|
কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকর: এক নির্ভীক বিপ্লবীঅশোক ধাওয়ালে |
মুম্বইয়ে ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহের দিনগুলিতে মহিলা সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে নৌসেনাদের খাদ্য সরবরাহ করার কাজে অহল্যা রঙ্গনেকর অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি ব্রিটিশ বুলেটের মুখোমুখি হন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন আরেক সাহসী নারী কোমল ডোন্ডে, যিনি পুলিশের গুলিতে শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। অহল্যার বোন কুসুম রণদিভের পায়েও গুলি লাগে। তবে সর্বক্ষণ গুলিবর্ষণের মুখোমুখি হওয়া প্রতিবাদকারীদের পাশে থাকা সত্ত্বেও বিস্ময়কর ভাবে অক্ষত থেকে যান অহল্যা। |
মহারাষ্ট্র রাজ্য ও দেশের সবচেয়ে নির্ভীক বিপ্লবীদের একজন কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকরের জন্মশতবর্ষের সূচনা হয়েছে ২০২২-এর ৮ জুলাই। ১৯২২ সালের ৮ জুলাই পুণে শহরে জন্মগ্রহণ করেন অহল্যা রঙ্গনেকর। তাঁর পিতা ত্র্যম্বক রণদিভে ছিলেন এক প্রগতিশীল মানুষ যিনি মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে ও অন্যান্য আলোকিত মানুষদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। জাত, ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের তিনি সক্রিয় বিরোধিতা করতেন। অহল্যা তাঁর যৌবনে অগ্রজ বি টি রণদিভের দ্বারা প্রভাবিত হন, যিনি ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃত্বের একজন। পুণে এবং থানে শহরে বিদ্যালয় শিক্ষার শেষে, তিনি ১৯৪২ সালে ২০ বছর বয়সে পুণের ফার্গুসন কলেজে বিজ্ঞানের স্নাতক পাঠক্রমে ভর্তি হন। স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হল, আর তার পরদিনই কংগ্রেসের গোটা নেতৃত্ব চলে গেল কারান্তরালে। সঙ্গে আরও অনেক ছাত্রীদের নিয়ে পুণে শহরে এক প্রতিবাদী জমায়েতে নেতৃত্ব দেন অহল্যা। তাঁদের সকলকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। কারাগারের ভেতরেই মেয়েরা সকলে মিলে সাদা, কমলা ও সবুজ শাড়ির কাপড় কেটে, সেলাই করে কয়লা দিয়ে প্রতীক এঁকে জাতীয় পতাকা তৈরি করলেন। ওখানে জেলের চৌহদ্দিতেই তাঁরা একটি পিরামিড তৈরি করলেন এবং অহল্যা তাঁদের তৈরি করা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন। এই ‘অপরাধে’ তাঁর আটকের মেয়াদ বাড়ানো হল। এ কাজের জন্যে তাঁকে ফার্গুসন কলেজ থেকেও বহিষ্কার করা হয়। ফলে তিনি মুম্বই চলে গিয়ে ভর্তি হন রুইয়া কলেজে এবং সেখান থেকে স্নাতক পাঠক্রমের পড়া শেষ করেন। মেধাবী ছাত্রী হওয়ার পাশাপাশি তিনি একইসঙ্গে ছিলেন প্রতিভাশালী খেলোয়াড়, অভিনেত্রী ও গায়িকা। প্রচুর মেডেল ও পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি এজন্যে।
১৯৪৩ সালে অহল্যা যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে এবং সাথে সাথেই আরও বেশি করে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও শ্রমজীবী নারীদের শ্রেণিগত লড়াইয়ে। ওই বছরই তিনি গঠন করেন প্যারেল মহিলা সঙ্ঘ যা পরবর্তী সময়ে বস্ত্রশিল্পে নিয়োজিত নারীদের অসংখ্য সফল লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই সংগঠনই পরে পরিণত হয় শ্রমিক মহিলা সঙ্ঘে যা আরও অনেক বছর পর মিশে যায় সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সংগঠনে। ১৯৪৫ সালে অহল্যা বিবাহ সম্পর্কে আবদ্ধ হন মুম্বইয়ের অগ্রণী ছাত্রনেতা পাণ্ডুরঙ ভাস্কর রঙ্গনেকরের সঙ্গে যিনি স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে ছিলেন নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের জাতীয় স্তরের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক। পিবিআর (যে নামে তিনি পরিচিত ছিলেন) পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, পার্টি রাজ্য দপ্তরের সম্পাদক এবং মহারাষ্ট্রের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের পরামর্শদাতা। তিনি নিঃসন্দেহে পার্টি জীবনে আমারও পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শক ছিলেন, ঠিক যেমন কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ছিলেন গোদাবরী পারুলেকর। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এই মুখপত্রেই তাঁর জন্মশতবর্ষে একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য লেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। অহল্যার জীবনের সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুম্বইয়ে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌসেনার বিদ্রোহের সময়। কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ উভয়েই নৌবিদ্রোহে সমর্থন জানাতে অস্বীকার করেছিল। প্রকৃতপক্ষে তাদের নেতৃত্ব নৌসেনাদের ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছিল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিই ছিল একমাত্র দল যারা নৌসেনাদের বিদ্রোহের পূর্ণ সমর্থনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও এআইটিইউসির নেতৃত্বে মুম্বইয়ের শ্রমিকশ্রেণি বীর নৌসেনাদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে ধর্মঘট পালন করে রাজপথে নেমেছিল। বিদ্রোহের দিনগুলিতে মহিলা সংগঠনগুলির তরফে নৌসেনাদের খাদ্য সরবরাহ করার কাজে অহল্যা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন নৌসেনাদের উপর নৃশংস দমনপীড়ন নামিয়ে আনে, তখন ব্রিটিশ বুলেটের মুখোমুখি হয়েছিলেন অহল্যা। তাঁর সঙ্গী ছিলেন কোমল ডোন্ডে নামে আরেক সাহসী নারী, যিনি পুলিশের গুলিতে শহিদের মৃত্যু বরণ করেন। আরেক সঙ্গী অহল্যার বোন কুসুম রণদিভের পায়েও পুলিশের গুলির আঘাত লাগে। বিস্ময়কর ভাবে অহল্যা অক্ষত থেকে যান যদিও তিনি সর্বক্ষণ গুলিবর্ষণের মুখোমুখি হওয়া প্রতিবাদকারীদের পাশেই ছিলেন। জনগণের নেতা স্বাধীনতার পর যে বিশাল গণ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন অহল্যা সেটা হল ১৯৫০ এর দশকের ঐতিহাসিক সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি, প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি এবং কৃষক ও শ্রমিক দল জোটবদ্ধ হয়ে গঠন করে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতি। সেই সমিতি নেতৃত্ব দিয়েছিল মুম্বইকে রাজধানী করে ভাষাভিত্তিক মহারাষ্ট্র রাজ্য গঠনের দাবিতে সুতীব্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। এই লড়াইয়ে কংগ্রেস সরকারের বুলেটের আঘাতে ১০৬ জন শ্রমিক ও কৃষক প্রাণ দিয়েছিলেন। সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মহিলাদের শামিল করিয়েছিলেন অহল্যা এবং এর জন্যে তাঁকে পুলিশের লাঠি ও কারাবরণ সহ্য করতে হয়েছিল। বিশিষ্ট মারাঠি সাংবাদিক, লেখক ও এই গণ আন্দোলনের নেতা প্রহ্লাদ কেশব (আচার্য) আত্রে অহল্যাকে নিয়ে ‘রণরঙ্গিণী’ নামে দৈনিক পত্রিকায় একটি কবিতা লেখেন। অহল্যা এরপর নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন বস্তি অঞ্চলের গরিবদের সহায়তা ও সংগঠিত করার কাজে এবং ১৯৬১ সালে মুম্বই পুর নিগমে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি নিয়মিত পুর নিগমে নির্বাচিত হয়ে গেছেন। পুর নিগমের অভ্যন্তরে তিনি ধারাবাহিকভাবে বস্তি অঞ্চলের মানুষের অভাব অভিযোগ, দাবিদাওয়ার কথা তুলে ধরেছেন এবং এর ফলেই এই অংশের জনগণের মধ্যে বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বস্তিবাসীদের অসংখ্য মিছিল সমাবেশ তিনি সংগঠিত করেছেন এবং সেখানে তিনি তাঁদের দাবিদাওয়ার সমর্থনে বক্তব্য রেখেছেন। মুম্বই নগরীর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষের সময় গ্রেফতার করা হয় অহল্যাকে এবং আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যার সুরাহার স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্যে তাঁকে কারান্তরালে থাকতে হয়। বহু কমিউনিস্ট নেতার মতো তাঁকেও ১৯৬২-১৯৬৬ অবধি প্রায় সাড়ে তিন বছর অতিবাহিত করতে হয় কারাগারে। দক্ষিণপন্থী সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ের পর ১৯৬৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সপ্তম কংগ্রেসে সিপিআইএম গঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে যখন অতি বাম সংকীর্ণতাবাদের প্রাদুর্ভাব হয়, তখন অহল্যা পার্টির পাশে দাঁড়িয়ে অতি বাম সংকীর্ণতাবাদের বিরুদ্ধেও লড়াই সংগঠিত করেন। ১৯৭০ সালে কলকাতায় সিআইটিইউ-এর প্রতিষ্ঠার পর মহারাষ্ট্রে সিআইটিইউ-এর সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অহল্যা সাগ্রহ ভূমিকা নেন এবং অনতিবিলম্বেই মহারাষ্ট্র রাজ্য সিআইটিইউ-এর সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ এবং ১৯৮৭ সালে মুম্বই শহরে সিআইটিইউ-এর সর্বভারতীয় সম্মেলন আয়োজিত হয় এবং উভয়ক্ষেত্রেই অভ্যর্থনা সমিতির পক্ষ থেকে এই সম্মেলনের সফল আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অহল্যা। ১৯৭৫ সালে তিনি সিআইটিইউ-এর সাধারণ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিশাল বিশাল ঐক্যবদ্ধ মহিলা আন্দোলন গড়ে ওঠে মুম্বই শহর ও মহারাষ্ট্র রাজ্যে। অহল্যা রঙ্গনেকর, মৃণাল গোরে, তারা রেড্ডি ও অন্যান্য মহিলা নেতৃত্বের উদ্যোগে এই আন্দোলন বিশাল চেহারা নেয় ঐতিহাসিক ‘লাটনে মোর্চা’ বা ‘বেলনী বিক্ষোভ’-এ যেখানে নারীরা রুটির বেলনী হাতে পথে নেমে এসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সোচ্চার হন। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার সারা দেশে জরুরি অবস্থা বলবৎ করে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়। অহল্যা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন এবং ১৯৭৫-৭৭ পর্যন্ত তাঁকে কারাবন্দি করা হয়। ইন্দিরা সরকারের একনায়কতন্ত্রী নীতির বিরোধিতায় সারা দেশে জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই গড়ে ওঠে। মহারাষ্ট্রের প্রতিটি গণআন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েই ১৯৭৭ সালে সিপিআইএম দলের পক্ষে মুম্বই উত্তর-মধ্য লোকসভা আসনের জন্যে অহল্যাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। বিশাল ব্যবধানে কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাস্ত করে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সেবারের নির্বাচনে সিপিআইএম প্রার্থী হিসেবে লাহানু কোম ও গঙ্গাধর আপ্পু বুরান্ডেও মহারাষ্ট্র থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন। লোকসভার সদস্য হিসেবে মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য রাজ্যের জনগণের বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছিলেন অহল্যা। ১৯৭৮ সালে জলন্ধরে অনুষ্ঠিত সিপিআই(এম) এর দশম কংগ্রেস থেকে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে মহারাষ্ট্রের তরফে দুজন নারী সদস্য পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার গৌরব অর্জন করেন। এঁদের একজন হলেন প্রবাদপ্রতিম কৃষক নেত্রী গোদাবরী পারুলেকর (যিনি ১৯৬৭ সালেই কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হযেছিলেন) ও দ্বিতীয় জন অহল্যা রঙ্গনেকর। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্যজনিত কারণে অব্যাহতি নেওয়ার আগে পর্যন্ত অহল্যা সুদীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সময়পর্বে কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকর সিপিআই(এম) মহারাষ্ট্র রাজ্য কমিটির সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে কর্মরত ছিলেন। সারা দেশে তিনিই সম্ভবত এখনও পর্যন্ত পার্টির একমাত্র নারী রাজ্য সম্পাদক। তাঁর চোখের অসুখ গুরুতর রূপ নেওয়ার পর তিনি এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। কিন্তু তার আগে ও পরে এক দীর্ঘ সময় জুড়ে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড অব্যাহত ছিল।
১৯৭৯ সালে অহল্যা সিআইটিইউ-র অন্যতম কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। বিমল রণদিভে ও সুশীলা গোপালনের সঙ্গে তিনি ১৯৭৯ সালে চেন্নাইয়ে শ্রমজীবী মহিলাদের প্রথম সর্বভারতীয় কনভেনশন সংগঠিত করার কাজে প্রধান উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখনই শ্রমজীবী মহিলাদের সর্বভারতীয় সমন্বয় কমিটি গঠিত হয়। এই সমন্বয় কমিটিই পরবর্তীতে শ্রমজীবী মহিলাদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি এবং সংগঠনের সমস্ত স্তরে শ্রমজীবী মহিলাদের নেতৃত্বদায়ী ভূমিকা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৮১ সালে চেন্নাইয়ের সর্বভারতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নিখিল ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির (এআইডিডব্লিউএ) প্রতিষ্ঠার কাজে অহল্যা ছিলেন অন্যতম স্থপতি। সম্মেলন থেকে তিনি সহ-সভানেত্রী নির্বাচিত হন, যে পদে তিনি ছিলেন পরবর্তীতে বহু বছর ধরে। তারপরের পর্বে তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভানেত্রী। আরও পরে তাঁকে সম্মানিত করা হয় এআইডিডব্লিউএ-র উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে। তিনি দীর্ঘদিন মহারাষ্ট্র রাজ্য এআইডিডব্লিউএ-র সভানেত্রীও ছিলেন। সক্রিয়ভাবেই তিনি কর্মরত থেকেছেন সিআইটিইউ ও এআইডিডব্লিউএ দু'টি সংগঠনেই এবং দু'টি সংগঠনেরই প্রতিটি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের নির্দেশে ভারতে যখন নয়া উদারবাদী নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন এর বিরুদ্ধে পার্টি, ভারতের সম্মিলিত ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও মহিলা আন্দোলনের তরফ থেকে ডাক দেওয়া প্রতিটি গণসংগ্রামের অংশীদার হয়েছেন কমরেড অহল্যা। সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের সমস্ত ধরনের প্রকাশের তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতর হওয়া সত্ত্বেও এবং বয়স আশি পেরিয়ে যাওয়ার পরও কর্মতৎপর হয়ে ওঠার জন্যে তাঁর যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তা নবীন প্রজন্মের কাছে এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ২০০৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনসঙ্গী পি বি রঙ্গনেকরের মৃত্যু শেষ বয়সে তাঁর কাছে এক চরম আঘাত ছিল। ৬৩ বছরের সহ-জীবনের পরিসমাপ্তি হয়েছিল এর মধ্য দিয়ে। দুজনেই ছিলেন পার্টি এবং গণ আন্দোলনের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ। এর এক বছর পর, ২০০৯ এর ১৯ এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অহল্যা রঙ্গনেকর। জীবনের ৬৭টি বছর ছিল পার্টির জন্যে নিঃস্বার্থ অবদানের পর্ব। পার্টি ও পার্টির বাইরের, হাজার হাজার মানুষ তাঁর শেষকৃত্যে এসে চোখের জল ফেলেছেন। এই দম্পতি রেখে গেছেন দুই পুত্র, অজিত ও অভয় এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের।
এক অসাধারণ মানুষ এক অসাধারণ মানুষ ছিলেন অহল্যা রঙ্গনেকর। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নিজের কর্মধারার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষকে সহায়তা করা। এই কাজে তিনি প্রায় নিয়মিত মুম্বইয়ের রাজ্য সচিবালয়ে যেতেন। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রীরা তাঁদের দপ্তরে অহল্যাকে প্রবেশ করতে দেখলেই উঠে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাতেন। তিনি কখনওই আগে থেকে তাঁদের সময় নিতেন না। জনগণের ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনেই তিনি তাঁদের অনুরোধ করতেন যা তাঁরা কখনওই ফেরাতে পারতেন না। এমন বিস্ময়করই ছিল তাঁর নীতিগত অবস্থানের জোর। আমি এমনটা নিজের চোখে হতে দেখেছি বহুবার। প্রায় চার দশকেরও আগে, আমরা এসএফআই-তে থাকার সময়ে অসংখ্য জঙ্গি বিক্ষোভ, পথ অবরোধ এবং সচিবালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি নিয়েছিলাম। আমাদের লাঠি ও গ্রেফতারির সম্মুখীন হতে হয়েছে বার বার। পুলিশের কয়েদখানায় অন্তরীণ অবস্থায় পার্টির তরফ থেকে আমাদের দেখতে এসে সাহস দেওয়ার কাজে প্রথম যিনি এসে হাজির হতেন সবসময়ই তিনি ছিলেন অহল্যা তাই। এই নামেই আমরা সশ্রদ্ধ ভালোবাসায় তাঁকে ডাকতাম। দশকের পর দশক ধরে সকালবেলায় তাঁর মুম্বইয়ের বাড়িটা কার্যত জনতার দরবারে পরিণত হত। যদিও তিনি কখনওই ক্ষমতাসীন ছিলেন না। সমাজের সব অংশের মানুষে তাঁর বাড়িতে ভিড় জমিয়ে তাঁদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলত। তিনিও সাধ্যমত তাঁদের সহায়তা করতেন। নিত্যদিনের এই ব্যাপক আকারের মতবিনিময়ের সুবাদেই জনগণের নাড়ির স্পন্দন টের পাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল অহল্যার। আমার মনে আছে, পার্টির রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সভাগুলিতে ভবিষ্যৎ আন্দোলন নিয়ে পরিকল্পনা রচনায় তাঁর এই সহজাত গুণ আমাদের ভীষণভাবে উপকার করত। অহল্যার সাধারণ জীবনযাত্রা তাঁকে সমস্ত কমরেডদের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। শালীনতা ও বাহুল্যহীনতা ছিল তাঁর সর্বসময়ের সঙ্গী। মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্ত্বেও সমস্ত রাজনৈতিক দলের মানুষেরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ছয় দশকের নিঃস্বার্থ ও নিষ্কলুষ রাজনৈতিক জীবনের প্রশংসা করতেন সকলে। এক আদর্শ কমিউনিস্টের দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি অহল্যার আস্থা ছিল প্রশ্নাতীত। দেশ, জনগণ ও পার্টির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অন্তহীন। একসঙ্গে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তাঁর সঙ্গে যে আলাপচারিতা আমার হয়েছে তা থেকে এর প্রমাণ আমি বহুবার পেয়েছি। তিনি প্রাক্তন সাংসদ হওয়ার সুবাদে আমি নিখরচায় তাঁর সফরসঙ্গী হতে পারতাম।
অহল্যা তাইকে নিয়ে আমার শেষতম স্মৃতি হচ্ছে তাঁর জীবনের অন্তিম বর্ষে তাঁর অসংখ্য ফোন কল। আমি তখন পার্টির রাজ্য সম্পাদক এবং আমাদের রাজ্য দপ্তর ‘জনশক্তি’-তে অনেক রাত পর্যন্ত থাকতাম। পার্টি এবং গণসংগঠনে কী কী কাজ হচ্ছে তার খবর নিতেন আর বলতেন, ‘অশোক, আমি কোথাও যেতে পারি না। চোখের জন্যে পার্টির পত্রপত্রিকাও পড়তে পারি না। পিবিআর নেই, তাই তোমাকেই সবসময় যন্ত্রণা দিই’। আমি তাঁকে বিশদে সব জানাতাম। তাঁর এই একাগ্রতার কথা বলতে বলতে কখনও কখনও আমার চোখ সিক্ত হয়ে যেতো। কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকর অমর রহে। জন্মশতবর্ষে কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকরকে জানাই রক্তিম অভিবাদন। — এবছর কমরেড অহল্যা রঙ্গনেকরের জন্মশতবর্ষ। ১৯ এপ্রিল ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। নিবন্ধটি সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপত্র 'পিপলস ডেমোক্রেসি' পত্রিকায় ২০২২ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার প্রকাশের তারিখ: ২৩-এপ্রিল-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |