|
|
কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ও পথ –দ্বিতীয় পর্বজ্যোতি বসু |
|
পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা তার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির মধ্যে সংঘাত সত্ত্বেও আপনা থেকে ভেঙে পড়বে না। শুধুমাত্র বাস্তব অবস্থা তৈরি হলেই বিপ্লব হয় না- এই বিপ্লব সমাধা করার জন্য চাই সচেতন চালিকা শক্তি। "দার্শনিকগণ বিশ্বের ব্যাখ্যা করেছেন- এখন প্রশ্ন হলো এর পরিবর্তন"- মার্কস ও এঙ্গেলস-র এই কথাগুলি ভুলে গেলে চলবে না। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের রচিত কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার-এ (১৮৪৮) বলেছেন: পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা বুর্জোয়াশ্রেণীরই শুধু জন্ম দেয়নি, এই শ্রেণীর শোষণ প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিরও জন্ম দিয়েছে। সেই শক্তি হলো- আধুনিক সর্বহারাশ্রেণী। |
|
|
তিন মার্কস তাঁর ঐতিহাসিক ক্যাপিটাল গ্রন্থে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উৎপত্তি এবং এই ব্যবস্থার বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতন এবং কমিউনিজমের উৎপত্তি ও বিকাশ অনিবার্য। মার্কস ও এঙ্গেলস ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট সমাজের একটা সাধারণ রূপরেখাও তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু সময়াভাবের জন্য বিস্তারিত আলোকপাত করে যেতে পারেননি। মার্কস তাঁর "ক্যাপিট্যাল", "হোলি ফ্যামিলি", "ক্রিটিক অব গথা প্রোগ্রাম" এবং এঙ্গেলস তাঁর "পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি", "হাউসিং কোশ্চেন" ইত্যাদি গ্রন্থে ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট সমাজের একটা ছক এঁকেছেন। এই গ্রন্থগুলি মার্কসবাদী তত্ত্বে বিশ্বাসী সবারই অবশ্য পাঠ্য। শুধু পাঠই যথেষ্ট নয়- অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণই বড়ো কথা। লেনিন তাঁর "রাষ্ট্র ও বিপ্লব" গ্রন্থে মার্কসের "ক্রিটিক অব গথা প্রোগ্রাম" এবং এঙ্গেলসের "পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” থেকে বিস্তারিত উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যা এখন "সমাজতন্ত্র” নামে পরিচিত মার্কস ও এঙ্গেলস তাকে কমিউনিজমের প্রথম স্তর আখ্যা দিয়েছেন। ক্রিটিক অব গথা প্রোগ্রামে আছে- পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া- এই কালে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আকার হবে "সর্বহারাশ্রেণীর বৈপ্লবিক একনায়কত্ব।" মার্কসের এই বক্তব্যের উপর লেনিন সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব যেমন বিপ্লবকে সংগঠিত করার জন্য অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য বিপ্লবকে সংহত ও সম্প্রসারিত করার জন্য। কারণ শোষকশ্রেণীগুলি পরাজিত হলেই উৎখাত হয় না। তারা দীর্ঘকাল ধরে প্রতি-বিপ্লব সংগঠিত করার জন্য চক্রান্ত চালিয়ে যায়। রুশ দেশে লেনিনের পরিচালনায় বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে সফল নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে আমরা এই শিক্ষাই লাভ করেছি। পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে রূপান্তরের সমগ্র ঐতিহাসিক কালেই সে কারণে সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব চালু থাকবে। অভ্যন্তরীণ প্রতি-বিপ্লবীদের দমন করার জন্যই শুধু একনায়কত্বের প্রয়োজন নয়, সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের কবল থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে রক্ষা করার জন্যও এই একনায়কত্বের প্রয়োজন। যখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন শ্রেণীহীন সমাজ গঠিত হবে, যখন দমন করার জন্য আর কোনো শোষকশ্রেণীর অস্তিত্ব থাকবে না তখন রাষ্ট্রের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে এবং রাষ্ট্র আপনা থেকেই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। এঙ্গেলস বলেছেন, রাষ্ট্র বিলোপ করা হয় না, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সমাজতন্ত্র হলো কমিউনিজমের প্রথম স্তর, যখন পুঁজিবাদের গর্ভ থেকে এক নতুন ব্যবস্থা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্ম হয়েছে, কিন্তু পুঁজিবাদী মতাদর্শের প্রভাব রয়ে গেছে। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যেক নাগরিককে তার কাজের ক্ষমতা অনুযায়ী মজুরি দেওয়া হবে। বিকাশের উন্নত স্তর অর্থাৎ কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থায় উৎপাদন শক্তির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটবে এবং প্রত্যেকেই তার চাহিদা অনুযায়ী মজুরি পাবার অধিকারী হবে। কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থায় অর্থনীতি, শিক্ষা ও সুস্থ সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটবে, কাজের ঘণ্টা প্রভূত হ্রাস পাবে এবং কমিউনিস্ট সমাজের কমিউনিস্ট মানুষ বাকি সময় শিক্ষা ও সংস্কৃতির সর্বাঙ্গীন বিকাশের কাজে অতিবাহিত করতে পারবে। এইভাবে শ্রেণীহীন সমাজ থেকে রাষ্ট্রহীন সমাজ গড়ে উঠবে সারা বিশ্বে। একমাত্র কমিউনিস্ট সমাজেই ব্যক্তির সত্যিকারের অবাধ বিকাশ সম্ভব হবে। এঙ্গেলস তাঁর "হাউসিং কোশ্চেন" গ্রন্থে ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট সমাজের এক সুন্দর রূপরেখা তুলে ধরেছেন। এঙ্গেলস লিখেছেন: শিল্প-বিপ্লব ইতিহাসে এই সর্বপ্রথম মানুষের শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা প্রভূত বাড়িয়ে দিয়েছে। সবার মধ্যে শ্রমের যদি যুক্তিযুক্ত বণ্টন করা যায় তা হলে সমাজের সদস্যদের ভোগের জন্য এবং মজুত তহবিল গঠনের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনই শুধু সম্ভব নয়, প্রত্যেক ব্যক্তির অবসর বিনোদনের জন্য যথেষ্ট সময় সুনিশ্চিত করাও সম্ভব। পূর্বতন সমাজব্যবস্থা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, কলা, যোগাযোগ ব্যবস্থা রক্ষা করাই শুধু যাবে না, এগুলি শাসকশ্রেণীর একচেটিয়া সম্পত্তি থেকে সমগ্র সমাজের সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত করাও যাবে; এগুলিকে শুধু রক্ষা করাই যাবে না, আরও বিকশিত করাও যাবে (মার্কস-এঙ্গেলস: মনোনীত রচনাবলী, খণ্ড ২, মস্কো)। মার্কস ও এঙ্গেলস নতুন কমিউনিস্ট সমাজের মৌল বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে প্রতিভাশালী দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। শোষণমুক্ত শ্রমিক সমাজতন্ত্রের (এবং কমিউনিজমের) অধীনে সমস্ত সৃজনশীল কর্মতৎপরতার উৎস হয়ে দাঁড়ায়। মার্কস ও এঙ্গেলস উল্লেখ করেছেন, সত্যিকারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে; সর্বহারা বিপ্লব সাহিত্যের বিকাশে সীমাহীন অগ্রগতির অফুরন্ত সুযোগ খুলে দেয়। সর্বহারাশ্রেণীর মহান ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য হলো সারা বিশ্বে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা। মার্কস ও এঙ্গেলস সেই সামাজিক শক্তিকে দেখেছিলেন যে শক্তি বিশ্বকে পরিবর্তন করতে সক্ষম, অর্থনীতি রাজনীতিতেই শুধু আরও অগ্রগতি ঘটাতে সক্ষম নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এই অগ্রগতি ঘটাতে সক্ষম। কমিউনিজম এমন এক শক্তি যা মনুষ্য-সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলি মেটাতে সক্ষম। চার কমিউনিজম একটি বিশ্ব ধারণা। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি কার্ল মার্কসের দু'টি যুগান্তকারী আবিষ্কার সমাজতন্ত্রকে বিজ্ঞানে পরিণত করেছে। ভেতরকার সংঘাত, উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে অবিরাম সংঘাতের ফল হিসাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য। ১৯১৭ সালে রুশ দেশে নভেম্বর (রুশ ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবর) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকেই বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভাঙনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফাটল ক্রমশই বাড়ছে। এখন বিশ্ব ভূখণ্ডের জনসমষ্টির এক-তৃতীয়াংশ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নতুন নতুন শক্তি অর্জন করছে। বিশ্ব জনসমষ্টির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈপ্লবিক তত্ত্ব ও কার্যক্রম জয়যুক্ত হয়েছে। সারা বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ১৯১৭ সালে যেখানে একটি মাত্র দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, এখন সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির সংখ্যা ৯৫। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতেও কিছু কিছু সমস্যা দেখা দেয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্যও আত্মপ্রকাশ করে। কমিউনিজমের শত্রুরা এই মতপার্থক্য বড়ো করে দেখানোর জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু এটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সমস্যা- আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানের জন্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি সচেষ্ট হয়। মার্কস এবং এঙ্গেলস (এবং পরবর্তীকালে লেনিন) কমিউনিজমের প্রথম স্তরে, অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের সমস্যার আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও বিকৃতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে সঠিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করতে হয়। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের রূপান্তরের সাথে সাথে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের ক্ষেত্রে সঠিক এবং নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়। নতুন মানুষ, নতুন সমাজ গড়ে তোলার জন্যই এর প্রয়োজন। তবে বাস্তব ঘটনা হলো সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হলেও উৎখাত হয়নি। এখনও সে প্রতিআক্রমণের উপযোগী যথেষ্ট শক্তি ধরে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি এর সাক্ষ্য বহন করছে। অবশ্যই এই প্রবন্ধে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা করা হচ্ছে না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা তার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির মধ্যে সংঘাত সত্ত্বেও আপনা থেকে ভেঙে পড়বে না। শুধুমাত্র বাস্তব অবস্থা তৈরি হলেই বিপ্লব হয় না- এই বিপ্লব সমাধা করার জন্য চাই সচেতন চালিকা শক্তি। "দার্শনিকগণ বিশ্বের ব্যাখ্যা করেছেন- এখন প্রশ্ন হলো এর পরিবর্তন"- মার্কস ও এঙ্গেলস-র এই কথাগুলি ভুলে গেলে চলবে না। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের রচিত কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার-এ (১৮৪৮) বলেছেন: পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা বুর্জোয়াশ্রেণীরই শুধু জন্ম দেয়নি, এই শ্রেণীর শোষণ প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিরও জন্ম দিয়েছে। সেই শক্তি হলো- আধুনিক সর্বহারাশ্রেণী। আধুনিক সমাজের শ্রেণীগুলির মধ্যে শ্রমিকশ্রেণীই সবচেয়ে সচেতন বিপ্লবী শ্রেণী। এই শ্রমিকশ্রেণীই বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থার কবর খননের ভূমিকা নিয়েছে। মার্কস এবং এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহারে "সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব” শব্দগুলি ব্যবহার করেননি। এখানে তাঁরা বলেছেন "শাসকশ্রেণী হিসাবে সংগঠিত সর্বহারাশ্রেণী।” পরবর্তীকালে বিশেষ করে ১৮৭১ সালের প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তারা "সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব”-র তত্ত্বের স্বচ্ছ ধারণা দেন। লেনিন তাঁর "রাষ্ট্র ও বিপ্লব", "সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লব ও দলত্যাগী কাউটস্কী” এবং অন্যান্য গ্রন্থ ও রচনায় এই তত্ত্বকে আরও বিকশিত করেন। লেনিন তাঁর "রাষ্ট্র ও বিপ্লব” গ্রন্থে বলেছেন, যাঁরা মার্কসের সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্বের তত্ত্বকে গ্রহণ করেন না তাঁরা নিজেদের মার্কসবাদী বলে দাবি করতে পারেন না। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের অনেক রচনায় বিপ্লবী মতাদর্শে দীক্ষিত সর্বহারাশ্রেণীর নিজস্ব পার্টি গঠনের উপর জোর দিয়ে গেছেন। মার্কস ও এঙ্গেলস দৃঢ়ভাবে মনে করতেন, একটি সুশৃঙ্খল সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী পার্টির পরিচালনা ছাড়া বিপ্লবের বাস্তব পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করা যায় না। মার্কস ও এঙ্গেলস যেখানে শেষ করেছেন লেনিন সেখান থেকে শুরু করেন। লেনিনই ছিলেন বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিচালিকা শক্তি মার্কসবাদী বলশেভিক (কমিউনিস্ট) পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। বলশেভিক পার্টির পরিচালনায় সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। একথার পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন যে, রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। নভেম্বর বিপ্লবের প্রভাবেই দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে এবং বিপ্লবী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। বলশেভিক পার্টির পরিচালনা এবং সর্বহারাশ্রেণীর নেতৃত্ব ছাড়া রুশ দেশে বিপ্লব সফল হতে পারত না, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এত শক্তি অর্জনে সক্ষম হতো না। অপর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যে দেশগুলি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে তারা ভিন্ন ভিন্ন রাস্তায় সমাজতন্ত্রে পৌঁছেছে: কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটি সাধারণ উপাদান আছে যা প্রত্যেক দেশের পক্ষেই সমভাবে প্রযোজ্য। উপাদানগুলির মধ্যে আছে: শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈপ্লবিক তত্ত্বে দীক্ষিত পার্টি (কমিউনিস্ট পার্টি)। সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার কথা আমরা বার বার উল্লেখ করছি, কারণ আমরা ভারতে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ধাপ হিসাবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিত দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। এই প্রসঙ্গে আমি পরে আসছি। সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ত্রৈমাসিক মুখপত্র ‘মার্কসবাদী পথ’ পত্রিকার তৃতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (নভেম্বর ১৯৮৩) জ্যোতি বসুর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধের মূল শিরোনাম ‘মার্কসবাদী দৃষ্টিতে কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ও পথ’। ‘মার্কসবাদী পথ’ পত্রিকার এই সংখ্যাটি কার্ল মার্কস মৃত্যুশতবার্ষিকী সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রকাশের তারিখ: ১৮-জানুয়ারি-২০২৫ |
|
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |