|
মুখে আম্বেদকর, মনে মনুর ত্রিশূলবাদল সরোজ |
আম্বেদকর আর.এস.এস এবং তার মনুবাদী হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধী ছিলেন। রিডলস অফ হিন্দুইজম সহ অন্যান্য বইয়ে তিনি বর্ণাশ্রম জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করেছেন। ‘আমি হিন্দু হয়ে জন্মেছি কিন্তু হিন্দু হয়ে মরবো না’ এই বলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকারী জনপ্রিয় জননেতা আম্বেদকর তো তাদের চক্ষুশূল হবেই। তা সত্ত্বেও তাদের নেতা, আম্বেদকরকে প্রকাশ্যে অপমান করার সাহস পায় না। তাই এভাবেই জনগণকে ভোলাতে আম্বেদকরের মুখোশ লাগিয়ে, মুখে তার নাম করে হাতে মনুর ত্রিশূল নিয়ে ধ্বংসাত্মক খেলায় নেমেছে। এই লোকসভা ভোটে বিভেদ এবং হিংসাই এদের অস্ত্র। একদিকে টিস, মুম্বই, ওয়ার্ধা এবং লখনৌতে মনুর ত্রিশূল লীলা চালু রয়েছে— অন্যদিকে মোদী যেই বুঝেছে পাত্তাড়ি গোটানোর সময় এসেছে ততই মুখে আম্বেদকরের দোহাই দিয়ে চলেছে। নিন্দাজনকভাবে আম্বেদকরকে ব্যবহার করে ধর্ম এবং জাতি ভেদের খেলায় নেমেছে, ভোট পেতে। |
আজকাল ভোট আসলেই দেখা যায় গুন্ডারা সব খুবই সভ্য ভব্য হাবভাব করে ঘুরে বেড়ায়। এখন জানি না কেন লোকে গুন্ডাদের আবার বাহুবলী নাম দিয়েছে! লোকগল্পে এমন উদাহরণ আমরা দেখেছি— স্বার্থসিদ্ধির সময় নেকড়েরা ‘গ্যারান্টি’ দেয় যে তারা নিরামিষাশী হয়ে যাবে, কিন্তু গল্পের পরিণতি আমরা ছোটবেলাতেই শিখে গেছি। এখন পরিস্থিতি হল— ঠিক ভোটপর্বের মাঝখানেই বিভেদকামীরা তাদের হিংসাত্মক, সাম্প্রদায়িক, বিভাজনকামী এজেন্ডাগুলি জোরকদমে প্রচার করতে শুরু করেছে। নির্লজ্জ এবং দ্বিধাহীনভাবে ভোটের আচরণবিধির সীমাকে বারবার লঙ্ঘন করে চলেছে। বিভাজনের রাজনীতি প্রচার এবং মিথ্যাপ্রচারে সবার চেয়ে এগিয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী নিজে। যিনি আপাতত প্রধানমন্ত্রী হয়েও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে অত্যন্ত নীচু স্তরের কুৎসিত এবং বিদ্বেষমূলক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন কথা বলছেন যে, যে কেন্দ্রীয় ভোট সংস্থা তিনি নিজের প্রিয়পাত্রদের সাজিয়েছেন, তারা পর্যন্ত বাধ্য হচ্ছে ভাষণগুলির বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করতে। আর এভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করে নিয়েছেন; যে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের দেশবাসীর মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ান, এবং নির্বাচনী আচরণ বিধি ভাঙেন! আর খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই নোটিশ জারি হয়। যখন ‘রাজা’ই এমন আচরণ করে তখন তার ‘কঞ্চি’ পারিষদরা আরও কী করছে ভেবে দেখুন। বিগত মাসে দেশের তিনটি বড় এবং বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাবলী দিয়ে এই মন্তব্যকে বিশ্লেষণ করা যায়। ১৮ এপ্রিল মুম্বইয়ের টাটা ইন্সিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্স-এর পি এইচ ডি গবেষক রামদাস প্রিনি শিবানন্দন-কে এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বিতাড়িত করেছে। তিনি দলিত সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা গবেষক। শাস্তি হিসেবে বলা হয়েছে আগামী ২ বছর পর্যন্ত টিসের তুলজাপুর, হায়দ্রাবাদ গৌহাটি কোনো ক্যাম্পাসেই তাঁর প্রবেশাধিকার নেই। রামদাস এই প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। আগে প্রোগ্রেসিভ স্টুডেন্টস ফোরামের সচিব ছিলেন; এখন দেশের অন্যতম প্রধান ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর কেন্দ্রীয় সভার সদস্য এবং মহারাষ্ট্র রাজ্য সমিতির সংযুক্ত সচিব। রামদাসকে বের করে দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে— ‘ওকে দেখেই না কি ওর স্বভাব জানা যায়’। তার ওপর প্রথম অভিযোগ, রামদাস, ভগৎ সিং-এর স্মরণে সেমিনার আয়োজন করেছিলেন; এবং তা টিস কর্তৃপক্ষের মতে ‘রাষ্ট্রবিরোধী/অ্যান্টিন্যাশনাল’ কাজ। দ্বিতীয় অভিযোগ— ২৬ জানুয়ারি, তাঁর উদ্যোগে আনন্দ পটবর্ধনের রাষ্ট্র পুরষ্কারে সম্মানিত সিনেমা- রাম কে নাম দেখনো হয়। তাতে নাকি তিনি রামমূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা উৎসবের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন এবং জনগণের ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হল এরকম ধরনের অনুশাসনমূলক কার্যক্রমের সমিতিতে ছাত্র সংগঠনের প্রধানের উপস্থিতি জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ রামদাসকে খবর পর্যন্ত দেয়নি। মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধাতে অবস্থিত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় মহাত্মা গান্ধী আন্তঃরাষ্ট্রীয় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন অধ্যাপককে ‘সো-কজ’ চিঠি ধরানো হয়েছে। সাতজনের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এঁদের অপরাধ হল প্রতি শুক্রবার এরা সকলে সন্ধে ৬টার সময় বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরেই আম্বেদকরের মূর্তির কাছে সম্মিলিত হতেন; ড. আম্বেদকরের লেখা কোনো একটি বই থেকে কিছু অংশ পড়া হত, তারপর সেই বিষয়ে আলোচনা চলত। সকলেই জানেন একে ‘স্টাডি সার্কল বা পাঠচক্র’ বলে। আম্বেদকর স্টাডি সার্কল ইন্ডিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর প্রথম সভা শুরু করে; এর মধ্যেই ৬১ টি অধিবেশন শেষ হয়েছে। এই পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে চিঠিতে জানানো হয়েছে আম্বেদকর পাঠচক্রের আয়োজন ছাত্রদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্মানের পক্ষে ক্ষতিকর। কর্তৃপক্ষের নির্দেশ তার জন্য অধ্যাপকদের ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চাননি বলে, দুজন অধ্যাপককে ট্রান্সফার করা হয়েছে এবং আরও দুজন অধ্যাপককে পদচ্যুত করা হয়েছে। লখনৌ-এর বাবা সাহেব ভীমরাও আম্বেদকর কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ এপ্রিল মাঝরাতে পুলিশ হানা দিয়ে অনশনরত ২৬ ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে দুজন নাবালক এবং দুজন মহিলা। এর কারণ, আম্বেদকর জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবছরেও ছাত্ররা শোভাযাত্রা আয়োজনের অনুমতি চেয়েছিল কর্তৃপক্ষের কাছে; কর্তৃপক্ষ ভোটের বাহানায় সে অনুমতি দেয়নি। তাতে ছাত্ররা বলে, একই যুক্তিতে তাহলে রামনবমীতেও এরকম কোনো আয়োজনের অনুমতি দেওয়া যাবে না, তাতে কর্তৃপক্ষ তাদের অনুরূপ আশ্বাস দেয়। তারপর রামনবমীর দিন, ক্যাম্পাসে উত্তাল ডিজে লাউডস্পিকার সহযোগে উৎসব শুরু হলে, এই ছাত্ররা আলোচনা করতে কলেজের অফিসে উপস্থিত হয়। তখন কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই নিরাপত্তা কর্মীদের দ্বারা তাদের ওপর হামলা করানো হয়। এসএফআই নেতা আব্দুল ওয়াহাব বলেন এর ফলে ছাত্রারা গুরুতর চোট পেয়েছে। হামলা চলাকালীন নিরাপত্তা কর্মীদের প্রধান নিজেকে ‘কুন্ডার ঠাকুর’ বলে পরিচয় দিয়ে ছাত্রদের জাতিবিদ্বেষী গালাগালি দিতে থাকে। কলেজের প্রক্টর এই হামলার নির্দেশ দেয়, তিনি নিজেই দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত কিন্তু আরএসএস। তিনি মনে করেন আম্বেদকর ‘দেশদ্রোহী’ কারণ তিনি মনুস্মৃতি পুড়িয়ে ছিলেন। তারপর এই হামলার দায় স্বীকার এবং প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে দলিত ছাত্র সংগঠন এবং এসএফআই-এর যৌথ অনশন কর্মসূচিতে পুলিশ আক্রমণ করে। জামিন পাওয়া ছাত্রদেরও পুলিশ দুদিন ধরে জেলে বন্ধ করে রাখে। পরে লখনৌ-এর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিক সংগঠনের হস্তক্ষেপে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। শুধু এই তিন ঘটনা নয়, একইরকম ধরণের ঘটনার খবর এসেছে সংযুক্ত রাষ্ট্রসংঘ (ইউ এন ও) থেকেও। সেখানে আম্বেদকর জয়ন্তী উপলক্ষে ১৮ এবং ২৩ এপ্রিল সভার আয়োজন করা হয়েছিল। ফাউন্ডেশন ফর হিউম্যান হরাইজন দ্বারা আয়োজিত এই অনুষ্ঠান দুটিতে অনেকে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আমেরিকায় ভারতে যিনি রাষ্ট্রদুত এবং ইউ এন ও তে ভারতের প্রধান দুজনেই অনুপস্থিত ছিলেন। অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে বলেন- ভারতে ভোট চলছে। এই গোষ্ঠীর আম্বেদকরের প্রতি এমন ব্যবহার নতুন কথা নয়। বেছে বেছে তাঁর মূর্তি ভাঙা, দাদরে তাঁর নিজের তৈরি সেন্টার, যেটি শেষ জীবনে তাঁর কর্মস্থল ছিল, সেই সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া সবই আছে। দিল্লি সরকারের এক মন্ত্রী আম্বেদকরের ২২ প্রতিজ্ঞা পাঠ করেছিলেন বলে তাকে বিভিন্ন অজুহাতে মন্ত্রীসভা থেকে সরানো হয়েছে। গুজরাতে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্য বই থেকে আম্বেদকরের সাহিত্য মুছে ফেলা হয়েছে। আরএসএস-এর রাজনৈতিক বাহু বিজেপির মোদী সরকার আর প্রাদেশিক সরকার মিলে লাগাতার এমন কর্মকাণ্ড করে চলেছে। এই সম্পর্কে বহু লেখালেখিও চলছে। মার্কসবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা যাঁর লেখালেখির বিষয়, সেই ভগৎ সিং বিষয়েও ভয় এই গোষ্ঠীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তৎকালীন সংঘ প্রধান ভগৎ সিং-এর ফাঁসির পর যে কুমন্তব্য করেছিলেন এবং স্বয়ংসেবকদের এমন বিপ্লবীদের থেকে দূরে থাকার যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তার দস্তাবেজ প্রমাণ ইতিহাসে মজুত আছে। আম্বেদকর আরএসএস এবং তার মনুবাদী হিন্দুরাষ্ট্রের বিরোধী ছিলেন। রিডলস অফ হিন্দুইজম সহ অন্যান্য বইয়ে তিনি বর্ণাশ্রম জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করেছেন। ‘আমি হিন্দু হয়ে জন্মেছি কিন্তু হিন্দু হয়ে মরবো না’ এই বলে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকারী জনপ্রিয় জননেতা আম্বেদকর তো তাদের চক্ষুশূল হবেই। তা সত্ত্বেও তাদের নেতা, আম্বেদকরকে প্রকাশ্যে অপমান করার সাহস পায় না। তাই এভাবেই জনগণকে ভোলাতে