|
এশিয়া মহাদেশে নতুন করে ঠাণ্ডা যুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবিজয় প্রসাদ |
র্কিন উপনিবেশ গুয়ামে মোট স্থলভাগের ২৭ শতাংশের মালিকানা মার্কিন সেনাবাহিনীর। এর ফলে ওই দ্বীপে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক সামরিক ঘাঁটি। ২০ বছর আগেই মার্কিন বায়ুসেনা গুয়ামের অ্যান্ডারসন বায়ুসেনা ঘাঁটিতে মজুত করেছে বেশ কয়েকটি উন্নত ক্রুজ মিসাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা। এখন এখানে রয়েছে বি–১ ও বি–৫২এইচ বম্বার। এবং মার্কিন নৌবাহিনী এখানে নতুন করে গড়ে তুলেছে তাদের নৌ-ঘাঁটি যেখানে মোতায়েন রাখা যাচ্ছে নিউক্লিয়ার অ্যাটাক সাবমেরিন। |
ফেব্রুয়ারি মাসের একেবারে গোড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ঘোষণা করে যে তারা ২০১৪ সালে ফিলিপিন্সের সঙ্গে স্বাক্ষর করা একটি চুক্তি এখন কার্যকর করবে। এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপপুঞ্জের একেবারে উত্তরে লুজন দ্বীপে বেশ কয়েকটা নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরি করবে। সম্ভবত এইসব ঘাঁটিতে রাখা হবে সেই সব যুদ্ধবিমান যা চিনের ওপর, এমনকী তাইওয়ানের কাছাকাছি এলাকাতেও আঘাত হানতে সক্ষম। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন ম্যানিলায় গিয়ে দেখা করেছেন ফার্ডিনান্ড ‘বংবং’ মার্কোস জুনিয়রের সঙ্গে। এই চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনার জন্যই তিনি ম্যানিলায় এসেছিলেন। এ ব্যাপারে আদৌ কোনও আপত্তি করতেই পারেননি জুনিয়র মার্কোস। আসলে তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপিন্সে যে ক্ষোভ জমে উঠছে তা থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে যে কোনও ইস্যুকেই তিনি ব্যবহার করছেন। যে সংকটে ফিলিপিন্সের নাগরিকেরা ভুগছেন সেগুলোর মোকাবিলা করার চেয়ে জুনিয়র মার্কোসের কাছে বরং সহজ হল সবকিছুর জন্য চিনকে কাঠগড়ায় তোলা। নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলি তৈরি হলে মার্কোসের সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং একইসঙ্গে দেশের লোকের নজর তিনি চিনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবেন।
নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলি ফিলিপিন্সে এই প্রথম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়। স্পেনীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ১৮৯৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্প্যানিশ–আমেরিকান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবা, পুয়ের্তো রিকো এবং ফিলিপিন্সের জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহকে দীর্ঘদিন ধরে দমন করে রেখেছিল। এই যুদ্ধে যখন স্প্যানিশ সাম্রাজ্য পরাজয়ের মুখোমুখি হয়, তখন জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলিকে দমন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাই পুরোনো স্পেনীয় উপনিবেশগুলি দখল করে নেয়। দখলদারির অংশ হিসাবে ফিলিপিন্সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটিগুলি নির্মাণ করে। তবে যখন জাপান এইসব দ্বীপ দখল করেছিল তখন সেই ঘাঁটিগুলি আমেরিকার হাতছাড়া হয়। ১৯৪৫ সালে জাপানি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সব এলাকা পুনর্দখল করে নেয়। ১৮৯৯ সালে স্পেনের শাসকদের কাছ থেকে লুজন দ্বীপ ছিনিয়ে নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশেষ করে লুজন দ্বীপের সিউবিক বে [উপসাগরীয়] এলাকার সামরিক ঘাঁটিগুলির ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নিয়েছিল তারা। ১৯৯২ সালে পর্যন্ত সিউবিক বেসহ এই অঞ্চলের বিশাল বিশাল সামরিক ঘাঁটিগুলি চালু রেখেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএসআর ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক করে যে পূর্ব এশিয়ার চারপাশে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলির কাঠামো আংশিকভাবে বন্ধ করে রাখবে। এখন আবার সামরিক ঘাঁটিগুলি সহ লুজন দ্বীপে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা।
২০২২ এর নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, তারা উত্তর অস্ট্রেলিয়ায় টিনডাল–এ রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান বায়ুসেনা ঘাঁটির ক্ষমতা আরও বাড়াবে যাতে ওই ঘাঁটিতে ৬টি বি–৫২এইচ স্ট্রাটোফোর্ট্রেস বম্বার রাখা যায়। এই যুদ্ধবিমানগুলি শব্দের গতিতে উড়তে পারে এবং নিখুঁত লক্ষ্যে চালিত পরমাণু বোমা (nuclear precision guided bombs) বহন করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় এভাবে নতুন করে সামরিক ঘাঁটির ক্ষমতা বৃদ্ধি, ফিলিপিন্সে নতুন একাধিক সামরিক ঘাঁটিকে সক্রিয় করে তোলা, এবং পূর্ব এশিয়ায় অন্যান্য অঞ্চলে (আমেরিকান সামোয়া, গুয়াম, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া) যেসব সামরিক পরিকাঠামো রয়েছে— এসব মোটেই ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার ভারী রণসজ্জার পুরোনো মডেলে তৈরি করা হয়নি। প্রাক্তন মার্কিন বিদেশ সচিব ডোনাল্ড রামসফিল্ডের তত্ত্ব ছিল ‘সামরিক বিষয়ে বিপ্লব’ নিয়ে আসা। এই তত্ত্বের মূল কথা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ভারী রণসজ্জার বদলে আরও শক্তিশালী কিন্তু তুলনায় হাল্কা, গতিশীল পরিকাঠামোর সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা। এই তত্ত্বের প্রভাবে এখনকার সামরিক ঘাঁটিগুলি গড়ে তোলা হচ্ছে বিমানক্ষেত্র ও নজরদারির কেন্দ্রের চারপাশে। এই মডেলের সাহায্যে কমিউনিকেশন বা যোগাযোগের প্রযুক্তির সুবিধা এবং বায়ুসেনা ও নৌসেনার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সেনা মোতায়েন করা যায়। এবং এই মডেলে বিপুল সংখ্যায় পদাতিক সেনা মোতায়েনের দরকার পড়ে না। ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া (ডিপিআরকে) এবং পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না (পিআরসি)— দুটি দেশের হাতেই এখন রয়েছে অত্যন্ত কার্যকর ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তি। ফলে বহু সংখ্যক সেনা জমায়েত করে বিশাল বিশাল সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হলে, সেগুলির ওপর ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে হামলা চালানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রণনীতিগত কৌশল ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পুরোনো আদলের বিশাল বিশাল সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা। এখন এগুলির বদলে তৈরি করা হচ্ছে অনেকগুলি ছোটো ছোটো সামরিক ঘাঁটি, যেমন (থাইল্যান্ডে) কোরাট রয়্যাল থাই বায়ুসেনা ঘাঁটি। আবার ফেডারেটেড স্টেটস অফ মাইক্রোনেশিয়া এবং পালাউয়ে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন ধরনের ছোটো ছোটো সামরিক ঘাঁটি।
মার্কিন উপনিবেশ গুয়ামে মোট স্থলভাগের ২৭ শতাংশের মালিকানা মার্কিন সেনাবাহিনীর। এর ফলে ওই দ্বীপে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক সামরিক ঘাঁটি। ২০ বছর আগেই মার্কিন বায়ুসেনা গুয়ামের অ্যান্ডারসন বায়ুসেনা ঘাঁটিতে মজুত করেছে বেশ কয়েকটি উন্নত ক্রুজ মিসাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা। এখন এখানে রয়েছে বি–১ ও বি–৫২এইচ বম্বার। এবং মার্কিন নৌবাহিনী এখানে নতুন করে গড়ে তুলেছে তাদের নৌ-ঘাঁটি যেখানে মোতায়েন রাখা যাচ্ছে নিউক্লিয়ার অ্যাটাক সাবমেরিন। গুয়াম এমন একটা সামরিক ঘাঁটি যেখান থেকে সর্বোচ্চ পরিকাঠামোগত সুবিধা পেতে পারে মার্কিন নৌসেনা। এখানে আক্রমণকারী জাহাজ, এমনকী বিমানবাহী রণতরীও নোঙর করে রাখা যায়। সামরিক এই সব পরিকাঠামো রক্ষার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোতায়েন করে রেখেছে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স ব্যাটারি (টিএইচএডি)।
এত সব সামরিক প্রস্তুতি কেন কেন চিনের চারপাশের জলসীমায় তাদের সামরিক শক্তি ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না। পেশিশক্তি প্রদর্শনের এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে মার্কিন সরকারের ইন্দো–প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (ফেব্রুয়ারি ২০২২)–তে। মার্কিন সরকারের তরফে বলা হয়েছে, ‘এই তীব্রতর মার্কিন নজরদারি চালু করতে হচ্ছে অংশত এই ঘটনার কারণে যে, ইন্দো–প্যাসিফিক এলাকা ক্রমশ বেশি বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, বিশেষ করে এই চ্যালেঞ্জগুলি আসছে পিআরসি–র তরফ থেকে।’ এই স্ট্র্যাটেজিতে বলা হয়েছে, এভাবে সামরিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য ‘অংশত’ দায়ী চিন। এছাড়া আর কোনও ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়নি। কিন্তু পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নার সঙ্গে সমস্যাটা কোথায়? কারণ ‘চিন ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে একটা প্রভাবাধীন এলাকা গড়ে তুলতে চায় এবং সেই লক্ষ্যে তারা তাদের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিসমূহকে সমন্বিত করছে। এবং তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা হয়ে উঠতে চাইছে।’ এমন কথাই লেখা আছে হোয়াইট হাউজের দলিলে। অন্যভাবে বললে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একথা মনে করে যে ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি’ হিসাবে তাদের নিজেদের যে ভূমিকা, তার বিপরীতে সরাসরি প্রতিযোগী হয়ে উঠতে চায় চিন। পশ্চিমী কর্পোরেশনগুলির কারখানা হয়েই থেকে যাক চিন— এটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায়। কিন্তু চিন যদি এরও ওপরে ওঠার ‘পথ খোঁজার চেষ্টা করে’ তাহলে আমেরিকার সামরিক শক্তির ক্রুদ্ধ দাপট সহ্য করতে হবে চিনকে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার ‘অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিসমূহকে সমন্বিত করতে চায়’ তাহলে সেটা হবে খুবই গ্রহণযোগ্য একটা ব্যাপার এবং তাতে কোনও ক্ষতি নেই। এবং ইন্দো–প্যাসিফিক রণনীতির অংশ হিসাবে ঠিক এটাই করে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর চিন যদি একই কাজ করে তাহলে তা কোনওমতেই মেনে নেওয়া যাবে না। যখন চিন তাদের ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়, তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় ‘গুন্ডামি’। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ক্ষমতা জাহির করে তাহলে সেটা হয়ে দাঁড়ায় ‘বিধিসম্মত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’।
তথ্য–যুদ্ধে এমন সৃজনশীল প্রয়োগের আংশিক লক্ষ্য হল এই কথাটা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যে চিন আসলে ‘সাম্রাজ্যবাদী’, এবং এই ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কিংবা ‘উপনিবেশিবাদ’–এর প্রতিরোধ করবে পশ্চিমী শক্তি এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা (অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া)। চিন যদি তাইওয়ান সহ নিজের ভৌগোলিক সীমারেখার সার্বভৌমত্ব রক্ষার চেষ্টা করে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগেই এক চিন নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে)— তখনই তাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে। চিন যেহেতু তার সীমান্তের বাইরেও বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে তাই তাকে ঘিরে নিঃসন্দেহে চাপ ও সংঘাত বাড়বেই। এবং চিনও তার প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে জাপান সাগর থেকে দক্ষিণ চিনসাগরের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন দ্বীপ নিয়ে প্রতিযোগিতাও বাড়বে (কারণ এই সব দ্বীপ ঘিরে বেশির ভাগ দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে)। তবে এই সব চাপ ও সংঘাত,এমনকী যদি তা বিভিন্ন আয়তনের দেশের মধ্যেও ঘটে, সেই সংঘাত থেকে কখনও সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব হয় না। এটা একেবারেই বোধগম্যতার বাইরে যে, কীভাবে চিন সাম্রাজ্যবাদী— মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এধরনের কথাবার্তা এখন এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছে, এবং এমনকী বামেদের একটা অংশের মধ্যেও এমন অবস্থানের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই ধরনের কথাবার্তার ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া মহাদেশের কিনারা জুড়ে তাদের সামরিক শক্তি গড়ে তোলাটা ন্যায্য অধিকার হিসাবে প্রচার করতে পারছে। যেসব দেশে এই সামরিক শক্তি গড়ে তোলা হচ্ছে তার মধ্যে পড়ে ভারত (ভারতকে এখন বলা হচ্ছে ন্যাটো প্লাস সদস্য দেশ)। এছাড়া রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইজরায়েল, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়া)।
এশিয়া মহাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের আসল কারণ হল অর্থনীতির ক্ষেত্রে চিনের বিপুল অগ্রগতি। চিন এখন ১২০টি দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক অংশীদার, যার মধ্যে পড়ে বেশির ভাগ এশিয় দেশ (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং আসিয়ান ব্লকভুক্ত দেশগুলি)। চিন তার প্রতিবেশী দেশগুলিকে হুমকি দিচ্ছে এবং সেই হুমকি থেকে দেশগুলিকে বাঁচাতেই সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিষয়টা মোটেই এরকম নয়।
বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হল চিনকে একটা গণ্ডীর মধ্যে আটকে ফেলা এবং তার অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করা। চিন হতে চায় ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি’, আমেরিকার এই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয় চিনের এই বিবৃতিতে যে, চিনের কখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হয়ে ওঠার ইচ্ছা আদৌ নেই। কিংবা ভবিষ্যতের ‘বহু মেরুবিশিষ্ট’ কোনও বিশ্ব ব্যবস্থায় চিন নিজেই কোনও একটা ‘মেরু’ হয়ে উঠতে চায় না। চিন বলছে যে তারা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে চায়, আরও শক্তিশালী করতে চায় আঞ্চলিক সংগঠনগুলিকে ও রাষ্ট্রসংঘকে। যদি চিন যা বলছে তা সত্যি বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে বোঝা যাবে যে চিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় না। বরং বিশ্বের শীর্ষ সংগঠন হিসাবে রাষ্ট্রসংঘর গুরুত্বকে সজোরে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। অন্যদিকে আমেরিকা যা বলতে চায় তা হল, চিনের আর্থিক উত্থানকে তারা সহ্য করতে পারছে না, যদিও চিনকে তারা অর্থনীতির দিক থেকে আটকাতেও পারছে না। সেকারণেই চিনের বিরুদ্ধে তারা এখন তাদের পূর্ণ সামরিক ক্ষমতাকে সংহত করে চলেছে। আসলে এটাই হল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, মোটেই চিনা সাম্রাজ্যবাদ নয়।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস প্রকাশের তারিখ: ১৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |