এক অন্তঃসত্বার চোখের জলের চিঠি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

চন্দন দাস
সাম্প্রতিককালে এই অভিযোগে ওডিশা, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, দিল্লি সহ বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা। আরও অনেককেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল ‘বাংলাদেশি’ অভিযোগে। রাজ্য সরকার কী করেছে? সোনালী বিবি সহ রাজ্যের পরিযায়ীদের উপর এই নিপীড়ন থামানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনও চিঠি লেখেননি, কোনও ফোন করেননি প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌কে। 

সোনালী’র চিবুক বেয়ে লোনা তরল ফোঁটা ফোঁটা নামছিল, স্পর্শ করছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি। 

সোনালী একবার দেখতে চাইছিলেন তাঁর সন্তানকে। আফরিন খাতুনকে। আদালতে ভিডিও কল বেআইনি। ভারতে যা নিয়ম, বাংলাদেশেও তাই। বৃহস্পতিবারও সেই কারণে সুদূর বীরভূমের পাইকরের দর্জিপাড়ায় মায়ের অপেক্ষায় থাকা মেয়ের মুখ সোনালী বিবি’র দেখা হয়নি। সোনালীর এদিনও জামিন হয়নি। অন্তঃসত্বা সোনালী এদিনও জবাব পাননি তাঁর প্রবল প্রশ্নের—  ‘আমার বাচ্চা হয়ে গেলে তার কী হবে?’ 

সোনালী বিবি অন্তঃসত্বা। তিনি বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলে বন্দী। অভিযোগ? বেআইনি ভাবে তিনি বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। তিনি অনুপ্রবেশকারী। সোনালী এখন খুবই অসুস্থ। সোনালীর মামলা দেখভাল করতে বীরভূম থেকে গেছেন মফিজুল সেখ। মফিজুলের কথায়,‘‘আমি কী জবাব দেবো সোনালীর প্রশ্নের? সোনালী খুবই অসুস্থ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাসপাতালে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি হয়েছে। যে কোনও দিন ও প্রসব করতে পারে। কী হবে তখন?’’ 

মফিজুল জানেন না। সোনালী জানেন না। আমরাও কী জানি? জানি না। শুধু জানি—  এখন যাঁর কোনও দেশ নেই, ভারত এবং বাংলাদেশ, দুই দেশই যাঁকে নাগরিক বলে মানতে চায় না, সেই সোনালী বিবি’র প্রশ্ন, আসলে অনাগত সন্তানেরও প্রশ্ন। তাই, তাঁর গর্ভে শ্বাস নিতে থাকা সন্তানের পরিচয়-জিজ্ঞাসা ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’র অন্যতম প্রশ্ন। যে নির্মমতা সোনালী বিবি সহ ৬ জনকে সহ্য করতে হচ্ছে, তার জবাব দিতে বাধ্য করা ছাড়া লড়াইয়ের শেষ হয় না। হতে পারে না। আগামী ৩০ নভেম্বর আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে সোনালী বিবিদের মামলা উঠবে। আর তার আগের দিন রাজ্যে শুরু হবে পদযাত্রা, তুফানগঞ্জ থেকে।


[সোনালী বিবি, সুইটি বিবি এবং তাদের দুই সন্তান ও দানিশ শেখ বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানায়।]

সোনালীর চোখের জলে ভাসা প্রতিটি শব্দ স্লোগান হোক।

বীরভূমের পাইকরের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবি, স্বামী দানিশ শেখ, ছেলে সাবির এবং একই এলাকার সুইটি বিবি, দুই ছেলে কুরবান ও ইমামের ঠাঁই বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সংশোধনাগারে বিচারাধীন বন্দী। বীরভূমের পাইকরের দর্জিপাড়া থেকে সপরিবারে দানিশ শেখ, সোনালি বিবি, সুইটি বিবিরা পাড়ি দিয়েছিলেন দিল্লি বেশ কয়েকবছর আগে। কুড়িয়ে আনা লোহা, লক্কর বিক্রি করে বেঁচে ছিলেন তাঁরা। এই রাজ্যে কাজ মেলেনি, তাই তাঁরা ভাংরির কেনাবেচায় জীবনধারণের লক্ষ্যে ভারতের রাজধানীতে গেছিলেন। গত ১৮ জুন দানিশের পরিবারকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। গত ২৬ জুন তাঁদের বিএসএফ ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশে। এই ‘পুশব্যাক’-এর পরে ওই ৬ জনকে গত ২০আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর মডেল থানার পুলিশ ‘অনুপ্রবেশকারী’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। গত তিন মাস তাঁরা সেখানেই বন্দী।

ইতিমধ্যে গত ২৫আগস্ট কলকাতা আদালত নির্দেশ দিয়েছিল ওই ৬জনকে চার সপ্তাহের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে। বাংলাদেশের আদালত ভারতকে বলেছে সোনালী, সুইটিদের ফিরিয়ে নিতে। তাঁদের কাছে আধার কার্ড সহ অন্যান্য নথী আছে। কিন্তু ভারত তাঁদের ফেরায়নি। ভারত সরকারের পুলিশের অভিযোগ কী? ‘বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশি।’ কিন্তু বাদ সেধেছে এসআইআর। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় সোনালী বিবি’র বাবা, মা সহ পরিবারের অনেক সদস্যর নাম মিলেছে।

📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ

সাম্প্রতিককালে এই অভিযোগে ওডিশা, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, দিল্লি সহ বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা। আরও অনেককেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল ‘বাংলাদেশি’ অভিযোগে। রাজ্য সরকার কী করেছে? সোনালী বিবি সহ রাজ্যের পরিযায়ীদের উপর এই নিপীড়ন থামানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনও চিঠি লেখেননি, কোনও ফোন করেননি প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্‌কে। 

তৃণমূলও এই বিষয়ে চুপ। বিলকুল চুপ।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেরা তিন ধরনের বঞ্চনার শিকার হন। প্রথমত, তাঁদের জন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নেই। যা আছে তা মমতা ব্যানার্জিদের মতো শাসকদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি। দ্বিতীয়ত, তাঁদের কোনও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। নির্দিষ্ট মজুরি নেই। পিএফ, গ্র্যাচুইটির মতো কোনও প্রাপ্য তাঁদের জন্য নয়। তৃতীয়ত, তাঁরা যেখানে কাজ করেন, বসবাস করেন, আয় করেন, জীবনযাপন করেন, সেখানে তাঁদের সরকার নির্বাচনের অধিকার নেই। ফলে সেখানে তাঁদের ‘কানাকড়ি দাম’ নেই। 


গত ২১শে জুলাই ধর্মতলায় দলের সমাবেশে ভাষণ দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। তিনি বলেছিলেন,‘‘আমাদের রাজ্যের ২২লক্ষ মানুষ অন্য রাজ্যে থাকেন। আমি তাঁদের ফিরে আসতে বলি। এখানে অনেক কাজ হচ্ছে। অন্য রাজ্যেরও দেড় কোটি মানুষ আমাদের রাজ্যে থাকেন। আমরা কোনও ভাষার অসন্মান করি না।’’ মুখ্যমন্ত্রীর স্মৃতি কী দুর্বল হয়েছে? ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর বারাকপুরে গেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ২০১৯-এর ৩০শে মে নৈহাটি গেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সেখানে কয়েকজন অবাঙালি মানুষ তাঁকে উদ্দেশ্য করে স্লোগান দিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে মমতা ব্যানার্জি,‘‘আমাদের খাবে, আমাদের পরবে, আবার গন্ডগোল করবে? বেঁচে আছো আমাদের জন্য।’’ এরপরেই তিনি পুলিশ কর্তাদের নির্দেশ দেন,‘‘সবার নাম নোট করে নিন। ঘরে ঘরে নাকা চেকিং করুন।’’

পরিযায়ী, ভিন রাজ্যে বসবাসকারী ভিন্ন ভাষার শ্রমজীবীদের ধমকে, চমকে দুমড়ে রাখায় কোনও তফাৎ নেই বিজেপি আর তৃণমূলে।

আর রাজ্যে কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ? যার উপর ভরসা রেখে ফিরে আসতে পারেন পরিযায়ীরা? রাজ্যে কাজের সুযোগ কমেছে। শিল্প বেহাল। বিনিয়োগ প্রায় নেই। মারাত্মক বিষয় দৈনিক মজুরি। যা নারী, পুরুষ সবাইকেই ভিন রাজ্যে যেতে বাধ্য করছে। সোনালী বিবিরা যেখানকার বাসিন্দা, সেই গ্রামাঞ্চলের দিকে তাকানো যাক। ‘মেন অ্যান্ড উওমেন, ২০২৪’-এর রিপোর্ট জানাচ্ছে, গ্রামে শ্রমজীবীদের কাজের বড় ক্ষেত্র কৃষি কাজ। সেখানে যুক্ত আছেন প্রায় ১কোটি ৩২লক্ষ মানুষ, যাঁদের মধ্যে ৪৭শতাংশ মহিলা। অর্থাৎ প্রায় ৬২লক্ষ মহিলা। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে সরকারি নয় এমন ক্ষেত্রগুলিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করা মহিলাদের দৈনিক গড় আয় ছিল ২৭২টাকা। তা চলতি বছরের জুনে পৌঁছেছে ৩২০ টাকায়। তবে এই ক্ষেত্রে গড় আয়ের ওঠানামা আছে। বিভিন্ন সময়ে আয় বাড়ে কমে। বিশেষত চাষের সময়, ফসল কাটার সময় আয় কিছুটা বাড়ে। অন্যান্য সময়ে কমে। দেশের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে শ্রমজীবী মহিলাদের গড় দৈনিক আয়ের বিচারে পশ্চিমবঙ্গ আছে ১৬ নম্বরে। যৌথভাবে এই স্থানে আছে উত্তরপ্রদেশও। 

সোনালী বিবি’রা দিল্লি, মুম্বাইয়ে যাবেন, তাই তো স্বাভাবিক। দিল্লি থেকে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কোথাও মজুরি বৃদ্ধির দাবির জোরালো অস্তিত্ব রয়েছে।

আরও পড়ুন:
মেলায় টাকা ওড়ে, ফেরে না পরিযায়ীরা  


প্রকাশের তারিখ: ২৩-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org