আম্বেদকরের মুখোশ লাগিয়ে, মুখে তার নাম করে হাতে মনুর ত্রিশূল নিয়ে ধ্বংসাত্মক খেলায় নেমেছে। এই লোকসভা ভোটে বিভেদ এবং হিংসাই এদের অস্ত্র। একদিকে টিস, মুম্বই, ওয়ার্ধা এবং লখনৌতে মনুর ত্রিশূল লীলা চালু রয়েছে অন্যদিকে মোদী যেই বুঝেছে পাত্তাড়ি গোটানোর সময় এসেছে ততই মুখে আম্বেদকরের দোহাই দিয়ে চলেছে। নিন্দাজনকভাবে আম্বেদকরকে ব্যবহার করে ধর্ম এবং জাতি ভেদের খেলায় নেমেছে, ভোট পেতে। রাজস্থানে ভোট-প্রচার সভায় মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যা এবং সবচেয়ে ভয়ংকর-অর্ধসত্য বলে গদি-বজায় রাখতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী। তার ঝুটা দাবি ২০০৪-এ ইউপিএ সরকারের সময় এসসি-এসটিদের জন্য সংরক্ষিত আসন মুসলিমদের দেওয়া হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশ কর্নাটকের মতো রাজ্যে গিয়ে ধর্মভেদের পাশাপাশি জাতিভেদের কথা বলে দলিত আদিবাসীদের তার বিভাজনের নোংরা খেলায় বোড়ে বানাতে চাইছে। এমন নয় যে, মোদী জানেন না যে, দলিত আদিবাসীদের জন্য যে সংরক্ষণ তা সংবিধানের অন্তর্গত; এবং তা অপরিবর্তনশীল তার মধ্যে ইচ্ছে মতো রদবদল করা যায় না। এও ভালো করেই জানেন যে, এই সংরক্ষণের আইন এসসি-এসটিদের বঞ্চিত করার জন্য নয়। এটাও মোদী জানেন, বিজেপি সরকারই সংরক্ষণ আইন সচেতনভাবে কৌশলে লঙ্ঘন করেছে সবচেয়ে বেশি। বিজেপির কেন্দ্র সরকার তার নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলিতে টুকরো টুকরো বিজ্ঞপ্তিতে কম সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করে, যাতে সংরক্ষিত আসন যোগ্যদের না দিতে হয়। এভাবে কৌশলে জোড়াতালি নিয়ম বের করে বিজেপি শাসিত এবং সমমনস্ক রাজ্য সরকার, সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। আরেকটি কৌশল, বেশিরভাগ সময় সংরক্ষিত আসনগুলিতে বলে দেওয়া হয়— ‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি’। তারপর সেই পদ্গুলিকে অসংরক্ষিত করে নিজস্ব প্রার্থী নিয়োগ করা হয়। মোদী সরকারের আমলে এইসব কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই সরকার ঠিকা এবং অস্থায়ী কর্মী নিয়োগকে নিয়মে পরিণত করেছে, এবং তাতে সংরক্ষণ-আইন লাগু করার কোনো বব্যস্থা নেই। তাহলে জাতিবিদ্বেষী মনোভাব কাদের? কারা চিরকাল ধরে বঞ্চিতদের আরও বঞ্চনা করছে? মনে রাখতে হবে, দলিত, আদিবাসীরা দীর্ঘ লড়াইয়ের পথ পেরিয়ে, সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যা ইচ্ছে মতো মোদি এবং অমিত শাহ বদলে দিতে পারে না। তা সত্ত্বেও লুকিয়ে-চুরিয়ে, চোরা-সুড়ঙ্গ বের করে মনুর মনোভাবকে লাগু করছে। মোদী সরকার নতুন শিক্ষা নীতিতে এসসি, এসটি সংরক্ষণ প্রশ্নে চুপ। সবকিছুকে মিলিয়ে তালগোল পাকিয়ে ‘বঞ্চিত সমূহ’ করে দেওয়া হয়েছে; তারমধ্যে শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধীরাও আছেন। এর অর্থ দলিত, আদিবাসীদের যে সামাজিক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক কারণে আলাদা সংরক্ষণের প্রয়োজন সে কথাকেই মান্যতা দেওয়া হয়নি। আসলে এই মনোভাব নিষ্পাপ নয়, সংরক্ষণ পদ্ধতিকে শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত। এই সব কাণ্ডকারখানা করে মোদী বুক চিতিয়ে মিথ্যে বলে বেড়াচ্ছে যে, সংরক্ষণ ছিনিয়ে মুসলিমদের দিয়ে দিচ্ছে বিরোধীরা। সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর সচেতন কুটিল-ষড়যন্ত্র ছাড়া একে আর কি বলা যায়? অনগ্রসর জাতির কোটা মুসলিমদের দেওয়া হচ্ছে নানা জায়গায় এসব মিথ্যে বলে বেড়ানো অতিচালাকি, আর শয়তানি ছাড়া আর কিছুই নয়। কর্ণাটকে আবার ওবিসি কোটা দলিতদের বঞ্চিত করে মুসলিমদের দেওয়া হচ্ছে বলে কুমীর-কান্না কেঁদেছেন মোদী। যদিও দেবগৌড়ার পার্টি জেডি (এস) এর সঙ্গেই বহুদিন যৌথভাবে ভোটে লড়ছে বিজেপি, সভায় সভায় দেবগৌড়ার সঙ্গী হয়ে ঘুরছে। আসল কথা হল ঠিক আগের রাজ্য-ভোটের সময় তৎকালীন বিজেপি সরকার মুসলিমদের সংরক্ষণ ছিনিয়ে নিয়ে অন্যদের দিয়েছিল। কিন্তু এই সংবিধান-বিরোধী শয়তানি চালকে সর্বোচ্চ আদালত রদ করে দেয়। সিদ্ধরমৈয়া সরকার এসে প্রথম ব্যবস্থাই বহাল করেছে; এবার একেই মোদি অনগ্রসর জাতির জন্য সংরক্ষণ ছিনিয়ে মুসলমানদের দেওয়া বলেছেন। যদিও মুসলমানদের এই সংরক্ষণের অধিকার তিন দশক ধরে, সংবিধান স্বীকৃত। মোদীর স্বভাবই হল সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানো। আগে কর্পুরী ঠাকুর, বিহারের ভোটদাতাদের প্রভাবিত করতে এই সংরক্ষণ দিয়েছিল। মোদী নিজে ভোটের ঠিক আগেই তাদের ‘ভারতরত্ন’ দিয়েছে, তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে ছবিও তুলেছে। ওবিসি কোটায় পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের সংরক্ষণ মোদীর গুজরাতে দেওয়া হয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের ৭০টি জাতিকে। মোদী একটি ইন্টারভিউতে নিজেই বলেছেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি এই সংরক্ষণ বহাল রাখার চেষ্টা করেছেন এবং ১২টি অতিরিক্ত জাতিকে আরও যোগ করেছেন। এর পরেও বিভিন্ন সভায় মিথ্যা বলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার— যেখানে যেমন কুমীরকান্না কেঁদে ভোট আদায় করা যায়। এখন মোদি নিজেই- ‘ইস বার ৪০০ পার’-এর শ্লোগান তুলতে ভুলে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সংবিধান বদলে দেওয়ার চক্রান্ত মানুষ বুঝে গেছে। জাতিভিত্তিক জনগণনা হতে না-দেওয়ার কৌশলও মানুষ বুঝে গেছে। মন্দির রাজনীতির ফাঁপা বেলুনে তো ভোট উদ্ধার হল না; মিথ্যা আড়ম্বরপূর্ণ গালভারী ‘মোদী-গ্যারান্টি’র বিজ্ঞাপনও কাজ করল না। প্রথম দফার ভোটের পর মোদী নিজেই ‘গ্যারান্টি’ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষ হতে-না-হতেই পায়ের নিচের মাটি সরছে দেখে এবার মুখোশ খুলে দাঁত নখ বেরিয়ে পড়ছে। আর নানা জায়গায় কুমীরের কাঁদুনিও কাজে দিচ্ছে না। ধূর্ত শেয়ালের রঙ (গেরুয়াধারী) ধুয়ে গেছে, ময়ূরের নকল পেখম খসে পড়ছে। তাই মঞ্চ থেকে ধর্ম আর জাতিভেদের বিষ ছড়িয়ে, ওয়ার্ধা থেকে লখনৌ পর্যন্ত আম্বেদকর, ভগৎ সিং এবং সংবিধানকে যারা আশ্রয় করেছে তাদের ভয় দেখানো হচ্ছে। একটা ভোট জেতার জন্য যদি কেউ এত নীচে নামতে পারে তাহলে তৃতীয়বার জিতলে যে ১৩০ কোটি ভারতবাসীর কী সর্বনাশ করবে তা সহজবোধ্য। বিভেদ-বিদ্বেষ বর্ষণই এদের স্থায়ী গ্যারান্টি। তার পালটা হিসেবে জনগণ বাকি দফার ভোটগুলিতে মোদীকে ঝোলাসুদ্ধু বিদায় করার ওয়ারেন্টি দিয়ে দেবে। সূত্র- লোকলহর পত্রিকায় ০৫-০৫-২০২৪-এ প্রকাশিত ভাষান্তর: বীথিকা সাহানা প্রকাশের তারিখ: ১৯-মে-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |