|
|
কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ও পথ – শেষ পর্বজ্যোতি বসু |
|
বিপ্লবের সাফল্যের অনেকগুলি পূর্ব শর্ত আছে। একটি পূর্ব শর্ত হলো- এই বিপ্লব কমিউনিস্ট পার্টির, অর্থাৎ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির চূড়ান্ত ভূমিকা। জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের সংগ্রাম পরিচালনাকালে আমাদের পার্টি সংগঠনকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করার জন্য সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পার্টি সভ্যদের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব অনুশীলন করতে হবে এবং এই তত্ত্বকে দেশের বাস্তব অবস্থায় প্রয়োগের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে তাঁদের তত্ত্ব অনুশীলন ও প্রয়োগ করতে হবে। |
|
|
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উত্তরণ একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক কাল। এই কালে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজালেই শুধু চলবে না, মানুষকেও ঢেলে সাজাতে হবে। এক কথায়, কমিউনিস্ট মানুষ তৈরি করতে হবে। কমিউনিস্ট মানুষ ছাড়া কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলা যায় না। অর্থাৎ মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত চেতনার মান প্রভূত উন্নত করতে হবে। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের বিভিন্ন রচনায় কমিউনিস্ট শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। এই প্রশ্নে লেনিন তাঁর একাধিক রচনায় যা বলেছেন তার কিছু কিছু তুলে ধরা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক হবে। আমাদের দেশের যুবসমাজ, বিশেষ করে আমাদের পার্টির নেতৃত্বে যুবসমাজের লেনিনের সংশ্লিষ্ট রচনাগুলি থেকে অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণের আছে। মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ঘটাতে হবে এবং নতুন ধরনের মানুষ, কমিউনিস্ট মানুষ তৈরি করতে হবে। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, প্রথমে কিছু শিক্ষিত লোক তৈরি করতে হবে যাঁরা সমাজতন্ত্র- কমিউনিজম গড়ে তুলবেন। এটা এক কাল্পনিক ধারণা। সমাজতান্ত্রিক- কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলার সাথে সাথেই কমিউনিস্ট শিক্ষাদানের কাজ চলতে থাকবে। মার্কসবাদীরা সেই সমস্ত মানুষের সাহায্যেই সমাজতন্ত্র গড়ে তুলতে চান যাঁরা পুঁজিবাদের পরিবেশে মানুষ হয়েছেন, "পুঁজিবাদ যাঁদের দুর্নীতিপরায়ণ করে তুলেছে, কিন্তু সেই সাথেই যাঁরা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য লৌহ-দৃঢ় হয়েছে।” (লেনিন: সংগৃহীত রচনাবলী, খণ্ড ২৯)। পুঁজিবাদের উৎখাতই যথেষ্ট নয়। ১৯১৯ সালে রুশ দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দু'-বছর বাদে লেনিন বলছেন: "সোভিয়েত রাষ্ট্রযন্ত্রের অর্থ হলো, শ্রমজীবী জনসাধারণ এমনভাবে সংগঠিত যে তাঁরা তাঁদের ঐক্যের শক্তির জোরে পুঁজিবাদকে ধ্বংস করতে সক্ষম। জনগণ তা করেছেন। কিন্তু পুঁজিবাদকে সম্পূর্ণ খতম করতে হলে এটাই যথেষ্ট নয়।" (লেনিন: সংগৃহীত রচনাবলী, খণ্ড ২৯, মস্কো)। লেনিন তাঁর একই রচনায় বলেছেন: আমাদের বিজয় যাতে সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত হতে পারে তার জন্য পুঁজিবাদের কাছ থেকে যা কিছু মূল্যবান, সমস্ত বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। কীভাবে এটা করতে হবে তাও লেনিন বলেছেন। তাদের কাছ থেকে, কমিউনিজমের শত্রুদের কাছ থেকেও আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তাদের শ্রমের ফলকে কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করতে হবে। ১৯১৯ সালের ৬ মে তারিখে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার উপর প্রথম কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণে লেনিন বলেছেন: আমরা কমিউনিস্ট পার্টির লোক; আমাদের বুঝতে হবে আমরা পুরাতন প্রতিষ্ঠানগুলি ভেঙে দিয়েছি। এখন আমরা সত্যিকারের সর্বহারা বিপ্লবের মুখ্য কাজের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি। আমরা কোটি কোটি মানুষকে সংগঠিত করার কাজে সম্মুখীন হয়েছি। এক্ষেত্রে গত ১৮ মাসে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার ভিত্তিতে আমাদের সঠিক রাস্তা গ্রহণ করতে হবে। এই সঠিক রাস্তা সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা, অজ্ঞানতা এবং বর্বরতা অতিক্রম করতে আমাদের সাহায্য করবে। নভেম্বর বিপ্লবের পর একাধিক রচনা ও ভাষণে লেনিন উল্লেখ করেছেন: আমরা বিপ্লব সফল করেছি, পুরাতন রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে দিয়েছি, এখন আমাদের গড়ার কাজ শিখতে হবে- বলশেভিকদের এটা প্রমাণ করতে হবে যে, তাঁরা ভাঙতেই শুধু জানেন না, নতুন করে গড়তেও জানেন। লেনিন বলেছেন, সমাজতান্ত্রিক গঠনকার্য সংগঠিত করার সময় মার্কিন দক্ষতার সাথে বলশেভিক নিষ্ঠা যুক্ত করতে হবে। পরবর্তীকালে, স্তালিনও এর পুনরাবৃত্তি করেছেন। লেনিন বার বার যে বিষয়টির উপর জোর দিয়েছেন তা হলো, অতীতকে বাদ দিয়ে বর্তমানকে ভাবা যায় না। পুরাতন সমাজের যা কিছু ভালো তার সবই আমাদের গ্রহণ করতে হবে এবং সেগুলি নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে লাগাতে হবে। সেই সাথেই পুরাতন সমাজের যা কিছু খারাপ তা বর্জন করতে হবে। কাজটি কঠিন কাজ, কিন্তু কঠিন হলেও সম্পন্ন করতে হবে এবং সেটা করা সম্ভব। এ ব্যাপারে কমিউনিস্টদের মধ্যে সুস্পষ্ট বোধ ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ কমিউনিস্টরাই নতুন সমাজ ব্যবস্থার অগ্রদূত। এক্ষেত্রে যুবসমাজের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। ১৯২০ সালের ২রা অক্টোবর তারিখে যুব কমিউনিস্ট লীগের তৃতীয় কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণে লেনিন যুব কমিউনিস্ট লীগের কাজ সম্পর্কে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। যুবসমাজের উপরই ভবিষ্যৎ কমিউনিস্ট সমাজ গঠনের দায়িত্ব বর্তাবে। সে কারণেই যুব কমিউনিস্টদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই কংগ্রেসে প্রদত্ত লেনিনের ভাষণের সারকথা নিম্নরূপ:- সাধারণভাবে যুবসমাজের এবং বিশেষ করে যুব কমিউনিস্ট লীগ ও অপর সংগঠনসমূহের কাজ এইভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে "শিক্ষা গ্রহণ কর।" এখানে প্রশ্ন থেকে যায়: কী শিখতে হবে এবং কীভাবে শিখতে হবে? পুরাতন পুঁজিবাদী সমাজের রূপান্তরের পর যারা কমিউনিস্ট সমাজ গঠন করবে তাদের পুরাতন ধাঁচে শিক্ষা দান করা চলবে না। আমরা পুরাতন সমাজব্যবস্থা থেকে যা পেয়েছি তার ভিত্তিতেই কমিউনিস্ট সমাজ গড়ে তোলা যায়। তবে তার জন্য প্রয়োজন পুরাতন শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন সাধন। যে যুবসমাজ কমিউনিজমকে এগিয়ে নিতে যেতে চায় তাদের কমিউনিজম কী এবং কেন তা জানতে হবে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ কমিউনিস্ট পুস্তক-পুস্তিকা, পত্র-পত্রিকা অধ্যয়ন করাই যথেষ্ট নয়। এতে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে না। পুরাতন সমাজব্যবস্থার একটি ক্ষতিকারক দিক হলো পুস্তক ও বাস্তব কাজের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ফারাক। যতদূর সম্ভব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের পুস্তকাদি ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলি ছিল ক্ষতিকারক, ভণ্ডামিতে পরিপূর্ণ এবং পুঁজিবাদী সমাজের অসত্য বর্ণনা। কাজ ছাড়া, সংগ্রাম ছাড়া কমিউনিস্ট পুস্তিকাগুলি থেকে অর্জিত কমিউনিজম সম্পর্কে পুঁথিগত বিদ্যা মূল্যহীন, কারণ এতে তত্ত্ব ও কাজের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থা চলতে থাকবে; এটাই ছিল পুরাতন বুর্জোয়া সমাজের অত্যন্ত ক্ষতিকারক বৈশিষ্ট্য। কমিউনিজম এমনভাবে অধ্যয়ন করা উচিত নয় যা কমিউনিজমের স্বার্থের ক্ষতি করে। পুরাতন সমাজব্যবস্থার ভালো ও খারাপ দিকের মধ্যে আমাদের পার্থক্য টানতে হবে। নিঃসন্দেহেই পুরাতন ব্যবস্থায় অধ্যয়নের সাথে বাস্তব কাজের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই ব্যবস্থায় যে শিক্ষা দেওয়া হতো তা ছিল মূল্যহীন, একপেশে এবং আমলাতান্ত্রিক ধাঁচের। কিন্তু তার থেকে যেন এ সিদ্ধান্ত টানা না হয় যে, মনুষ্য-সমাজ যে জ্ঞানার্জন করে তার অনুশীলন বাদ দিয়ে কমিউনিস্ট হওয়া যায়। একথা চিন্তা করা ভুল হবে যে, পুঞ্জীভূত জ্ঞানের ফলশ্রুতি হিসাবে কমিউনিজমের উদ্ভব ঘটেছে সেই জ্ঞান আহরণ বাদ দিয়ে কমিউনিস্ট স্লোগান ও কমিউনিস্ট বিজ্ঞানের নীতিগুলি শেখাই যথেষ্ট। কমিউনিজম যে মনুষ্য-সমাজ কর্তৃক অর্জিত জ্ঞানের ভিত্তিতে আত্মপ্রকাশ করেছিল, মার্কসবাদ তার একটি দৃষ্টান্ত। প্রধানত মার্কস কমিউনিস্ট তত্ত্ব, কমিউনিস্ট বিজ্ঞান সৃষ্টি করেছেন। মার্কস ছিলেন একজন প্রবল প্রতিভাশালী ব্যক্তি। কিন্তু এই মার্কসবাদী তত্ত্ব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের তত্ত্বে পরিণত হয়েছে। কেন মার্কসের শিক্ষা বিপ্লবীশ্রেণীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করতে সবচেয়ে সক্ষম হয়েছে? এই প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হলো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আহরিত মনুষ্য-সমাজের পুঞ্জীভূত জ্ঞানের উপর মার্কস ভিত্তি করেছিলেন। মনুষ্য-সমাজের বিকাশের বিধিগুলি অনুশীলনের পরে, মার্কস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা থেকে কমিউনিস্ট সমাজব্যবস্থায় উত্তরণ অবশ্যম্ভাবী। তখনই একজন কমিউনিস্ট হতে পারেন যখন তিনি মনুষ্য-সমাজ কর্তৃক সৃষ্ট সম্পদ সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবেন। অর্জিত জ্ঞান যদি মনের মধ্যে দাগ না কাটে তা হলে কমিউনিজম একটি ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হবে। আপনাদের কমিউনিস্ট হিসাবে শিক্ষা পেতে হবে। যুব লীগের কাজ হলো, বাস্তব কর্মতৎপরতাকে এমনভাবে সংগঠিত করা যাতে শিক্ষা, সংগঠন, ঐক্য এবং সংগ্রামের মাধ্যমে যাঁরা নেতৃত্ব চাইছেন তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়া যায়। কীভাবে যুবসমাজকে কমিউনিজম শিখতে হবে? লেনিন তার এই উত্তর দিয়েছেন: কমিউনিজম শিখতে হলে পুরাতন শোষণের সমাজের বিরুদ্ধে সর্বহারাশ্রেণী এবং শ্রমজীবী জনসাধারণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের সাথে প্রতিটি ধাপে অনুশীলন ও শিক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। যখন জনসাধারণ আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের কথা বলেন তখন তার উত্তরে আমরা বলি: একজন কমিউনিস্টের কাছে নৈতিক মূল্যবোধের অর্থ ঐক্যবদ্ধ শৃঙ্খল এবং শোষক শ্রেণীগুলির বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম। আমরা চিরস্থায়ী নৈতিক মূল্যবোধের তত্ত্বে বিশ্বাস করি না এবং নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারের মুখোশ খুলে ধরি। নৈতিক মূল্যবোধ মনুষ্য-সমাজকে উচ্চস্তরে নিয়ে যাবার এবং শোষণ থেকে শ্রমিকদের মুক্ত করার উদ্দেশ্য সাধন করে। এর রূপায়ণের জন্য আমরা সেই যুবসমাজকে চাই যারা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামের মাধ্যমে পরিপক্কতা অর্জন করেছে” (লেনিন: সংগৃহীত রচনাবলী, খণ্ড ৩১)। "যুব কমিউনিস্ট লীগ যদি সর্বক্ষেত্রে এইভাবে কাজ সংগঠিত করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার অর্থ হবে পুরাতন বুর্জোয়া রাস্তায় ফিরে যাওয়া” (লেনিন- সংগৃহীত রচনাবলী, খণ্ড ৩১, পৃ. ২৮৩-৯৯)। তত্ত্ব ও কাজের মধ্যে যথাযথ সম্পর্ক রক্ষা, পুরাতন ব্যবস্থার ভালো জিনিসগুলি গ্রহণ এবং খারাপ জিনিসগুলি বর্জন, জনগণের মধ্যে অবিরাম বৈজ্ঞানিক কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রচার- এগুলিই হলো কমিউনিস্ট শিক্ষার সারকথা। কেবলমাত্র কিছু কমিউনিস্ট সাহিত্য অধ্যয়ন করলেই সাচ্চা কমিউনিস্ট হওয়া যায় না। বিপ্লবের পরও পরাজিত বুর্জোয়াশ্রেণী এবং বিদেশের বুর্জোয়াশ্রেণীগুলি অবিরাম কমিউনিস্ট-বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাবে। সে কারণেই বুর্জোয়া অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে অবিরাম মতাদর্শগত প্রচারাভিযান সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তার উপরও লেনিন গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ভারত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বৃহৎ ধনিকগোষ্ঠীর নেতৃত্ব পরিচালিত একটি বুর্জোয়া- ভূস্বামী রাষ্ট্র। আমি ভারতবর্ষের জন্য আমাদের পার্টি যে কর্মসূচী গ্রহণ করেছে তার কিছু কিছু এখানে তুলে ধরতে চাই। ছয় মার্কসবাদের মৌল তত্ত্ব ভারতসহ সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠা ভারতের বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এটা এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। কিন্তু এই লক্ষ্য একদিন না একদিন রূপায়িত হবেই। সমাজ বিকাশের মার্কসীয় তত্ত্ব থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে অনায়াসে আসতে পারি। ১৯৬৪ সালে আমাদের পার্টি (সি পি আই (এম)) এক কর্মসূচী গ্রহণ করে। কর্মসূচীতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে- আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা। আমাদের পার্টি শাসকশ্রেণীর মুখে সমাজতন্ত্রের বুলির উপর কোনো গুরুত্ব আরোপ করে না। সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ধাপ হিসাবে পার্টি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের সামনে উপস্থিত করেছে। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের আহ্বান পার্টি জানিয়েছে। জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হবে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে এবং শ্রমিক-কৃষকের সূদৃঢ় মৈত্রীর ভিত্তিতে। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে এই ফ্রন্ট সমস্ত সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, সামন্তবাদ-বিরোধী এবং একচেটিয়া কারবার-বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করবে। জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠন একটি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের প্রক্রিয়া। পার্টির কর্মসূচীতে আছে, বৃহৎ ধনিকগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পরিচালিত বুর্জোয়া-ভূস্বামীদের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাড়া জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল হতে পারে না। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে কোনো অলংঘ্য প্রাচীর নেই। জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিত্তি প্রস্তুত করবে। বিপ্লবের সাফল্যের অনেকগুলি পূর্ব শর্ত আছে। একটি পূর্ব শর্ত হলো- এই বিপ্লব কমিউনিস্ট পার্টির, অর্থাৎ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টির চূড়ান্ত ভূমিকা। জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের সংগ্রাম পরিচালনাকালে আমাদের পার্টি সংগঠনকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করার জন্য সচেতন প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। পার্টি সভ্যদের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব অনুশীলন করতে হবে এবং এই তত্ত্বকে দেশের বাস্তব অবস্থায় প্রয়োগের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে তাঁদের তত্ত্ব অনুশীলন ও প্রয়োগ করতে হবে। এ নিয়ে আমরা ইতিপূর্বেই আলোচনা করেছি। পার্টি-কর্মসূচীর ১১২নং ধারায় বলা হয়েছে, জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের জন্য সংগ্রাম পরিচালনাকালে দেশের কোনো কোনো রাজ্যে বা অঞ্চলে নতুন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে- নতুন পরিস্থিতি দেখা দিলে একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হবে। আমাদের মূল লক্ষ্যে অবিচল থেকেও কোনো কোনো রাজ্যে কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রয়োজন হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরায় এই ধরনের সরকার আমরা গঠন করেছি। কেরালায় এখন অবশ্য আবার কংগ্রেস পরিচালিত সরকার গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে অপর কোনো কোনো রাজ্যেও এ জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বলাই বাহুল্য এটা মার্কসবাদী অর্থে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নয়। মনে রাখতে হবে, ভারতের পুঁজিপতি-ভূস্বামী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি বা দু'টি রাজ্যে বামপন্থীদের সরকার জনগণের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধানে সক্ষম নয়। এই সব সরকারের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও এরা জনগণের সক্রিয় সহযোগিতায় জনস্বার্থবাহী কর্মতৎপরতা সংগঠিত করার মাধ্যমে জনসাধারণের চরম দুর্দশা কিছুটা লাঘব করতে পারে, জনসাধারণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করতে পারে এবং তাঁদের চেতনার মান প্রভূত উন্নত করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বামফ্রন্ট সরকারদ্বয় নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই কাজগুলি করে চলেছে। জনগণের উন্নত চেতনা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর সংগ্রামকে জোরদার করারও সহায়ক হবে। অতএব বামফ্রন্ট সরকারকে চোখের মণির মতো রক্ষা করা শ্রমজীবী জনসাধারণের সমস্ত অংশের সামনে একটি জরুরি কর্তব্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পার্টি যে কাজ ও দায়িত্বগুলির সম্মুখীন হয়েছে সেগুলির মধ্যে আছে: জনসাধারণের সঙ্গে থাকা, দৈনন্দিন সংগ্রাম পরিচালনা করা, তাঁদের বিভিন্ন গণ-সংগঠনে সংগঠিত করা ও রাজনৈতিক চেতনার মান উন্নত করতে সাহায্য করা। জনসাধারণের স্বার্থ জড়িত এমন কোনো কাজই (তা যত ছোট কাজই হোক না কেন) "সংস্কারবাদ" বলে অবহেলা করা উচিত নয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সঙ্কটের মুহূর্তে সমগ্র পার্টি ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সর্বশক্তি দিয়ে সে সঙ্কটের মোকাবিলা করে। উদাহরণ হিসাবে ১৯৭৮ সালের প্রলয়ঙ্কর বন্যা, ১৯৮১ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে কংগ্রেস (আই)-র জন-বিরোধী ধর্মঘটের ডাক, ১৯৮২ সালের অভূতপূর্ব খরা এবং সাম্প্রতিককালে ডাক্তারদের ধর্মঘট ইত্যাদির প্রশ্নে পার্টির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু জনগণের মধ্যে দৈনন্দিন কর্মতৎপরতা সংগঠিত করার প্রশ্নে আমাদের মধ্যে এখনও ত্রুটি থেকে গেছে- দৈনন্দিন কর্মতৎপরতায় অবহেলার ঝোঁক বেশ কিছুটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ত্রুটি অবিলম্বে সংশোধন করা প্রয়োজন। লেনিনের একটি হুঁশিয়ারীর কথা আমাদের সব সময়েই স্মরণ রাখতে হবে: বুর্জোয়াশ্রেণী প্রতিনিয়তই তাদের বিষাক্ত মতাদর্শ জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য সচেষ্ট। জনগণের চেতনার মান অপরিবর্তিত থাকবে- এটা কখনই ধরে নেওয়া উচিত নয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের শত্রুরা চুপ করে বসে নেই। কংগ্রেস প্রদত্ত ভোটের ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সে কারণেই জনসাধারণের মধ্য থেকে তাঁদের চেতনার মানকে আরও উন্নত করার জন্য লাগাতার রাজনৈতিক-মতাদর্শগত প্রচারাভিযান পরিচালনা অত্যাবশ্যক। যে ৩৬ শতাংশ ভোটদাতা কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে তাদেরও একটা বড়ো অংশকে আমাদের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য লাগাতার প্রচারাভিযান চালিয়ে যেতে হবে। তার জন্য চাই জনগণের মধ্যে দৈনন্দিন কর্মতৎপরতা পরিচালনা। এক্ষেত্রে আমাদের পরিচালিত গণ-সংগঠনসমূহের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কর্মীদের কাজ হবে, বুর্জোয়া সংস্কৃতির বিকল্প হিসাবে শ্রমজীবী জনগণের সুস্থ সংস্কৃতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। কাজটি শুরু হয়েছে, কিন্তু কাজের ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। আমাদের পার্টি সাধারণভাবে দুর্নীতির ঝোঁক থেকে মুক্ত। তবে মনে রাখতে হবে আমরা বুর্জোয়া-ভূস্বামী রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চৌহদ্দির মধ্যে একটা বামফ্রন্ট সরকার পরিচালনা করছি। সে কারণেই দুর্নীতির ঝোঁক আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই ঝোঁক বা প্রবণতা অঙ্কুরে বিনষ্ট করার জন্য সমগ্র পার্টিকে সুপরিকল্পিত ও সচেতন অভিযান চালাতে হবে। একে মতাদর্শগত অভিযান হিসাবে গণ্য করতে হবে। কমিউনিস্ট শিক্ষার এটা এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সেই সাথেই চালিয়ে যেতে হবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের উপর ব্যাপক প্রচারাভিযান। শ্রমজীবী জনগণকে এটা বোঝাতে হবে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাই তাঁদের মজুরি-দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে সক্ষম। সারা দেশেই পার্টি সংগঠন জোরদার করতে হবে, পার্টির সুসংবদ্ধ বিকাশ সুনিশ্চিত করতে হবে। বিজয়ওয়াড়া পার্টি কংগ্রেসে গৃহীত সাংগঠনিক প্রস্তাবে বিষয়টির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পার্টির সভ্যসংখ্যা বাড়ালেই চলবে না, সভ্যদের গুণগত মানও উন্নত করতে হবে। পার্টি শিক্ষার কাজ সংগঠিতভাবে ও নিয়মিত পরিচালনার উপর জোর দিতে হবে। সেই সাথেই জোর দিতে হবে আত্ম-অনুশীলনের উপর। প্রত্যেক ক্ষেত্রে আমাদের সাংগঠনিক ত্রুটিগুলি নির্মূল করার জন্য আমাদের শুদ্ধির অভিযান শুরু করতে হবে। আমরা তার সূচনা করেছি, কিন্তু চাহিদার তুলনায় এটা এখনও পর্যাপ্ত নয়। মার্কসের মৃত্যু শতবর্ষ পালন উপলক্ষে আমাদের যে শপথ গ্রহণ করতে হবে তা হলো: মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব আয়ত্ত করতে হবে, সেই তত্ত্বকে দৈনন্দিন সংগ্রাম ও আন্দোলনে প্রয়োগ করতে হবে, জনগণের রাজনৈতিক চেতনার মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে লাগাতার প্রচারাভিযান চালাতে হবে। আমাদের এই কর্মতৎপরতা জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের সংগ্রামকেও জোরদার করবে। সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির ত্রৈমাসিক মুখপত্র ‘মার্কসবাদী পথ’ পত্রিকার তৃতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (নভেম্বর ১৯৮৩) জ্যোতি বসুর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধের মূল শিরোনাম ‘মার্কসবাদী দৃষ্টিতে কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ও পথ’। ‘মার্কসবাদী পথ’ পত্রিকার এই সংখ্যাটি কার্ল মার্কস মৃত্যুশতবার্ষিকী সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রকাশের তারিখ: ১৯-জানুয়ারি-২০২৫ |
|
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |