|
গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব অনির্দিষ্টকাল অস্বীকার করা যায় না- ২এস ওয়াই কুরেইশি |
|
|
বিকল্প যা হতে পারে সমাধানের অনেকগুলি উপায় গভীরভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে: তৃতীয় বিকল্প হল ধাপে ধাপে পুনর্বণ্টন — দুটি কিংবা তিনটি নির্বাচনী চক্রের পর্বের মধ্যে দিয়ে ধীর ধীরে রদবদল করা। নাটকীয় কোনও পরিবর্তনের চেয়ে এটা ভাল। এতে রাজনৈতিক অভিঘাত কমে এবং গণতান্ত্রিকভাবে বিষয়টা মানিয়ে নেওয়া যায়। এর আগেও ধীরে চলো বা ধাপে ধাপে এগোনোর নীতি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পক্ষে ভালই কাজ করেছে। ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলির পুনর্গঠন নির্দিষ্টভাবে সফল হয়েছে এই কারণেই যে, পাটিগণিতের রষকষহীন হিসাবনিকাশের বদলে এক্ষেত্রে বিষয়টির স্পর্শকাতরতা ও ধৈর্যের ওপর ভরসা রাখা হয়েছিল। এই সব বিকল্পের মধ্যে আমার মতে যৌগিক বা মিশ্র ফর্মুলাই সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। এই ফর্মুলায় গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা — দুটোকেই মর্যাদা দেওয়া হয়। এতে ভালভাবে শাসন পরিচলনার জন্য প্রণোদনাও সৃষ্টি হয়। আবার সংবিধানের ওপর ছুরিকাঁচি চালাতে হয় না। অর্থ কমিশনের মডেলে এই ব্যবস্থাই কার্যকর হচ্ছে এবং সেই ব্যবস্থাকে ভারত ইতিমধ্যেই বৈধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। রাজ্যসভার প্রশ্ন লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের আলোচনা থেকে আশ্চর্জজনক ভাবে অনুপস্থিত রাজ্যসভা। এই বিতর্ক কিন্তু আমাদের বাধ্য করে রাজ্যসভার দিকটিও খতিয়ে দেখতে। সংবিধান প্রণেতারা রাজ্যসভা গঠন করেছিলেন কাউন্সিল অফ স্টেটস হিসাবে —তাঁরা চেয়েছিলেন এটা এমন একটা কক্ষ হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিকে রক্ষা করা হবে। তবে আমাদের রাজ্যসভা সেই উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশের রয়েছে ৩১টি রাজ্যসভার আসন। তামিলনাড়ুর ১৮। যদি পুর্নবিন্যাসের পর লোকসভার আসন সংখ্যার ফারাক বাড়ে, তাহলে এখন রাজ্যসভা যে ভাবে গঠিত হয়ে আছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ক্ষতি যথেষ্ট মাত্রায় পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একটা আরও সহজতর, আশু সংস্কার করা যেতে পারে। বাসস্থান সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তাকে ফেরাতে হবে। রাজ্যসভায় যিনি তামিলনাড়ুর প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য তাঁর সঙ্গে তামিলনাড়ুর সত্যিকারের সম্পর্ক থাকতে হবে। এটাও কোনও রাডিক্যাল ভাবনা নয়।এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রাথমিক স্তরের যুক্তি। গভীরতর প্রশ্ন শেষ বিচারে লোকসভা আসনের পুর্নবিন্যাস ভারতকে আরও একটা গভীরতর প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করবে: একটা বিশুদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ব্যবস্থা যা চালিত হবে নিখাদ জনসংখ্যাগত পাটিগণিতের ভিত্তিতে, সেটাই কি গ্রহণ করা হবে? নাকি ভারত বেছে নেবে একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্র যেখানে সংখ্যাগত সমতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে অঞ্চলগুলির আস্থা এবং জাতীয় সংহতি? ভারতীয় ইউনিয়নের তরফে অবশ্যই দক্ষিণের কাছে এই বার্তা যেন না যায় যে, ‘যেহেতু তোমরা সফল হয়েছ তাই তোমাদের প্রভাব অবশ্যই কমাতে হবে।’ এটা রাজনৈতিকভাবে মোটেই সুচারু পদক্ষেপ হবে না এবং নীতিগতভাবে হবে অসমর্থনীয়। এমনটা হলে ভারতের সব রাজ্যের কাছে এই বার্তা যাবে যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা মানে রাজনৈতিকভাবে শাস্তির খাঁড়া নেমে আসা। একইসঙ্গে ভারতীয় ইউনিয়ন দেশের উত্তরকে একথা বলতে পারে না যে, ‘যেহেতু তোমাদের জনসংখ্যা বেড়ে গেছে তাই তোমাদের গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের মূল্য অবশ্যই থাকবে গুরুত্বের বিচারে স্থায়ী ভাবে খাটো হয়ে।’ গণতন্ত্র তখনই বৈধতা পায় যখন প্রতিটি নাগরিকের ভোটের গুরুত্ব হয় সমান। যে পথে এগোতে হবে ভারতের সংবিধান তৈরিই করা হয়েছে ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। লোকসভা জনসংখ্যার প্রতীক। রাজ্যসভা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে নিরাপদে আড়াল করে রেখেছে। অর্থ কমিশন সমতার ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। ভাষা নীতির বিকাশ ঘটেছে নানা ভাষার দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। ভারতের প্রতিভা সর্বদা তার অবস্থান রক্ষা করেছে কঠোরতম অভিন্নতার মধ্যে নয়, বরং আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে সহাবস্থানের নীতির মধ্যে। আসন পুনর্বিন্যাসের সমস্যার সমাধানে সেই প্রতিভাকেই কাজে লাগাতে হবে। জন্মের হারে সমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই যে মিলে যাওয়াটা একটা সুযোগ তৈরি করবে —হয়ত সেই পরিস্থিতি পুরোপুরি তৈরি হতে এক দশক কিংবা ১৫ বছর লেগে যাবে— সেই সময়পর্বে ভারত ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তুলতে পারে। সাংবিধানিক সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলে সংহতিনাশক কোনও সমাধানসূত্রে পৌঁছনোর চেয়ে আগের বিকল্পটাই বরং ভাল। ভারতের জনসংখ্যা কত তা গণনা করবে ২০২৭ সালের সেন্সাস। আবার ভারতের সংবিধান সম্পর্কিত প্রজ্ঞা কতদূর তা প্রমাণিত হবে আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে। যদি বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাহলে এই পর্বান্তর ভারতে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করবে এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রীয় বাঁধনকে রক্ষা করবে। তবে যদি খুব খারাপ ভাবে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা আঞ্চলিক উদ্বেগের শিকড় আরও গভীরে পৌঁছে দিতে পারে এবং এই প্রজাতন্ত্রের নৈতিক ভারসাম্যকে অস্থির করে তুলতে পারে। সব পক্ষের অবস্থান কঠোর হয়ে ওঠার আগে, আলাপ আলাচনা না করেই কোনও একটা সূত্র ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার আগে, ঐক্যমত্যে না পৌঁছেই সাংবিধানিক পুর্নগঠন শুরু করার আগে — এখনই হল যুক্তিবিচার সহকারে আলোচনার উপযুক্ত সময়। অতএব নজির রয়েছে। সেই প্রজ্ঞাও আমাদের রয়েছে। প্রশ্ন হল এগুলো কাজে লাগানোর নতো রাজনৈতিক ইচ্ছা আমাদের আছে কিনা। এখন ভারতের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটা স্রেফ এই নয় যে: প্রতিটি রাজ্য কটি করে আসন পাবে? আরও গভীরতর চ্যালেঞ্জ হল: গণতান্ত্রিক সমতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সুসঙ্গতি ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে আমরা কী ভাবে রক্ষা করব। আগামী দশকে এটাই হবে সবচেয়ে নির্ধারক সাংবিধানিক প্রশ্নগুলির মধ্যে অন্যতম। এই প্রশ্নের যে উত্তর আমরা দেব সেটাই ঠিক করে দেবে আগামী প্রজন্মগুলিতে ভারতীয় ইউনিয়নের চেহারা কেমন হবে। সুতরাং অন্বেষণ শুরু হোক — মনোযোগ সহকারে, জরুরি ভিত্তিতে, এবং সংবিধানের সেই মর্মবস্তুকে স্মরণে রেখে, যে সংবিধান এই অসাধারণ ইউনিয়নটিকে ৭৫ বছর ধরে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে। সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাস এবং ভারতীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যত সম্পর্কে হায়দারবাদে ৪১তম পুচালাপল্লি সুন্দরাইয়া স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার এস ওয়াই কুরেইশির ভাষণ। ভাষান্তর – সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ০৭-জুন-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |