|
আন্দোলনের অভিজ্ঞতাদীধিতি রায় |
আসলে ‘every personal is political’ শ্লোগান শুধু লড়াইয়ের ময়দানে ওঠে না, এই শ্লোগান প্রতিদিন রান্নাঘর থেকে শুরু হয়ে কয়লা খাদান অব্ধি যায়। শ্রমের নিরাপত্তা নিয়ে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যখন কথা বলছি তখন আমাদের বারংবার বলতে হবে তাদের কথা যাদের কাছে ‘শ্রম’-টাই বেঁচে থাকার নিরাপত্তা, দু-বেলা খেয়েপরে বাঁচার একমাত্র রসদ। গত কয়েক বছরে লিঙ্গভিত্তিক আধিপত্য কায়েম যেমন বেড়েছে তেমনই বেড়েছে জাতভিত্তিক দখলদারি স্থাপনের চেষ্টা। ফলস্বরূপ, উন্নাও তে মন্দিরে আটকে সংখ্যালঘু একটি মেয়েকে লাগাতার ধর্ষণ করে উচ্চবর্ণের হিন্দু পুরুষরা। |
এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপ দাবি না-আদায় হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই লড়ছেন সকল। ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীরা অবশ্যই এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে রয়েছেন তবু এই আন্দোলন সকলের। এই সময়কালে আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে শ্রমিক মহল্লায়, কৃষক পল্লীতে। গ্রামের পুকুরে বাসন মাজতে মাজতে মহিলারা আলোচনা করছেন আরজি করের নৃশংসতা, উঠে আসছে নারীমুক্তির প্রশ্ন— সহজ ভাষায়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এই মুভমেন্টে আমরা শুনেছি ‘reclaim the nights’ এই কথা। শ্লোগান উঠে এসেছে রিক্লেইম দ্য নাইট মুভমেন্ট থেকে যা ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে অনুরণিত হয়েছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ মধ্যবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড ইয়র্কশায়রে রিপারের হত্যার পর পুলিশ মহিলাদের গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রিত করার ফতোয়া দেয় এবং এরপরই ইংল্যান্ড উত্তাল হয়ে ওঠে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নকে সামনে রেখে। ফলস্বরূপ ইংল্যান্ডের লিডসের মহিলারা ১৯৭৭ সালে রাত দখল করে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে। এবং এই আন্দোলন কেবলমাত্র নারীমুক্তির প্রশ্নে সীমিত থাকেনি তার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পরে ইন্টারসেকশনালিটির আঙ্গিকে। প্রতিবন্ধী মহিলা, কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা, জাত ও ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু মহিলাদের বিভিন্ন পরিচিতি ভিত্তিক হিংসার বিরুদ্ধে মহিলাদের সংগঠিত করেছিল। সেই আন্দোলনের ছাপ দেখা যাচ্ছে আরজি কর আন্দোলনে। ঘোষিত কর্মসূচি হিসাবেই এ-বছর স্বাধীনতার রাতে তিনশোর বেশি জায়গায় মেয়েরা রাত দখল করে। ১৯৭৭-এর লিডসের আন্দোলন বহুমাত্রিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন পরিচিতি ভিত্তিক নারী শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিল সে-আন্দোলন। সেই ছায়া আরজি কর-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনেও লক্ষ করা যাচ্ছে। তিলোত্তমার ঘটনার যে বিষয়টা সামনে এসে যাচ্ছে বারবার তা হল কর্মক্ষেত্রে নারী সুরক্ষার প্রশ্ন। এবং তাই এই আন্দোলনে কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা প্রদানের জন্য আইসিসি গঠনের দাবি আমাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে একটা। কিন্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মহিলাদের ওপর হিংসার স্তরও বিভিন্ন। উচ্চবিত্ত মহিলা ও নিম্নবিত্ত মহিলাদের অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে তারতম্য বিদ্যমান সহজেই। কিন্তু তাদের ওপর সংগঠিত হিংসার তারতম্যকে শাসক লুকিয়ে রাখতে চায়— এ যেন এক চিরায়ত ফন্দি। যে-মহিলা অফিসে চাকরি করেন কিংবা সংগঠিত সেক্টরে আছেন তার জন্য আমরা আইসিসি-র দাবি করি, কিন্তু যে-মহিলা গৃহ-সহায়িকার কাজ করেন, কয়লা খাদানে নেমে কয়লা সংগ্রহ করেন কিংবা বাড়ি বা রাস্তা তৈরিতে জোগারের কাজ করেন তার কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য কী ব্যবস্থা আছে? একজন গৃহ-সহায়িকা যদি কর্মক্ষেত্রে কোনোরকম যৌন নির্যাতন কিংবা লাঞ্ছনার শিকার হন এবং সেটা যদি তিনি জানান তাহলে পরদিন থেকে তার ভাত জোটা বন্ধ হয়ে যাবে। একই রকমভাবে কয়লা খাদানে কাজ করা মহিলাটির জন্য কোনও সেন্সিটাইজেশন সেল থাকে না। ফলত এই আন্দোলন অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে কীভাবে দেখছে তা নিয়ে নিরন্তর তর্ক ও চর্চা করা উচিত। যেদিন সোদপুর থেকে শ্যামবাজার অব্ধি দীর্ঘ মানবশৃঙ্খল হল সেই মানবশৃঙ্খলে ছিলেন এক মহিলা যিনি লোকের বাড়িতে রান্না করেন। তিনি বললেন, এ-লড়াই তো সবার, বিচার তো চাইতেই হবে। অথচ তার কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার উপায় সম্পর্কে আমরা এখনও দিশা দেখাতে পারিনি কেবল কয়েকটি আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা ছাড়া। তবুও তিনি লড়ছেন, আমাদের ধারণা এরকম বহু মহিলা, বহু প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষ এই লড়াইয়ে এসেছেন যারা প্রতিদিন নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসরে নানাভাবে হেনস্থা হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করার উপাদান সংগ্রহ করতেই এই আন্দোলনে তাঁদের সামিল হওয়া। আসলে ‘every personal is political’ শ্লোগান শুধু লড়াইয়ের ময়দানে ওঠে না, এই শ্লোগান প্রতিদিন রান্নাঘর থেকে শুরু হয়ে কয়লা খাদান অব্ধি যায়। শ্রমের নিরাপত্তা নিয়ে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যখন কথা বলছি তখন আমাদের বারংবার বলতে হবে তাদের কথা যাদের কাছে ‘শ্রম’-টাই বেঁচে থাকার নিরাপত্তা, দু-বেলা খেয়েপরে বাঁচার একমাত্র রসদ। গত কয়েক বছরে লিঙ্গভিত্তিক আধিপত্য কায়েম যেমন বেড়েছে তেমনই বেড়েছে জাতভিত্তিক দখলদারি স্থাপনের চেষ্টা। ফলস্বরূপ, উন্নাও তে মন্দিরে আটকে সংখ্যালঘু একটি মেয়েকে লাগাতার ধর্ষণ করে উচ্চবর্ণের হিন্দু পুরুষরা। হাথরসে দলিত মেয়ের ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ দায়ের করতে চায় না রাষ্ট্র। এই সব ক্ষেত্রে বুর্জোয়া মিডিয়া লঘু করে দিতে চায় ধর্ষিতার শ্রেণি পরিচয়, তার জাতপাত গত অবস্থান আর মুখ্য করতে চায় কেবল লিঙ্গসত্ত্বাকে। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখা উচিত— “শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়াটি নিজেই চরিত্রে একটি লিঙ্গায়িত প্রক্রিয়া। কারণ পুঁজি ও শ্রমের পারস্পরিক যোগাযোগ নারীর মজুরিবিহীন কাজের উপর ন্যস্ত যা কি-না সামাজিক পুনরুৎপাদনের ভিত্তিটি তৈরি করে।” একজন উচ্চবর্ণের মেয়ের ওপর সমাজের চোখরাঙানি পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য এবং একজন দলিত মেয়ের ওপর সমাজের চোখরাঙানি আরও প্রকট হচ্ছে প্রতিদিন। উচ্চবর্ণের লোকেরা নিম্নবর্ণকে স্পর্শ করে না, তাই তারা ধর্ষণ করতে পারে না— এরকম যুক্তিতে একের পর এক ধর্ষক বেকসুর খালাস হচ্ছে এদেশে। হাথরসের ধর্ষিতার বাড়ির সামনে পুলিশ প্রহরা বসে, ধর্ষিতার দাদা কাজ হারায় আর ধর্ষকরা খুলে আম ঘুরে বেড়ায়— এটায় লিঙ্গভিত্তিক শোষকের শ্রেণিজাত অবস্থান! আর এই আন্দোলন তাই আমাদের শেখায় কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং আইসিসি গঠন ও সক্রিয় রাখার ব্যবস্থা করতে। যে ছোটো প্রাইভেট কোম্পানিতে একজন মহিলা কর্মী যৌন নির্যাতনের কথা বললে কাজ হারাতে পারেন কিংংবা সামাজিক ক্ষেত্রে স্লাট শেমিং-এর শিকার হতে পারেন