলশভিক ও সেই ধারার কমিউনিস্টদের ধন্যবাদ, যাঁরা শ্রেণি এবং সাম্রাজ্যের আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরে, উপনিবেশবাদ বিরোধী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদ ও সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ট্রাইকন্টিনেন্ট (‘তৃতীয় বিশ্ব’-র পরিবর্তে এই শব্দবন্ধটিকেই আমি উপযুক্ত মনে করি এবং আধুনিক পরিভাষায় একে ‘গ্লোবাল সাউথ’-ও বলা হচ্ছে)-এর মধ্যে বলশেভিক বিপ্লবের এই দিকটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। 

কৃষকরাই লিখল তাদের নিজেদের ইতিহাস 

বলশেভিক বিপ্লব হলো ইতিহাসের সেই বিপ্লব যার মাধ্যমে কৃষকরা, তাঁদের নিজেদের ইতিহাস নির্মাণকারী হিসেবে উঠে আসে। কৃষক বিক্ষোভ, বিদ্রোহ ফরাসি বিপ্লবের সময়ে দেখা গেলেও, তাঁরা কখনোই শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও প্যারিসের প্রলেতারিয়েতদের ওপরে উঠে বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পুরনো শাসনব্যবস্থার পতন ও বিপুল সংখ্যক সামন্তপ্রভুদের ব্যক্তিগত জমির মালিকানার অবসান বহু কৃষকের সুবিধা করেছিল বটে, কিন্তু তাঁদের স্বাধীন উদ্ভাবন বা উদ্যোগগুলিকে অনেকক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে দমনও করা হয়েছিল। অন্যদিকে, বলশেভিক বিপ্লবে, এমনকি তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভাবনাটি একটি বিশেষ উল্লেখের অবদান রাখে। বিপ্লবের বাস্তবায়নের সময় বহু সংখ্যক কৃষক (লেনিনের ভাষায় ‘পেজেন্টস ইন ইউনিফর্ম’ বা উর্দি পরিহিত কৃষক) বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, এবং শহর (মূলত সেন্ট পিটার্সবার্গ ও মস্কো)-এ থাকা শ্রমিক ও বিপ্লবী বুদ্ধিবৃত্তিকারদের সঙ্গে বিশাল গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা কৃষকদের মধ্যে সংযোগ সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই কৃষকেরাই। বলশেভিক বিপ্লবের পরে সব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, তা সে চীন বিপ্লব থেকে ভিয়েতনাম বা কিউবা থেকে গিনি বিসাউ ইত্যাদি আবর্তিত হয়েছে দুটি প্রশ্নকে ঘিরে, এক, জাতি/উপনিবেশ সংক্রান্ত প্রশ্ন ও দুই, কৃষকদের প্রশ্ন। 


ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় পেট্রোগ্রাদ 

রুশ বিপ্লব, মার্কসীয় চিন্তাধারার তাত্ত্বিক ভিত্তিতেও উদ্ভাবনী পরিবর্তন এনে দেয়। যতদিন অবধি মার্কসবাদী তত্ত্ব জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স সহ ইউরোপের অন্যান্য শিল্পশহরগুলিতে আটকে ছিল, ততদিন পর্যন্ত কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদেরই পুঁজিবাদের “কবর খননকারী” হিসেবে তুলে ধরা হত। যখনই সেই মার্কসীয় তত্ত্ব আধা শিল্পক্ষেত্র যুক্ত ও মূলত কৃষি প্রধান দেশ রাশিয়ায় ঢুকে পড়লো, তখনই কৃষকদের প্রশ্নটা নতুন ভাবে সমাধানের বিষয়ে ভাবনা শুরু হল। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক পরপরই বহু সংখ্যক কৃষক পরিবারের যুবদের সেনাবাহিনীতে যোগদান করিয়ে, যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। এর ফলে যে যুদ্ধে তাঁদের অংশগ্রহণের কথাই নয়, সেই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ, আদপে কৃষকদের পূর্ববর্তী ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়, এবং তাঁরা নিজ নিজ দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে যেতে থাকেন। এই ‘পেজেন্টস ইন ইউনফর্ম’-দের রাগকে সংগঠিত করে কি বিপ্লবের দিকে চালিত করা যায়? এই প্রশ্নই লেনিন তাঁর কমরেডদের করেন এবং রুশ বিপ্লবের স্লোগানের অন্যতম দুটি শব্দ হয়ে দাঁড়ায় ‘জমি’ ও ‘শান্তি’। মানব ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করা বলশেভিক বিপ্লবের অনন্যতা এখানেই যে, এটি মার্ক্সীয় তত্ত্বের গভীরতা ও প্রসারতা বাড়িয়েছিল। 

দুই রাশিয়া 

দুটি মহাদেশ জুড়ে ছড়ানো রাশিয়া একটি বিশাল দেশ। এর মূল শহর, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র, বেশিরভাগ শিল্পক্ষেত্র এবং বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণি ছিল ইউরোপে-যদিও সেটি ইউরোপের পূর্ব অংশে। অন্যদিকে, রাশিয়ার কৃষক সমাজ ও উপনিবেশগুলি ছিল এশিয়ায়। দুই অংশের জন্যই কার্যকর হবে, এমনই কৌশলগত ধারণার আশ্রয় নিতে হয়েছিল লেনিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের। এমনই বিবিধ বিষয়ের মধ্যে এই বিপ্লবের অনন্যতা লুকিয়ে আছে। ইউরোপীয় সমাজ-গণতন্ত্রের ইতিহাসে কখনোই উপনিবেশেগুলির স্বাধীনতা একটি সমাজতান্ত্রিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়নি, না কখনও কৃষকদের একটি বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে দেখা হয়েছে। একমাত্র আধা ইউরোপীয়, আধা এশীয় রাশিয়াতেই এই কাজটির দৃঢ় এবং বিশ্বাসযোগ্য উপস্থাপন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ, বিশেষত সমাজ-গণতন্ত্রীরা রাশিয়াকে আধা এশীয়, এশীয় এবং আরও নানা ভাবে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতেন। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগ সমাজ-গণতন্ত্রী, যাঁরা নিজেদের দেশে বিপ্লব করতে ব্যর্থ হন, জার্মানির বিপ্লবকে ব্যর্থ করার ঘটনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, এমনকি, কমিউনিস্ট বিরোধী ব্লকেরও অংশ হয়ে যান, তাঁরা এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছন যে, রাশিয়ার বিপ্লব প্রচেষ্টা নাকি ব্যর্থ, কারণ এটি ইউরোপীয় নয়, সেহেতু বিশেষ ‘অগ্রবর্তী’ও নয়। 

ইতিহাসের অন্যতম মোড় ঘোরানো ঘটনা এটি। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পরে, বিশেষত, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি ও হাঙ্গেরিতে ক্ষণিকের বিপ্লবী অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পরে, মার্ক্সীয় বিপ্লবের অনুশীলনের ভরকেন্দ্র ক্রমশ ইউরোপ থেকে ‘ট্রাইকন্টিনেন্ট’-এর দিকে সরে আসতে থাকে। সেই ইউরোপে জুড়ে নেমে আসে ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদে ঘোর অমানিশা। ১৯১৯ সালের ১৫ ই জানুয়ারি জার্মানির সমাজ-গণতন্ত্রী সরকারের ভাড়াটে ফ্যাসিবাদী গুন্ডাদের হাতে খুন হওয়া রোজা লুক্সেমবার্গের মৃত্যু সেরকমই ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও পশ্চিম ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিকাররা রাজনৈতিক অর্থনীতি, দর্শন, সাহিত্যতত্ত্ব থেকে একাধিক ক্ষেত্রে বহু মার্ক্সীয় তত্ত্বের আমদানি ঘটালেও, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটানোর অনুশীলনের বেলায় ঢুঢু! ইউরোপের সব সমাজ-গণতন্ত্রী সরকার, ন্যাটো (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন), ট্রাইল্যাটারাল কমিশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই অবস্থান নেয়। 

