প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া

প্রভাত পট্টনায়েক

যে সব দেশ আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করে, তারা কর্মসঙ্কোচন সৃষ্টিকারী মার্কিন সংরক্ষণবাদের ফাঁদে পড়লে অন্য কোনও উপায়ে নিজেদের দেশে মোট চাহিদা বৃদ্ধি করে বেকারত্বকে যে মাথাচাড়া দিতে দেবে না, তার কোনও উপায় নেই। ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধের নিহিতার্থ হ’ল আমেরিকার বেকারত্ব অন্য দেশে রপ্তানি করা। একেই বলে  beggar thy neighbour policy (আমার প্রতিবেশি ভিখারী হোক নীতি)।

বিদেশ থেকে মার্কিন মুলুকে আমদানি করা পণ্যের ওপরে বাড়তি শুল্ক চাপানো হবে বলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখতে বসেই যে ঘোষণা করেছেন, তাতে দুনিয়া জুড়ে বেশ হইচই পড়ে গিয়েছে। মেক্সিকো, কানাডা, কলম্বিয়ার মতো দেশগুলির সাথে ট্রাম্পের লক্ষ্য ভারতও। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অহোরাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ‘গভীর’ বন্ধুত্বের কথা চতুর্মুখে বলে বেড়ালেও ট্রাম্প কিন্তু ভারতকে তার টার্গেট লিস্ট থেকে ছাড় দেননি। কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়ার মতো দেশের রাষ্ট্রনায়করা যখন পালটা হুমকি দিয়ে মার্কিন পণ্যের ওপরে শাস্তিমূলক শুল্ক বসানোর কথা শুনিয়ে রেখেছে, সেই সময়ে আমাদের ছাপ্পান্ন ইঞ্চি আগ বাড়িয়ে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য ইতিমধ্যে আমেরিকা থেকে আমদানি করা অনেক পণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক নিজেরা যেচে কমিয়ে দিয়েছে অথবা দেওয়ার কথা চিন্তা-ভাবনা করার কথা জানিয়ে রেখেছে। এর পরেও ট্রাম্পের ভবি ভোলবার নয়। 

বাড়তি শুল্ক চাপানো নিয়ে দুনিয়ায় হইচই শুরু হলেও আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি কিন্তু দুনিয়ার বিশেষ নজর নেই। উঁচু হারে আমদানি শুল্ক বসালে দেশের অভ্যন্তরের উৎপাদকদের দেশের বাজারের ওপরে দখল জমাতে সুবিধে হয় সন্দেহ নেই।  উঁচু শুল্ক চাপানোর সাথে সাথে যদি কেবল দেশীয় উৎপাদকদের বাজারের ওপরে দখল বাড়ানো শুধু নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেরও প্রসার ঘটানো যায়, তাহলে অধিক শুল্কের কারণে বিদেশী পণ্যের পরিমাণ হ্রাস পাবে এমনটা বলা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে যদি দেশীয় অভ্যন্তরীণ বাজারের বিস্তার না ঘটে তবে এটা নিশ্চয় করে বলা যায় যে, বিদেশী পণ্যের আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাবে।

তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজারের বিস্তার ঘটানোর উপায় কী? এতদিনে একথাটা সকলেই জানে যে, সরকারি ব্যয় যথেষ্ট  বৃদ্ধি করা হলে অভ্যন্তরীণ বাজারেরও প্রসার ঘটবে। এখন প্রশ্ন হল, এই অতিরিক্ত ব্যয়নির্বাহ করার জন্য সরকার টাকা পাবে কোথা থেকে? এই কথাও আজকাল সকলেই জানে যে, সরকার এই অতিরিক্ত টাকা পেতে পারে দুটি উৎস থেকে— হয় বাজেটে আর্থিক ঘাটতি বৃদ্ধি করে অথবা ধনীদের ওপরে অতিরিক্ত করভার চাপিয়ে। প্রথম উপায় অবলম্বন মারফৎ অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি ঘটানো হলে সমাজের কোনও অংশের ওপরেই কোনওরূপ অতিরিক্ত কর আরোপের প্রয়োজন হবে না এবং ফলতঃ, কারোরই ভোগব্যয় কাটছাঁট করার প্রয়োজন পড়বে না। তার ফলে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির গোটাটাই মোট চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাজারের প্রসার ঘটাবে। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, অর্থাৎ যদি ধনীদের ওপরে কর চাপিয়ে বর্ধিত সরকারি ব্যয়ের অর্থের সংস্থান করা হয়, তাহলে ব্যাপারটা কী ঘটে? ধনীরা কমপক্ষে তাদের আয়ের অর্ধেক সঞ্চয় করে। ধরা যাক বর্ধিত সরকারি ব্যয়ের অর্থের সংস্থান করার জন্য ধনীদের ওপরে ১০০ টাকা হারে বর্ধিত কর চাপানো হল। এই ১০০ টাকার পুরোটাই বর্ধিত চাহিদার সৃষ্টি করে। এই বর্ধিত করের দরুণ উক্ত ধনীর ভোগ-ব্যয়ের, ধরা যাক, ৫০ টাকা কাটছাঁট করতে হল এবং বাকি ৫০ টাকা তার কম সঞ্চয় হল। এই ১০০ টাকা সরকার চাহিদা সৃষ্টি জন্য যখন খরচ করে, তখন নীট চাহিদা বাড়ে ৫০ টাকার। অর্থাৎ বাজারের প্রসার ঘটে ৫০ টাকার। সেটাই বা কম কী? গরীবদের ওপরে কর চাপালে হিতে বিপরীত হবে। গরীবরা যেহেতু যা আয় করে তার পুরোটাই গ্রাসাচ্ছাদনে ব্যয় করতে হয়, তাই তাদের ওপরে বর্ধিত করভার চাপালে বাজারের প্রসার ঘটা তো দুরের কথা, তাদের বিদ্যমান চাহিদারই সঙ্কোচন ঘটে। পরোক্ষ কর বাড়ালেও একই দশা হয়। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ বাজারের কোনও বিস্তার ঘটে না। 

এই নিবন্ধের গোড়াতেই আমরা বলেছিলাম যে প্রায় গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ ঘোষণার আনুষঙ্গিক আর একটি বিষয় নিয়ে দুনিয়ার কর্তারা নিশ্চুপ রয়েছেন। সেটা হল এই যে, ট্রাম্পের এই জেহাদের পরিপূরক হিসেবে মার্কিন মুলুকের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রসারের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে আলোচিত দুটি উপায়ের কোনও একটি অবলম্বন করে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির কোনও পরিকল্পনা ঘোষিত হয়নি। আর্থিক ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধির করার কোনও ইচ্ছে ট্রাম্প সাহেবের নেই। যদি তিনি সত্যিই কিছু চান, তা হ’ল কীভাবে ধনীদের কর আরও কমানো যায়। সুতরাং, তাঁর ঘোষিত শুল্ক-যুদ্ধের মোদ্দা কথাটি হচ্ছে বিদেশি পণ্যের ওপরে বাড়তি শুল্কের বোঝা চাপিয়ে কীভাবে  বিদ্যমান আমদানির পরিমাণ কমানো যায়। আমেরিকার বাণিজ্য-সহযোগীরা যদি ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যের মাশুল হিসেবে হ্রাসপ্রাপ্ত রপ্তানির শিকার হয়, তা’হলে তারা তাদের নিজ দেশের অর্থ-ব্যবস্থায় উপরে বর্ণিত দু’টি পদ্ধতির যে কোনও একটি অবলম্বন করে কর্ম সংস্থানের সংকোচন রোধ করতে পারে এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজকর্মের চলতি মাত্রা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল প্রতিটি দেশকে আন্তর্জাতিক পুঁজির আদেশ অনুসারে নিজ নিজ আইন সভায় FRBM আইন পাশ করাতে হয়েছে। এই আইন অনুসারে কোনও দেশই তার জিডিপির একটা নির্দিষ্ট শতাংশের বেশি আর্থিক ঘাটতি পাশ করাতে পারবে না। পুঁজির আশঙ্কা, মাত্রাছাড়া আর্থিক ঘাটতির অনুমতি দিলে মুদ্রাস্ফীতিও লাগাম ছাড়া হবে। সুতরাং, কোনও দেশ আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির হুকুম মত চলতে না চাইলে সে দেশ থেকে একযোগে লগ্নি প্রত্যাহার করবে। ফলে সেই দেশ নিদারুণ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হবে। সুতরাং যে সব দেশ আমেরিকার সাথে বাণিজ্য করে, তারা কর্মসঙ্কোচন সৃষ্টিকারী মার্কিন সংরক্ষণবাদের ফাঁদে পড়লে অন্য কোনও উপায়ে নিজেদের দেশে মোট চাহিদা বৃদ্ধি করে বেকারত্বকে যে মাথাচাড়া দিতে দেবে না, তার কোনও উপায় নেই। ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধের নিহিতার্থ হ’ল আমেরিকার বেকারত্ব অন্য দেশে রপ্তানি করা। একেই বলে beggar thy neighbour policy (আমার প্রতিবেশি ভিখারী হোক নীতি)।

