পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দুটি বিষয় ইদানীং খবরের শিরোনামে চলে এসেছে। প্রথমটি হল একশো দিনের কাজ বা মনরেগা প্রকল্পে বিপর্যয়, এবং দ্বিতীয়টি হল ক্ষুদ্র ফিনান্স কর্পোরেশন থেকে গ্রামের মানুষের ঋণের বোঝা এবং তার সঙ্গে যুক্ত আর্থিক, সামাজিক বিপর্যয়। একশো দিনের কাজ প্রকল্প বা মনরেগা বা নতুন আঙ্গিকে জি-রাম-জি প্রকল্প একটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প।পশ্চিমবঙ্গে কার্যত এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ। প্রকল্পটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে বাংলার গ্রামে মানুষের বেঁচে থাকার সঙ্গে এই দুটি বিষয়ের যোগাযোগ স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একশো দিনের কাজ গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প। এই প্রকল্পের উপর এখন গ্রাম-বাংলায় নির্ভরতা মানুষের অনেকটাই। তার কারণ কোভিড পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ২০২২ সালের পর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে কৃষিকাজের উপর নির্ভর করে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে, কারণ অ-কৃষিকাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমেছে। তাই গ্রামীণ পরিবারগুলি প্রচ্ছন্ন আর্থিক অভাব বা অনটনে ভুগছে, বাধ্য হয়ে ক্ষুদ্র ফিনান্স কর্পোরেশন থেকে ঋণ নিচ্ছে। বিষয়টি চক্রাকারে যুক্ত এবং এই চক্র থেকে বেড়িয়ে আসা গ্রামীণ পরিবারের পক্ষে কঠিন। এই চক্র তৈরি হওয়ার পিছনে গ্রামীণ পরিবারগুলির আর্থিক আয় এবং ভোগব্যয় কত তা জানা প্রয়োজন। আর্থিক অনটন থেকেই এই চক্র তৈরি হয়েছে। এই চক্র আরও পোক্ত হয়েছে গ্রামে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার ফলে। কাজ নেই, তাই গ্রাম ছেড়ে বেড়িয়ে না-গেলে চাই মনরেগা প্রকল্প, না-হলে খেত মজুরিতে নাম লেখানো এবং ঋণ নিয়ে পারিবারিক ব্যয়ের পথ খোলা। এই চক্রেই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষ আটকে পড়েছে বলা যায়।
একশো দিনের কাজ উধাও
গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে বেশির ভাগ পরিবারের আর্থিক অভাবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একশো দিনের কাজ প্রকল্পের প্রায় উধাও হয়ে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র ফিনান্স কর্পোরেশন থেকে ঋণ বেড়ে যাওয়া। প্রথমে একশো দিনের কাজ প্রকল্পের কয়েকটি তথ্যে আসা যাক। সাধারণভাবে প্রতি বছর বাজেটে এই প্রকল্প বাবদ বরাদ্দ কমেছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের দাবিদার দেশের মধ্যে ১০% ছিল। এই প্রকল্পে ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি তথ্য জানাচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য অনুমোদিত শ্রম বাজেট ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ সালের জন্য শূন্য। ২৩টি জেলায় ১৩৬.৬ লক্ষ জব কার্ড ইস্যু করা হয়েছিল। ২০২১-২২ সালে কাজ করেছিল ৭৫.৯৭টি পরিবার এবং ১১১.২২ লক্ষ শ্রমিক। খাতায় কলমে ঠিক ২০২১-২২ সালে ১০০ দিনের কাজ পেয়েছিল ৪.৭১ লক্ষ। অর্থাৎ ২০২১-২২ সালে বেশির ভাগ শ্রমিকই খাতায় কলমেও ১০০ দিনের কাজ পাননি। খাতায় কলমে এই দুটি শব্দ ব্যবহার করা হল কারণ এরকম রিপোর্ট মাঝে মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে বেড়িয়ে আসে যে খাতায় যা লেখানো হয়, সেই পরিমাণ কাজ এবং মজুরি মনরেগার শ্রমিকেরা পান না। তাই সরকারি তথ্যে যা রয়েছে তাকে খাতায় কলমে বলা হল। কেন এরকম হয়? কারণ আর্থিক দুর্নীতি। সে শুধু এই প্রকল্পে নয়, অন্য সব ধরনের প্রকল্পেই রয়েছে। যেভাবেই হোক-না-কেন খাতায় যা লেখা থাকে তা সঠিক নয়, এরকম প্রমাণ আছে নানা সমীক্ষায়।
দেখা যাক মনরেগার সরকারি পরিসংখ্যানে এই প্রকল্পে বঞ্চিত হলেন কতজন এই দু-তিন বছরে। ২০২২-২৩ সালে যে কয়টি পরিবার কাজ পেল তার সংখ্যা নেমে এল পরের বছর ১৬.২৯ লক্ষে। এক বছরে এই প্রকল্পে কাজ হারায় ৫৯.৬৮ লক্ষ পরিবার। ২০২২-২৩ সালে ২০.২ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন এই প্রকল্পে, অর্থাৎ এক বছরে কাজ হারান ৯১.০২ লক্ষ শ্রমিক। খাতায় কলমে ১০০ দিন কাজ করেন ১৬১৮জন শ্রমিক। ২০২২-২৩ সালের পর এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ শূন্য হয়ে গিয়ে আর কেউ কাজ পাননি। এত জন যে কাজ হারালেন, কীভাবে পরিবারগুলি চলছে? পর্যাপ্ত না-হলেও রেগার কাজ হারানো শ্রমিকের সংখ্যা আদৌ কম নয়। মনরেগায় কাজ হারানোর শ্রমিকের মধ্যে দুটি ভাগ রয়েছে। একদল শ্রমিক প্রকল্পের ভরসায় বসে থেকে নাম লেখানোর সুযোগ পেলেন না। যদি এই প্রকল্প থাকত, তাহলে তো তারা শ্রমিক হতেন। এঁদের খোঁজ পরিসংখ্যান দিতে পারবে না কারণ তাঁদের অস্তিত্ব থাকলেও নাম লেখানো নেই। দ্বিতীয় ভাগে পড়ছেন তাঁরা যাঁদের কাজ ছিল, হারালেন। এই দ্বিতীয় ভাগের পরিসংখ্যান উপরে দেওয়া হল।
কৃষিতে স্বনিযুক্তি
এই সময় থেকেই কৃষিতে স্বনিযুক্তি বাড়তে শুরু করে। কৃষিকাজে ফিরে আসে অনেক পরিযায়ী শ্রমিকও। কৃষিতে নিযুক্ত হয় বেশি মানুষ, কিন্তু কৃষি থেকে আয় পর্যাপ্ত নয়, বরং কমে আসছে এই আয়। ২০২৩-২৪ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্সের রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে এমন শ্রমিকের সংখ্যা যারা সমীক্ষার আগে এক সপ্তাহ কাজ করেছেন। এই পরিসংখ্যান নেওয়ার অর্থ যাতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিককে গণনা করা যায়। সারা বছর, সারা মাস কেউ যখন কাজ পান না তখন এরকম গণনা প্রয়োজন যে সমীক্ষার আগে এক সপ্তাহ তিনি কাজ পেয়েছেন কিনা। পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম-শহর মিলিয়ে এই পরিসংখ্যানের একটি সারণি নিচে দেওয়া হল। এই সারণিতে রাজ্যে স্বনিযুক্তি এবং তার মজুরির বিন্যাস রাখা হল।
সারণি-১: ২০২৩-২৪ সালে বর্তমান সপ্তাহে স্বনিযুক্তি কাজে শ্রমিক
| |
মজুরি দৈনিক ৫০টাকার কম
|
স্বনিযুক্তিতে অংশ
|
|
কৃষি এবং সংশ্লিষ্ট
|
৬৩.০%
|
৪৭.৩%
|
|
খনি
|
০.১%
|
০.১%
|
|
শিল্পকারখানা
|
১৮.৩%
|
১৮.১%
|
|
নির্মাণ
|
০.২%
|
২.২%
|
|
পরিষেবা
|
১৮.৩%
|
৩২.০%
|
এই সারণিতে সেই ক্ষেত্রগুলিই নেওয়া হয়েছে যেগুলি গ্রামবাংলার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই তথ্য আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কৃষিকাজে মানুষ কাজে যোগ দিচ্ছে স্বনিযুক্ত হয়ে, কিন্তু এতে আর্থিক লাভ নেই। পারিবারিক ব্যয় চালানো প্রায় অসম্ভব। তাই ঋণের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েছে গ্রামের মানুষ। বাড়ছে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণ।
পারিবারিক ভোগব্যয় কত
ঋণের প্রয়োজন কেন হল গ্রামীণ পরিবারগুলির তা বুঝবার জন্য খুঁজতে হবে গ্রামীণ মাথা পিছু ভোগব্যয়ের পরিসংখ্যান। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দপ্তর যে ভোগব্যয়ের সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে তার ভিত্তিতে জানা যায় পশ্চিমবঙ্গে প্রতি পরিবার পিছু মাসে গড়ে ভোগব্যয় ১৩৬১৪.৭৩ টাকা। এর মধ্যে গ্রাম-শহরে ফারাক আছে। ২০২৩-২৪ সালে প্রতি মাসে মাথা পিছু গড় ভোগব্যয় বাংলার গ্রামে ৩৬২০ টাকা যা শহরে ৫৭৭৫ টাকা। গ্রামীণ এই মাথা পিছু ব্যয়ের চেয়ে নিচে যে রাজ্যগুলি রয়েছে তা হল ঝাড়খণ্ড, ছত্তিসগড়, উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশ। গ্রামীণ বাংলায় পরিবার পিছু গড় ভোগব্যয় বা খরচে অন্য অনেক রাজ্যের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে এ-রাজ্য, তা বোঝা যায়। বাংলার আর্থিক বিপর্যয় এই তথ্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। খরচ করার মতো সংস্থান নেই বেশির ভাগ পরিবারগুলির।
খাদ্যপণ্যের দাম যে-হারে বেড়েছে, সেই নিরিখে এটি স্পষ্ট এই পরিমাণ গড়ব্যয়ের প্রায় সবটুকুই দেখা যায় খাদ্যে ব্যয় করা হয়, বিশেষ করে খাদ্যশস্যে অর্থাৎ ভাত রুটিতে। এই তথ্যে বোঝা যায় যে গ্রামীণ পরিবারের অর্থাভাব পরিণত হচ্ছে খাদ্যাভাবে। তাই বাধ্য হচ্ছে গ্রামীণ পরিবারগুলি ঋণ নিতে।
আয়ের পথ কোথায়
এতক্ষণ যে-পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা করা হল তা গড় পরিসংখ্যান। গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গে এই গড় আয়ের পরিমাপই কমে আসছে। কিন্তু যদি গ্রামীণ আয়ের বৈষম্যের প্রেক্ষিতে এই আলোচনা করা যায়, তাহলে দেখি যে ঠিক এই কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামীণ আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। একশো দিনের কাজের উপর গ্রামের এত মানুষের নির্ভরতা বোঝায় যে গ্রামের এক বড়ো অংশের মানুষের আয়ের পথ খোলা নেই।
২০১১-২০২৪ সালের মধ্যে এ-রাজ্যে কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধির হার মাত্র ১.৩%। কৃষিতে আয়ের সুযোগ কম জেনেও কৃষিতে স্বনিযুক্তি বেড়েছে এই কয়েক বছরে। ২০২৩-২৪ সালের পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের রিপোর্টে জানা যাচ্ছে যে রাজ্যে দৈনিক ৫০ টাকার কম আয় করে এরকম মানুষের ৬৩% কাজ করেন কৃষি এবং কৃষিজ ক্ষেত্রে (সারণি-১)।
কৃষি ক্ষেত্রের উপর গ্রামীণ মানুষের নির্ভরতা শুধু ২০২২ সালের পর থেকে শুরু হয়েছে এমনটা নয়। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যানেও কৃষি এবং কৃষিজ ক্ষেত্রে দেখা যায় ৫০.৭% শ্রমজীবীর নির্ভরতা। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের আদমসুমারি রিপোর্টেও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে যে অকৃষি ক্ষেত্রের উত্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়, ২০১১ সালের পর সেই ক্ষেত্রের সংকোচন চোখে পড়ে, গ্রামীণ শিল্পের বিকাশেও শ্লথগতি আসে। শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে আসে এবং কর্মসংস্থান কমে আসে। তাই কৃষিকাজে ফিরে আসে গ্রামের মানুষ। এই ধরনের শ্রমনিযুক্তিকে ছদ্ম বেকারত্ব বলে। খেতে মানুষ কাজ করলেও এত শ্রমিকের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন নেই, কিন্তু মানুষের কাজের আর কোনো জায়গা নেই, তাই মানুষ কৃষিতেই রয়েছেন। এই কারণেই মানুষের নির্ভরতা ছিল একশো দিনের কাজ প্রকল্পের উপর। ২০১১ সালের পর যে সব ক্ষেত্রে অকৃষিজনিত কাজ সংকুচিত হয়ে গেছে, এবং কৃষিকাজে আয়ের সংস্থান কমে গেছে সেই সব গ্রামীণ পরিবার থেকে হয় পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে নয় একশো দিনের কাজ প্রকল্পের উপর নির্ভর করে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করেছে। এই প্রবণতা গত চার/পাঁচ বছরে বহু মাত্রায় বেড়ে গেছে।
গ্রামীণ দারিদ্র্য পশ্চিমবঙ্গে অনেক রাজ্যের চেয়ে বেশি। সর্বশেষ পরিসংখ্যান আমাদের জানাচ্ছে যে কয়েকটি রাজ্য অতিরিক্ত দারিদ্র্যে ভুগছে, তার মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের এই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার ২০২৩ সালে ছিল ১১.৮৯%। এর সাথে অতীতের দারিদ্র্যের হারকে তুলনা করা যাবে না। এটি তো সব মেলানো সূচকের এক গড় হিসেব। কিন্তু এই অস্পষ্ট হিসেবের মধ্যেও বেড়িয়ে এসেছে কোন্ কোন্ জেলা অতিরিক্ত দারিদ্র্য। অতিরিক্ত জেলাগুলি হল উত্তর দিনাজপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর। এখানে দারিদ্র্যের হার ২৬.৮৪% এর মতো। মালদা এবং মুর্শিদাবাদে দারিদ্র্যের হার ১৭.৮৯% এর মতো। পূর্ব বর্ধমান ও দক্ষিণ দিনাজপুরও জেলাও দরিদ্র জেলা। মোটের উপর পশ্চিমবঙ্গ এই সূচকের ভিত্তিতে দরিদ্র রাজ্য। যে-জেলাগুলি দরিদ্র জেলা বলে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলি তো ২০১১ সালেই পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে চিহ্নিত ছিল।
গ্রামীণ দারিদ্র্যের মূল কারণ জীবিকা নির্বাহ করার জন্য গ্রামের মানুষ যে-কাজ করছেন এ-রাজ্যে তাতে আয় শুধুমাত্র কমছে না, এই আয় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই, এমন কি এই আয়ের কোনো নিশ্চয়তাও নেই। তাই বেড়ে চলেছে ক্ষুদ্রফিনান্স সংস্থা থেকে ঋণ।
শেষ পর্ব আগামীকাল
প্রকাশের তারিখ: ২৩-মার্চ-২০২৬ |