তার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে হবে। এই আন্দোলন আমাদের শেখাচ্ছে গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে মহিলাদের সরব করার জন্য সংবেদনশীল করে তোলার প্রক্রিয়াকে। এই আন্দোলন আমাদের শেখাচ্ছে বিড়ি-শ্রমিক, ইট ভাটার শ্রমিক, গৃহ-সহায়িকা, যৌন কর্মী, কয়লা খাদান, চাষের জমি সহ প্রত্যেক স্তরে মহিলাদের অধিকার, মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে। ভারতে নারীবাদের ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে: প্রথম পর্যায়টি, ১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছিল, যখন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সমাজ সংস্কারকরা শিক্ষা ও সামাজিক রীতিনীতির সংস্কার করে নারী অধিকারের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছিল, দ্বিতীয় পর্যায়, ১৯১৫ থেকে ভারতের স্বাধীনতা পর্যন্ত, যখন ভারতের রাজনীতিতে সরাসরি নারীরা অন্তর্ভুক্ত হন এবং নারী আন্দোলন গড়ে ওঠে যা পরবর্তীতে স্বাধীন মহিলা সংগঠনগুলির তৈরির মাধ্যমে আরও বিকশিত হয়; এবং অবশেষে, তৃতীয় পর্যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী, যা বিবাহের পরে নারীদের অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে সমানাধিকারের কথা বলে। বহির্বিশ্বে কোথায় পঞ্চম কোথাও ষষ্ঠ নারীবাদের ঢেউ দেখা যায়... এক্ষেত্রে এই আন্দোলনকে এখনই নারীবাদের কোনও তরঙ্গ কিনা তা বলা যাবে না। তবে লিবেরাল ফেমিনিস্টরা তাদের শহুরে মিডল ক্লাস গণ্ডিতে অতীতের মতোই একে তরঙ্গ বলতেই পারেন যদি এটি মহিলাদের স্বাধিকার এবং সমানাধিকারের লড়াইয়ের আইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। মার্ক্সিস্ট ফেমিনিস্টরা যেহেতু শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে লিঙ্গরাজনীতিকে ব্যাখ্যা করে ফলত এই আন্দোলন যদি একইসাথে কয়লা খাদানে কর্মরত মহিলার, বিড়ি শ্রমিকের, ক্ষেতে কাজ করা মহিলার, যৌন কর্মী, গৃহসহায়িকা সহ বিভিন্ন মহিলার এবং প্রান্তিক লিঙ্গের সকল মানুষের কাজের জায়গায় বহুমাত্রিক শোষণের অবসানের লড়াইকে অন্তর্ভুক্ত করে তবে ভেবে দেখা যাবে এটি আদৌ তরঙ্গ কিনা। যদি এই আন্দোলনের বিভিন্ন বাঁকে জাতভিত্তিক ধর্মভিত্তিক লিঙ্গভিত্তিক শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় তবে তা দিনবদলের ঢেউ তুলবে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস চিহ্ন-এর শেষে একজন শহীদ হওয়ার মুহূর্তে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে বাকিদের উদ্দেশ্যে যে মিছিলটা এগোবে না? মিছিল এগোনোর নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সার্থকতা পায় এই গল্প। এ-ঘটনা আমাদের যেন একই উপলব্ধির সামনে সমাপতিত করে, যেন তিলোত্তমা আমাদেরকে একই প্রশ্ন করে, লড়াইটা আর এগোবে না? এ-লড়াই তো কেবল তিলোত্তমার অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মধ্যে শেষ নয়। এই লড়াই আসলে শ্যামবাজারের পাঁচটা রাস্তার সংযোগস্থলের মতো, বহুমাত্রিক শোষণ এবং তার সাথে পুঁজির সম্পর্ক, তার সাথে রাষ্ট্রসঞ্জাত চোখরাঙানি সেসব নিয়েই এগিয়ে যাওয়া আমাদের। কেউ কেউ এই আন্দোলনকে স্তিমিত বলে দাগিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু এই আন্দোলনের আঁচ এখনও জ্বলছে, বুকের ভিতর জ্বলছে। যে মেয়েটা সকালে ধান কাটছে, যে মেয়েটা খনিতে নামছে, যে বিড়ি মুড়ে সুতোয় টান দিচ্ছে, যে অফিসে কী বোর্ডে টাইপ করছে তারা প্রতিদিন এই আঁচের উত্তাপে হাত সেঁকতে সেঁকতে পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করছে। এই যৌথতাই আমাদের এই আন্দোলনের শিক্ষা। প্রকাশের তারিখ: ০৬-অক্টোবর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |