আদানি ও নয়া উদারবাদী রাষ্ট্র

সাত্যকি রায়
এবার দেখা  যাক এহেন সংস্থার  উপরে আমাদের দেশের আর্থিক কার্যকলাপে কতটা  নির্ভরশীলতা  তৈরী করা  হয়েছে। এই মুহূর্তে আদানিরা ১৯১ টি বৃহৎ প্রকল্প রূপায়ণের  কাজে যুক্ত, যার মোট মূল্য প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকা। তারা সম্প্রতি ১২৩ টি প্রকল্প সম্পূর্ণ করেছে  যার পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ  কোটি টাকা। গৃহীত  প্রকল্প  গুলির মধ্যে রয়েছে ১৩ টি পোর্ট, ৩৩ টি রিন্যুএবল এনার্জি সংক্রান্ত প্রকল্প, ১২ টি বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রকল্প ও বৃহৎ সিমেন্ট প্রকল্প। এই সমস্ত  প্রকল্প  গুলি যোগ করলে এতে নিযুক্ত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ যদিও কিছু বছরে বিস্তৃত কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয়  হল এই পরিমাণ দেশের  এক বছরে গড়ে  সব প্রকল্পে বিনিয়োগের মোট পরিমাণের সমান। অতএব বোঝা যাচ্ছে যে, পরিকাঠামোর  ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সরকার ইতিমধ্যে আদানিদের উপরে  কতটা  নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে।

একজন শর্ট সেলার মূলত ধার করে চলতি বাজার দামে কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনে বিক্রি করে  থাকে পরবর্তী সময় সে সমসংখ্যক শেয়ার কিনে যার কাছে  ধার  করেছিল সেই শেয়ার ফিরিয়ে দেয় এর মধ্যবর্তী সময় শর্ট সেলার চেষ্টা করে উক্ত কোম্পানির শেয়ার এর বাজার দাম কমিয়ে আনতে যাতে শেয়ার ফেরত দেওয়ার সময় শেয়ার এর দাম কেনার সময়ের চেয়ে কম হয় এই বেশি  দামে আগে শেয়ার বিক্রি করে পরে কম দামে শেয়ার কিনে ফেরত করার মধ্যে দিয়ে লাভ করে  থাকে  শর্ট  সেলার  সংস্থা অতএব এটা খুব স্বাভাবিক যে শর্ট সেলার সংস্থা হিনডেনবার্গ যে আদানির শেয়ার মূল্য কমানোর লক্ষ্যে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই আসলে শর্ট সেলার সংস্থাগুলি সেই ধরণের  কোম্পানি গুলিকে টার্গেট করে থাকে যাদের শেয়ারমূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বাড়ানো রয়েছে তাদের সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করে যদি তারা এই সত্য উদ্ঘাটন করে দেখাতে পারে যে, শেয়ার মূল্য কোম্পানির স্বাস্থ্যের তুলনায় বেশি  উপরে দেখানো আছে তবে  সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাজারে শেয়ারের দাম কমবেঅতএব আদানির শেয়ার এর দাম কমানোর সম্ভাবনা বিবেচনা  করেই শর্ট  সেলার সংস্থা ওই কোম্পানিকে টার্গেট করেএর মধ্যে দেশি, বিদেশী জাতীয়, বিজাতীয় এসব খোঁজার খুব  একটা কারণ কিছু নেই

যদি হিনডেনবার্গ রিপোর্ট আপাতত সরিয়ে রাখা হয় এবং সি এম আই প্রাওএস ডেটাবেস দেখা যায়, যেখানে প্রায় আমাদের দেশের চব্বিশ হাজার কর্পোরেট সংস্থার তথ্য দেওয়া হয়, তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে কেন  হিনডেনবার্গ আদানি গ্রুপ কে টার্গেট করেছিল আদানি গ্রুপে একশোর বেশি  কোম্পানি আছেযাদের সম্মিলিত অ্যাসেট লায়বিলিটির অনুপাত ২০২১-২২ সালে .৭৪ ছিল যা অধিকাংশ বড়  কর্পোরেট সংস্থার  চেয়ে  কমসাধারণত এই অনুপাত একের চেয়ে বেশি  হয় অর্থাৎ সংস্থার  মোট অ্যাসেটের মূল্য মোট লাইয়াবিলিটির চেয়ে  বেশি হবেআদানি গ্রুপ এর ডেট-টু-একুইটি রেসিও দেখলেও  একই লক্ষণ  প্রকাশিত হচ্ছেসমস্ত বড়  কর্পোরেট  সংস্থার  তুলনায়  আদানি গ্রুপের এই অনুপাত সবচেয়ে বেশি২০১৭-১৮ থেকে  ২০২১-২২ এই অনুপাত . থেকে  . এর মধ্যে ছিলএই সমস্ত  তথ্য থেকে  এটা পরিষ্কার যে আদানি গ্রুপের বাজার থেকে ঋণের  পরিমাণ যথেষ্ট বেশি  ছিলঅন্যদিকে এটা খেয়াল  করা  দরকার  যে আদানিরা বিপুল পরিমাণ  অর্থ  বাজার থেকে  সংগ্রহ করলেও তারা নিজেদের সংস্থার ফিক্সড অ্যাসেট অর্থাৎ মেশিন ইত্যাদিতে স্থায়ী বিনিয়োগ বিশেষ  একটা যায় নি২০১৯-২০ থেকে  ২০২১-২২ এই তিন বছরে দেশের প্রায় ২৪ হাজার কর্পোরেট সংস্থার স্থায়ী বিনিয়োগ গড়ে  বেড়েছে যথাক্রমে ১১., ., . হারেশেষের  দুটি বছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার কমে গিয়েছিল অতিমারীর কারণেকিন্ত আদানি গ্রুপের এই বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার বরাবর ছিল ঋণাত্মকঅতিমারীর আগেও ২০১৯-২০ সালে বিনিয়োগ হার ছিল- . শতাংশতিন বছরের গড়  ধরলে  দেখা  যাবে যে সমস্ত  কর্পোরেট সংস্থা যখন . শতাংশ  হারে স্থায়ী বিনিয়োগ ঘটিয়েছে তখন  আদানি গ্রূপের এই বিনিয়োগের গড়  হার ছিল  -. শতাংশঅতএব এটা বোঝা  যাচ্ছে  যে আদানি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ তার সম্পদের তুলনায়  অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি  ছিল এবং স্থায়ী বিনিয়োগের সাপেক্ষে তাদের বৃদ্ধির  হার সমস্ত  কর্পোরেট সংস্থাগুলির গড় হারের তুলনায় কম ছিল

এবার দেখা  যাক এহেন সংস্থার  উপরে আমাদের দেশের আর্থিক কার্যকলাপে কতটা  নির্ভরশীলতা  তৈরী করা  হয়েছেএই মুহূর্তে আদানিরা ১৯১ টি বৃহৎ প্রকল্প রূপায়ণের  কাজে যুক্ত, যার মোট মূল্য প্রায় লক্ষ কোটি টাকাতারা সম্প্রতি ১২৩ টি প্রকল্প সম্পূর্ণ করেছে  যার পরিমাণ প্রায় এক লক্ষ  কোটি টাকাগৃহীত  প্রকল্প  গুলির মধ্যে রয়েছে ১৩ টি পোর্ট, ৩৩ টি রিন্যুএবল এনার্জি সংক্রান্ত প্রকল্প, ১২ টি বিদ্যুৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রকল্প বৃহৎ সিমেন্ট প্রকল্পএই সমস্ত  প্রকল্প  গুলি যোগ করলে এতে নিযুক্ত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ যদিও কিছু বছরে বিস্তৃত কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয়  হল এই পরিমাণ দেশের  এক বছরে গড়ে  সব প্রকল্পে বিনিয়োগের মোট পরিমাণের সমানঅতএব বোঝা যাচ্ছে যে, পরিকাঠামোর  ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সরকার ইতিমধ্যে আদানিদের উপরে  কতটা  নির্ভরশীলতা তৈরি করেছেএর সঙ্গেআরও গুরুত্বপূর্ণ হল কেন্দ্রীয় সরকার এল আই সি বা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া কে এই আদানির শেয়ার কেনায় বাধ্য  করেছেএই সরকারি  সংস্থা গুলিকে ডিসইনভেস্টমেন্ট এর নামে শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তার  দিকে ঠেলে  দেওয়া হল এল আই সি এস বি আই এর কর্তা ব্যক্তিরা আশ্বাস দিচ্ছেন যে তাদের সংস্থার এক্সপোসার খুবই  কম এবং তাদের ক্যাশ ফ্লো এতটা পরিমানে আছে যে আদানির শেয়ার এর মূল্য শূন্য  হয়ে  গেলেও তারা তাদের বিমাকারীদের বা আমানত কারীদের সমস্ত দেয় মেটানোর ক্ষমতা  রাখবে কিন্ত প্রশ্ন  হল এই অনাহুত অনিশ্চয়তার জন্য দায়ী কে? উত্তর সহজ: যারা দেশের  সম্পদ বা সাধারণ  মানুষের কষ্টার্জিত সম্পদ সম্বল কে কর্পোরেটদের লগ্নি পুঁজিতে রূপান্তরিত করতে  চায়এরই ফলস্বরূপ এই সমস্ত  সংস্থাগুলির কেনা আদানির শেয়ারের দাম কমায় তাদের অ্যাসেট এর মূল্য কমছে একথা  ঠিক  যে শেয়ার বিক্রি না করা  পর্যন্ত লাভ  বা ক্ষতি কোনোটাই বাস্তবায়িত  হয়  না ফলে  এল আই সি বা এস বি আই যে এই মুহূর্তে বিপুল লোকসান  করবে  তা নয়কিন্তু  যে কোনো কোম্পানির অ্যাসেটের বর্তমান  বাজার মূল্য তার আর্থিক অবস্থান ভবিষ্যৎকে অবশ্যই  প্রভাবিত করে  থাকেবিশেষত  বাজার থেকে অর্থ  সংগ্রহের  ক্ষমতা, এবং চলতি শেয়ার এর নির্ভরযোগ্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা অবশ্যই প্রভাবিত  হয়আদানির শেয়ার এর দাম কমে যাওয়ায় তারা কুড়ি হাজার কোটি টাকার ফলো অন অফার তুলে নিতে বাধ্য  হয় কারণেইইতিমধ্যেই তারা তাদের আয় ক্যাপিটাল খাতে খরচের লক্ষ্য মাত্রা কমিয়ে  আনতে বাধ্য হয়েছেএই সব কিছুরই অর্থনীতির  উপর  নেতিবাচক  প্রভাব আছে তার কারণ আদানির দুরবস্থার প্রভাব দেশের উপরিকাঠামোর  বিনিয়োগের উপর পড়বে, কাজ আটকে থাকবে  বা হয়তো প্রজেক্ট হাতেই নেওয়া হবে  নাদেশের  অধিকাংশ  আর্থিক কর্মকান্ডে যদি  কোনো একটি কর্পোরেট সংস্থার  উপর নির্ভরশীলতা অন্যায় ভাবে  অতিরিক্ত হয়ে  ওঠে তাহলে শুধু তার ভবিতব্যের  সঙ্গে দেশের ভবিতব্যের এক অদ্ভুত যোগাযোগ গড়ে ওঠে তাই নয় ওই বিপুল নির্ভরশীলতার কারণে ওই কর্পোরেট সংস্থার সরকারের সঙ্গে সুবিধা আদায়ের দরকষাকষি করার  ক্ষমতা অনেক বেশি হয়ে যায়

