নভেম্বরের দর্শন

ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তী
ট্রেনে আসতে আসতে সাদা কাগজে লেখা হয়ে গেছে সেই অমূল্য দলিল যা তিনি রাশিয়ায় পৌঁছে উপস্থাপিত করবেন কমরেডদের সামনে। যাকে এখন আমরা জানি এপ্রিল থিসিস নামে। যার মোদ্দা কথা হল শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা দখলের কাজ শুরু করতে হবে এখনই। সরলরৈখিক নয়, ইতিহাসের উল্লম্ফন। লেনিন বলবেন ইতিহাসকে ধাক্কা দেওয়ার কথা।

দীর্ঘ নির্বাসনের পর রাশিয়ায় ফিরছেন লেনিন। ১৯১৭-র মার্চ মাসে। ট্রেনে করে। মাঝপথে হাতে এসেছে একখানা প্রাভদা-র ইস্যু। তাতে দুখানা প্রবন্ধ, বুখারিন ও স্তালিনের। দুজনেরই মূল কথা হল যে ফেব্রুয়ারিতে রাজতন্ত্রের উৎখাতের মধ্য দিয়ে যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার প্রতি সমর্থন জানাতে হবে। রাজতন্ত্রের পর বুর্জোয়া গণতন্ত্র। ইতিহাসের সরলরৈখিক প্রগতি। দুজনেই এই সূত্রায়ণই করেছেন। প্রবন্ধ পড়ে ভীষণ বিরক্ত হলেন লেনিন। হওয়ারই কথা। কারণ ট্রেনে আসতে আসতে সাদা কাগজে লেখা হয়ে গেছে সেই অমূল্য দলিল যা তিনি রাশিয়ায় পৌঁছে উপস্থাপিত করবেন কমরেডদের সামনে। যাকে এখন আমরা জানি ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে। যার মোদ্দা কথা হল শ্রমিক শ্রেণির ক্ষমতা দখলের কাজ শুরু করতে হবে এখনই। সরলরৈখিক নয়, ইতিহাসের উল্লম্ফন। লেনিন বলবেন ‘ইতিহাসকে ধাক্কা দেওয়ার’ কথা। 

নির্বাসনে থাকাকালীন গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন হেগেল, এবং অন্যান্য দার্শনিকদের তত্ত্ব। দিস্তা দিস্তা নোট নিয়েছেন। পরে যা প্রকাশিত হবে ফিলোসফিকাল নোটবুক নামে। আর তাতে লিখছেন ‘যে-কোনও জিনিসকেই অন্য যে-কোনও কিছুতে রূপান্তর করা সম্ভব’। গোটা ইউরোপের কমিউনিস্টরা (তখন তারা নিজেদের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বলতেন। লেনিন ‘এপ্রিল থিসিসে’ এটাও ব্যাখ্যা করেন যে কেন তার পার্টি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নয়, বরং কমিউনিস্ট পার্টি) বুর্জোয়াদের লেজুড়বৃত্তি করছেন। মার্কসবাদকে বিকৃত করছেন। আর তার বিরুদ্ধেই লেনিনের দার্শনিক লড়াই। নভেম্বরের অভ্যুত্থান আসলে এই লড়াইয়েরই চূড়ান্ত পরিণতি। 

লেনিন লিখছেন রাষ্ট্র ও বিপ্লব। কাউটস্কি এবং বুখারিনের বিরুদ্ধে লিখছেন। কাউটস্কি বলছেন বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে দিয়েই শ্রমিকশ্রেণিকে কাজ চালাতে হবে। আর বুখারিন বলছেন শ্রমিকশ্রেণির নিজের রাষ্ট্রের দরকারই নেই। রাষ্ট্রকে এখনই বাতিল করে দাও। লেনিন দেখালেন যে, আসলে দু-পক্ষই রাষ্ট্র নামক বিষয়টিকে ঐতিহাসিক বিকাশের ধারা থেকে বিযুক্ত করে দেখছেন। দু-পক্ষই আসলে একই কথা বলছেন। তারা বলছেন যে, বুর্জোয়া রাষ্ট্রই রাষ্ট্রের বিকাশের শেষ চেহারা। অতএব দার্শনিকভাবে দু-পক্ষই আসলে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। শুধু দুজনের ব্যাবহারিক সিদ্ধান্ত আলাদা।  একদল বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের শেষ রূপ ভেবে তাকেই রেখে দেওয়ার পক্ষে আর আরেকদল রাষ্ট্রকে (যেহেতু তারাও মনে করেন যে, এটাই রাষ্ট্রের শেষ রূপ) এখনই বাতিল করে দেওয়ার পক্ষে। লেনিন দেখালেন রাষ্ট্রের উৎপত্তির ঐতিহাসিক কারণ। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ও বিকাশের সাথে রাষ্ট্রের বিকাশকে জুড়লেন, যা মার্কসবাদের বা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মৌলিক কথা। সম্পত্তির বিকাশ রাষ্ট্রকে বিকশিত করেছে। যার স্বাভাবিক অ্যান্টিথিসিস হল সম্পত্তির বিনাশ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করবে। বাকি সব রাষ্ট্রের সাথে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্রের এটাই মৌলিক গুণগত ফারাক। এতদিন সম্পত্তি রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটিয়েছে, এবার রাষ্ট্র সম্পত্তির বিনাশ ঘটাবে। এটা আসলে বিষয় (অবজেক্ট) ও বিষয়ীর (সাবজেক্ট) পারস্পরিক প্রতিস্থাপন। যা পুঁজিবাদ আসলে উল্টো করে রেখেছে।

শ্রমিকশ্রেণি এই বিপ্লবের নেতা। কিন্তু কেন? পুঁজিবাদ তার বিকাশের প্রক্রিয়ায় সর্বহারাশ্রেণিকে তৈরি করে। যে-শ্রেণির কাছে নিজের শ্রম-শক্তি বিক্রি করা ছাড়া বেঁচে থাকার কোনও উপায় থাকে না। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল যে, শ্রম-শক্তি ছাড়া কিছুরই মালিক নয় এরকম বিপুল জনসমষ্টি ছাড়া সার্বজনীন পণ্যায়ন সম্ভব নয়। যেমন ধরা যাক, একটা নদীর পাশে পাঁচশো কৃষক পরিবার বসবাস করে। সেই নদীর জলেই তাদের চাষবাস। নদীর জল তাদের কাছে পণ্য নয়। এবার একদিন এই জলের মালিকানা চলে গেল প্যাকেজড জল সাপ্লাই করা কোনও কোম্পানির হাতে। জল পণ্য হল। চাষবাস বন্ধ হল। এবার এই কৃষকরাই নিজের শ্রমশক্তি বিক্রির জন্য শ্রমের বাজারে শ্রমিক হিসেবে হাজির হল। গোটা পুঁজিবাদের ইতিহাসই তাই। মার্কস পুঁজি-র প্রথম খণ্ডে যখন এই সম্পদের জবর দখলের কথা বলেন তখন তিনি ওই অধ্যায়ের নামকরণ করেন ‘দ্য সো কলড প্রিমিটিভ একিউম্যুলেশন’। ‘সো কলড’ কেন?  কারণ পুঁজিবাদের এই প্রক্রিয়া ‘প্রিমিটিভ’ নয় বরং তা নিরন্তর। পুঁজিবাদকে বেঁচে থাকতে হলে ক্রমাগত এই প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। পুঁজিবাদের বিকাশে ক্রমাগত সর্বহারাশ্রেণিতে নতুন অংশ যুক্ত হতেই থাকবে। সর্বহারাকরণ (প্রলেতারিয়ানাইজেশন) পুঁজিবাদের নিরন্তর প্রক্রিয়া। যে কৃষকরা কৃষিকাজ-চ্যুত হয়ে সর্বহারার দলে নাম লেখাল সেই কৃষকদের নদীর ওপর চিরদিনের জন্য মালিকানা ফেরত পাওয়ার শর্ত কী? শর্ত হল নদীর ওপর, জলের ওপর থেকে ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান। এই শর্তকে সার্বজনীন করলে দাঁড়ায় যে, সর্বহারাশ্রেণির সমস্ত কিছুর ওপর মালিকানার শর্ত হল, সমস্ত কিছুর ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার চিরতরে অবসান। ঐতিহাসিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান চাওয়া এই সর্বহারাশ্রেণিই তাই বিপ্লবের নেতা। এইখানে তার শ্রেনি হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত গুণ মুখ্য নির্ণয়ক বিষয়, তার সংখ্যা নয়। এই অব্দি বোঝাপড়াটা মার্কসবাদের মৌলিক কথা। লেনিন জানতেন। আরও অনেকেই জানতেন। কিন্তু দার্শনিক লেনিন যে সমস্যাটার মধ্যে পড়বেন তা হল, রাশিয়ার সমাজ শুধুমাত্র বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েত এই বাইনারিতে [দু-ভাগে] বিভক্ত নয়, তা বহুমাত্রিক। রাশিয়ার বড়ো অংশ কৃষক। সেই কৃষক জমির মালিকানা চায়, ব্যক্তিগত মালিকানা। শ্রমিকশ্রেণি চায় ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান। কিন্তু লেনিন গড়লেন শ্রমিক কৃষকের মৈত্রী। এই মৈত্রীর ভিত্তি কী? 

সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর লেনিনের অন্যতম প্রধান রচনা। সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে লেনিনের সূত্রায়ণের নানাদিক নিয়ে আলোচনা করার পরিসর এখানে নেই। আমরা শুধু এইটুকু আলোচনায় আনব যে, লেনিন এখানে পুঁজিবাদকে তার উত্থানের যুগ থেকে গুণগতভাবে পৃথক এক চরিত্রের পুঁজিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই পার্থক্যের প্রধান দিক হল সাম্রাজ্যবাদের যুগের পুঁজিবাদ আসলে সংকটগ্রস্থ পুঁজিবাদ, তাই সে তার ঐতিহাসিক বিপ্লবী চরিত্র হারিয়েছে। এর পরিণতি হল প্রাক-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক সন্ধি বা সমঝোতা। এই সমঝোতারই স্বাভাবিক এন্টিথিসিস হল শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী। সাধারণ বিমূর্ত নিয়মে পুঁজিবাদ ও সামন্ততন্ত্রের যে বিরোধের ধারণা ছিল সুনির্দিষ্ট মূর্ত ঐতিহাসিক বাস্তবতায় তা ঐক্যে পরিণত হয়েছে। শ্রমিক ও কৃষকের মৈত্রীর  ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। 

কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা করলে আমরা দেখব যে, লেনিন কৃষকদের মধ্যে জমি বন্টনের নীতিকে প্রথম থেকে সমর্থন করেননি। বলশেভিক পার্টির প্রাথমিক বোঝাপড়া ছিল সমস্ত জমির জাতীয়করণের নীতি। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর যখন বলশেভিক পার্টির বাকি নেতৃত্ব বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে থিতু করার কথাই ভাবছেন তখন অভ্যুত্থানের আহ্বান জানানো লেনিন, ক্ষমতা দখলের বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায়, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর স্বার্থেই জমি বন্টনের সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। এই যে ঐতিহাসিক সামগ্রিকতার বিচারে সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে যাচাই করা, এটাই মার্কসবাদী পার্টি হিসেবে লেনিনের পার্টিকে গুণগতভাবে অনন্য করে তোলে। 
সেই পার্টি কী রকম? লেনিনের পার্টি গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতার নিয়মে চলা পার্টি। গণতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতা এই শব্দ বন্ধনী নিয়ে বিতর্ক তুমুল। লেনিনের সময়ও ছিল। এখনও আছে। থাকার কথাও। কারণ আপাত দৃষ্টিতে দেখলে দুটি পরস্পর বিরোধী শব্দ ‘গণতান্ত্রিক’ এবং ‘কেন্দ্রিকতার’ সহাবস্থান। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এটাই আসলে দ্বান্দ্বিক ঐক্য। বৈপরীত্যের ঐক্য। গণতান্ত্রিক এবং কেন্দ্রিকতার সিন্থেসিস। এবং এই সিন্থেসিসের ফলে ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ নামক যে তৃতীয় সত্তা (এন্টিটি) তৈরি হয় তা আলাদাভাবে গণতন্ত্রও নয় কেন্দ্রিকতাও নয়। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সম্পর্কে ভুল ধারণার অন্যতম প্রধান উৎস হল গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতাকে বিচ্ছিন্নভাবে স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে বিচার করার প্রবণতা। এছাড়াও আরেকটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হল, পার্টি পরিচালনার এই নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার কারণ আমাদের চেতনায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মর্মবস্তু, যার নাম প্রতিযোগিতা, সেই প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের মতাদর্শগত প্রভাব। পার্টি পরিচালনার নীতি শেষমেষ তাই একটি মতাদর্শগত সংগ্রামও। 

লেনিন বলেছিলেন যে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কমিউনিস্ট মতাদর্শ স্বতস্ফূর্তভাবে তৈরি হয় না। তাকে বাইরে থেকে সঞ্চারিত করতে হয়। এই কথাটাই দুনিয়ার তামাম পণ্ডিতদের সমস্যা। তারা প্রশ্ন তুলবে, তাহলে কি শ্রমিকশ্রেণিকে বিপ্লবী করার জন্য বাইরে থেকে মাতব্বর নিয়ে আসতে হবে?  শ্রমিকশ্রেণি নিজের ভালো নিজে বুঝতে পারে না? লেনিন না-জন্মালে বিপ্লব হত না? এখানে আমরা চেতনা বা মতাদর্শ বিষয়ে মার্কসবাদের একটি মৌলিক বোঝাপড়ার পুনরাবৃত্তি করতে চাই। প্রথমত, মার্কসের কথায়— যে-কোনও সমাজে শাসকের মতাদর্শই মতাদর্শের জগতকে শাসন করে। তার মানে সাধারণভাবে শ্রমজীবী মানুষও শাসকের মতাদর্শগত-শাসনের অধীনেই থাকে। এই সূত্রায়ণের সাথে যদিও মার্কসবাদী নন এরকম অনেক পণ্ডিতেরাও একমত। কিন্তু মার্কস তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটা বলছেন তা হল— ‘. . . but theory becomes a material force as soon as it has gripped the masses’ [বাঁকা হরফ লেখকের]। উপরের বাক্যটিতে মার্কস কী বলছেন? তত্ত্ব আর মানুষ, কে কাকে ‘গ্রিপ’ করবে বা পাকড়াও করবে?  ভালো করে বাক্যটি আবার দেখলেই বোঝা যাবে মার্কস এটা বলেননি যে মানুষ তত্ত্বকে পাকড়াও করবে, বরং ঐ বাক্যে ‘it’ হচ্ছে তত্ত্ব বা মতাদর্শ, অর্থাৎ তত্ত্ব এসে মানুষকে পাকড়াও করবে। তার মানে মানুষের মস্তিষ্ককে পাকড়াও করার আগেই তত্ত্বের একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে। বা উল্টো করেও বলা যায়, যদি কোনও ভাবনা সুসংগঠিত সূত্রের সমাহার হিসেবে মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করার (বা পাকড়াও করার) ক্ষমতা অর্জন করে তবেই তাকে মতাদর্শ বলে আখ্যায়িত করা যায়। শ্রমিক বিপ্লবের মতাদর্শ হিসেবে মার্কসবাদ ঐতিহাসিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামজাত,  কিন্তু তত্ত্ব হিসাবে তার স্বতন্ত্র বিকাশও আছে এবং মানুষের চেতনাকে ‘গ্রিপ’ করার ক্ষমতাও আছে। আর ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষের চেতনায় এই আদর্শ গাঁথা হয়ে গেলে এই তত্ত্বই ইতিহাসের বস্তুগত উপাদানের রূপান্তরিত হয়। মাথায় মতাদর্শ সঞ্চালনের কাজটা তাই পার্টিকে সচেতনভাবে, সংগঠিতভাবে করতে হয়। লেনিন ঠিক এই কথাটাই বলতে চেয়েছেন। আর নভেম্বর বিপ্লব এই সূত্রায়ণের বাস্তবতাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। 

লেনিনের কথায় ‘বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী সংগ্রাম হয় না’। বোঝাই যাচ্ছে লেনিন আসলে তত্ত্ব ও প্রয়োগের দ্বান্দ্বিক ঐক্যের কথাই বলছেন। কিন্তু বিপ্লবী পার্টিকে কোনটার ওপর বেশি জোর দিতে হবে? তার সহজ উত্তর হল, যখন যেটা কম হচ্ছে তার ওপর। ফয়েরবাখ সংক্রান্ত অষ্টম থিসিসে মার্কস বলছেন ‘All social life is essentially practical. All mysteries which lead theory to mysticism find their rational solution in human practice and in the comprehension of this practice’ [বাঁকা হরফ লেখকের]। ওপরের বাক্যটির একটি সরলীকৃত ব্যাখ্যার বিপদ সবসময় থাকে। তা হল, আমরা বলতে পারি যে এখানে মার্কস বলছেন— তত্ত্বের ধোঁয়াশা, রহস্যময়তার সমাধান ঘটে মানুষের ব্যাবহারিক কাজে। কিন্তু তাতে সবটা বোঝা যায় না। শেষ অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ (যা বাঁকা হরফে আছে)। শুধু কাজ নয়, ব্যাবহারিক কাজ সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধিও জরুরি। এই ‘উপলব্ধি’ ছাড়া লেনিনের ভাষায় ‘ইতিহাসকে ধাক্কা দেওয়ার’ সন্ধিক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায় না। সে জন্যেই লড়াই সংগ্রামের মধ্যে থেকেও সেই লড়াইকে ‘বাইরে থেকে’ দেখার অনুশীলন জারি রাখতে হয়। সহজ করে বললে, গাড়ি যদি আটকে যায় তাহলে গাড়ির ভেতরে বসে ধাক্কা দেওয়া যায় না। গাড়ির বাইরে এসে দেখতে হয় যে চাকা কোথায়, কেন, কীভাবে, কী কারণে আটকে আছে। কোথায় দাঁড়িয়ে দেখছি সেটাই মূল কথা। 

প্রকাশের তারিখ: ১৮-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org