ভারত সহ আমেরিকার বাণিজ্য সহযোগীরা ট্রাম্পের পাল্টা নিজেরাও মার্কিন পণ্যের বিরুদ্ধে শুল্ক-সংরক্ষণের দেওয়াল তুলতে পারে। এভাবে দুনিয়া জুড়ে শুল্ক-যুদ্ধ শুরু হলে অচিরেই তা কাউন্টার প্রোডাক্টিভ হবে, অর্থাৎ কোন দেশেরই লাভ হবে না। ১৯৩০ সালের মহামন্দার সময়ে যখন বৃটিশ পাউন্ডের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো তখন  এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু যেমনটা আশঙ্কা করা গিয়েছিল, সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল কারণ সকলেই লাভবান হতে চাইছিল।

আমাদের আলোচ্য বিষয়টিকে একটু অন্য ভাবে দেখা যায়। যদি আমরা দুনিয়ার পুঁজিবাদকে একটি অখন্ড সত্তা হিসেবে কল্পনা করি, কারণ পুঁজি এখানে তুলনামূলক স্বাধীনভাবে তাদের গতিবিধি অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে এই পুঁজিবাদী দুনিয়ায় সমস্ত  জাতি-রাষ্ট্রগুলি আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির পদতলে এমন ক্রীতদাসত্বের দাসখৎ লিখে দিয়েছে যে তারা নিজের দেশের সীমানার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে যে উদ্যোগ নেবে, সেই পথও খোলা নেই। ফলে গোটা বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে মোট চাহিদার বৃদ্ধির কোন সম্ভাবনা নেই। একটিমাত্র দেশ, তার হীনতম স্বার্থবুদ্ধি-সঞ্জাত বাণিজ্যিক স্বার্থের সংরক্ষণের জেরে দুনিয়ার এক বৃহৎ অংশের মোট চাহিদা ছিনিয়ে নিয়ে নিতে চাইছে। একটি মাত্র দেশের এই খোলাখুলি দস্যুতা কেবলমাত্র তখনই সফল হতে পারে যদি অন্য দেশগুলি প্রত্যাঘাত না করে। অদৃষ্টের পরিহাস এটাই যে, প্রত্যাঘাত করলেও আগের মতই বেকারত্বের পঙ্কিল আবর্তে তারা ঘুরপাক খেতেই থাকবে।

কোন অর্থেই এবং কারও স্বার্থেই ট্রাম্পের এই শুল্ক-যুদ্ধ কোনও অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে না। আমেরিকার বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলি যদি প্রত্যাঘাত না করে তবে আমেরিকা হয়তো নতুন কর্মসংস্থানের মুখ দেখতে পারে। যদিও তা অন্যান্য দেশের কর্ম সংকোচনের মূল্যে। কিন্তু যদি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি ফোঁস ক’রে উঠে পালটা প্রত্যাঘাত করে, তাহলে কোন পক্ষেরই কোন লাভ হবে না।  বরং তারা সমবেত ভাবে বৃহত্তর কর্ম সংকোচনের মুখোমুখি হবে। ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের সমস্যা হচ্ছে ,নেহাতই আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনা ঘটছে এমন এক পরিমণ্ডলে যেখানে লগ্নী পুঁজির অবাধ গতিবিধির ওপরে কোনও বাধা নিষেধ নেই। নয়া উদারবাদী জমানার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে পুঁজির অবাধ গতিবিধির ওপরে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা চলবে না। ট্রাম্প তেমন কাজ যে কখনই করবে না সেটা বলাই বাহুল্য।

পুনশ্চ- এই নিবন্ধ রচনা শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা তাদের প্রায় সমস্ত ট্রেডিং পার্টনারের ওপরে নতুন বর্ধিত আমদানি শুল্ক ঘোষণা করেছে। চীন, ইওরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা প্রভৃতি দেশ উপযুক্ত পালটা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। ভারত নিশ্চুপ।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
ভাষান্তর: নন্দন রায়

 


প্রকাশের তারিখ: ১১-এপ্রিল-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org