|
এক নির্ভীক মার্কসবাদী ঐতিহাসিকমালিনী ভট্টাচার্য |
তিনি ভারত চর্চায় মার্কসবাদী তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন।অনেকের ভুল ধারণা আছে মার্কসবাদীরা সংস্কৃতিকে অর্থনীতির উপরিকাঠামোর অংশ বলে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। প্রফেসর পানিক্করের লেখা পড়লে এই ভুল ধারণা দূর হতে পারে, কারণ ইতিহাসে সংস্কৃতির ভূমিকা তাঁর বিশ্লেষণে গভীর তাৎপর্য পেয়েছে। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংস্কৃতির যে একটি চলিষ্ণু ও গুরুত্বপূর্ণ রূপ আছে, তা অধ্যাপক পানিক্কর তাঁর বহু লেখায় তুলে ধরেছেন। |
অধ্যাপক কে এন পানিক্করের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে মনটা খুবই ভারাক্রান্ত। মৃত্যুকালে ওঁর প্রায় ৯০ বছর বয়স হয়েছিল। উনি এমন একজন মানুষ ও ইতিহাসবিদ ছিলেন, যাঁর অনুপস্থিতি আমরা আজ বেশি করে অনুভব করব। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’, যেটার আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ হয়তো সম্ভব নয়। তিনি ছিলেন সেইরকম একজন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল।স্বাধীন ভারতবর্ষে বা তার আগেও অনেক পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল কেই আমরা পেয়েছি; ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অধ্যাপক পানিক্কর অন্যতম – যিনি একজন বিদ্বান, সুবক্তা এবং সুদক্ষ শিক্ষক হিসেবে তাঁর স্বাক্ষর রেখে গেলেও, বর্তমান সময়ে একজন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবেই তাঁকে আমরা মনে রাখব।তিনি নিজের বিষয়ে অগ্রগণ্য পণ্ডিত, সুদক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষাবিদ -- এই সবই ছিলেন, কিন্তু আজকের দিনে তাঁকে আমরা বিশেষভাবে মনে রাখব একজন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসাবে যিনি নিজের পরীক্ষিত অভিমত প্রকাশ্যে জানাতে ভয় পেতেন না। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত বই, Towards Freedom 1940, যা ICHR (Indian Council Of Historical Reasearch) থেকে প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি বিভিন্ন দলিলের ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রামাণ্য ইতিহাদ লিখেছেন। শুধু তাই-ই নয়, সেখানে তাঁর বিশ্লেষণের চরিত্রকেও খুব পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরেছেন। সেই বিশ্লেষণের চরিত্রটা আজকের দিনে বিশেষ জরুরি এ কারণেই, যে আমরা ইতিহাসের এত রকমের বিকৃতি দেখতে পাচ্ছি, যা শুধু একদল দক্ষিণপন্থী ঐতিহাসিকই করছেন, তা নয়; সমাজমাধ্যম, গণমাধ্যম সহ বহু জায়গায় যাঁরা ইতিহাসে চর্চার সঙ্গে কোনও ভাবেই যুক্ত নন, তাঁরাও এই ইতিহাস বিকৃতির অংশ হয়ে উঠছেন বা তাকে আরও প্রসারিত করছেন। এটার বিরুদ্ধে তিনি আমাদের বহু আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি উগ্র জাতীয়তাবাদকে ইতিহাসচর্চার ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে তা কেবল ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকা গবেষক, শিক্ষার্থী, ঐতিহাসিকদেরই ক্ষতি করবে না; বরং সমগ্র সমাজের ক্ষতিসাধন করবে। তিনি সবসময় এই সংকীর্ণ উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে কথা বলে এসেছেন। আজীবন তিনি এই ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায়, প্রকাশ্যে রুখে দাঁড়িয়েছেন। একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদের মতোই, তথ্য প্রমাণ সহ সেই ভুল যুক্তি, দাবিগুলিকে খণ্ডন করেছেন। সেজন্যই তিনি একজন যথার্থ পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল, যার অবদান কেবল ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমগ্র সমাজে মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। দিল্লির Indian School Of Social Sciences থেকে প্রকাশিত Social Scientist পত্রিকাটির সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই পত্রিকাটিকে নির্মোহ ইতিহাস চর্চার এক ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে তুলে ধরতে তিনি বিশেষ অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ভারত চর্চায় মার্কসবাদী তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন।অনেকের ভুল ধারণা আছে মার্কসবাদীরা সংস্কৃতিকে অর্থনীতির উপরিকাঠামোর অংশ বলে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। প্রফেসর পানিক্করের লেখা পড়লে এই ভুল ধারণা দূর হতে পারে, কারণ ইতিহাসে সংস্কৃতির ভূমিকা তাঁর বিশ্লেষণে গভীর তাৎপর্য পেয়েছে। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংস্কৃতির যে একটি চলিষ্ণু ও গুরুত্বপূর্ণ রূপ আছে, তা অধ্যাপক পানিক্কর তাঁর বহু লেখায় তুলে ধরেছেন। A Concerned Indian’s Guide to Communalism এবং Culture and Consciousness in Modern India এই বইগুলিতে তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তাঁর বহু উল্লেখযোগ্য বই আছে, যার সবগুলির নাম এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বহু বইয়ে তিনি মার্কসবাদী অর্থনীতির যে বিস্তৃত একটি দিক, যেখানে সমাজবদলের ক্ষেত্রে অর্থনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির যে অঙ্গাঙ্গী যোগাযোগ তার কথা তুলে ধরেছেন। A Concerned Indian's Guide to Communalism, যেখানে তিনি সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র কীভাবে বিকশিত হয়, সেবিষয়ে খুব মূল্যবান সন্দর্ভ রেখে গেছেন। Social Scientist পত্রিকাটির কথা তো আগেই বললাম। তিনি আরও একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখান থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ শুরু। নাট্যকর্মী সফদার হাশমির মৃত্যুর পর, তাঁর স্মরণে নাট্যভাবনায় অনুপ্রাণিত বহু মানুষকে নিয়ে তৈরি হয় সংগঠন ‘সহমত’(Safdar Hashmi Memorial Trust) যা ভারতের ইতিহাসে সংস্কৃতির বহুত্বের পক্ষে এবং তার ওপর নানা আক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এই সংগঠনের সঙ্গে জুড়ে ছিলেন। শেষ করব এটা বলেই যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সবাইকেই এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু আজকের দিনে যখন আমাদের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস যখন RSS-BJP অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির হাতে বিপন্ন, তখন তাঁর এই অনুপস্থিতি অনেক বেশি করে অনুভূত হবে। তাঁর মৃত্যুতে তাঁকে স্মরণ করা অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু, তিনি যে মূল্যবোধের প্রতিনিধি ছিলেন, ইতিহাস, সংস্কৃতি চর্চার প্রতি সেই মূল্যবোধকে জিইয়ে রাখাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। প্রকাশের তারিখ: ১০-মার্চ-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |