গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব অনির্দিষ্টকাল অস্বীকার করা যায় না- ১

এস ওয়াই কুরেইশি
এখন তামিনলাড়ুর সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের আসন সংখ্যার ফারাক প্রায় ৪০টি। সম্প্রসারিত সংসদে এই ফারাকটা হয়ে যেতে পারে ৬০। সংসদে ভোট আনুপাতিক হারে হয় না। একেবার নির্দিষ্ট সংখ্যার ভিত্তিতে হয়। সংখ্যাগত এই শক্তি জোটের পাটিগণিতকে প্রভাবিত করে, প্রভাবিত করে মন্ত্রিসভা গঠনকে, প্রভাবিত করে সংবিধান সংশোধনকে এবং  সর্বোপরি প্রভাবিত করে ভারতীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে। 

হায়দরাবাদে আসাটা আমার কাছে সবসময়ই বেশ উপভোগ্য। ভারতের খব কম শহরই ভারত–ভাবনাকে এত ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছে। হায়দরাবাদ কখনই কট্টর বিভাজনে বিশ্বাস করেনি। এখানে অনায়াসেই মিলেমিশে থাকে ভারতের উত্তর আর দক্ষিণ, মিলেমিশে থাকে উর্দু ও তেলুগু, বিরিয়ানি আর প্রযুক্তি। এখানে হাত ধরাধরি করে সহাবস্থান করে পুরোনো কালের মাধুর্য এবং বিশ্বায়িত যুগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সব কিছু অনুক্ষণ থাকে পাশাপাশি, থাকে মিলমিশে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সাংসদ এবং এই দেশ সাধারণ নাগরিকদের অধিকারের স্বপক্ষে সরব যত কণ্ঠস্বরের জন্ম দিয়েছে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে নীতিনিষ্ঠ যিনি— সেই কমরেড পুচালাপল্লি সুন্দরাইয়ার নামাঙ্কিত ৪১তম স্মারক বক্তৃতা দেওয়াটা আমার কাছে বিশেষ সম্মানের। সুন্দরাইয়া একথা উপলব্ধি করেছিলেন যে গণতন্ত্র মানে শুধুমাত্র নির্বাচন নয়। গণতন্ত্র মানে হল, ক্ষমতার কাঠামো সত্যি সত্যি ক্ষমতাহীনদের সেবা করছে কিনা। ভাষাভিত্তিক পনুর্গঠন, যুক্তরাষ্ট্রীয় সমতা, বিদ্যমান ব্যবস্থা যাদের পিছনের সারিতে ফেলে রেখেছে তাদের মর্যাদা প্রদান— তিনি এসবের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। আজ আমি আপনাদের সামনে যে প্রশ্নটা রাখব তা হল— গণতান্ত্রিক সমানাধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা— এ দুইয়ের মধ্যে ভারতে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষিত হচ্ছে। এই বিষয়েই সুন্দরাইয়া আলোচনায় মগ্ন হতেন যুগপৎ আবেগ ও অনমনীয়তার সঙ্গে। আশা করি, আমার এই বক্তৃতায় সেই ঐতিহ্যের প্রতি অন্তত কিছুটা হলেও সম্মান দেখাতে পারব। 

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় খুব শিগগিরই যেটা সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে সেটা হল: সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাস। এই বিষয়টা আলোচনা করার আদর্শ জায়গা হল হায়দরাবাদ।

এই সেই দিন পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, সংসদীয় আসনের সীমানার পুনর্বিন্যাস এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আলোচনা নিশ্চিতভাবেই দশ মিনিটের মধ্যে সম্মেলনের হল ফাঁকা করে দেবে বলে গ্যারান্টি দেওয়া যায়। এই বিষয়ের আলোচনাটা ছিল একেবারেই সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও আমাদের মতো নির্বাচনী আধিকারিকদের বিশেষ অধিকার। হঠাৎ করেই দেখা গেল, বিষয়টা রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে— এবং এ-নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিধানসভায়, টেলিভিশন স্টুডিওয়, অ্যাকাডেমিক সেমিনারে, এবং ক্রমশ বেশি বেশি করে উঠে আসছে গোটা দক্ষিণ ভারত জুড়ে সাধারণ মানুষের কথাবার্তায়। 

কেন?

কারণ অনেকগুলি দক্ষিণের রাজ্য এই ভয় পাচ্ছে যে তাদের সাফল্যই তাদের রাজনৈতিক অসুবিধার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একেবারে গোড়া থেকে যে সব রাজ্য শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিনিয়োগ করে এসেছে, তারা এখন ভয় পাচ্ছে যে সংসদে তারা তাদের প্রভাব খোয়াতে পারে। এই ভয় পাওয়াটা নির্দিষ্টভাবে এই কারণে যে, তারা জাতীয় লক্ষ্য পূরণ করে বসে আছে। এটা এমন এক স্ববিরোধ যা জাতীয় স্তরে রীতিমতো মনোযোগ দেওয়ার মতো বিষয়।

এরই পাশাপাশি, উত্তরের রাজ্যগুলিও সমানভাবে ন্যায্য একটা প্রশ্ন তুলতে পারে:  অতীত হয়ে যাওয়া একটা যুগের জনসংখ্যা সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভারত কত দিন ভরসা রাখতে পারে? যে গণতন্ত্রে সামিল ১৪০ কোটি মানুষ, তার সংসদীয় পাটিগণিত এমন একটা সেন্সাস বা জনগণনার ওপর কি ভরসা করতে পারে, যে গণনা শেষের সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল ৫৪ কোটি ৮০ লক্ষ?

দুটি যুক্তির পক্ষেই গণতান্ত্রিক বৈধতা রয়েছে। সেকারণেই সীমানা পুনর্নির্ধারণ শুধুমাত্র একটা টেকনিক্যাল কর্মসূচি নয়। এটা ভারতীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ ভারসাম্যের প্রশ্ন। 

ইস্যুটা যেন দক্ষিণ বনাম উত্তরের সংঘাতে পরিণত না-হয়। বিষয়টাকে এভাবে দেখাটাই বিপজ্জনক ও অতি সরলীকরণ। প্রতিটি বৃহৎ যুক্তরাষ্ট্রই জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য — এ-দুইয়ের মধ্যে সংঘাতের মুখে পড়ে। ভারত গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই দ্বিধা বা উভয় সংকটের ভুক্তভোগী। তবে এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট প্রজ্ঞার সঙ্গে এই সংঘাতকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছে এই দেশ। 

মানচিত্র যখন অনড়

অনেক ভারতীয় এ-কথা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন না যে, আমাদের সংসদীয় মানচিত্র চালু রয়েছে সেই ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে। বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে লোকসভার আসনগুলির বণ্টন সেই ১৯৭৬ সাল থেকে কার্যত হিমায়িত বা অনড় অবস্থায় রয়েছে। এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। এটা ছিল সচেতন রাজনৈতিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত।

ভারত এই স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, যদি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিনিধিত্বকে কঠিন নিগড়ে বাঁধা হয়, তাহলে যে সব রাজ্য জন্মের হার নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে রাজনৈতিক ভাবে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। তাই প্রথমে ২০০১ সাল পর্যন্ত সংসদ আসন পুর্নবণ্টন স্থগিত করে রাখে। তারপর ৮৪তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং বলা হয় ২০২৬ সালের পর প্রথম জনগণনা পর্যন্ত এটা স্থগিত থাকবে। সাংবিধানিক এই মুহূর্তটি এখন দ্রুত সামনে চলে আসছে।

আশা করা যায় পরবর্তী জনগণনা হবে ২০২৭ সালে। তারই ফলে স্বাধীনতার পর এই প্রথম দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস হবে যার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। যখন পুনর্বিন্যাস স্থগিত রাখা শুরু হয়, তখন ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৫৪ কোটি ৮০ লক্ষ। এখন আমাদের জনসংখ্যা ১৫০ কোটির কাছে পৌঁছচ্ছে। অথচ প্রতিনিধিত্বের বিষয়টা দাড়িয়ে রয়েছে পিছনে ফেলে আসা অন্য এক ভারতের পাটিগণিতের ওপর— জনসংখ্যাগতভাবে সেই ভারতের অস্তিত্ব আর নেই।

মানবিক খতিয়ানের হিসাব কষলে দেখা যাক এর অর্থ কী দাঁড়ায়। আজকের দিনে উত্তরপ্রদেশের কোনও লোকসভা কেন্দ্রে ২০ লক্ষ ভোটার থাকতে পারে। আবার কেরলের কোনও লোকসভা কেন্দ্রে এর অর্ধেক সংখ্যক ভোটার থাকতে পারে। দুটি কেন্দ্রই একজন করে সাংসদ নির্বাচন করে। তার মানে উত্তরপ্রদেশের এক জন নাগরিকের ভোটের সংসদীয় একক ১ হলে, কেরলের একজন নাগরিকের ভোটের সংসদীয় এককের ভার তার দ্বিগুণ, এক্ষেত্রে ২। এই অস্বাভাবিকত্ব নেহাত তুচ্ছ নয়। কয়েক দশক ধরে এই অসঙ্গতি জমে জমে একটা গুরুতর গণতান্ত্রিক ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। 

আমাদের সংবিধান প্রণেতারা এ-কথা জানতেন যে ভারত শুধুমাত্র সংখ্যার গণতন্ত্র নয়। ভারত আসলে অসাধারণ বৈচিত্র্যসম্পন্ন একটি ইউনিয়ন। ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একমাত্র সাংগঠনিক নীতি সংখ্যাগত গরিষ্ঠতা হতে পারে না। সেই প্রজ্ঞাকে আবারও পরীক্ষার মধ্যে ফেলা হচ্ছে। সম্ভবত সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর থেকে এই প্রথম বার সেই প্রজ্ঞাকে ফেলা হচ্ছে আরও কঠোর পরীক্ষার মধ্যে। 

দক্ষিণের উদ্বেগ

দক্ষিণ ভারতে যে উদ্বেগ রয়েছে তা বাস্তব, যুক্তিসঙ্গত এবং সংবিধানসম্মত। তামিলনাড়ু, কেরল, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে একেবারে গোড়া থেকেই জনসংখ্যায় স্থিতিশীলতা আনার বিষয়টা কার্যকর করেছে। জন্মের হার কমেছে। নাটকীয়ভাবে বেড়েছে নারীশিক্ষা। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। এই রাজ্যগুলি সেগুলিই করেছে যা তাদের করতে বলা হয়েছিল।

এখন এই পরিস্থিতি থেকেই দেখা দিচ্ছে স্ববিরোধিতা।

তামিলনাড়ুর এখনকার জন্মহার আনুমানিক ১.৮— যা উর্বরতার হার ২.১-এর অনেক নীচে। উল্লেখযোগ্য উন্নতি সত্ত্বেও উত্তরপ্রদেশে এই হার এখনও প্রায় ২.৭। ভিন্ন ভিন্ন জনসংখ্যাগত পছন্দের কারণে গত ৫০ বছর ধরে এই ফারাক জমে জমে এখন বিপুল হয়ে উঠেছে। অতএব যদি নির্ভেজাল জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদীয় আসন স্থিরীকৃত হয়, তাহলে এই ফাঁক বা পার্থক্যটা সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যেও অনুপ্রবেশ করবে। 

দক্ষিণের নেতারা সংকীর্ণতা দোষে দুষ্ট নন। তাঁরা একটা মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন: যে সব রাজ্য মানব উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে তাদের কি সেজন্য শাস্তি দেওয়া হবে? জাতীয় স্তরে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি। এবং একে আঞ্চলিক মনোভাব বলে খারিজ করে দেওয়া যাবে না।

উত্তরের দাবি

যদি ন্যায্যত বিচার করতে হয় তাহলে সমান গুরুত্ব দিয়ে অন্যপক্ষের দাবিও শোনা উচিত। 

যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের কাছে প্রতিনিধিত্বের ভার নির্ধারণের বিষয়টি, কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতুবি রাখা বা অস্বীকার করা যায় না। এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মূল্য— এই নীতি চিরকালের জন্য স্থগিত রাখা যায় না।

বিহার বা উত্তর প্রদেশের একজন তরুণ ভোটারকে এ-কথা বলা যায় না যে, তাঁর ভোটের ভার বা ওজন কম, কারণ তাঁর রাজ্যে জনসংখ্যা দ্রুত হারে বেড়েছে। কারণ ওই তরুণ ভোটার তো আর জনসংখ্যা বিষয়ক নীতি নির্ধারণ করেননি। তিনি জন্মেছেন ওই নীতি গৃহীত হওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে। সুতরাং, স্থায়ীভাবে তাঁর ভোটের ভার বা ওজন কমিয়ে ধরার মানে হল এক ধরনের গণতান্ত্রিক বৈষম্যমূলক আচরণ করা।

উত্তরের রাজ্যগুলি পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। তারা বদলাচ্ছে। সেখানে জন্মহার কমছে। শিক্ষার মান বাড়ছে। সে-কারণে ১৯৭১-এর ক্ষণচিত্রের ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব অনড় বা হিমায়িত করে রাখার মানে হল যে পরিবর্তন ঘটে গেছে তাকে অস্বীকার করা এবং যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে তাকেও অস্বীকার করা। 

উত্তরের দাবি স্রেফ রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের দাবি নয়। আসলে এ হল গণতান্ত্রিক মর্যাদার প্রশ্ন।

সরকারের আশ্বাস

প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার বার দক্ষিণের রাজ্যগুলিকে এই আশ্বাস দিয়েছেন যে, আসন পুনর্বিন্যাসের পর কোনও রাজ্যই একটি আসনও হারাবে না। আনুপাতিক বরাদ্দের বিষয়টি রক্ষিত হবে। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে সংসদের আসন সংখ্যা বেড়ে হবে ৮৫০। এতে লাভ হবে দক্ষিণের রাজ্যগুলিরও। তামিলনাড়ুর আসন ৩৯ থেকে বেড়ে হতে পারে প্রায় ৬০। উত্তরপ্রদেশের আসন সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ৬৯ থেকে ১২০।

এই আশ্বাসকে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। এর মধ্যে রয়েছে এই অঙ্গীকার যে, আসন পুনর্বিন্যাস জনসংখ্যাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটা হাতিয়ার হয়ে উঠবে না।

কিন্তু সংসদীয় রাজনীতি সংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতে চলতে পারে না। আসলে চলে ভোটদান ক্ষমতার যথার্থ শক্তির ওপর।

এখন তামিনলাড়ুর সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের আসন সংখ্যার ফারাক প্রায় ৪০টি। সম্প্রসারিত সংসদে এই ফারাকটা হয়ে যেতে পারে ৬০। সংসদে ভোট আনুপাতিক হারে হয় না। একেবার নির্দিষ্ট সংখ্যার ভিত্তিতে হয়। সংখ্যাগত এই শক্তি জোটের পাটিগণিতকে প্রভাবিত করে, প্রভাবিত করে মন্ত্রিসভা গঠনকে, প্রভাবিত করে সংবিধান সংশোধনকে এবং  সর্বোপরি প্রভাবিত করে ভারতীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে। 

অঙ্ক বিচার করে আনুপাতিক সমতাকে। রাজনীতি পরিমাপ করে কার্যকলাপগত প্রভাবকে। 

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ঠিক এখানেই।

অন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়

বৃহৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাসম্পন্ন দেশগুলির মধ্যে ভারতই প্রথম এমন উভয়সংকটের মোকাবিলা করছে, বিষয়টা মোটেই এরকম নয়।
জনসংখ্যা যাই হোক না কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট প্রতিটি প্রদেশকে দুজন করে সেনেটর দেয়। ওয়াইওমিং প্রদেশের জনসংখ্যা  ৬ লক্ষের কম এবং ক্যালিফোরনিয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। অথচ দুটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্বই সমান। এতেও ভারসাম্যের অভাব তৈরি হয়। তবে নিখাদ জনসংখ্যাগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটা একটা ব্রেক হিসাবে কাজ করে।

একই ধরনের শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে জার্মানির বুন্দেসরাট থেকে। সেখানে রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব শুধুমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে নয়। বরং সেখান রয়েছে একটা স্তরবিন্যস্ত ব্যবস্থা। সবচেয়ে ছোটো রাজ্যগুলির আসন তিনটি, মাঝারি রাজ্যগুলির চারটি করে, তার চেয়েও বড়ো রাজ্যগুলির আসন পাঁচটি করে এবং সবচেয়ে বড়ো রাজ্যের আসন ৬টি। এই গুরুত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছে যাতে ছোটো রাজ্যগুলিকে নিরাপত্তা দেওয়া যায় এবং একই সঙ্গে জনসংখ্যাগত বাস্তবতার স্বীকৃতি দেওয়া যায়। এই ভারসাম্য— বিশুদ্ধ সমতা নয়, আবার বিশুদ্ধ অনুপাতও নয়— এটাই নির্দিষ্টভাবে সেই ধরনের সৃজনশীল ফেডারাল চিন্তা যা ভারতের এখন দরকার। 

জনসংখ্যা যাই হোক না কেন, অস্ট্রেলিয়া প্রতিটি রাজ্যকে দিয়েছে ১২টি করে সেনেটের আসন। আবার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে প্রতিফলিত হয়েছে জনসংখ্যা। এই দুটি চেম্বার একসঙ্গে গণতান্ত্রিক সমতার সঙ্গে ফেডারাল নিরাপত্তার ভারসাম্য তৈরি করে দিয়েছে।

এই শিক্ষাগুলির মধ্যে একটা সুসঙ্গতি রয়েছে: বৃহৎ বৈচিত্র্যসম্পন্ন ফেডারেশনগুলি প্রায় সর্বদাই বিশুদ্ধ জনসংখ্যার পাটিগণিত থেকে উচ্চতর কক্ষকে রক্ষা করে রেখেছে। ভারতের সংবিধানও ঠিক এই যুক্তিটাকেই বিবেচনা করতে চেয়েছে। এখানে প্রশ্নটা হল, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জনসংখ্যাগত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছে কিনা। 

(শেষাংশ আগামীকাল)

সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাস এবং ভারতীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যত সম্পর্কে হায়দারবাদে ৪১তম পুচালাপল্লি সুন্দরাইয়া স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার এস ওয়াই কুরেইশির ভাষণ।

অনুবাদ- সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ০৬-জুন-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org