অতীতের প্রতিশ্রুতি 

একদম নতুন এক উদ্ভাবন, নতুন যুগের শুরু হিসেবে অক্টোবর বিপ্লবকে দেখা যায়। আবার, এটাকে এমন এক মুহূর্ত হিসাবেও দেখা যেতে পারে, যখন অতীতের নানা প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। মার্কস ও লেনিন বিপ্লবের গৌরবোজ্জ্বল অতীত সম্পর্কে যথেষ্ট ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী, ৫ লক্ষ সদস্যের জ্যাকোবিন দলের পাশাপাশি, তুলনামূলক ভাবে ক্ষুদ্র, গ্রাচ্চুস বাবুফের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ‘দ্য কন্সপিরেসি অফ ইকুয়ালস’-এর মধ্যেও বামপন্থী ঝোঁক সম্পর্কে তাঁরা অবহিত ছিলেন। লেনিন নিজেই বলশেভিক বিপ্লবকে ১৮৭২ সালের প্যারি কমিউন, তারপরে রাশিয়ায় ১৯০৫ ও ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বিপ্লবকে একই চিন্তাধারার বাস্তবায়ন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ৪০ হাজারের বেশি কমিউনার্ডদের শাহাদাতের মাধ্যমে তৈরি হওয়া মানবমুক্তির সেই কমিউনকে লেনিন তাঁর আদর্শ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এমনকি, কমিউনের কাজের ধরণকে তিনি বিপ্লবোত্তর সমাজে বাস্তবায়নের কথাও ভেবেছিলেন, যা কিনা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের থেকেও বেশি গণতান্ত্রিক। ফরাসি রাজনীতি, জার্মান দর্শন ও রুশ সাহিত্যের মৌল ধারণাগুলির সুযোগ্য উত্তরাধিকার বুকে নিইয়ে জন্মানো এক রুশ বুদ্ধিবৃত্তিকার আলেকজান্ডার হার্জেন, সেদেশে দাসপ্রথা বিলোপের বহু আগে, ১৮৫০ সালেই বলে দিয়েছিলেন, “রাশিয়ার ভবিষ্যৎ তার কৃষকরা”। সেই একই সময়ে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়, দাসপ্রথার সুবিধাভোগী সামন্তপ্রভুদের মনে, নিজেদের আধিপত্য সম্পর্কে কাঁপন ধরিয়েছিল। তখনই ওই ব্যবস্থার সংস্কার, আধুনিকীকরণ, শিল্পায়ন সহ একাধিক ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপকে অনুকরণ করার চেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৮৬১ সালে দাসপ্রথার বিলোপ সেই সংস্কারেরই একটি অংশ। যদিও, এই দাসপ্রথা বিলোপের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। রাশিয়া জুড়ে অর্ধেকেরও বেশি জমি, বিশেষ করে উর্বর জমিগুলি, পুরনো যে জমিদার, সামন্ত, ভূস্বামীরা নিজেদের দখলে রেখেছিল, সেই জমিগুলি তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে উঠলো। বেশিরভাগ জমি, কৃষকদের হাতে নয়, গেল তৎকালীন এক ধরণের কমিউন (রুশ ভাষায় ‘মির’)-এর হাতে। মাত্র ১৫ শতাংশ জমি, দেশের ৪০ শতাংশ মুক্ত দাসদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হল। এর ফলে ওই জমির ভাগের পরিমাণ এতই ছোট হয়ে দাঁড়ালো যে, সেই জমিতে চাষ করে পরিবারের অন্ন সংস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠলো। শুধু তাইই নয়, এর জন্য ওই মুক্ত ভূমিদাসদের পরের ৪৯ বছরের বেশি সময় ধরে কিস্তি প্রদান করতে হত (এই কিস্তি ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর তুলে নেওয়া হয়েছিল)। এর ওপর, এই কৃষক পরিবারের সন্তানরাই রুশ সাম্রাজ্যবাদী সৈন্যবাহিনীর মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯ শতকের শেষের দিকে রাশিয়ায় একটা বড় অংশের বুদ্ধিবৃত্তিকারদের সমাহার হয়েছিল; যদিও, তাঁদের মধ্যে খুব কম জনই শহরের শ্রমিকদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছিল। এঁদের বলা হত ‘নারোদনিকি’ (রুশ ভাষায় ‘নারোদ’ শব্দের অর্থ জনগণ)। এঁরা বহু ভাগে বিভক্ত ছিলেন, এবং বেশিরভাগ অংশই নৈরাজ্যবাদ ও বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। যে জার দাসপ্রথার বিলোপ ঘটিয়ে নিজের নাম কিনতে চেয়েছিলেন, তাঁকেই এরকম এক বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদের ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় (উনিশ শতকের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদীরা এই ঘটনাকে ‘প্রোপাগান্ডা অফ দ্য ডিড’ বলে অভিহিত করতেন)। জর্জি প্লেখানভ, যিনি পরে বিখ্যাত হয়ে উঠবেন, এরকমই এক বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী, ভেরা জাসুলিচ (উনি নিজের সৌন্দর্যের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন)-এর সঙ্গে মিলে ১৮৮২ সালে রাশিয়ায় প্রথম মার্কসবাদী চর্চাকেন্দ্র বা গ্রুপ গড়ে তোলেন। যদিও, একটি যথাযথ মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক দল, ‘রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টি’(RSDLP) ১৮৯৮ সালে তৈরি হয়, যা আবার বছর ৫ পর, ১৯০৩ সালে দুটি মূল ধারায় ভেঙে যায়। মেনশেভিক (সংখ্যালঘু) ও বলশেভিক (সংখ্যাগুরু)। এই নাম দুটি ঠিক হয় RSDLP-র লন্ডনে অনুষ্ঠিত ৫১ জন প্রতিনিধি সম্বলিত, দ্বিতীয় পার্টি সম্মেলনে, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে, যেখানে রুশ নেতা মার্তভের পক্ষের বেশ কয়েকজন অনুপস্থিত থাকায় লেনিনের পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়।    

 
অক্টোবর বিপ্লবের নেতাদের মাঝে লেনিন 

এমন মনে করার কোনও কারণ নেই যে, মার্কসকে রাশিয়ার বিপ্লবী বুদ্ধিবৃত্তিকাররা বা রাজনৈতিক কর্মীরা চিনতেন না। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে মার্ক্সের প্রত্যক্ষ যোগাযোগও ছিল। মার্ক্সের কাছে তাঁরা মূল যে প্রশ্ন রেখেছিলেন, তা হলঃ রাশিয়ার চিরাচরিত কমিউন ব্যবস্থা কি বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হতে পারে? এর উত্তরে মার্ক্স খানিক চিন্তায় পড়েন, এবং নিজেকে রুশ ইতিহাস ও অর্থনীতির পাঠে ডুবিয়ে দেন। ওই পড়ার ফাঁকেই তিনি এর উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন, যদিও তার পেছনে শর্ত ছিল। তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাদের পর্যায়গুলির মধ্য দিয়ে না গিয়ে সরাসরি সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব যদি, ইউরোপের প্রলেতারিয়েতরা রুশ বিপ্লবের সমর্থনে এগিয়ে আসেন। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। এক, বলশেভিক সহ বেশিরভাগ রুশ বামপন্থী মানুষজন, কেবল অর্থনীতির ক্ষেত্রেই নয়, বরং, রাজনৈতিক ভাবেও সংসদীয় উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্রের পথে উত্তরণ সম্ভব বলে মনে করতেন।  অক্টোবরের মাত্র কয়েক মাস আগে পর্যন্তও, সেই প্রশ্নে লেনিন সবসময়ই সংখ্যালঘুদের পক্ষে ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি বিপ্লবী দলের প্রধান কর্তব্য হলো প্রতিটি বুর্জোয়া সংকটকে বিপ্লবী সংকটে পরিণত করা এবং যেকোনো উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক পর্যায় শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য একটি নিষ্ফল পর্যায় হবে। দুই, যদিও, লেনিন ভেবেছিলেন যে, পরিস্থিতি সদর্থক হলেই বিপ্লবী জোট ক্ষমতা দখল করতে পারবে, কিন্তু ইউরোপের বহুল অংশে যদি না সেই একই সময়ে বিপ্লব সংঘটিত হয়, তাহলে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়াকে বিপ্লবোত্তর পর্যায়ে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এই ক্ষেত্রে মার্ক্স ও লেনিন দুজনেই একমত ছিলেনঃ রুশ বিপ্লব সফল করতে ইউরোপের অগ্রণী প্রলেতারীয় বাহিনীর সমর্থন প্রয়োজন। লেনিন এবিষয়ে খানিকটা নিশ্চিতই ছিলেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপে যে সংকট ডেকে এনেছে, তার ফলে ইউরোপের বহু দেশে বিশেষত জার্মানিতে বিপ্লব সফল হবে। এর ফলেই তাঁর আশা ছিল যে, রুশ বিপ্লব ইউরোপের বিপ্লবগুলির সূচনাপর্ব হয়ে দাঁড়াবে। যদিও সেই আশাভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বের ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতেই, বিপ্লবী মার্ক্সবাদ নয়, বরং ভয়ানক ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটলো। এরপরের ইতিহাস, এই সফল বিপ্লবটির সঙ্গে সঙ্গে বহু ব্যর্থ বিপ্লব প্রচেষ্টারও ইতিহাসও বটে। এতগুলি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পরই, স্তালিন ও সোভিয়েত সরকারের পক্ষে বলতে গিয়ে এক নতুন তত্ত্বের অবতারণা করেন নিকোলাই বুখারিন, তা হলঃ ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’। 

নব্য পুঁজিবাদী শ্রেণির উত্থান 

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয় রাশিয়ায় বহুমুখী সংকট তৈরি করে, যার ফলে ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তি, দ্রুতগতিতে আধুনিকীকরণ এবং শিল্পায়ন ঘটেছিল। এই শিল্পায়নের জন্য পুঁজির প্রধান উৎস ছিল যুদ্ধের বিজয়ী প্রতিপক্ষ ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এর পাশাপাশি এক নব্য পুঁজিবাদী শ্রেণির উত্থান ঘটে, যদিও শিল্প ও আর্থিক লেনদেনে তাঁদের অংশীদারিত্ব ছিল তুলনামূলক ভাবে কম। এছাড়াও, ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিপুল পরিমাণ জমিসহ নতুন সামন্ত শ্রেণির উত্থান-ও এই সময় লক্ষ্য করা যায়। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগই যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করতে চেয়েছিলেন। এই শতকের শেষে ১৮৯৯ সালে লেনিন একটি বই লিখলেন, দ্য ডেভালাপমেন্ট অফ ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া। এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, রুশ সমাজব্যবস্থা এমন এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে প্রলেতারিয়েত শ্রমিক ও কৃষক মৈত্রীর সামনে বিপ্লবী সংগ্রাম করার জন্য যথেষ্ট কারণ বর্তমান। কৃষিক্ষেত্রেও ভূমিদাস প্রথার অবলুপ্তির পর বহু পরিবর্তন ততদিনে এসে গেছে। কিন্তু তৎকালীন জারের স্বৈরাচার এবং সেই স্বৈরাচারের সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতামূলক সম্পর্কে আবদ্ধ বুর্জোয়া শ্রেণীর উপস্থিতিতে, সেই সঙ্গে এই শ্রেণির কোন উদারনৈতিক দায়বদ্ধতা ছাড়া, কেবল সংগঠিত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর ভিত্তি করে কীভাবে একটি আধুনিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব? এই প্রশ্নের উপর ভিত্তি করেই বলশেভিক রাজনৈতিক সাহিত্য ইতিহাসের প্রথম চিরায়ত লেখাটি এল, ১৯০২ সালে লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান? বা কী করিতে হইবে? (যদিও, এই শিরোনামটি তিনি নিয়েছিলেন বিখ্যাত রুশ দার্শনিক, সাহিত্য সমালোচক নিকোলাই চের্নিশেভস্কির একই নামের লেখা একটি উপন্যাস থেকে। রুশ যুবসমাজের ওপর এই উপন্যাসের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল)। 


     ১৯০৫ সালে তোলা ছবি 

ইতমধ্যেই জার শাসনাধীন রাশিয়া নিজেদের উপনিবেশ পূর্ব দিকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছিল। কোরিয়ার উপকূল পর্যন্ত বা মঙ্গোলিয়া অবধি এমনকি মাঞ্চুরিয়া-ও তাদের এই উপনিবেশ বানানোর পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে জাপানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাশিয়া অবৈধ প্রবেশাধিকার চালাচ্ছিল। জাপানকে নিচু জাতি হিসেবে তাচ্ছিল্য করে, এবং নিজেদের অসুবিধা যেমন, রুশ সামরিক ক্ষমতার সঠিক পর্যালোচনা না করে এবং ওই বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে অবিচ্ছিন্ন সামরিক সাহায্য পাঠানোর সমস্যা বিবেচনা না করে জার শাসিত রুশ সরকার জাপানের বিরুদ্ধে ১৯০৪ সালে যুদ্ধ ঘোষণা করল। এই যুদ্ধেও পরাজিত হল রাশিয়া, এবং সে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে এগোল। ১৯০৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে রাশিয়ার বড় বড় শিল্পনগরীগুলি এবং পরবর্তীতে দেশজুড়ে শ্রমিক ধর্মঘটের ঢেউ উঠতে লাগল। লক্ষণীয় এই যে, মহিলারা নিজেরা বিপুল সংখ্যায় সংগঠিত হয়ে উঠলেন, এবং শ্রমিকদের থেকে এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো রুশ নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পেশাদার পেটি বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যেও। কিন্তু ১৯১৭ সালের থেকে যেটা আলাদা, তা হল, রুশ কৃষকরা শহরের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সেভাবে একাত্ম হতে পারেননি, এবং এত পরাজয়ের পরেও সেনাবাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জার শাসনতন্ত্রের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। উল্টোদিকে, রুশ শ্রমিক বাহিনীর জঙ্গি মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একদিকে, ইউরোপীয় রাশিয়ার প্রায় অর্ধেক শ্রমিক এই ধর্মঘটগুলিতে অংশ নিয়েছিল, পাশাপাশি, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে উঠছিল। 

সেনাবাহিনী ও কৃষকদের সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ বলশেভিকরা তখন রাজনৈতিক দল হিসেবে সদ্য উঠে আসছে। লেনিন নিজেও তখন ১৯০৫-এর এই ঘটনাবলি নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা ও লেখালিখি করেছিলেন। সেই লেখার পরিমাণ প্রায় ৪০০ পাতার কাছাকাছি। শেষ অবধি তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, যে রাশিয়ার ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েত শ্রমিকরাই নির্ধারক বিপ্লবী শ্রেণি, এবং অন্যান্য শোষিত শ্রেণিগুলিকে নেতৃত্ব দেওয়া ও একজোট করার ক্ষমতা আছে এই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে। তিনি আরও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, যে রুশ বুর্জোয়ারা জারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে বা পশ্চিম ইউরোপের আরও বৃহৎ পুঁজিবাদী শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই করবে বলে যে ভাবনাটি উঠে আসছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ থেকেই বোঝা যায়, মেনশেভিকদের স্বাধীন, সুগঠিত, উদারনৈতিক, বুর্জোয়া সাধারণতন্ত্র আদপেই একটি অলীক কল্পনা; তাই ভবিষ্যতের যেকোনো বিপ্লবের অভিমুখ হবে সমাজতান্ত্রিক। তিনি আরও মনে করেন, শ্রেণিশক্তি বর্তমানে যথেষ্ট নির্ধারক হয়ে উঠেছে; ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পরাজয়ের মূল কারণ হল, শ্রমজীবী শ্রেণিকে সম্পূর্ণ ভাবে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর মাধ্যমে একজোট করে নেতৃত্ব দেওয়ার মত বিপ্লবী ভ্যানগার্ডের অভাব। ১৯০৫ সালের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি ১৯১৭ সালের বিপ্লবকে সফল করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। 

কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ও মেনশেভিকদের সঙ্গে ভাঙন 

পরবর্তী দশকে বলশেভিকরা আরও বড়, প্রশিক্ষিত এবং শ্রমজীবী শ্রেণি ও অন্যান্য শোষিত শ্রেণিগুলির মধ্যে বিপুল সমর্থন প্রাপ্ত একটি দল হিসেবে তৈরি হয়ে ওঠে। গোপনে পার্টির কাজ চালানোর ক্ষেত্রেও সুদক্ষ হয়ে ওঠেন তাঁরা। ১৯১২ সালে মেনশেভিকদের সঙ্গে তাঁদের সুস্পষ্ট ভাবে বিচ্ছেদ তৈরি হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পার্টির প্রতিনিধিরা যখন নিজ নিজ দেশের সরকারকে সমর্থন জানানোর কথা ঘোষণা করেন, তখনও লেনিন বলশেভিকদের নিয়ে সেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক থেকেও বেরিয়ে আসেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে, সাম্রাজ্যবাদী দেশজগুলির মধ্যে নিজেদের উপনিবেশগুলিকে ভাগ বাঁটোয়ারা করার জন্য, এক ‘আন্তঃ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছিলেন লেনিন। এই যুদ্ধে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ মারা গেছিলেন। যে সব দল নিজেদেরকে ‘সমাজতান্ত্রিক’  বা ‘বিপ্লবী’ বলে আখ্যা দেয়, সেই দলগুলির পক্ষে থেকে এই যুদ্ধকে সমর্থন করা রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই নামান্তর। এই ধরণের দলগুলির সঙ্গে এক মঞ্চ ভাগ করে নেওয়া ছিল প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব। এই পুরো সময়জুড়ে বিপ্লবের বুনিয়াদি চিন্তাভাবনার প্রতি লেনিন সৎ ছিলেন। যদিও, একথা সত্য, রাশিয়ায় যে সময় বিপ্লবী পরিস্থিতি অনুকূল হয়ে উঠছে, ঠিক সে সময়েই বলশেভিকরা রাশিয়ার ভিতরে ও বাইরে (আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে) সব ধরণের বামপন্থী ক্ষেত্রগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। অন্যদিকে, এই বিচ্ছিন্নতা না থাকলে হয়ত লেনিনের পক্ষে বিপ্লব সংগঠিত করা সম্ভব হত না। এটাও সত্যি যে, বিচ্ছিন্নতা ও বাইরে থেকে সমর্থনের অভাবের দীর্ঘ ও অসহনীয় ফলও ভুগতে হয়েছিল তাঁদের। 

📲এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ এখন আপনার হোয়াটস অ্যাপে

লেনিন আশা করেছিলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সংকটময় পরিস্থিতির সঙ্গে অক্টোবর বিপ্লব মিলে গোটা ইউরোপ জুড়ে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দেবে। কিন্তু ঠিক কারা সেই বিপ্লবগুলোর নেতৃত্ব দেবে? ইউরোপের সমস্ত সমাজতান্ত্রিক এবং সমাজ-গণতান্ত্রিক দলগুলো ইতমধ্যেই নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়াদের সঙ্গে মিত্রতা করে নিয়েছিল। সেই দেশগুলোর প্রায় সবগুলোতে অবশিষ্ট কমিউনিস্টদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম ছিল এবং তাঁরা শুধু সেদেশের বুর্জোয়াদের দ্বারাই নয়, সমাজ-গণতন্ত্রীদের দ্বারাও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদী আধিপত্যের সূচনাকারী বেনিতো মুসোলিনির রোম অভিযানের মাত্র ১৮ মাস আগে, গ্রামসি ও বোর্দিগার নেতৃত্বে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জার্মানিতে, যে সমাজ-গণতান্ত্রিক দলটি অক্টোবর বিপ্লব ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তার নিন্দা করেছিল, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই সেই দলটিই সেদেশে শাসক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে রোজা লুক্সেমবার্গের হত্যাকাণ্ডের পেছনের তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এর আগের বছরই রোজা, তাঁর স্পার্টাকাস লীগকে জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির রূপ দিয়েছিলেন। অক্টোবর বিপ্লবের জন্য ‘ইউরোপীয় বিপ্লবগুলো’ যে সহায়ক ও স্থিতিশীলকারী ভূমিকা পালন করবে বলে লেনিনের যে আশা, তা মূলত জার্মানির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। পরিণামে, সেই আশা অলীক ও ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হল, যা বিচারের ক্ষেত্রে লেনিন কিছুটা হলেও ভুল করেছিলেন। 

