কমরেড গালিব, এক মহান প্রগতিশীল কবি

রাজা নাঈম
গালিবের মেজাজটাই ছিল ব্যঙ্গ ও হাস্যে ভরপুর। নিজের ক্ষতিকে নিয়ে তামাশা করবার ক্ষমতাও তার ছিল। তুমি ঘৃণা করতেন কেবল ভাবের অগভীরতা, লোকদেখানো জমক ও ছেলেমানুষিপনা; উনি পছন্দ করতেন উদ্ভাবনী ক্ষমতা, মৌলিকত্ব, অনন্যতা, লালিত্য ও বিশুদ্ধতা।
শিল্পী ও কবিরা সর্বাগ্রে আমাদের জীবনকে করে তোলে সুরগীতিময়— তাঁরা তৈরি করেন আনন্দচ্ছ্বাসের প্রতিবেশ। আলোকিত করেন আমাদের মননকে, দেখান মানবতার সর্বোচ্চ গন্তব্যের দিকে আমরা কিভাবে এগিয়ে চলেছি।

আজ থেকে দেড়শ বছর আগের ১৫ ফেব্রুয়ারি মরণের কোলে ঢলে পড়া গালিব দুনিয়ার সেই বিরলতম মহান শিল্পীদের মধ্যে একজন, যিনি সময়ের সরণি বেয়ে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ আরো বেশি জনপ্রিয় হয়েছেন। রূঢ় বাস্তব যদিও এই যে জীবিত থাকাকালীন গালিব তাঁর প্রাপ্য মহিমার আসন কখনো পাননি।

গালিবের কবিতার খ্যাতি ওঁর যৌবনেই আগ্রা, দিল্লি-সহ উত্তর ভারতের সমগ্র ঊর্দুবলয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল; কিন্তু গালিবের কাব্যের আকার ও অর্থ— দুই-ই ওঁর নিজের সময়ের প্রচলিত ও জনরুচিসম্মত ঘরানার থেকে পৃথক ছিল। ওঁর কবিতার অর্থ ছিল অনন্য, কবিতার সৌন্দর্য ছিল অভূতপূর্ব। একে হৃদয়ঙ্গম ও উপভোগ করতে হলে মনকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করতে হত— আর তার জন্য দরকার ছিল সময়।

গালিবের সমকালে উত্তর ভারত ছিল অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা, এবং দুর্বলতায় দীর্ণ, তীব্র বেদনা ও যন্ত্রণায় কাতর। এই পরিপ্রেক্ষিতে, তখনকার অধিকাংশ কবিতা হয় মরশুমি সস্তা উচ্ছলতায় পূর্ণ অথবা চূড়ান্ত হতাশা ও পরাজয়ের ভাবনায় ভরে থাকত। গালিবের নিজের ব্যক্তিগত জীবন ছিল অভাব, দুর্দশা ও দারিদ্র্যের লম্বা কাহিনি। সঙ্গী ছিল ওর 'নিজের সত্যিকারের কোনো কদর নেই'- এই যন্ত্রণাকর অনুভূতি।

কিন্তু গালিবের মহানুভবতা এইখানেই যে ওই জমানার অন্য বহু কবির মত 'হয় ভাঙো বা গড়ো'— এই দর্শনের অনুসারী উনি ছিলেন না। তিনি পরিপার্শ্বের শিকার হননি, বরং তাকে অতিক্রম করেন, এভাবেই নিজের চেতনার ক্ষয়কে এড়িয়ে যেতে পারলেন। 'ওয়াদাত-আল-ওয়ুজুদ' (বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য)-এর দর্শন থেকে তিনি বৈপ্লবিক ও প্রগতিশীল ফল বের করতে সক্ষম হন। এমন কি ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, স্থিতি-গতিকে দেখবার সময়েও তিনি বুঝতে পারেন মুখোমুখি দাঁড়ালে এরা পরস্পরের বিপরীত হলেও জীবন ও তার সমস্ত প্রকাশ আদতে ঐক্যের রূপ। এই বিশৃঙ্খলার পরিসরে, তার নজরে মানুষের অস্তিত্বটাই এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার ঠেকে!

গালিবের কথায়,
'জীবনের জাঁকজমক পেরিয়ে তাকাও
এই যে গোলমাল, হইচই-আমাদেরই কল্যাণে
মানুষ নামের এই ধূলিধূসরিত পর্দার ওপার থেকে
এক রহস্যঘেরা ভবিষ্যঘটন ঝিলমিল করে চলেছে!'

এ কারণেই গালিব এই মানুষকে ভালবাসতেন; কারণ তাঁর হৃদয় ছিল উৎসাহ, আকাঙ্ক্ষা ও কামনা, আবেগ ও আশায় সদা ভরপুর। আর যখন সে নিজেকে শোক-দুঃখ, ব্যর্থতা ও দুর্ভাগ্যের ক্ষোভের আবর্তে বাঁধা পড়তেও দেখত, তখনো তিনি বলতেন:
'ঘরে যা টুকু বেঁচে ছিল তা তোমার দুঃখের জন্য রাখা
যাতে দুরমুশ করতে পারে তা
যা আমাদের এককালের গড়ে তুলবার বাসনা হিসেবে জানতাম,
এখনও তা ভীষণ প্রবল!'

এই অনুরূপ গড়ে তুলবার অপেক্ষা, জীবন নির্মাণ ও তার শোভাবৃদ্ধির চূড়ান্ত স্পৃহা, স্থায়ী অশান্ত চিত্ত এবং ওই একই মননের সন্তাপ, গালিবের ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে দামি মূলধন। যে হৃদয় এইরকম অস্থিরমতি ও অধৈর্য্য নয়, এবং যে মানসের জীবনকে রূপান্তরের একাগ্রতা নেই, গালিবের মতে তা নীচ, চ্যুতিময় ও ঘৃণ্য।
'গালিব, সুখী-ও তৃপ্ত মানুষের কঠিন, শীতল হৃদয় সম্বন্ধে সজাগ থেকো
যে হৃদয় ও জীবন দুঃখ ও কাতরতা ধারণ করে (তাকে সম্মান করা চলে)
কতই না সহৃদয় অনুগ্রহ এই মনে ও জীবনে রয়েছে!'

আরেকটি কবিতায়, এই একই বিষয়ে তিনি বলছেনঃ
'যদি আমি কাউকে ঈর্ষা করে থাকি, তবে সেই ব্যক্তি
নিশ্চয়ই একা ঘোরে ফেরে, ভুখা ও তৃষ্ণার্ত
পাহাড়ের পাথুরে উপত্যকায়-
সে হারাম (মক্কার পবিত্র স্থান)-এর তৃপ্ত চিত্ত নয় নিশ্চিত
যে আব-ই-জমজম (মক্কার হাগারের কুয়োর জল) দিয়ে নিজেদের প্রাণের তেষ্টা মেটায়।'

গালিবের মেজাজটাই ছিল ব্যঙ্গ ও হাস্যে ভরপুর। নিজের ক্ষতিকে নিয়ে তামাশা করবার ক্ষমতাও তার ছিল। তুমি ঘৃণা করতেন কেবল ভাবের অগভীরতা, লোকদেখানো জমক ও ছেলেমানুষিপনা; উনি পছন্দ করতেন উদ্ভাবনী ক্ষমতা, মৌলিকত্ব, অনন্যতা, লালিত্য ও বিশুদ্ধতা।

গালিবের মতে মানবতার মহোত্তম লক্ষণ ছিল জীবনের প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করা। তিনি বিরক্ত হতেন কেবল আবেগের একমাত্রিক প্রকাশে, নিষ্প্রাণতায় ও ক্রমক্ষয়িষ্ণুতায়। একটা চিঠিতে, মজার মোড়কে তিনি লিখছেনঃ
         'যখন আমি জান্নাতের কথা ভাবি আর ভাবি আমার সব গুনাহ মাফ হয়ে যায় যদি, আর আমাকে একজন হুরি-সহ এক মহল দেওয়া               হয় ইনাম রূপে, এই শাশ্বত আস্তানা ও সারা জীবন ওই একই খুশনসিব মানুষীর সঙ্গে কাটাবার কথা ভেবেই আমার হৃদয় অশান্ত হয়ে          ওঠে; আর হৃৎপিণ্ড যেন লাফিয়ে গলায় চলে আসে, ওই হরি ক্রমে ক্লান্ত হবে, আর কেন-ই বা হৃদি উদ্বিগ্ন হবে না, ওই একই                           পান্নাপ্রাসাদ আর ওই একই তুবা(জন্নতের গাছ)'র ডাল...'
 
গালিব নিশ্চিত অভিজাত জীবনধারণের সঙ্গে সম্যক পরিচিত ছিলেন, যাতে অসংবেদনশীলতা ভরপুর, মানবতা, বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানের অভাব এবং সৌন্দর্য ও বিশুদ্ধতা-মুক্ত আত্মম্ভরী সুখসন্ধান সম্পৃক্ত ছিল; তাই তিনি নিশ্চিতভাবেই প্রবল বিচ্ছিন্নতা ও ঘৃণাবোধ করতেন এই সব থেকে। তিনি সর্বদা প্রকৃত রত্নের খোঁজে ব্রতী ছিলেনঃ
'জন্নত থেকে সেই আনন্দের খোঁজ করো
যা জামশেদ পেয়েছিল
ওর আড়ম্বর পেতে চেওনা (যেহেতু
ওর কোনও মূল্য নেই)
যদি তোমার পেয়ালায় দ্রাক্ষারস থেকে থাকে,
জেনো ওটাই আদত
জেনো ওটাই ধন্য করে, পেয়ালাটি নয়
কাছে চুনির তৈরিই হোক না কেন।'

একটি চিঠিতে এক জায়গায় গালিব তাঁর 'আনন্দে'র ধারণা পেশ করছেন স্পষ্ট ও সাদামাটা ভাষায়ঃ
        'শোনো সাহেব, কোনও এক মানুষের যেকোনো এক শখের মাফিক যেকোনো রকম রুচি যদি থাকে এবং সে তার জীবন অসংকোচে             তাতে কাটাতে পারে, তবে তাকেই আনন্দ বলতে হবে।'

কারোর ইচ্ছেমতো কাজ করবার স্বাধীনতা কেবল 'আনন্দে'র সঠিক সংজ্ঞা এমনটা নয়, বরং ব্যক্তির স্বাধীনতারও সংজ্ঞা। শ্রেণিসমাজ যদিও এই সুযোগ খুব বেশি দেয় না। গালিবের সামনে যদি সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের ধারণা পেশ করা হত, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি একই সুযোগ পাবে, উনি নির্ঘাত সোৎসাহে একে সমর্থন করতেন।

তিনি চাইতেন যেহেতু কৃচ্ছ্রসাধন ও স্বাধীনতা এবং ত্যাগ ও প্রশ্রয়ের মত মণিমুক্তো মানুষের সংগ্রহে রয়েছে, মানুষকে এগুলি ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ দেওয়াও বাঞ্ছনীয়; এবং প্রবল সাধ নিয়ে তিনি বলেনঃ
        'যদি গোটা দুনিয়াতে না-ও হয়, অন্তত যে শহরে আমি থাকি, সেখানে যেন কোন ভুখা-নাঙ্গা মানুষকে দেখা না যায়। খোদার হাতে                  দণ্ডিত, মানুষের হাতে প্রত্যাখ্যাত, দুর্বল, পীড়িত, (এক) ফকির, প্রতিকূলতার হাতে বন্দি, আমার এবং আমার বক্তব্য ও দক্ষতার ব্যাপার          নির্বিশেষে, যে মানুষ কাউকে ভিক্ষা করতে দেখতে সইতে পারে না, নিজে দোরে দোরে ঘুরে ভিক্ষারত অবস্থাতেও, সে মানুষ হলাম                 আমি।'

গালিব এই বেদনাতুর চিঠি লেখেন আজ থেকে প্রায় দেড়শ' বছর আগে। কিন্তু দুনিয়া কতই না বদলেছে! গালিবের কলম আমাদের সবথেকে মূল্যবান আত্মিক উপহার আর গালিব আমাদের সবথেকে ভালোবাসার কবি। ওনার গুণ আজ বিশ্ব দরবারে উজাড়, ওনার খ্যাতি ক্রমবর্ধমান, এবং ওঁর মনের আশ 'যেন কোনো ভুখা-নাঙ্গা মানুষকে না দেখা যায়' দুনিয়াতে বাস্তবায়িত হয় উনি মারা যাবার ৫০ বছরের মধ্যেই, ১৯১৭তে যখন রাশিয়াতে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হয়।
 
— রাজা নাঈম একজন পাকিস্তানি সমাজবিজ্ঞানী, গ্রন্থ সমালোচক ও পুরস্কার বিজয়ী অনুবাদক, বর্তমানে লাহোর নিবাসী। উনি লাহোরের প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতিও বটে।

ভাষান্তর: দেবরাজ দেবনাথ

ঋণ: দ্য ওয়্যার

প্রকাশের তারিখ: ২৯-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org