পহেলগামের পর: এবার কী?

ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
সন্ত্রাসবাদী হিংসা ও তার বিদ্বেষপূর্ণ মতাদর্শের বিরুদ্ধে যে লড়াই তার ভিত্তি সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা হতে পারে না, বরং সেই লড়াইয়ের ভিত্তি হবে মানুষের ঐক্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ। এই ঐক্য ও মূল্যবোধই সন্ত্রাসবাদী ও তাদের মদতদাতাদের কৌশলকে পরাস্ত করে ভারতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হানায় ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনার নিন্দা ও শোক গোটা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ভারত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৫টি পরিবার এবং নেপালের একটি পরিবার দেখেছেন ঠান্ডা মাথায় তাদের পরিবারের প্রিয়জনদের হত্যা করা হয়েছে। ধর্ম জেনে নিয়ে খুন করার পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা আশা করেছিল দেশজুড়ে তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করবে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় উস্কানি দেবে। কিন্তু ঠিক উল্টোটাই ঘটেছে। জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের ও জনগণের সমস্ত অংশ এই সন্ত্রাস হানার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ক্রোধে ফেটে পড়েছেন এবং তার নিন্দা করেছেন। এবং সকলেই এক সুরে কথা বলেছেন। রাজনৈতিক স্তরে সব রাজনৈতিক দলগুলি এই জঘন্য হামলাকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মোকাবিলা করার শপথ নিয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কাশ্মীরের জনগণের প্রতিক্রিয়া। একেবারে নিঃসঙ্কোচে এবং ঐক্যবদ্ধ ভাবে, তাঁরা এই গণহত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন। জম্মু ও কাশ্মীরের সব শহরে যেভাবে হরতাল ও বন্‌ধ পালিত হয়েছে এবং জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভার বিশেষ অধিবেশেন সর্বসম্মতভাবে যে-প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে তাতেই প্রমাণিত হয় সাধারণ মানুষের মনোভাবে এবং রাজনৈতিক অভিব্যক্তিতে একটা বড়ো ধরনের বদল এসেছে। 

এখন যে প্রশ্নটা সরকার ও দেশের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তা হল, এই জঘন্য হামলার জবাব দেওয়া হবে কীভাবে? প্রথম কাজ হল, যারা এই অপরাধে জড়িত তাদের শাস্তি দিতে হবে।  হামলাকারী সন্ত্রাসবাদী স্কোয়াডের যে সদস্যদের চিহ্নিত করা গেছে তাদের খুঁজে বের করে নির্মূল করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানকে অবশ্যই সফলভাবে শেষ করতে হবে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে। সেগুলি হল স্থায়ী সন্ত্রাসবাদী হুমকির মোকাবিলায় আরও কী কী করতে হবে এবং কীভাবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা কাঠামোর মোকাবিলা করতে হবে। কারণ পাক বাহিনী এবং তাদের নিরাপত্তা কাঠামোই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় দেয় ও তাদের টিকিয়ে রাখে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া এই মর্মে তীক্ষ্ণ এবং জেদি চিৎকার চালিয়ে যাচ্ছে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ভাবে বিশাল আকারে বদলা নিতে হবে। পুলোয়ামা হামলার সময়ও এমনটাই ঘটেছিল এবং তারও আগে উরি ও পাঠানকোট হামলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে যে, ভারতকে সামরিক অভিযান এমন মাত্রায় চালাতে হবে যাতে পাকিস্তানে থাকা সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকে একেবারে নির্মূল করে দেওয়া যায় এবং ভবিষ্যৎ হামলার সম্ভাবনাকেও ঠেকিয়ে  দেওয়া যায়। আবেগের বশে এবং প্রতিশোধের একটানা কোরাসের মুখে মনে হতে পারে যে, আত্মসম্মান আছে এমন কোনও দেশের সামনে এটাই একমাত্র বিকল্প। তবে সন্ত্রাসবাদকে ধ্বংস করার ঘোষিত যে লক্ষ্য, তা কি এভাবে অর্জন করা যাবে?

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোঁকরগুলি বন্ধ করার ওপর। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ও ব্যর্থতার কারণেই পহেলগাম হামলা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদী  হামলার প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সমাবেশিত করার জন্য কাশ্মীরের পরিস্থিতি খুবই অনুকূল। বহু বছর ধরে এই রাজ্যে যেভাবে প্রশাসনের সামরিকীকরণ করা হয়েছে এবং সাধারণভাবে যে দমনপীড়ন চালানো হয়েছে, সেটাই উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদী হিংসার মোকাবিলায় গুরুতর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের বিচ্ছিন্নতা কমানোর জন্য অবশ্যই পদক্ষেপ করতে হবে এবং এমন কোনও কিছুই করা চলবে না যাতে এই প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়। সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছে এমন ১০ জনের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ-ঘটনা হল সেই উদাহরণ যা থেকে বোঝা যায় দলবদ্ধভাবে শাস্তির ব্যবস্থা আসলে জনগণকেই সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এই ভাবে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে উপত্যকার সবকটি প্রধান রাজনৈতিক দল। রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে এবং সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলে সন্ত্রাসবাদী লোকজনকে বিছিন্ন করার জমি তৈরি হবে।  

সীমাপার সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করতে হবে একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে— তার মধ্যে থাকতে হবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ এবং আরও জোরদার নিরাপত্তার ব্যবস্থা। কিছু আশু পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই করেছে সরকার, যেমন কূটনৈতিক মিশনের আয়তন ও কর্মী সংখ্যা কমিয়ে আনা, ভিসা বাতিল করা এবং সিন্ধু জল চুক্তি ‘স্থগিত’ করা। তবে এই চুক্তি কার্যকর করা যাবে না গুরুত্বপূর্ণ ও  বিস্তারিত আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা ছাড়া। 

ভারতের অবস্থানের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য এবং পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার লক্ষ্যে যে কূটনৈতিক প্রয়াস চলছে তা জারি রাখতে হবে। এর জন্য পহেলগাম গণহত্যায় পাকিস্তানের সন্ত্রাস যোগের প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সেও (এফএটিএফ) ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জোরদার করতে হবে যাতে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে পাকিস্তান যে মদত দিচ্ছে তা বন্ধ করতে এফএটিএফ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান এফএটিএফ-এর ‘গ্রে লিস্ট’-এ তালিকাভুক্ত ছিল জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে অর্থ সাহায্য করার অপরাধে। এর ফলে পাকিস্তান হাফিজ সইদের মতো লস্কর নেতাদের বিরুদ্ধে আংশিক হলেও কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল। পাশপাশি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কিছু আর্থিক পদক্ষেপ করার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে একথা জানা গেছে যে, ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর তিন প্রধানের বৈঠকে, ‘পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ধরন, নিশানা এবং সময়’ নির্ধারণের ভার প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর ওপরেই ছেড়ে দিয়েছেন। তবে কী ধরনের সামরিক প্রত্যাঘাত করা হবে তা ঠিক করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই। সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করাই স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য। সামরিক পদক্ষেপ সেই লক্ষ্য অর্জনে সফল হবে কিনা সে-বিষয়েও আগাম স্পষ্টতা থাকতে হবে। ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং ২০১৯-এর বালাকোট বিমান হানার ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে আঘাত করার কাজে ওই দুই পদক্ষেপ ততটা কার্যকর হয়নি, যদিও তা মোদি সরকারের দ্রুত বদলা নেওয়ার দাবিতে পালিশ লাগিয়েছিল। তাছাড়া এই দুই পদক্ষেপ পরেও সন্ত্রাসবাদী হানা ঠেকাতে পারেনি। 

এখন ওই দুই পাল্টা হানার চেয়েও বড়ো ধরনের অ্যাকশনের কথা বলা হচ্ছে। এই ধরনের সামরিক অভিযান সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে নিশানা করে তাদের নির্মূল করতে পারবে কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। এ-ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে যারা নন স্টেট অ্যাক্টরদের, বিশেষত তাদের পিছনে যখন পাকিস্তানের আইএসআই এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের মদত রয়েছে, তাদের দমন করা কঠিন। সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা হবে এবং তার জেরে দুই দেশের মধ্যে সশস্ত্র শত্রুতার বৃত্তটা আরও প্রসারিত হয়ে পড়বে, এমন পরিণামের বিষয়টাও হিসেবের মধ্যে রাখতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত বাধলে তা পাকিস্তানের মাটিতে পাক সামরিক বাহিনীর অবস্থানকে আরও সংহত করায় সাহায্য করতে পারে। অথচ সে দেশে পাক সামরিক বাহিনী ক্রমশই তাদের জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। তাছাড়া সামরিক সংঘাতের জেরে পাকিস্তানের নিরাপত্তার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার শীর্ষকর্তাদের ভারতের বিরুদ্ধে ‘ছায়া’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মনোভাবকে আরও কঠোর করে তুলবে। যখন সামরিক অভিযানের কথা ভাবা হবে তখন সরকারকে এই সব কিছুকেই হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। 

পহেলগামে জঘন্য সন্ত্রাসবাদী হানার বিরুদ্ধে যখন গোটা দেশ ঐক্যবদ্ধ, তখনই এমন কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যেগুলি বেশ গোলমেলে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় জঘন্য ধরনের ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রচার চলছে। কাশ্মিরী ছাত্র এবং ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং কয়েকটি রাজ্য থেকে তাদের চলে যেতে বলা হচ্ছে। আগরায় এক মুসলিম তরুণ বিরিয়ানির দোকানে কাজ করতেন। তাঁকে গুলি করে খুনের মতো স্তম্ভিত করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হয়েছে যে পহেলগামের বদলা নিতে এই খুনটি করেছে গোরক্ষকেরা। এই বিদ্বেষ প্রচারকে কোনও ভাবে যদি মেনে নেওয়া হয় তা সমাজকে বিভাজিত করবে এবং সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য পূরণেই সহায়তা করবে। যারা এ-ধরনের সংহতি নষ্ট করার মতো কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের যে ঐক্য গড়ে উঠেছে যারা তাকে বিপথে চালিত করা ও ভাঙার চেষ্টা করবে তাদের সম্পর্কে কোনও রকম নরম মনোভাব দেখানো যাবে না। 

সন্ত্রাসবাদী হিংসা ও তার বিদ্বেষপূর্ণ মতাদর্শের বিরুদ্ধে যে-লড়াই তার ভিত্তি সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতা হতে পারে না, বরং সেই লড়াইয়ের ভিত্তি হবে মানুষের ঐক্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধ। এই ঐক্য ও মূল্যবোধই সন্ত্রাসবাদী ও তাদের মদতদাতাদের কৌশলকে পরাস্ত করে ভারতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। 

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, ৩০ এপ্রিল, ২০২৫।


প্রকাশের তারিখ: ০৪-মে-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org