|
বিদ্যাসাগরের তর্করীতি: শাস্ত্র বনাম ইতিহাসরামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য |
|
বিধবা-বিবাহ বিষয়ে প্রথম প্রস্তাব (১৮৫৫)-এর সূচনায় বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন: যদি যুক্তিমাত্র অবলম্বন করিয়া [বিধবা-বিবাহকে] কর্তব্য কর্ম বলিয়া প্রতিপন্ন কর, তাহা হইলে, এতদ্দেশীয় লোক কখনই ইহা কর্তব্য কর্ম বলিয়া স্বীকার করিবেন না। যদি শাস্ত্রে কর্তব্য কর্ম বলিয়া প্ৰতিপন্ন করা থাকে, তবেই তাঁহারা কর্তব্য কর্ম বলিয়া স্বীকার করিতে ও তদনুসারে চলিতে পারেন। এরূপ বিষয়ে এদেশে শাস্ত্রই সর্বপ্রধান প্রমাণ, এবং শাস্ত্রসম্মত কর্মই সর্বতোভাবে কর্তব্য কর্ম বলিয়া পরিগৃহীত হইয়া থাকে। অতএব বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত অথবা শাস্ত্রবিরুদ্ধ কর্ম, ইহার মীমাংসা করাই সর্বাগ্রে আবশ্যক।১ যুক্তিসঙ্গত আর শাস্ত্রসম্মত— দুটি যে এক ব্যাপার নয়, বরং পরস্পরের বিরোধীও হতে পারে—এই আভাসটুকুই এখানে দেওয়া হয়েছে। শুধু যুক্তি দিয়ে এদেশে কাজ উদ্ধার হবে না, কারণ: লোকে নির্বিচারে শাস্ত্র মানতেই অভ্যস্ত। এই ব্যাবহারিক বুদ্ধি থেকেই প্রথম প্রস্তাব-টি লেখা। শাস্ত্রই যেন বিদ্যাসাগরের একমাত্র অবলম্বন। পরাশরের বচন উদ্ধৃত করে তিনি দেখান, ‘স্বামী অনুদ্দেশ হইলে, মরিলে, ক্লীব স্থির হইলে, সংসারধর্ম পরিত্যাগ করিলে, অথবা পতিত হইলে, স্ত্রীদিগের পুনর্বার বিবাহ করা শাস্ত্রবিহিত।’ পরাশরের বচন কেন? কারণ, একমাত্র তাঁর স্মৃতিই কলিযুগে মেনে চলার যোগ্য। তাই, অন্যান্য স্মৃতি বা নিবন্ধগ্রন্থে যা-ই থাক, পরাশরে যখন বিধবা-বিবাহর নির্দেশ আছে, তখন আর অন্য কোনো কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।—এই ছিল বিদ্যাসাগরে মূল বক্তব্য। প্রথমে তাই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে: ‘ভগবান্ পরাশর কেবল কলিযুগের নিমিত্ত ধর্ম নিরূপণ করিয়াছেন এবং কলিযুগের লোকদিগকে তাঁহার নিরূপিত ধর্ম অবলম্বন করিয়া চলিতে হইবেক’। পরাশরসংহিতা-ই কলিযুগের ধর্মশাস্ত্র— এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগর আরও কিছু সম্ভাব্য আপত্তির আগাম উত্তর দিয়ে রেখেছেন। যেমন, বিধবার বিবাহর পর যে-পুত্র জন্মাবে তাকে কি ‘ঔরস’ পুত্র বলা হবে, না ‘পৌনর্ভব’ বলা হবে। এ-ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগরের আশ্রয় পরাশরসংহিতা। সেখানে ‘পৌনর্ভব’ শব্দটিই নেই । সুতরাং তাকে ‘ঔরস’ পুত্র বলেই ধরা হবে (‘দত্তক’ বা ‘কৃত্রিম’ কেন নয়— তার ব্যাখ্যাও বিদ্যাসাগর দিয়েছেন)। বৃহন্নারদীয় পুরাণ ও আদিত্যপুরাণ-এর বচন অনুসারে কেউ কেউ বলেন, কলিযুগে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ। বিদ্যাসাগর বচনদুটি পরীক্ষা করেছেন। প্রথমটিতে বলা হয়েছে, ‘একজনকে কন্যা দান করিয়া সেই কন্যার পুনরায় অন্য বরে দান’ কলিতে বর্জনীয়। বিদ্যাসাগরের মতে, এর সঙ্গে বিধবা-বিবাহের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘পূর্ব পূর্ব যুগে, অগ্রে এক বরে কন্যা দান করিয়া, পরে সেই বর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বর উপস্থিত হইলে তাহাকে কন্যা দান করার এই যে শাস্ত্রসম্মত ব্যবহার ছিল, বৃহন্নারদীয়ের বচন দ্বারা ওই ব্যবহারের নিষেধ হইয়াছে। অতএব, ওই নিষেধকে কলিযুগে বিধবাবিবাহর নিষেধ বলিয়া বোধ করা কোনো ক্রমে বিচারসিদ্ধ হইতেছে না।’ আদিত্যপুরাণ-এর বচনেও ‘দত্তা কন্যার দান’ রহিত করা হয়েছে। সে-ক্ষেত্রেও বিধবা-বিবাহর নির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। কিন্তু, তার চেয়ে বড়ো কথা: পরাশরসংহিতা-য় যখন কলিযুগে বিধবা-বিবাহর স্পষ্ট বিধি দেখা যাচ্ছে, তখন কষ্টকল্পনার দরকার কী! এর পরে বিদ্যাসাগর, যেন তর্কর খাতিরে, মেনে নিলেন ঐ দুটি পুরাণে কলিযুগে বিধবা-বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তার মানে, পরাশরসংহিতা-র সঙ্গে পুরাণের বক্তব্যে বিরোধ দেখা যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কী কর্তব্য? ব্যাসসংহিতা উদ্ধৃত করে বিদ্যাসাগর বলেন, ‘স্মৃতি ও পুরাণের পরস্পর বিরোধ হইলে স্মৃতিই প্রমাণ’। তাই স্মৃতি হিসেবে পরাশরসংহিতা-র মতই গ্রাহ্য। সবশেষে আর একটা সম্ভাব্য আপত্তির কথা উঠেছে: শাস্ত্রসম্মত হলেও বিধবা-বিবাহ শিষ্টাচারবিরুদ্ধ। এবার বিদ্যাসাগর বশিষ্ঠসংহিতা-র শরণ নিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে: ‘শাস্ত্রের বিধান না-পেলে তবে শিষ্টাচারকে প্রমাণ বলে ধরা যায়।’ পরাশরসংহিতা-য় যখন বিধবা-বিবাহর কথা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, তখন শিষ্টাচারের প্রসঙ্গ অবান্তর। এ-ই তা হলে বিদ্যাসাগরের তর্করীতি। শাস্ত্রবচন হল শাব্দপ্রমাণ। তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়েই তিনি বিধবা-বিবাহকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরাশরসংহিতা-ই তাঁর একমাত্র অবলম্বন। অন্য আপত্তির জবাবে ব্যাস ও বশিষ্ঠসংহিতা। পরাশরসংহিতা-র প্রাধান্য প্রমাণের জন্যেই শেষ দুটি সংহিতাকে কাজে লাগানো হয়েছে। বিদ্যাসাগর তাই ধরে নিয়েছিলেন, সব আপত্তির উত্তর দেওয়া হল। ‘অতএব, কলিযুগে বিধবাবিবাহ যে সর্বপ্রকারেই কর্তব্য কর্ম, সে-বিষয়ে আর কোনো সংশয় বা আপত্তি হইতে পারে না।’ সমস্যা কিন্তু অত সহজে চোকেনি। পরাশরের কথার ঐ সহজ ব্যাখ্যায় সব পণ্ডিত সায় দিতে রাজি হননি। বরং, কথাটা পরাশর কার প্রসঙ্গে বলেছিলেন— বাগদত্তা না বিবাহিতা, পরাশরসংহিতা কি শুধুই কলিধর্ম বিষয়ে, বচনটি আদৌ পরাশরের কি না—এরকম নানা প্রশ্ন উঠেছিল। ‘বিষয়ী’ ও ‘শাস্ত্রব্যবসায়ী’ দু-ধরণের লোকই বিদ্যাসাগরের প্রস্তাব-এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তাঁদের লেখায় ‘উপহাস ও কটূক্তি’ দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এত সূক্ষ্ম তর্ক ও কূটোক্তির মোকাবেলা করতে হবে– এর জন্যেও বোধহয় তিনি তৈরি ছিলেন না। যা-ই হোক, বিধবা-বিবাহ বিষয়ে দ্বিতীয় প্রস্তাব-এ (অক্টোবর ১৮৫৫) তিনি প্রত্যেকের বক্তব্য ধরে ধরে জবাব দিলেন। এইখানে একটা জিনিস দেখার আছে। একটি প্রসঙ্গে, আপত্তির উত্তর দিতে গিয়ে, বিদ্যাসাগরকে স্মৃতিশাস্ত্র ছাড়িয়ে অন্য একটি ক্ষেত্রে ঢুকতে হয়েছিল। সেটি ইতিহাস। এখানে আর পরাশর তাঁর আশ্রয় নন, কোনো ভাষ্যকার বা নিবন্ধকার তাঁর সহায় নন । কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কহ্লণ-এর রাজতরঙ্গিণী, কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি-র পত্রিকায় প্রকাশিত শাসনপত্র ইত্যাদি উল্লেখ করে বিদ্যাসাগর দেখাতে চান: শাস্ত্রর সব নিষেধ কার্যত মেনে চলা হয়নি। এর পরে, আরও এক-পা এগিয়ে তিনি বলেছেন: দেশের আচার-ব্যবহার পাল্টায়, নতুন শাস্ত্র বা শাস্ত্রর নতুন ব্যাখ্যাও তৈরি হয়। বঙ্কিমচন্দ্র একবার বলেছিলেন, ‘বেদের অবজ্ঞা সাংখ্যে প্রকাশ্যে কোথাও নাই, বরং বৈদিকতার আড়ম্বর অনেক। কিন্তু সাংখ্যপ্রবচনকার বেদের দোহাই দিয়ে শেষে বেদের মূলোচ্ছেদ করিয়াছেন।’২ বিদ্যাসাগরও এইভাবেই ধর্মশাস্ত্রর ‘মূলোচ্ছেদ’ করেছিলেন। যে-প্রসঙ্গে ইতিহাসের কথা উঠেছে, সেটি নতুন নয়। প্রথম প্রস্তাব-এও প্রসঙ্গটি উঠেছিল। এর নাম ‘কলিবর্জ্য’, অর্থাৎ কলিযুগে কোন্ কোন্ কাজ বর্জন করা উচিত।৩ স্মৃতিশাস্ত্রে অনেক আচার-ব্যবহার-প্রায়শ্চিত্তবিধির কথা আছে। পরবর্তীকালে তার অনেক ক’টি সম্পর্কে প্রশ্ন বা আপত্তি উঠেছিল। যেহেতু প্রাচীন শাস্ত্রে সেগুলির কথা আছে, তাই তাদের অশাস্ত্রীয় বলে বাতিল করা যায় না। কিন্তু সেগুলি চলতে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আনুমানিক বারো শতকের শেষদিক থেকে ‘কলিবর্জ্য’র একটা তালিকা করা শুরু হয়। দুটি, তিনটি, পাঁচটি করে বাড়তে বাড়তে তা মোট পঞ্চান্নটি নিষেধে গিয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন স্মৃতির ভাষ্যকার, নিবন্ধকার ও পুরাণ ও উপপুরাণকাররা এগুলির উল্লেখ করেছেন। বলা হল: সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর যুগে ওইসব আচার ইত্যাদি চলে থাকতে পারে, কিন্তু কলিতে অচল। পুরো তালিকাটি ক্লান্তিকর হবে, কয়েকটি মাত্র নিচে দেওয়া হল: অগ্নিহোত্র, নরমেধ, অশ্বমেধ, গোমেধ, রাজসূয়, যজ্ঞের সুরা ও মদ্যপান, দীর্ঘকাল ব্রহ্মচর্য, সন্ন্যাসগ্রহণ, বানপ্রস্থ, দূরতীর্থযাত্রা, সমুদ্রযাত্রা, মাতুলকন্যাবিবাহ, অসবর্ণাবিবাহ, নিয়োগ ও দত্তা কন্যাকে দান (প্রথাগতভাবে একে বিধবা-বিবাহ বলেই ধরা হত)। বাঙলায় ‘কলিবর্জ্য’র তালিকাকে প্রামাণিক বলে স্বীকার করা হত। রঘুনন্দন স্বয়ং তাঁর উদ্বাহতত্ত্ব-য় এমন তালিকা উদ্ধৃত করেছেন। উইলিয়ম জোন্স্ যখন মনুসংহিতা-র ইংরিজি তর্জমা করেন, তার শেষে কয়েকটি উপপুরাণের বচনও তিনি জুড়ে দেন, কারণ, এখানকার পণ্ডিতরা তাঁকে বুঝিয়েছিলেন এগুলিও যথেষ্ট প্রামাণিক। জগন্নাথের বিবাদভঙ্গার্ণব-এও কলিবর্জ্য গুরুত্ব পেয়েছে (এর ভিত্তিতেই কোলব্রুক-এর ‘ডাইজেস্ট’ সংকলন করা হয়েছিল)।৪ প্রথম প্রস্তাব-এ বিদ্যাসাগর একমাত্র পরাশরের ভরসায় কলিবর্জ্যর প্রামাণিকতা নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার প্রশ্ন উঠল: পরাশর যদি শুধু কলির ধর্ম হয়, তবে তাতে অশ্বমেধের কথা আছে কেন? অশ্বমেধ তো কলিকালে নিষিদ্ধ। কোনো কোনো পণ্ডিত বললেন, তার মানে, পরাশরসংহিতা-য় কলি ছাড়াও অন্য যুগের ধর্ম নিরূপণ করা আছে। পরাশর শুধুই কলিযুগের কথা বলেছেন— এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই বিদ্যাসাগর লড়ছিলেন। আর সব ধর্মশাস্ত্রই তাঁর বিরুদ্ধে। এখন, পরাশরের কলিসর্বস্বতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সত্যিই তাঁর ভিত টলে যায়। এখানে পৌঁছে তাই বিদ্যাসাগর শরণ নিলেন ইতিহাসের: এই আপত্তির নিরাকরণ করিতে হইলে, অগ্রে ইহাই নিরূপণ করা আবশ্যক, আদিপুরাণে বৃহন্নারদীয়পুরাণে ও আদিত্যপুরাণে যে-সকল নিষেধ আছে, সে সমুদায় কলিযুগে নিষেধ বলিয়া পূর্বাপর প্রতিপালিত হইয়া আসিয়াছে কিনা। আমাদের দেশের আচার-ব্যবহারাদির ইতিহাস-গ্রন্থ নাই, সুতরাং এ বিষয়ে অনুসন্ধান করিয়া, যতদূর কৃতকার্য হইতে পারা যায়, তদনুসারে ইহা স্পষ্ট প্রমাণ হইতেছে, আদিপুরাণ, বৃহন্নারদীয়পুরাণ ও আদিত্যপুরাণের ঐ সমস্ত নিষেধ প্রতিপালিত হয় নাই। ঐ তিন গ্রন্থে যে সকল ধর্ম কলিযুগে নিষিদ্ধ বলিয়া নির্দেশ আছে, কলিযুগে সে সকল ধর্মের অনুষ্ঠান হইয়াছে, তাহার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে।৫ এর পরে এসেছে প্রবরসেনের অশ্বমেধ, মিহিরকুলের অগ্নিপ্রবেশ, জয়পীড়ের দূতের সমুদ্রযাত্রা, মাতৃগুপ্তের যতিধর্ম অবলম্বন, রাজা সুবস্তুর যাবজ্জীবন ব্রহ্মচর্য ইত্যাদি একের পর এক প্রমাণ। এর থেকে দেখা গেল, পরাশরে অশ্বমেধের কথা থাকলেও তাতে কলিযুগধর্মের কোনো হানি হয় না। কারণ: কলিযুগেও অশ্বমেধ হয়েছে। অর্থাৎ, কলিবর্জ্যর কোনো প্রামাণিকতা–বাস্তব, ব্যাবহারিক প্রামাণিকতা নেই। এর ফলে, পরাশরের প্রামাণিকতাও অক্ষুণ্ন রইল, যদিও পুরাণ ও নিবন্ধকারদের মর্যাদা গেল কমে। ইতিহাসের প্রমাণ দিয়ে এক শাস্ত্রর তুলনায় অন্য শাস্ত্রর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা— নিঃসন্দেহে নতুন ব্যাপার। গোড়া থেকেই বিদ্যাসাগর যুগধর্ম অনুসারে শাস্ত্রর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রামাণিকতার প্রশ্ন তুলেছিলেন। শাস্ত্রর যাথার্থ্যও তাঁর কাছে যুগসাপেক্ষ। ফলে সনাতন ধর্ম আর অপরিবর্তনীয় থাকে না। দ্বিতীয় প্রস্তাব-এর শেষে বিদ্যাসাগর আবার শাস্ত্রর দোহাই দেন: আপনারা, ইতিপূর্বে, কেবল শাস্ত্র দেখিয়াই, পূর্বপ্রচলিত আচারের পরিবর্তে, অবলম্বিত নূতন আচারে সম্মতি প্রদান করিয়াছেন। এক্ষণে যখন শাস্ত্র পাইতেছেন এবং সেই শাস্ত্র অনুসারে চলিলে বিধবাদিগের পরিত্রাণ ও শত শত ঘোরতর অনিষ্ট নিবারণের পথ হয়, স্পষ্ট বুঝিতেছেন, তখন আর প্রস্তাবিত বিষয়ে অসম্মতি প্রদর্শন করা আপনাদের কোনো মতেই উচিত নহে।৬ কিন্তু শাস্ত্রর ভিত্তি এর মধ্যেই আলগা হয়ে গেছে। আচার-অনুষ্ঠান যে পাল্টায়, আর নতুন আচারকে মেনেও নেওয়া হয়— এই বাস্তব ঘটনাই হয়ে উঠেছে তাঁর আসল সাক্ষ্য। এ-ক্ষেত্রেও তিনি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন তাঁর সমসাময়িক ঘটনাবলি থেকে। তাঁর সাধারণ সিদ্ধান্ত ছিল এই: আর, আপনারা ইহাও বিবেচনা করিয়া দেখুন, আমাদের দেশের আচার একবারেই অপরিবর্তনীয় নহে। ইহা কেহই প্রতিপন্ন করিতে পারিবেন না, সৃষ্টিকাল অবধি আমাদের দেশে আচার পরিবর্ত হয় নাই; এক আচারই পূর্বাপর চলিয়া আসিতেছে। অনুসন্ধান করিয়া দেখিলে, আমাদের দেশের আচার পদে পদে পরিবর্তিত হইয়া আসিয়াছে। পূর্ব কালে এ দেশে চারি বর্ণের যেরূপ আচার ছিল, এক্ষণকার আচারের সঙ্গে তুলনা করিয়া দেখিলে, ভারতবর্ষের ইদানীন্তন লোকদিগকে এক বিভিন্ন জাতি বলিয়া প্রতীতি জন্মে। বস্তুতঃ ক্রমে ক্রমে আচারের এত পরিবর্ত হইয়াছে যে, ভারতবর্ষের ইদানীন্তন লোক, পূর্বতন লোকদিগের সন্তানপরম্পরা, এরূপ প্রতীতি হওয়া অসম্ভব।৭ অর্থাৎ, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রই শাস্ত্রর নিত্যতার মূলোচ্ছেদ করছে। মনে রাখা দরকার, বিদ্যাসাগর এই তর্ক করেছিলেন স্মার্ত পণ্ডিতদের সঙ্গে। কলিযুগ, তার ইতিহাস— এ-সব বিষয়ে শাস্ত্রীয় ধারণাই তাঁর ও তাঁর প্রতিপক্ষর আশ্রয়। যে-সব সূত্র প্রামাণিক বলে দুপক্ষই মেনে নেবেন— একমাত্র সেগুলিকেই তিনি ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে মৃচ্ছকটিক-এর উল্লেখে৮ একটু আশ্চর্য লাগতে পারে। কিন্তু বিদ্যাসাগর তো স্মার্তদের অস্ত্রেই তাঁদের ঘায়েল করতে চান। কলিবর্জ্যকে অপ্রামাণিক বলে প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মশাস্ত্রকেই তিনি ইতিহাসের অধীন করে ফেললেন। এতে এক ঢিলে দু’পাখি মারা হল। যে-সব দেশাচার শাস্ত্রমূলক বলে চলে আসত, ‘অন্য শাস্ত্র অথবা শাস্ত্রের অন্য ব্যাখ্যা উদ্ভাবিত হওয়াতে’ তাদের বদলে নতুন আচারও যে চালু হয়েছে— এ কথা আর অস্বীকার করার পথ রইল না। তবুও বিদ্যাসাগর শাস্ত্রকে ত্যাগ করেননি। যুগধর্ম যে শাস্ত্রর নিত্যতার বিরোধী— এ কথা বুঝেও তিনি সর্বদাই (শিখণ্ডীর মতো?) সামনে রাখেন পরাশরকে। যুগধর্মর কারণেই পরাশর তাঁর কাছে একমাত্র শিরোধার্য প্রমাণ— ঠিক যেমন সতীদাহর প্রশ্নে রামমোহনের কাছে ছিলেন মনু। রামমোহন কিছুতেই যুগধর্মর কথা তোলেননি। তাতে তাঁর অসুবিধে হত। কারণ, পরাশরকে কলির একমাত্র ধর্মশাস্ত্র বলে স্বীকার করলে সতীদাহর শাস্ত্রীয়তাও মানতে হয়। পরাশরে বিধবার জন্যে তিনটি বিধানই পাশাপাশি আছে: ব্রহ্মচর্য, পুনর্বিবাহ ও সহমরণ। রামমোহন তাই মনু ছাড়া আর কারও প্রামাণিকতাকে আমল দিতে রাজি নন।৯ অন্যদিকে, বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে সহমরণ আর কোনো সমস্যাই নয়। ১৮২৯-এর ১৭ নং রেগুলেশন এই তার ফয়সালা হয়ে গেছে। তিনি তাই কলিযুগের খর্বতাকেই তাঁর পক্ষের যুক্তি হিসেবে হাজির করেন: পরাশর কলিযুগের বিধবাদিগের পক্ষে তিন বিধি দিতেছেন, বিবাহ, ব্রহ্মচর্য, সহগমন। তন্মধ্যে রাজকীয় আদেশক্রমে, সহগমনের প্রথা রহিত হইয়া গিয়াছে। এক্ষণে বিধবাদিগের দুই মাত্র পথ আছে বিবাহ ও ব্রহ্মচর্য; ইচ্ছা হয় বিবাহ করিবেক, ইচ্ছা হয় ব্রহ্মচর্য করিবেক। কলিযুগে, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া, দেহযাত্রা নির্বাহ করা বিধবাদিগের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। এই নিমিত্তই, লোকহিতৈষী ভগবান্ পরাশর সর্বপ্রথম বিবাহেরই বিধি দিয়াছেন। সে যাহা হউক, স্বামীর অনুদ্দেশ প্রভৃতি পাঁচ প্রকার বৈগুণ্য ঘটিলে, স্ত্রীলোকের পক্ষে বিবাহের স্পষ্ট বিধি প্রদর্শিত হওয়াতে, কলিযুগে, সেই সেই অবস্থায়, বিধবার পুনর্বার বিবাহ করা শাস্ত্রসম্মত কর্তব্য কর্ম বলিয়া অবধারিত হইতেছে।১০ ‘সে যাহা হউক’ কথাটা বেশ মজার। পরাশর ‘লোকহিতৈষী’ ছিলেন বলে সহগমনের অত প্রশংসা করেছেন— এমন ভাবলে হাসি পায়। কিন্তু বিদ্যাসাগর তো পরাশরকে ব্যবহার করতে চান, এইমাত্র। সুতরাং পরাশরকে ‘ভগবান্’ বলে সুখ্যাত না-করলে চলবে কী করে? প্রশ্ন উঠতে পারে: রামমোহন ও বিদ্যাসাগর কি তাহলে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেননি? হ্যাঁ, স্পষ্টতই তাঁরা দুটি আলাদা এবং পরস্পরবিরোধী— ঐতিহ্য থেকে তর্ক শুরু করেছিলেন। রামমোহন যদি পরাশরকে কলিযুগের ধর্মশাস্ত্র বলে স্বীকার করতেন, তাঁকে তা হলে— বিদ্যাসাগরের বিরোধীদের মতো— পরাশরবচনের অন্য ব্যাখ্যা করার দিকে যেতে হত। তাই তিনি সবার ওপরে মনুর কর্তৃত্বকে তুলে ধরেন। বিদ্যাসাগরকেও এই প্রশ্নর মুখে পড়তে হয়েছিল: তাহলে মনু কি মিথ্যা? তিনি তো বিধবার পুনর্বিবাহর কথা বলেননি, শুধু ব্রহ্মচর্যর কথাই বলেছেন। বিদ্যাসাগর তখন তুলে ধরেন যুগধর্মর ধারণা। মনু হলেন সত্যযুগের ধর্মশাস্ত্র, কলিযুগে তা চলবে কেন? এখন পরাশরের যুগ।১১ শাস্ত্রীয় তর্কর মজাই এই। গোটা ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে আছে কথার ওপর। শুধু, কথাটা বেদের বা স্মৃতির হওয়া চাই। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর এই সুযোগটাই নিয়েছেন। শাস্ত্রর উদ্ধৃতি, তাঁদের কাছে, প্রতিপক্ষর মুখ বন্ধ করার উপায় মাত্র। রামমোহন শাস্ত্রকে নিত্য বলে মেনে নেন, বিদ্যাসাগর যুগধর্মর ওপর জোর দেন— দুইই তাঁদের তর্ককৌশলের অঙ্গ। দুজনেই ছিলেন লক্ষ্যমুখী মানুষ— উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে যে-কোনো উপায় নিতে প্রস্তুত— যদি বিপক্ষকে তা দিয়ে প্যাঁচে ফেলা যায়। টীকা ১. বিদ্যাসাগর রচনাসংগ্রহ, গোপাল হালদার, সম্পা. খণ্ড ২, কলকাতা: বিদ্যাসাগর স্মারক জাতীয় সমিতি, ১৯৭২, পৃ. ২২-২৩। বিদ্যাসাগরের সব উদ্ধৃতিই এই সংস্করণ থেকে। সূত্র- রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, বিদ্যাসাগর: নানা প্রসঙ্গ, কলকাতা: চিরায়ত, ২০১৯ প্রকাশের তারিখ: ২৬-সেপ্টেম্বর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |