অ্যান্টি ড্যুরিং - মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষার সম্পদ (১ম পর্ব)

রথীন সেন
তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক পণ্ডিতদের আস্ফালনের প্রতিবাদে এঙ্গেলস ঘোষণা করলেন "বর্তমান জার্মানিতে নতুন চিন্তা পদ্ধতি সৃষ্টিকারী হের ড্যুরিং আদৌ বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি নন। কিছুকাল যাবৎ সেই দেশে অজস্র দার্শনিক এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে অসংখ্য নিত্য নতুন পদ্ধতি ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি আবির্ভূত হচ্ছে। ..... আসলে হের ড্যুরিং এই ধরনের গলাবাজি করা মেকি বিজ্ঞানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নমুনা। কাব্যে, দর্শনে, অর্থনীতিতে, ইতিহাস তত্ত্বে সব কিছুই জার্মানিতে অর্থহীন দন্তনিনাদে ডুবে যাচ্ছে।

উনিশ শতকের ইউরোপ। শ্রমিকদের গণ-আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে আর বুর্জোয়ারা তাদের বিপ্লবী চরিত্র হারিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিতে পরিণত হতে শুরু করেছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলন যখন নতুন একটি বিপ্লবী শক্তির জন্মের সূচনা করছে ঠিক সেই সময় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস-এর কর্মজীবনের শুরু।

কার্ল মার্কসের ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাশিয়ার রাইন প্রদেশের বারমেন শহরে ১৮২০ সালের ২৮শে নভেম্বর।

১৮৪২-এ যখন মার্কস ও এঙ্গেলস-এই দুই মহান বিপ্লবী পরস্পরের সঙ্গে পরিচিতির সূত্রে পাশাপাশি এসে দাঁড়ালেন তখন শ্রমিক আন্দোলন ছিল মূলতঃ অসংগঠিত, লক্ষ্যহীন এবং প্রকৃতপক্ষে স্বতঃস্ফূর্ততার উপর নির্ভরশীল। কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, বুর্জোয়া ব্যবস্থার বিরোধিতা ও তার ত্রুটি দুর্বলতাগুলির সমালোচনা করলেও যুক্তির আলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে মানব সমাজের গতিধারাকে বিশ্লেষণ করে ধনতন্ত্রের অবসান ও সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতার কথা তখনো ছিল শ্রমিকশ্রেণির অজানা। নিজস্ব শ্রেণিস্বার্থ সম্বন্ধে শ্রমিকশ্রেণি ছিল অসচেতন। সমাজতন্ত্রের চিন্তাকে বিজ্ঞানসম্মত একটি তত্ত্বে পরিণত করেছিলেন কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। সারা পৃথিবীর শ্রমিকশ্রেণী তাই মহান মার্কসের পাশাপাশি এঙ্গেলসকেও এক অসামান্য বোদ্ধা, সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার, আমৃত্যু শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে সংগ্রামী ও সংগঠক হিসাবে স্মরণ করে।

সারা জীবন এঙ্গেলস অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করেছেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব বিশ্লেষণ ও প্রতিষ্ঠার জন্য, নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তোলার। তাঁর বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ পুস্তকটির রচনা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

এই অসামান্য রচনাটির মধ্যেই শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী তত্ত্বকে তিনি সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বইটির তিনটি অংশ, দর্শন, অর্থশাস্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, যার মধ্য নিয়ে এঙ্গেলস সমগ্র মার্কসবাদী চিন্তাকেই সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করেছিলেন। মার্কসবাদ শিক্ষার ক্ষেত্রে, সমাজতন্ত্রের অপরিহার্যতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানব সমাজের গতিধারা অনুধাবন ও শোষণমুক্তির যথার্থ পথ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ নিঃসন্দেহে অবশ্য পাঠ্য। অ্যান্টি ড্যুরিং’-এর অর্থশাস্ত্র সংক্রান্ত অংশটির দশম অধ্যায় লিখেছিলেন মার্কস। এছাড়াও পুস্তক হিসাবে মুদ্রণের পূর্বে সমগ্র পাণ্ডুলিপিটি এঙ্গেলস মার্কসকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। সেই সময়, মার্কস ব্যস্ত ছিলেন ‘ক্যাপিটাল’ রচনার কাজে।

এঙ্গেলস-এর মূল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বস্তুবাদী বিশ্ববীক্ষাকে প্র তিষ্ঠা করা। মার্কসবাদীদের কাছে বইটি মার্কসবাদের বিশ্বকোষ নামে পরিচিত। কারণ, ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে এই বিতর্কে এঙ্গেলসকে অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস, দর্শন, প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সমাজতন্ত্রের অজস্র প্রশ্ন আলোচনা করতে হয়েছে। এঙ্গেলস নিজেই বলেছেন— সময় এবং শূন্য, দেশ সম্পর্কিত ধারণা থেকে দ্বিধাতু তত্ত্ব (দেনা পাওনার উপায় হিসাবে দু'টি ধাতুকে ব্যবহার), বস্তু এবং গতির নিভর্রতা হতে নৈতিক ভাবধারার অনিত্য প্রকৃতি, ডারউইনের বক্তব্য থেকে ভবিষ্যতের তরুণ সম্প্রদায়কে শিক্ষাদান অবধি সমস্ত বিষয় ছিল এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’-এর তিনটি পরিচ্ছেদের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে এঙ্গেলস রচনা করেছিলেন। ইউটোপীয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র'। ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ রচনা কালে প্রতি মুহূর্তে এঙ্গেলসের মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে, কারণ এই সময় তাঁর স্ত্রী গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৮৭৮-এর সেপ্টেম্বরে তাঁর জীবনাবসান হয়। ব্যক্তিগত এই দুঃখ ও যন্ত্রণা নিয়েও এঙ্গেলস ছিলেন শোষিত। মানুষের প্রতি কর্তব্যে অবিচলিত।

১৮৭৫ সালে জার্মানির দু'টি রাজনৈতিক সংগঠন সোস্যাল ডেমোক্রাটিক ওয়ার্কার্স পার্টি ও জার্মান শ্রমিকদের সাধারণ সমিতি সম্মিলিত হয়। এই উদ্দেশ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির গোথা কংগ্রেসে একটি কর্মসূচী গৃহীত হয়। কর্মসূচীটির খসড়া প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায়, সোসাল ডেমোক্রাটিক পার্টির নেতারা সুবিধাবাদী স্রোতধারার সঙ্গে আপস করতে সম্মত হয়েছেন। মার্কস ও এঙ্গেলস একে বিরাট ভুল এবং এর পরিণতি হবে মারাত্মক মনে করেছিলেন। জার্মানির শ্রমিক নেতাদের এই ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য খসড়াটির তীব্র সমালোচনা করে মার্কস যা লিখেছিলেন তা-ই পরে ‘গোথা কর্মসূচীর সমালোচনা' নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু মার্কসের সমালোচনা ও বিপরীত যুক্তি অগ্রাহ্য করেই, জার্মান শ্রমিকদের দু'টি রাজনৈতিক সংগঠনের সম্মেলন একটি বাস্তব সত্যে পরিণত হয়।

মার্কস ও এঙ্গেলস যা আশঙ্কা করেছিলেন, প্রকৃতপক্ষে গোথা কংগ্রেসের পর তা সত্য হয়ে ওঠে। পার্টির কেন্দ্রীয় পত্রিকা সেই সব লেখকদের মর্যাদা দিতে থাকে যাদের সম্পর্কে পার্টির এক নেতাকে এঙ্গেলস তখনই লেখেন যে তাঁদের মারাত্মক অর্থনৈতিক ভ্রান্তি, ত্রুটিপূর্ণ মতবাদ এবং সমাজতন্ত্রী সাহিত্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এ পর্যন্ত জার্মান আন্দোলনের তত্ত্বগত উৎকর্ষকে পুরোপুরি ধ্বংস করার সেরা মাধ্যম হয়ে উঠছে। অন্যত্রও এঙ্গেলস মন্তব্য করেন যে পার্টির নৈতিক ও বৌদ্ধিক স্তরের অবনমন ঘটেছে এবং এর সংবাদপত্র ও সম্মেলনগুলিতে অর্ধশিক্ষিত পণ্ডিতদের 'অজ্ঞতা' প্রকাশিত হচ্ছে।

এই পটভূমিকায় ইউজেন ড্যুরিং-এর আবির্ভাব। ব্যক্তিগত জীবনে ইউজেন ড্যুরিং ছিলেন প্রথমে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পরে ১৮৭৩ সাল হতে তিনি অধ্যাপনা করতেন মেয়েদের বেসরকারি কলেজে। পরবর্তী কালে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাদানের অধিকারটি কেড়ে নেওয়া হয়। ড্যুরিং পেটি বুর্জোয়া তত্ত্বগুলির বিচিত্র সংমিশ্রণে এক নতুন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোষণা করেন। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা ও উদ্বৃত্ত মুলোর ভিত্তিতে পুঁজিবাদী উৎপাদনের রহস্য উদ্ঘাটন— এই যে দু'টি বিরাট আবিষ্কারের জন্য মানব সভ্যতা মার্কসের কাছে কৃতজ্ঞ, তাকে অগ্রাহ্য করেই ড্যুরিং-এর সমাজতান্ত্রিক কল্পনা। প্রসঙ্গত মার্কস এবং তাঁর মতবাদ সম্পর্কে ড্যুরিং লিখেছিলেন— ‘নিষ্ফলা ধারণা যেগুলি বাস্তবে ইতিহাস ও তর্কশাস্ত্রগত অলীক কল্পনার জারজ সন্তান... বিভ্রান্তিকর বিকৃতি... ব্যক্তিগত অহমিকা, নীচ মুদ্রাদোষ, বদমেজাজী, রসিকতার নামে ভাঁড়ামী.... দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক পশ্চাদপদতা।...’ ডারউইনের তত্ত্বকেও ড্যুরিং জঘন্য ভঙ্গিতে আক্রমণ করেছিলেন। ড্যুরিং-এর ভাষায়: ডারউইনীয় অর্ধ কবিতা এবং রূপান্তর কুশলতা আর তার সঙ্গে উপলব্ধি সম্বন্ধে স্থুল ও সচেতন সংকীর্ণতা ও বিবর্তনের তীক্ষ্ণতায় দুর্বলতা...। আমাদের মতে ডারউইনবাদের, যার থেকে অবশ্য লামার্কের সুত্রগুলিকে বাদ দিতে হবে, বৈশিষ্ট্য হলো মানবতার বিরুদ্ধে এক বর্বরতা ‘চার্লস ডারউইনের জন্ম ১৮০১ সালে। বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভূ-তত্ত্ব বিদ্যা সম্বন্ধে এক শিক্ষামূলক ভ্রমণে ডারউইন ওয়েলস-এ যান। এরপর প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে 'এইচ এম এস বিগল জাহাজে চেপে দীর্ঘ পাঁচ বছর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সুযোগ পান। এই দীর্ঘ বছরগুলিতে ডারউইন অর্জন করেছিলেন প্রকৃতি সম্বন্ধে গভীর অভিজ্ঞতা। জৈবিক ক্রমবিকাশের মূল সূত্র আবিষ্কার ডারউইনের অসাধারণ কীর্তি। ১৮৫১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গ্রন্থ 'অরিজিন অব স্পিসিস'। ১৮৭১ সালে 'ডিসেন্ট অব ম্যান।' প্রথম বইটি পড়ে মার্কস এঙ্গেলসকে লিখলেন ‘আমাদের ধারণার প্রাকৃতিক ঐতিহাসিক ভিত্তি সৃষ্টি করে দিয়েছে এই গ্রন্থটি’। এঙ্গেলসও প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বইটি পড়েন। ডারউইনের আবিষ্কার তাদের কাছে বিবেচিত হয়েছিল এক অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে। ডারউইনের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত পরবর্তী আবিষ্কারে কিছুটা সংশোধিত হয়েছে, কিন্তু নিঃসন্দেহে ডারউইনের মতবাদই জীববিদ্যার ভিত্তি। তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের তত্ত্বের স্রষ্টা। তিনি লিখলেন যে বিভিন্ন প্রজাতির সৃষ্টি এখন হতেই স্থির ও অপরিবর্তনীয় নয়। বহু রূপান্তরের পথ ধরেই তারা এগিয়েছে। সুবিধাজনক জৈবিক রূপগুলোই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে টিকে থাকবে আর অনিবার্যভাবেই বিলুপ্ত হবে অসুবিধাজনক রূপগুলি।

জীবজগতের ক্রমবিকাশের তত্ত্ব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে লামার্কের নামও উল্লেখযোগ্য।

ডারউইনের মূল বক্তব্য জীবজগতে বৈচিত্র্য বিপুল। শুধু বিভিন্ন জাতি বা প্রজাতির মধ্যে নর (Species), এক জাতি বা প্রজাতির মধ্যেও এই বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এমনকি, একই পিতা মাতার সন্তানদের মধ্যেও থাকে নানা পার্থক্য।

দ্বিতীয়তঃ জীবের মধ্যে সন্তান সংখ্যার বৃদ্ধি স্বাভাবিক প্রবণতায় খাবার ও বাসস্থানের জন্য অনিবার্যভাবেই চলে প্রতিযোগিতা। অন্তহীন এই জীবনযুদ্ধ।

তৃতীয়তঃ খাদ্য ও বাসস্থানের জন্যে এই যুদ্ধে যারা পরাজিত হয়, যুদ্ধে, রোগে বা ক্ষুধার তাড়নায় আগে মরে যায় তাদের স্বাভাবিকভাবেই বংশবৃদ্ধি হয় না এবং ক্রমশ পৃথিবী থেকে তাদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। প্রকৃতির নির্বাচনে জীবনযুদ্ধে যারা জয়ী হয়, দীর্ঘদিন নিজেদের রক্ষা করে এবং সন্তান সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এভাবেই সৃষ্টি হয় নতুন নতুন জাতি ও প্রজাতির। এই যোগ্যর অস্তিত্বের প্রশ্নেই ডারউইন ব্যবহার করেছেন হাভার্ড স্পেনসারের কথাটি ‘Survival of the fittest’। ডারউইন আরো বললেন যে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পার্থক্যও অনতিক্রম্য নয়। দীর্ঘকাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একজাতি অন্য জাতিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এইভাবেই উৎপত্তি হয়েছে মানুষের। অন্যদিকে, লামার্কের বক্তব্য প্রাণীর অঙ্গ সংস্থানে পরিবর্তন হতে পারে পরিবেশের প্রভাবে। প্রাণীর জীবিতকালেই শারীরিক বৈশিষ্ট্য বংশানুক্রমে সংক্রামিত হতে পারে। কিন্তু কোন দোষ বা গুণ বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হবেই একথা বলা যায় না। ডারউইনের বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে স্বীকার না করলেও এঙ্গেলস ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এ লিখেছিলেন যে ডারউইনীয় তত্ত্বের চালিকা শক্তির কাছে প্রকৃতি বিজ্ঞান বিরাট প্রেরণা পেয়েছে।

ডারউইন প্রসঙ্গে তোলা ইউজেন ড্যুরিং-এর প্রশ্নের উল্লেখ করে এঙ্গেলস দ্বিধাহীনভাবে বলেছেন, প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনটি সম্বন্ধে যার বিন্দুমার জ্ঞান নেই শুধু সে-ই এরকম প্রশ্ন তুলতে পারে। এঙ্গেলসকে লেখনী তুলে নিতে হয়েছিল ডাউড্যুরিং-এর নির্বোধ, শালীনতাহীন, যুক্তি বিবর্তিত বক্তব্যের প্রতিবাদে। ড্যুরিং দাবি করেছিলেন তাঁর বক্তব্য অর্থশাস্ত্র, দর্শন ও সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে এক বিপুল পরিবর্তন সৃষ্টি করবে। দর্শনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে ড্যুরিং বললেন ‘পৃথিবী ও জীবন সম্পর্কে সর্বোচ্চ ধরনের চৈতন্যের বিকাশই দর্শন এবং ব্যাপকতর অর্থে সকল জ্ঞান ও অভী নার নীতিগুলি এর অন্তর্ভুক্ত।’ বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় ড্যুরিং-এর এই নতুন বক্তব্যের সমর্থনসূচক রচনা প্রকাশিত হতে থাকে। জার্মানির পার্টির নৈতিক ও বৌদ্ধিক মানের হ্রাস এবং ডাবিং-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মার্কস ও এঙ্গেলসকে বিচলিত করে। প্রকৃতপক্ষে, ড্যুরিং-এর জনপ্রিয়তা শ্রমিকশ্রেণির পার্টির তত্ত্বগত ভিত্তিকেই অনিশ্চিত করে। যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে তা হলো বিপ্লবী প্রলেতারীয় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাবে অথবা পার্টি সুবিধাবাদী পেটিবুর্জোয়া অবস্থান গ্রহণ করবে?

আমাদের মনে রাখতে হবে ইতিপূর্বে ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে, 'কমিউনিস্ট ইশতেহার', যেখানে সমাজ ব্যবস্থার গতিধারা বিশ্লেষণ করে পুঁজিবাদী সমাজে নির্মম ও নির্লজ্জ শ্রমিক শোষণের চরিত্রটি অনাবৃত করা হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে অনিকশ্রেণীর মুক্তির পথ, ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে মার্কসের রচনা 'ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ড যেখানে এই পূঁজিবাদী শোষণের চরিত্রটি আরও যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে ও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। এছাড়াও এঙ্গেলসের সামনে ছিল প্যারি কমিউনের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা; তাই ইউজেন ড্যুরিং-এর মতো ব্যক্তিদের যুক্তি বুদ্ধিহীন পাণ্ডিত্যাভিমানের বাচালতা এঙ্গেলসকে গভীরভাবে আহত করেছিল। এর প্রতিবাদে নীরব থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক পণ্ডিতদের আস্ফালনের প্রতিবাদে এঙ্গেলস ঘোষণা করলেন ‘বর্তমান জার্মানিতে নতুন চিন্তা পদ্ধতি সৃষ্টিকারী হের ড্যুরিং আদৌ বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি নন। কিছুকাল যাবৎ সেই দেশে অজস্র দার্শনিক এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে অসংখ্য নিত্য নতুন পদ্ধতি ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি আবির্ভূত হচ্ছে। ..... আসলে হের ড্যুরিং এই ধরনের গলাবাজি করা মেকি বিজ্ঞানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নমুনা। কাব্যে, দর্শনে, অর্থনীতিতে, ইতিহাস তত্ত্বে সব কিছুই জার্মানিতে অর্থহীন দন্তনিনাদে ডুবে যাচ্ছে।’

১৮৭৭ সালের শুরুতেই জার্মান সোসাল ডেমোক্রাসির মুখপত্রে এঙ্গেলস ‘বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হের ইউজেন ড্যুরিং সাধিত বিপ্লব’ শিরোনামে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখলেন। ড্যুরিং সমর্থকরা এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ১৮৭৭ এর মে মাসে পার্টি কংগ্রেসে এঙ্গেলস-এর প্রবন্ধগুলির প্রকাশ বন্ধ করার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এই প্রস্তাবটি কংগ্রেসে গৃহীত না হলেও সিদ্ধান্ত হয় যে প্রবন্ধগুলি এরপর মূল সংবাদপত্রে নয়, বৈজ্ঞানিক ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত হবে। ১৮৭৮ সালেই প্রবন্ধগুলি সংগ্রথিত করে ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ পুস্তক হিসাবে মুদ্রিত হয়।

এই বইয়ের সূচনাতেই এঙ্গেলস বললেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মণীষীদের পক্ষে তাঁদের পূর্বসূরীদেরমতোই নিজেদের যুগের সীমা অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব ছিল না। সমস্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে বুর্জোয়াদের বিরোধের পাশাপাশি ছিল শোষক ও শোষিত, নিষ্কর্মা ধনী ও গরিব মজুরদের সাধারণ বিরোধ। এই পরিস্থিতি ছিল বলেই বুর্জোয়াদের প্রতিনিধিরা শুধু একটা বিশেষ শ্রেণি নয়, সমস্ত নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে নিজেদের প্রচার করতে সমর্থ হয়। যদিও জন্ম থেকেই বুর্জোয়ারা তাদের বিপরীত শক্তির দ্বারা ভারাক্রান্ত। মজুরি শ্রমিক ছাড়া পুঁজিপতিদের অস্তিত্ব অসম্ভব এবং গিল্ডের মধ্য যুগীয় বার্জার যে পরিমাণে আধুনিক বুর্জোয়া রূপে প্রকাশিত, সেই পরিমাণে গিল্ডের কর্মী এবং গিল্ডের বাইরেকার দিন মজুরেরা পরিণত হয় প্রলেতারিয়েতে। এবং অভিজাতদের সঙ্গে সংগ্রামে বুর্জোয়ারা যুগপৎ সকলের, বিভিন্ন মেহনতী শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব দাবি করতে পারলেও বড়ো বড়ো প্রত্যেকটি বুর্জোয়া আন্দোলনেই স্বাধীন বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই শ্রেণিটির - যাৱা বৰ্তমান প্রলেতারিয়েতের পুরোধা।

‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’ মূলগতভাবে দর্শন সংক্রান্ত বই। জগৎকে উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ করার দৃষ্টিভঙ্গিই দর্শন। ভাববাদী দার্শনিকদের মতে দর্শন হচ্ছে চেতনা বা ভাব। আর বস্তুবাদী দার্শনিকের মতে বস্তুজগৎকে কেন্দ্র করেই সব কিছু ঘটছে। অর্থাৎ, চেতনাই জগৎ অথবা বস্তুই জগৎ। এই হচ্ছে ভাববাদী ও বস্তুবাদী দার্শনিকদের বিচারের মর্মবস্তু। এখানে এঙ্গেলস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মার্কসবাদের মূলকথা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে মার্কস ও এঙ্গেলস-এর পূর্ববর্তী দার্শনিকদের মধ্যে হেগেলই বিশেষভাবে তুলে ধরেন দ্বান্দ্বিকতার সূত্র। এঙ্গেলস বললেন, হেগেলের দর্শনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো ‘দ্বান্দ্বিকতার পুনঃপ্রবর্তন’। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকদের সকলেই ছিলেন স্বভাব দ্বান্দ্বিক। দ্বান্দ্বিকভাবে মৌলিক চিন্তাগুলির বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ছিলেন অ্যারিস্টটল। দ্বান্দ্বিকতার প্রবক্তা হিসাবে রেনে দেকার্ত ও স্পিনোজার নামও উল্লেখযোগ্য। হেগেল অবশ্য নিঃসন্দেহে ভাববাদী। কিন্তু, মূলত বিষয়াশ্রয়ী ভাববাদী হেগেল চেয়েছিলেন দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্বের মাধ্যমে অগ্রগতির নিয়ম সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে। হেগেলের দার্শনিক ব্যাখ্যায় ইতিহাসে চলার পথে বার বারই দেখা দেয় বিরোধ, আর সেই বিরোধ বিক্ষোভ সংঘাতের মধ্য দিয়েই মানুষ এগিয়ে চলেছে প্রগতির পথে। কিন্তু, হেগেলের দার্শনিক চিন্তার স্ব-বিরোধিতাও যথেষ্ট। হেগেলের মতে সকল ঘটনার ভিত্তি হচ্ছে ভাব বা তাঁর ভাষায় 'পরমভাবের বিকাশ। বাস্তব জগৎ, তাঁর মতে, এই ভাবেরই একটি প্রতিফলন। হেগেলের দার্শনিক ধারণা রক্ষণশীল ও ভাববাদী। কিন্তু দ্বান্দ্বিকতার প্রশ্নে (অবিরাম বিকাশ ও রূপান্তরের প্রক্রিয়া) নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক।

হেগেলের দার্শনিক চিন্তাধারা মার্কস ও এঙ্গেলস গভীরভাবে অনুশীলন করেছিলেন। এবং বিশেষভাবে গ্রহণ করেছিলেন দ্বান্দ্বিকতার সূত্রটিকে। আংশিকভাবে ফয়েরবাখের বক্তব্যকেও তাঁরা স্বীকৃতি জানালেন। জার্মান দার্শনিক ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ সামন্তপ্রভুদের ধর্মীয় ভাববাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন প্রকৃতি এবং মানুষকে নিরীক্ষণ করতে হবে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মানুষ ও জগতের অস্তিত্বের ক্ষেত্রে ঈশ্বর ও পরম ভাবের কোন প্রয়োজন নেই। মানুষ ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি। বরং ঈশ্বরই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের দ্বারা। কিন্তু, ফয়েরবাখের বস্তুবাদ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এই বস্তুবাদী ধারণা ছিল যান্ত্রিক, সীমাবদ্ধ ও সংগতিহীন। হেগেলের ভাববাদকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফয়েরবাখ তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এঁদের বক্তব্যের অসংগতি দূর করেই মার্কস ও এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্ব।

এঙ্গেলস মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষাকে তার সমগ্রতায় উপস্থাপিত করেছেন। মার্কসবাদের প্রতিটি উৎস যে পরস্পর সম্পৃক্ত এবং একে অপরকে প্রভাবিত করছে তিনি তা ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করলেন। এর যে কোন একটি উৎসকে অস্বীকার করলে বা সরিয়ে নিলে অনিবার্যভাবে তা সমগ্রতার মধ্যে বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে এবং সুবিধাবাদ বা সংশোধনবাদের পথকে উন্মুক্ত করে দেয়।

ড্যুরিং-এর মতবাদকে তীব্র ভাবে আক্রমণ করে এঙ্গেলস সুস্পষ্টভাবে বললেন যে, জগতের প্রকৃত ঐক্য তার বাস্তব অস্তিত্ব থেকেই গঠিত। প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর মধ্যে যে অনন্ত বৈচিত্র্য আমরা দেখি তা বস্তুর গতি বিকাশেরই বিভিন্ন রূপ। বিকাশের অত্যন্ত উন্নত স্তরে বস্তুর বৈশিষ্ট্যগুলির অন্যতম হলো চেতনা। গতিহীন বস্তু অসম্ভব। গতিময় বস্তুর বিভিন্ন রূপ ছাড়া বাস্তবে আর কোন কিছুই নেই।

‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এ এঙ্গেলস দ্বন্দ্বতত্ত্বের বিশদ ব্যাখ্যা উপস্থিত করেন। তিনি দেখান দ্বন্দ্ববাদ, বস্তুসমূহ ও তাদের প্রতিরূপগুলিকে তাদের অপরিহার্য সম্পর্ক, গতি, উৎপত্তি ও বিনাশের মধ্যে উপলব্ধি করে।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মূল তিনটি সূত্রকে এঙ্গেলস তুলে ধরলেন। এই তিনটি সূত্র হলো— ঐক্য ও বিপরীতের সংঘাত, পরিমাণগত পরিবর্তনগুলির গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তর এবং নেতির নেতি বা নিরাকরণের নিরাকরণ (Negation of negation )।

এঙ্গেলস দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিকাশের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্টভাবে লিখলেন। এক্ষেত্রে অধিবিদ্যক (Metaphysical ) যুক্তির দুর্বলতা প্রমাণ করতে গিয়েও এঙ্গেলস গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে ডারউইনের উল্লেখ করেছেন। অধিবিদ্যাকের কাছে—বস্তু ও তার মানসিক প্রতিচ্ছবি অর্থাৎ চিন্তা ভাবনা পরস্পর বিচ্ছিন্ন, এদের বিচার করতে হবে পরস্পর থেকে পৃথকভাবে। অনুসন্ধেয় বস্তু হিসাবে এগুলি অনড় ও অপরিবর্তনীয়। এঙ্গেলস লিখেছিলেন— দ্বান্দ্বিকতার প্রমাণ হলো প্রকৃতি এবং একথা স্বীকার করতেই হবে যে আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিদিন অত্যন্ত মূল্যবান বিষয়বস্তু দিয়ে প্রমাণ করে চলেছে যে শেষ বিচারে প্রাকৃতিক ক্রিয়া অধিবিদ্যামূলক নয়, দ্বন্দ্বমূলক... এ প্রসঙ্গে সর্বাগ্রে নাম করতে হয় ডারউইনের। প্রকৃতির অধিবিদ্যক (Metaphysical) সম্বন্ধবোধের বিরুদ্ধে তিনি গুরুতর আঘাত করে প্রকৃতপক্ষে প্রমাণ করেন যে সমস্ত জৈব সত্তা, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং স্বয়ং মানুষ কোটি কোটি বছরের এক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ফল।’

জীবজগতের উদাহরণ টেনে প্রকৃতির বিকাশের দ্বান্দ্বিক চরিত্রের সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এ। এঙ্গেলস লিখেছেন যে জীবনও একটা বিরোধ যা সমস্ত বস্তু ও প্রক্রিয়ার মধ্যেই উপস্থিত, এবং তা অবিরাম জন্ম নিচ্ছে ও নিজেকে রূপান্তরিত করছে। যখনই বিরোধটি লোপ পায়, জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তখনই অবধারিতভাবে ঘটে মৃত্যু।

মূল বইয়ের বানান অপরিবর্তিত রয়েছে।

ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের ২০২ তম জন্মবার্ষিকী আগামীকাল, ২৮ নভেম্বর ২০২২।

এই রচনাটির ২য় পর্ব আগামীকাল প্রকাশিত হবে।

 

প্রকাশের তারিখ: ২৭-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org