লগ্নি পুঁজির সঙ্গে দেশের আর্থিক ব্যবস্থা যত  নিবিড় ভাবে  যুক্ত হবে, শেয়ার বাজারের ওঠা  পড়া অর্থনীতির প্রকৃত কার্যকলাপকে তত  বেশি  প্রভাবিত  করতে  পারবে এটাই লগ্নি পুঁজির শাসন এই শাসন প্রচ্ছন্নভাবে পুঁজির পুনরুৎপাদনের প্রয়োজনীয় শর্ত গুলিকে প্রথমত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের লাভের  শর্তে  পরিণত করে এবং অর্থনীতির ক্রমাগত ফিনান্সিয়ালিসশনের মাধ্যমে সেই সব  পূর্বশর্ত গুলিকে দেশ বা মানুষের প্রয়োজনীয় শর্তে  রূপান্তরিত করার পরিমন্ডল তৈরী করেবড় কর্পোরেট  সংস্থার  সঙ্গে রাষ্ট্র নেতাদের নিবিড় সম্পর্ক এই প্রথম দেখা গেল তা নয়আগেও নানা সময়ে তা প্রকট আকার ধারণ করেছিল পার্লামেন্টে রাস্তায় তা নিয়ে বিক্ষোভ জনরোষও দেখা  গিয়েছিলো দেশের  সরকার সে  ক্ষেত্রে বিতর্কের চাপে পড়ে নিজেদের শ্রেণী আধিপত্য বজায়  রাখতে নানা আইন নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে বাধ্য হয়েছিল  আজকের সময়ের  বৈশিষ্ট্য হল কর্পোরেট লগ্নি পুঁজির আধিপত্য রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণ করছে এই অবৈধ সম্পর্ক এখন লুকানো সম্ভব  হচ্ছে এলেক্টোরাল বন্ড ইত্যাদির মাধ্যমে  অতীতে যা সহজেই  দৃশ্যমান  ছিল সবচেয়ে বড় কথা  হলো বর্তমান সময়ে অর্থনীতিতে কর্পোরেটদের নিরঙ্কুশ অংশীদারত্ব তাদের গভীর  নিয়ন্ত্রণকে অর্থনীতি সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে প্রতিভাত করতে সক্ষম করছেআদানির শেয়ার এর দামের ওঠা  পড়ায়  সাধারণ  মানুষের  খুব একটা কিছু  যেত আসতো না যদি  না ব্যাঙ্ক, বীমা, অন্যান্য পরিষেবা, পরিকাঠামো, এমনকি জল  বা বিদ্যুতের মত প্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহ  এই সব কিছুই  কর্পোরেট সংস্থা আর ফাটকা বাজারের উপর  নির্ভরশীল না হত এবং এই নির্ভরশীল করে তোলার কাজটাই সযত্নে করে  চলেছে নয়া  উদারবাদী রাষ্ট


প্রকাশের তারিখ: ২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org