প্রথম পর্বের পর...
ক্ষুদ্রফিনান্সের রমরমা
এই মুহূর্তে ২৩টি জেলায় ক্ষুদ্রফিনান্সের মাধ্যমে ঋণের পরিমাণ ৩৩,১৮১ কোটি টাকা। ক্ষুদ্রফিনান্সের বেসরকারি একটি রিপোর্ট সা-ধন ২০২৫ সালে প্রকাশ করেছে যে দেশের মধ্যে ২৫টি জেলায় ক্ষুদ্রফিনান্সের বাড়বাড়ন্ত বেশি, এর মধ্যে ৬টি পশ্চিমবঙ্গে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে গ্রামীণ মুর্শিদাবাদ। অতিরিক্ত গ্রামীণ দারিদ্র্যের এক প্রকাশ বাংলার গ্রামে এই ক্ষুদ্রফিনাসের রমরমা। বেসরকারি এই সংস্থাগুলি গজিয়ে উঠেছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা চড়া সুদে রাজ্যের মানুষকে ঋণদান করার জন্য। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না-করে এই তেজারতি কারবার গড়ে উঠেছে দেশের সব রাজ্যেই, পশ্চিমবঙ্গে এর অংশ অনেকটাই বেশি। এ-রাজ্যের গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের আর্থিক অসহায়তা ক্ষুদ্রফিনান্সের রমরমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে গ্রামে গ্রামে।
গ্রামীণ নিম্ন আয়ের চক্র
উপরের আলোচনা থেকে আর্থিক বিপর্যয়ের চক্রের বন্ধন কেন শক্ত তা বুঝতে সাহায্য করে। এই চক্রকে ভিতর থেকে কাজ করার কারণ তো পরিষ্কার— পারিবারিক আর্থিক অসহায়তা, উপার্জনের সব পথ বন্ধ এবং ধীরে ধীরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়া। কিন্তু এই চক্র যাতে মজবুত থাকে তার জন্য অন্যান্য শক্তিও কাজ করে। কারা এই ক্ষুদ্রফিনান্সের মালিক? উন্নয়ন বা বিকাশ যাই বলি না কেন, তার লক্ষণ তো হতে পারে না কৃষির উপর স্বনিযুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া? গ্রামে অকৃষিক্ষেত্রের বিকাশ হল না কেন? গ্রামের মানুষের আয় কোথা থেকে হবে?
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামকে ঘিরে গত কয়েক বছরে ঘটে গেছে একের পর এক দুর্নীতি। মনরেগা, আবাস যোজনা, পরিবেশ, শিক্ষায় নিয়োগকে কেন্দ্র করে আর্থিক কেলেঙ্কারির পরিমাণ সীমাহীন। এ ছাড়াও বালি পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি নানা কেলেঙ্কারি আদালতে নথিভুক্ত। যে কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি আসলে উন্নয়নের অর্থ বিলোপ করে, যেন জলের পাইপ ফেটে গিয়ে জল বেড়িয়ে যাচ্ছে। আর্থিক দুর্নীতি আসলে মানুষের আর্থিক বঞ্চনা সৃষ্টি করে। এই দুর্নীতি যখন সংগঠিত আকার নেয়, তখন গ্রামেরই এক অংশ বেশির ভাগ মানুষের আর্থিক বিপর্যয়ের চক্রটি বাইরে থেকে মজবুত করে। এই অংশ কারা? কিছু মানুষ তো এই প্রক্রিয়ায় লাভবান হয়, সেটাই স্বাভাবিক। এই লাভবান অংশই রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকে এবং এইভাবেই গ্রামে নব্য ধনী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে।
পারিবারিক নিম্ন আয়ের চক্রের বাইরে যারা থাকে তাঁরাই এই ক্ষমতার মাতব্বরদের ধরে মধ্যস্তত্বভোগীর কাজ করে। কেউ কেউ এই অংশকে রেন্টিয়ার ক্লাস বলেছেন। কৃষিক্ষেত্রে সমবায় সেভাবে গড়ে ওঠেনি সর্বত্র, তাই কৃষি উৎপাদনে উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেচের জল, সার, কৃষির সব উৎপাদনের প্রয়োজনীয় পণ্যেই মুনাফা লুটছে এই অংশ। সেই মুনাফা বাড়ছে এবং কৃষিতে মজুরি কমছে। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে নয়া উদারীকরণের ত্রিশ বছর অতিক্রান্ত। সেই অর্থনীতির লাগামছাড়া আগ্রাসী পথ এরকমই। এই আগ্রাসী পুঁজিবাদ কর্পোরেটের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা। তাই পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে যে নব্য ধনী অংশ, যে অংশ এই আর্থিক দুর্নীতির অংশীদার, সেই অংশের সাথে মিত্রতায় বদ্ধ হয়েছে এই কর্পোরেটের অংশ। বৃহৎ পুঁজির মালিক আর মধ্যসত্ত্বভোগীর মধ্যে এখানে কোনো সংঘাত নেই— একে অপরের মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করে চলেছে। যে-প্রক্রিয়ায় একে অপরের মুনাফা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে চলেছে এই দুটি অংশ সেই প্রক্রিয়াতেই আবার গ্রামের সাধারণ মানুষের পারিবারিক আয় নিচের দিকে রাখার যে চক্র তা মজবুত করে রাখছে। এই অংশ পরিবারগুলির নিম্ন আয়ের চক্রকে বাইরে থেকে মজবুত রাখে যার ফলে গ্রামের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি কখনোই এই নিম্ন আয়ের চক্র থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে না। ক্রমশ তাঁরা এই নিম্ন আয়ের চক্রকে তাঁদের ভবিতব্য বলে ভেবে নেয় এবং এই চক্রের বাইরে বেড়িয়ে আসা সম্ভব, এই সত্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্রমে তাঁদের মধ্যে হারিয়ে যায়।
এ এক নয়া নিয়মে লুটেরা পুঁজিবাদের শোষণ। এই শোষণের সঙ্গে তাই কৃষিতে অতীতের জমি ভিত্তিক শোষণের পার্থক্য রয়েছে কিন্তু বিরোধ নেই। অতীতের অনেক বাস্তুঘুঘুরা গ্রামে ফিরে এসে এই নব্য ধনী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যাদের জমিতে বর্গা আইন বসেছিল, তারাই চলে এসেছে বর্গার অধিকার কাড়তে। বর্গা আইন জমিতে উচ্ছেদ আটকেছিল। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত ছিল জমির অধিকারও। তাই বর্তমানে শোষণের চরিত্র কৃষি, অকৃষি, শিল্প সব কিছুরই পরিপন্থী। লুটেরা পুঁজির সাথে দীর্ঘকালীন উৎপাদন ব্যবস্থার সম্পর্ক নেই— তা শুধু আপতকালীন মুনাফা বোঝে। এই পদ্ধতি নিঃসন্দেহে আত্মবিধ্বংসী। কোনো-না-কোনো প্রক্রিয়ায় এই পদ্ধতি ধ্বংস হতে বাধ্য কারণ এই পদ্ধতি অবিরাম চলার মতো মুনাফাকে রসদ করতে পারে না। তাই নিম্ন আয়ের যে চক্রকে বাজি রেখে বা বলপ্রয়োগ করে এই মুনাফা বা আপাত-মুনাফা ভোগ করে যে অংশ তা আর্থিক, রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে টিকিয়ে রাখা কষ্টকর কারণ এই পদ্ধতির কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। তাই এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য বলপ্রয়োগ বা দুষ্কৃতায়ন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে আমরা এই ঘটনাই প্রত্যক্ষ করছি এখন। এই অর্থনীতি নির্ভর করে চলেছে দুষ্কৃতিদের শক্তির উপর।
এই নিম্ন আয়ের চক্রকে বাইরে থেকে যে-শক্তি টিকিয়ে রাখছে তা রাখঢাক না-রেখেই এই কাজ করছে, কিন্তু এই পদ্ধতিতে নিম্ন আয়ের চক্রকে পাকাপাকি করার চেষ্টাও তারা করবে, এটাই স্বাভাবিক। গ্রামের মানুষের আয় বৃদ্ধির সব পথগুলিও তাই একে একে বন্ধ করে দিয়েছে এই শক্তি। তাই কৃষি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিতে উৎপাদনে শ্লথতা, প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা— এটাই গ্রামবাংলার ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকাশের তারিখ: ২৪-মার্চ-২০২৬ |