মহিলাদের অংশগ্রহণ 

১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মহিলাদের একটি বিশাল মিছিলের মধ্যে দিয়ে বিপ্লবের প্রথম ধাপ সংগঠিত হয়। এই মিছিলে খাদ্যের (বিশেষত রুটির) অভাবের প্রশ্নটি তুলে ধরা হয় এবং কারখানায় ধর্মঘটরত শ্রমিকদের তাঁদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা। প্রায় এক বছর ধরে চলা এই ধর্মঘট দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রধান দাবি হয়ে ওঠে দুটি: রুটি এবং শান্তি। নির্ণায়ক মুহূর্তটি আসে, ২৫ থেকে ২৭ শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে, যখন বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর আদেশ পাওয়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে, পুলিশের ওপরেই গুলি চালায়। এরপর, সেতু, অস্ত্রাগার এবং রেলস্টেশন-সহ রাজধানীর বেশিরভাগ অংশ শ্রমিকদের দখলে চলে যায়। শ্রমিকরা জায়গায় জায়গায় ‘সোভিয়েত’ তৈরি করে এবং এই আন্দোলন অন্যান্য শহর ও গ্রামগুলির বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে, এবং শ্রমিক ও সৈন্যদের একটি বিরাট জোট গড়ে ওঠে। শহরে কর্তব্যরত, যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আসা এবং সেনাবাহিনী ত্যাগ করা লক্ষ লক্ষ সামরিক ব্যক্তি এই জোটের অংশ ছিলেন। মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ জার সিংহাসন ত্যাগ করায়, ৩০০ বছরের পুরনো রোমানভ শাসনের অবসান ঘটে এবং একটি অস্থায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। 


ক্লারা জেটকিন ও রোজা লুক্সেমবার্গ 

এপ্রিল থিসিস 

জুরিখে নির্বাসনে থাকাকালীন লেনিন এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখেন। পার্টি মুখপত্র প্রাভদা-তে ছাপার জন্য তিনি সেখান থেকে তাঁর বিখ্যাত তিনটি ‘দূর থেকে চিঠি’ পাঠান, যা Letters from Afar নামেই পরিচিত। এরপর সেই নির্বাসন থেকে ফিরে এসে তিনি লেখেন এপ্রিল থিসিস, যেখানে এই অস্থায়ী সরকারের মাধ্যমে উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র স্থাপনের যে চিন্তা তৎকালীন রাশিয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছিল, তাঁর তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই ভিন্ন ছিল যে তাঁর সহকর্মীরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর স্ত্রী, ঘনিষ্ঠ সহকর্মী নাদেঝদা ক্রুপস্কায়াও ভেবেছিলেন, লেনিন হয়তো পাগল হয়ে গেছেন। তিনি বলশেভিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হলেও, তিনি এই সময় নিজের দলেও এতটাই সংখ্যালঘু হয়ে গিয়েছিলেন, যে তিনি থিসিস-টিকে তাঁর ‘ব্যক্তিগত অভিমত’ বলে পার্টির কাছে উপস্থাপন করেন। 

১৯১৭ সালের মার্চ এপ্রিল মাসে তাঁর বক্তব্যের নির্যাসটিই আমি এখানে তুলে ধরবো। 

১) ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল। 

২) ব্রিটিশ ও ফরাসি পুঁজিপতিরা দুর্বল রুশ বুর্জোয়া শ্রেণি, ‘ডুমা’ (রুশ সংসদ)-য় তাদের প্রতিনিধি এবং একদল সেনাপতি ও সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে জারকে উৎখাত করার এবং ওই বিপ্লবকে একটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উদারনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ষড়যন্ত্র করার ফলেই রাজতন্ত্রের এত দ্রুত পতন ঘটে। পাশাপাশি, জনগণের অসন্তোষ প্রশমিত করার জন্য হাতেগোনা কয়েকটি লোকদেখানো সংস্কারও করা হয়েছিল। 

৩) ১৯০৫-০৭ সালের বিপ্লবের সময় সর্বহারা শ্রেণী কিছুটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং বিপ্লবকে প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় তথা সর্বহারা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা এখন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। 

৪) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগোনোর পূর্বে, একটি স্থিতিশীল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পর্যায়ের পক্ষে কথা বলার মধ্য দিয়ে মেনশেভিক, এসআর ইত্যাদি গোষ্ঠীগুলো দেশীয় ও বিদেশী পুঁজিবাদীদের মিত্রশক্তি হিসেবে কাজ করছিল। এদের সঙ্গে কোনো ঐক্য সম্ভব নয়। 

৫) অন্তর্বর্তী সরকার প্রথম থেকেই সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ওপর অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, কেন্দ্রীয় স্তর থেকে আঞ্চলিক স্তর পর্যন্ত সরকারের সব স্তরে আধিপত্য বিস্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল। এবং যদি এটা চলতে থাকে, তবে এটি পেত্রোগ্রাদে সোভিয়েতের আকারে থাকা প্রলেতারীয় শ্রেণির নেতৃত্বাধীন সরকারের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত এবং তাকে আঁতুড়ঘরেই গলা টিপে মেরে দিত। 

৬) অন্তর্বর্তী সরকার যুদ্ধটি শেষ করতে পারেনি, কারণ এই সরকার ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মত উন্নত দেশগুলির পুঁজিবাদী শ্রেণীর উপর নির্ভরশীল ছিল এবং যে উদ্দেশ্যে যুদ্ধটি প্রথমত শুরু করা হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট মিল ছিল। 

৭) দুটি স্লোগান ছিল কেন্দ্রীয়, “সোভিয়েতের হাতে সমস্ত ক্ষমতা” এবং “শান্তি, রুটি ও স্বাধীনতা”। 

৮) সর্বহারা বিপ্লবের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হল “....সব জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং শ্রমিকদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গণফৌজ গঠন... [যা] অবশ্যই একটি সার্বজনীন গণসংগঠনের রূপ পাবে, এবং পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে সমস্ত কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এটি তৈরি হবে; দ্বিতীয়ত, এটিকে কেবল পুলিশি কার্যাবলী বাস্তুবায়নের কাজে লাগালেই হবে না, বরং সাধারণ রাষ্ট্রীয় কার্যাবলীর সঙ্গে সামরিক কার্যাবলী এবং সামাজিক উৎপাদন ও বণ্টনের নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় ঘটানো হবে”; 

“কোন আধাসামরিক সাধারণতন্ত্র নয়… বরং দেশজুড়ে সোভিয়েত, শ্রমজীবী, কৃষি শ্রমিক এবং কৃষিজীবীদের সাধারণতন্ত্র। 

—“পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের বিলুপ্তি।” 

—“সকল ভূসম্পত্তি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্তকরণ।” 

—“একটি কমিউন রাষ্ট্র” (লেনিন একটি পাদটীকায় যোগ করেন, “অর্থাৎ, এমন একটি রাষ্ট্র যার আদি ভিত্তি রূপ হল প্যারি কমিউন”)।)

সারসংক্ষেপে এই প্রথম সাতটি বিষয় এতটাই বিতর্কিত ছিল, যে প্রতিপক্ষদের কথা তো বাদই দিলাম; তাঁর নিজের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মীদের অধিকাংশই এর পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু অষ্টম বিষয়টি, যা সরাসরি উদ্ধৃত করে দেওয়া হয়েছে, বিপ্লবের পর লেনিনের পরিকল্পিত রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা, তা ছিল এককথায় বিস্ফোরক (কোনো সেনাবাহিনী নয়, কোনো আমলাতন্ত্র নয়, সম্পূর্ণ সশস্ত্র জনগণ)। 


১৯২১ সালে মস্কোয় কমিন্টার্নের তৃতীয় কংগ্রেসে সিঁড়িতে বসে নোট নিচ্ছেন 

ইউরোপের বাইরে 

যুক্তিযুক্তভাবেই বলা যায়, রুশ বিপ্লব লেনিন ও তাঁর সহকর্মীদের অন্তত এই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছিল, যে ইউরোপীয় বিপ্লবগুলোর চরম ব্যর্থতার ফলে, ইউরোপীয় শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে নয়, বরং ঔপনিবেশিক দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্দোলনগুলোর মধ্যে, এবং বিশেষ করে কমিউনিস্ট ও তাঁদের মিত্রদের দ্বারা পরিচালিত সেইসব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যেই, বলশেভিকদের প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদী মিত্রদের, খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। সংক্ষেপে, লেনিনের নিজেরই লেখায় যেমন বলা হয়েছিল, “পশ্চাৎপদ ইউরোপ” থেকে “উন্নত এশিয়া”-র দিকে যাত্রা। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলে পরবর্তী বড় ভাঙনটি শিল্পপ্রধান জার্মানিতে নয়, বরং প্রধানত কৃষিপ্রধান চীনে এসেছিল; তা এমন এক বিপ্লবের মাধ্যমে যা শহরগুলো থেকে সরে এসে গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিপ্লবী সক্ষমতা ও মুক্তি বাহিনী গড়ে তুলেছিল এবং চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করেছিল কেবল তখনই, যখন এক মৌলিক ধরণের কমিউনিস্ট চর্চা কৃষক প্রশ্ন ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় প্রশ্নের গভীরে সম্পূর্ণরূপে প্রোথিত হয়েছিল। খোদ জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই, চিয়াং-এর স্বঘোষিত “জাতীয়তাবাদী”-রা, জাপান-বিরোধী প্রতিরোধে মাও সে তুং-এর কমিউনিস্টদের কাছে পরাজিত হয়েছিল।

পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিবর্তনের বহু নেতিবাচক দিক নিয়ে যা-ই বলা হোক না কেন, একটি বিষয় ছিল স্থির, তা হলো ত্রি-মহাদেশের (ট্রাইকন্টিনেন্ট) প্রায় প্রতিটি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের সুনির্দিষ্ট বস্তুগত সমর্থন। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত জাতীয় বুর্জোয়াদের শাসনব্যবস্থার প্রতিও রাশিয়ার এই সমর্থন ছিল, যেমন জওহরলাল নেহরুর ভারত এবং গামাল আবদেল নাসেরের মিশর, যারা উন্নয়নের একটি স্বাধীন পথ অনুসরণ করে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে মুক্ত থাকতে চেয়েছিল। এই পারস্পরিক সহানুভূতির ভিত্তির মূল কারণ এই যে, সাম্রাজ্যবাদ, ত্রি-মহাদেশের দেশগুলির অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রতি ঠিক ততটাই বিদ্বেষী ছিল, যতটা খোদ কমিউনিজমের প্রতি। 

ভাষান্তর: অর্ক সেন

 


প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org