বাংলায় কৃষি ও কৃষক বাঁচাবার লড়াই 

সঞ্জয় পূততুণ্ড
বামফ্রন্ট সরকারের সময় গ্রামাঞ্চলের সমস্ত সমবায়গুলিকে উদ্যোগী করে লক্ষ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে ব্যাপকতম ধান সংগ্রহ অভিযান সংগঠিত হতো। কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা মূল্য অপেক্ষা কুইন্টাল প্রতি ১০০ টাকা বাড়তি দামে রাজ্যের সর্বত্র ধান সংগ্রহ হতো। সে ব্যবস্থা হবে আরো প্রসারিত। এবার ১৬টি ফসলের সংগ্রহ ব্যবস্থা করা হবে উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ দামে। বর্তমানে কেরালার অর্ধেক দামে পশ্চিমবাংলায় কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয়। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত দামও এ রাজ্যের কৃষক পায় না— সে দামে ধান বিক্রি করে ফড়েরা।

পুঁজির সর্বগ্রাসী আক্রমণে বিপন্ন কৃষি ও কৃষক। মানুষের শ্রম এবং প্রকৃতির সম্পদে পুঁজির নির্মম দখলদারি চাই- এ উদ্যোগ তীব্রতর হতেই ৯০-এর দশকে দেশে নেমে আসে ভয়ঙ্কর কৃষি সংকট। সংকট প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে কৃষির উপর নির্ভরশীল দেশের ৬০ শতাংশ মানুষকে। কৃষি উৎপাদনে ঘাটতি, শুরু হয় আত্মহত্যার মর্মান্তিক মিছিল। পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার কৃষককে নিয়ে লড়াই করে চলে। ২০১১-তে তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠার ছ’মাসের মধ্যেই শুরু হয় কৃষক আত্মহত্যা। এবছরে বিশেষ করে, বিপর্যস্ত আলু চাষীর আত্মহত্যাও রাজ্য সরকারকে বিচলিত করেনি। বিপুল অর্থব্যয় এবং হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে কৃষকের বাড়ছে শুধু ঋণের বোঝা— বিপর্যস্ত তার জীবন যাত্রা।

কৃষক কিনবে বেশি দামে, বেচবে কম দামে

বাজার সম্পূর্ণ পুঁজির দখলে। জমিতে ‘জো’ এল— কৃষক মাঠে নামতে উদগ্রীব। কিন্তু চাষের জন্য চাই বীজ-সার-যন্ত্র-কীটনাশক— সবটাই আসবে পুঁজিপতির কাছ থেকে। দাম তারাই স্থির করবে। তাদের স্থির করা দামে কৃষির উপকরণ সংগ্রহ করে নিজেকে নিংড়ে মেহনত ঢালবে তার প্রাণ প্রিয় জমিতে। মাঠে ফসল ভালো হতে দেখেও কৃষকের বুক জুড়িয়ে যায়। কিন্তু তারপরেই শঙ্কা ফসলের দাম মিলবে তো। সার-বীজের মতো উৎপাদিত পণ্যের দামও স্থির করবে পুঁজিপতিই— কৃষক নয়। কারণ পাইকারি ব্যবসা তাদেরই দখলে। কৃষক পুঁজিপতির কাছে কিনছে কৃষির সমস্ত উপকরণ। আবার পুঁজিপতির কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে তার উৎপাদিত ফসল। উভয় ক্ষেত্রেই দাম স্থির করার ক্ষমতা পুঁজিপতির। ফলে কৃষকের লোকসান অনিবার্য। এবার কৃষকের পুঁজিতে টান— জমিই তার একমাত্র পুঁজি। তাই লোকসানের পরিমাণ জমি বন্ধক বা সরাসরি বিক্রয়। এপথেই পুঁজি মানুষের শ্রম ও প্রকৃতি সম্পদ লুট করে চলেছে। ভারতবর্ষে শাসক বিজেপি দল, বিশেষত বাংলার শাসক তৃণমূল কংগ্রেস কৃষককে এমনই ভয়ঙ্কর সর্বনাশের শেষ প্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।

চাই বিকল্প নীতি

কৃষক, তথা দেশ বাঁচাতে চাই বিকল্প নীতি, বিকল্প কর্মসূচি। দেশের মধ্যে একমাত্র কেরালা রাজ্য বিকল্প নীতিতেই কৃষককে রক্ষার দায়িত্ব পালন করে চলেছে। কৃষি সংকটে সারাদেশে যখন কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে, পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকারের সময় ধান-সবজি-মাছ উৎপাদনে বিকল্প নীতি প্রয়োগ করেই উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশে ছিল শীর্ষস্থানে। আজ কেরালার বাম গণতান্ত্রিক সরকার বিকল্প নীতি কার্যকর করে নজির সৃষ্টি করেছে। পুঁজির লুট আপাতত বন্ধ হবে না। কিন্তু বিকল্প পথে রাজ্যের কৃষি-কৃষককে বাঁচাবার কার্যকর উদ্যোগের বাস্তবতা অবশ্যই রয়েছে। দেশ-বিদেশের প্রতিক্রিয়ার ষড়যন্ত্রীরা বিকল্পনীতির জন্যই বামফ্রন্টকে উদ্যোগী ছিল। সেই বিকল্প নীতির আরো উন্নত প্রয়োগই রাজ্যকে বাঁচাতে পারবে।

বামফ্রন্ট সরকারের সময় গ্রামাঞ্চলের সমস্ত সমবায়গুলিকে উদ্যোগী করে লক্ষ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে ব্যাপকতম ধান সংগ্রহ অভিযান সংগঠিত হতো। কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা মূল্য অপেক্ষা কুইন্টাল প্রতি ১০০ টাকা বাড়তি দামে রাজ্যের সর্বত্র ধান সংগ্রহ হতো। সে ব্যবস্থা হবে আরো প্রসারিত। এবার ১৬টি ফসলের সংগ্রহ ব্যবস্থা করা হবে উৎপাদন ব্যয়ের দেড়গুণ দামে। বর্তমানে কেরালার অর্ধেক দামে পশ্চিমবাংলায় কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয়। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারিত দামও এ রাজ্যের কৃষক পায় না— সে দামে ধান বিক্রি করে ফড়েরা।



মুনাফা-শিকারী, ফড়ে, তোলাবাজদের বামফ্রন্ট সরকারের সময় অনেকটা সংযত থাকতে হয়েছে। আজ তারা শুধু বেপরোয়া নয়, আজ শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীসহ প্রশাসন ওই ভূমিকায় বেপরোয়া। নিচু তলায় খুঁটে খাবার লোকের সংখ্যাটা সীমাহীন। ব্যাপক বিস্তৃত ভূমি সংস্কারের বাংলায় আজ বিপরীত উদ্যোগ চলছে। চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে বর্গা-পাট্টা জমির রেকর্ড লোপাট করার ষড়যন্ত্র চলছে।

সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অফিস হাসপাতাল কর্মীর অভাবে ধুঁকছে। কিছু ক্ষেত্রে শাসক দলের কর্মীদের কিছু ভাতা দিয়ে সিভিক ভলেন্টিয়ার নামে পোষণ করা হচ্ছে। বামফ্রন্ট আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সমস্ত শূন্য পদ পূরণের দায়িত্ব পালন করবে স্বচ্ছতার প্রক্রিয়ায়। 

কর্মসংস্থানের বিকাশের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পে দেশের মধ্যে রাজ্যের প্রথম স্থান আবার পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সাথে উদ্যোগ চলবে বৃহৎ শিল্প পুনস্থাপনের। নারী সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে রাজ্য উদ্যোগী হবে। আগামী ৫ বছরে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠন করে তাদের কাজে যুক্ত করা হবে। 

কৃষিসহ সমস্ত ক্ষেত্রে গভীর আর্থিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ সমবায় ব্যবস্থার কার্যত অনুপস্থিতিতে মাইক্রো ফিনান্স-এর নির্মম উৎপাত চলছে গ্রাম শহরে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়ির মেয়েদের টাকা কষা চলছে। এই সকল সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রবীনদের জন্য চালু করা হবে স্বাস্থ্য সেবা প্রকল্প। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে গরীব নাগরিকদের মাসিক ৬০০০ টাকা পেনশন চালু করা হবে। 

নদী ভাঙ্গন গ্রামীণ জীবনে গভীর সংকট ডেকে আনে। ভাঙ্গন রোধের পরিকল্পিত উদ্যোগ চলবে। আবার মজা নদী খাল পুকুর জলা ভরাট করার উদ্যোগ নির্মমভাবে বন্ধ করা হবে। জমি মাফিয়াদের কঠোরভাবে সংযত করতে হবে। 

সংখ্যালঘু ও আদিবাসী প্রধান এলাকায়  স্কুল-কলেজের হোস্টেল নির্মাণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সমস্ত এলাকায় আঞ্চলিক সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করা হবে। আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চার পূর্ণ উদ্যোগ আবার চালু করা হবে।

ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনা কৃষি ও কৃষককে বিপর্যস্ত করে জমির উপর পুঁজিপতিদের দখলদারি কায়েমের উদ্যোগ চলছে। তৃণমূল পরিচালিত রাজ্য সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষক। তারা ধর্ম বর্ণের বিভেদকে প্রশ্রয় দিয়ে কেন্দ্রীয় উদ্যোগকেই সহায়তা দিয়ে চলছে। সমগ্র দেশের বামপন্থী বিকাশকে বাধা দিতেই প্রতিক্রিয়ার শক্তি অর্থ ও প্রচার দ্বারা এই অপশক্তিকে রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করিয়েছে। 

রাজ্য আজ ধ্বংসের কিনারায়। তাই বিকল্প বাম নীতি পুনপ্রতিষ্ঠা করেই রাজ্যকে বাসযোগ্য করতে হবে।


প্রকাশের তারিখ: ১২-এপ্রিল-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org