|
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বিশ্বজোড়া সঙ্ঘাতের নতুন পটভূমিসুচিক্কণ দাস |
নয়া উদারবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা চায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি, যার নির্যাস হল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রো চিপ, সেগুলি নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসা করতে এবং এই প্রযুক্তিকে বাকি বিশ্বের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আধুনিকতম হাতিয়ার হিসাবে প্রয়োগ করতে। অর্থাৎ মার্কিন পুঁজিপতিরা চায় এ আই প্রযুক্তি হোক তাদের এক্সক্লুসিভ সম্পত্তি। অন্যদিকে চীন চায় এ আই প্রযুক্তি হোক ইনক্লুসিভ বা সবার জন্য। এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হোক গ্লোবাল সাউথের সব দেশে। দেশে দেশে তৈরি হোক এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং এই প্রযুক্তির বিকাশের সুফল ভাগ করে নিক গোটা বিশ্ব। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্ঘাত এখন এআইএর জগতে ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। |
পুঁজি, প্রযুক্তি ও মানব উন্নয়ন এ আই। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এখনও পর্যন্ত এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, যার উদ্ভাবন এবং প্রয়োগ মানব সভ্যতার বিকাশকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার কার হাতে থাকবে? দামী ও ক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোচিপ নির্মাতা মার্কিন একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে? তারাই কি এই প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করবে? এবং উৎপাদনের সমস্ত ক্ষেত্র, এমনকি উন্নত যুদ্ধের প্রযুক্তিকেও নিয়ন্ত্রণে রেখে গরিব ও অনুন্নত দেশগুলিকে বাধ্য করবে তাদের তাঁবেদারি করতে? নাকি এই প্রযুক্তি যতদূর সম্ভব পৌঁছে যাবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে এবং তা কাজে লাগিয়ে এই দেশগুলি এআই-এর ক্ষেত্রে মার্কিন নয়া উদারনীতিবাদী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ আলগা করে নিজেদের বেছে নেওয়া পথে এগোতে পারবে? এ নিয়ে সঙ্ঘাত ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এবং এখানেও সমসাময়িক বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতির নানা ইস্যুর মতো সঙ্ঘাতের বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে চীন ও আমেরিকা। নয়া উদারবাদী, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা চায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি, যার নির্যাস হল উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও মাইক্রো চিপ, সেগুলি নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসা করতে এবং এই প্রযুক্তিকে বাকি বিশ্বের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আধুনিকতম হাতিয়ার হিসাবে প্রয়োগ করতে। অর্থাৎ মার্কিন পুঁজিপতিরা চায় এ আই প্রযুক্তি হোক তাদের এক্সক্লুসিভ সম্পত্তি। অন্যদিকে চীন চায় এ আই প্রযুক্তি হোক ইনক্লুসিভ বা সবার জন্য। এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া হোক গ্লোবাল সাউথের সব দেশে। দেশে দেশে তৈরি হোক এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং এই প্রযুক্তির বিকাশের সুফল ভাগ করে নিক গোটা বিশ্ব। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্ঘাত এখন এআইএর জগতে ক্রমশ প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। বিষয়টা স্পষ্টতর হতে পারে কিছুটা পিছন দিকে ফিরে দেখলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছিল পরমাণু প্রযুক্তি।পরমাণু প্রযুক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নে পাচার করার ভুয়ো অভিযোগে ১৯৫৩ সালের ৬ জুন রোজেনবার্গ দম্পতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই বছরেই প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার চালু করেছিলেন অ্যাটম ফর পিস কর্মসূচি, যার লক্ষ্য ছিল অসামরিক পরমাণু প্রযুক্তি বিভিন্ন দেশকে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা ঘরে তোলা। অর্থাৎ তখন পরমাণু প্রযুক্তি ছিল মার্কিন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের দুনিয়োজোড়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে শুধু অসামরিক পরমাণু প্রযুক্তিই দেয়নি, দিয়েছিল সামরিক পরমাণু নিরাপত্তা। চীন ও উত্তর কোরিয়াকে সোভিয়েত দিয়েছিল পরমাণু অস্ত্রের প্রযুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্রের প্রযুক্তি কাউকে না দিয়ে মিত্র দেশগুলোকে করে রেখেছিল তাদের ওপর নির্ভরশীল। আর সোভিয়েত পরমাণু অস্ত্রের প্রযুক্তি দিয়ে মার্কিন আগ্রাসনের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিউবাকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া ঘিরে যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা আমরা জানি। পরে সোভিয়েত যখন ভারতকে পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তি দেয়, তখন আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারসাম্য তৈরির জন্য একই প্রযুক্তি পাকিস্তানকে দিতে বাধ্য হয়। এভাবে পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তিকে ঘিরে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত এবং সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীগত মৌলিক ফারাক বিদ্যমান ছিল। এখন বোঝা যাচ্ছে, যদি উত্তর কোরিয়া বা চীনের হাতে পরমাণু অস্ত্র না থাকত, তাহলে সোভিয়েত পরবর্তী বিশ্বে এই দুই দেশও মার্কিন হামলার শিকার হতে পারত। এবং উত্তর কোরিয়ার মতো ছোট দেশের পরিণতি সাদ্দামের ইরাক, আসাদের সিরিয়া কিংবা গদ্দাফির লিবিয়ার মতোই হতো। পরমাণু অস্ত্র রয়েছে বলেই ট্রাম্প প্রশাসন উত্তর কোরিয়াকে এতটা রেয়াত করে চলে। এবং পিয়ং ইয়ং এখন হোয়াইট হাউজের সত্যিকারের উদ্বেগের উৎস হিসাবেই বিদ্যমান রয়েছে। এভাবেই সোভিয়েতের নীতির সুফল এখনও পৃথিবী ভোগ করছে। এই আলোচনায় আমরা দেখব, সাম্প্রতিক বিশ্বে এ আইকে ঘিরে চীন ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে একই ধরনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
১২ জুন ২০২৬। মার্কিন বাণিজ্য দপ্তর নির্দেশ জারি করে, কোনও বিদেশি নাগরিক মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি অ্যানথ্রপিক-এর দুটি সবচেয়ে উন্নত লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল ব্যবহার করতে পারবে না। (লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যা কোনও বিষয়ের পাঠ তৈরি, সারসংক্ষেপ করা এবং অনুবাদের কাজ করে স্বাভাবিক ভাষার চেয়েও ভালভাবে)। সেই নির্দেশ তৎক্ষণাৎ কার্যকর করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অ্যানথ্রপিক-এর ক্লড ফেবল ৫ এবং মিথোস ৫ মডেল দুটি এমন ভাবে সরিয়ে নেওয়া হয় যাতে আর কেউ তা ব্যবহার করতে না পারে। ট্রাম্প সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ক্ষমতা অ্যানথ্রপিক এর ছিল না। কারণ বাণিজ্য দপ্তর জানিয়েছিল, বিষয়টা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এমনকী যারা অ্যানথ্রপিকের কর্মী অথচ মার্কিন নাগরিক নন, তাদেরও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছিল। এর জের পুরো মডেলের ব্যবহারই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ৩০ জুন পর্যন্ত জারি ছিল এই নিষেধাজ্ঞা। পরে অ্যানথ্রপিক তাদের মডেল এতটাই শক্তিশালী করে যে হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা প্রায় নেই। আমেরিকার এ আই অ্যাকশন প্ল্যানে হোয়াইট হাউজ কী বলছে দেখে নেওয়া যাক। ‘এআই এর যুগে উন্নত এ আই কম্পিউটিং ব্যবস্থা খুবই আবশ্যিক। এতে অর্থনীতির সচলতা বাড়ে এবং নতুন নতুন সামরিক সক্ষমতা তৈরি হয়। আমাদের যারা বিদেশি প্রতিযোগী তাদের এই সম্পদ কাজে লাগাতে দেওয়া যাবে না। কারণ বিষয়টা একই সঙ্গে স ভূস্ট্র্যাটেজিক প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। তাই রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আমাদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গী নিতে হবে। ‘মানুষ এ পর্যন্ত যা কিছু আবিষ্কার করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল আবিষ্কার হল সেমিকন্ডাক্টর। সেমিকন্ডাক্টর তৈরির পাইপলাইনে যে সব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও প্রক্রিয়া লাগে সেগুলোর ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আমেরিকা ও তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের। সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে নতুন নতুন গবেষণা করে আমাদের অবশ্যই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে হবে। কিন্তু আমাদের আবিষ্কার যাতে আমাদের বিরোধীরা কাজে লাগাতে না পারে সেটাও আমেরিকাকে দেখতে হবে। তেমনটা হলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। সেকারণে সেমিকন্ডাক্টরক রপ্তানির বিধিনিষেধ আরও কঠোর করতে হবে এবং তা শক্ত হাতে প্রয়োগ করতে হবে। ‘আমেরিকাকে স্পর্শকাতর প্রযুক্তির রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার জন্য আমাদের অংশীদার ও মিত্রদের উৎসাহিত করতে হবে। যদি তারা নিয়ন্ত্রণ মানতে না চায় তাহলে ফরেন ডিরেক্ট প্রোডাক্ট রুল কাজে লাগিয়ে তাদের বাধ্য করতে হবে।এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক তালমিল স্থাপন করার জন্য বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে হবে।’ (সূত্র: আমেরিকাজ এ আই অ্যাকশন প্ল্যান, হোয়াইট হাউজ, জুলাই, ২০২৫)। ওপরের উদ্ধৃিতগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, চীনের কাছে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এ আইকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বজোড়া নতুন আধিপত্য কায়েম করার পরিকল্পনা করেছে। এবং সেকাজে তাদের হাতিয়ার হল সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নির্মাণ প্রযুক্তি। তাদের লক্ষ্য এই প্রযুক্তিকে পূর্ণ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি বিশ্বে মার্কিন আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, সাম্রাজ্যবাদের দুটো উদ্দেশ্যই সফল হবে। এক কথায়, নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য, এটাই মার্কিন এ আই নীতির সার কথা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গী ও চীন ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ক্যালিফোরনিয়ার প্রযুক্তি সংস্থা ওপেন এআই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের তৈরি নতুন চ্যাটবট বাজারে নিয়ে আসে। এর নাম দেওয়া হয় চ্যাটজিপিটি। ওপেন এ আই জানায়, কথা বলার মতো করে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে চ্যাটজিপিটি। এই প্রযুক্তি স্তম্ভিত করে দেয় গোটা দুনিয়াকে। বিশেষজ্ঞরা বলতে শুরু করেন, চ্যাটজিপিটই হল এ আইএর ‘মস্তিষ্ক’। ফলে এক ধাক্কায় এ আইএর জগতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে এই মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা। এখন প্রতি সপ্তাহে বিশ্বের প্রতি ৮ জন বাসিন্দার ১ জন ব্যবহার করছেন চ্যাটজিপিটি। এই বিপুল সাফল্যের জেরে অনেকটা এগিয়ে যায় আমেরিকা। এই সাফল্যের পিছনে ছিল উন্নত মাইক্রোচিপ তৈরিতে সাফল্য। মাইক্রোচিপের বাজারে ক্রমশ তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। এই চিপগুলোর বেশির ভাগই তৈরি করেছে মার্কিন সংস্থা এনভিডিয়া। গত বছর অক্টোবরে এনভিডিয়া হয়ে দাঁড়ায় বিশ্বের প্রথম কোম্পানি যাদের মোট বাজার মূল্য ছিল ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। সর্বকালের বিচারে সবচেয়ে দামী কোম্পানি। চীন যাতে এনভিডিয়ার চিপ না পায় সেজন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করে মার্কিন সরকার। এতেএ আইয়ের বাজারে মার্কিন একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৩ সাল থেকে চলে আসা যাক ২০২৫ সালের জানু্য়ারিতে। সে বছরই দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে বসেন ট্রাম্প। তাকে ঘিরে ছিলেন মার্কিন কর্পোরেট জগতের দৈত্যরা। আর ঠিক সেই বছরেই চীন বাজারে নিয়ে আসে তাদের বিকল্প ও শক্তিশালী চ্যাটবট ডিপসেক। ক্ষমতা প্রায় চ্যাটজিপিটির সমান। সবচেয়ে বড় কথা, চ্যাটজিপিটি এবং ক্লডের মতো লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল তৈরি করতে যে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়েছিল মার্কিন কোম্পানিগুলিকে,তার মাত্র কয়েক ভগ্নাংশ ডলার খরচ করে ডিপসেক তৈরি করে ফেলে চীন। এর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় শেয়ার বাজারে। ডিপসেকের প্রভাবে ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিপুল ধ্বস নামে এনভিডিয়ার শেয়ারের দামে। এক দিনে এই মার্কিন কোম্পানি শেয়ারের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার, যা মার্কিন শেয়ার বাজারে ক্ষতির রেকর্ড। এভাবে এক ধাক্কায় চীনের বিজ্ঞানীরা এ আইয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেন। কাহিনির সমাপ্তি এখানেই নয়। মার্কিন কোম্পানিগুলি তাদের প্রযুক্তি কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখে মুনাফা কামানোর জন্য। অন্যদিকে চীন জানিয়ে দেয়, তাদের পথ ‘ওপেন সোর্স’ এ আই। তারা তাদের চ্যাটবট ডিপসেকের কোড অনলাইনে প্রকাশ করে দিয়ে জানায়, যে কেউ এই কোড ব্যবহার করতে পারবে। এর মানে, এ আই প্রযুক্তিকে চীন একচেটিয়াকরণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার না করে, এই প্রযুক্তি যাতে উন্নয়শীল গ্লোবাল সাউথ সহ সকলে ব্যবহার করতে পারে সেই পথ নেয় এবং তা ঘোষণাও করে দেয়। আমেরিকার কাছে যা কুক্ষিগত করা সম্পদ, চীনের কাছে তা সহজলভ্য পাবলিক গুডস। এটাই হল দৃষ্টিভঙ্গীগত ফারাক। এভাবেই মার্কিন পুঁজির ‘এক্সক্লুসিভ’ দৃষ্টিভঙ্গীর বিপরীতে চীন নিয়ে এসেছে ‘ইনক্লুসিভ’ দৃষ্টিভঙ্গী। অর্থাৎ প্রযুক্তির বিকাশ কোনও একটি দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে না, তা কাজে লাগাতে হবে সব দেশের জন্য যাতে মানব সভ্যতায় নতুন করে আর বৈষম্য সৃষ্টি না হয়। এ ভাবেই এ আইকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিশ্বে আমেরিকা ও চীনের সঙ্ঘাত বেড়ে উঠছে। এই সঙ্ঘাতের মূল বিষয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির কুক্ষিগত সম্পদ হয়ে থাকবে, নাকি তা পৃথিবীর সব মানুষের, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া দেশগুলিরও সম্পদ হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ এ আই নিয়ে তাদের এই বিকল্প নীতি চীন আরও স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছে এ বছরের জুলাই মাসে শাংহাইয়ের একটি সম্মেলনে। এই শহরের ওয়ার্লড আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স কনফারেন্সে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ঘোষণা করেন, ‘আমরা চীনে প্রায়ই এ কথা বলে থাকি যে, একটা তার দিয়ে সঙ্গীত সৃষ্টি হয় না। একটা গাছে অরণ্য হয় না। একই ভাবে এ আইএর উন্নতি কোনও একটি দেশের একক পারফরমেস হওয়া উচিত নয়। একে হতে হবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক সিম্ফনি।‘ খুব নিরীহ ভাষায় বলা হলেও একটি দেশের একক পারফরমেন্স বলতে জিনপিং যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই নিশানা করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য হল, ‘আধুনিক জীবনে এআই হল প্রথম ডিজিটাল পরিষেবা যার জন্য আমেরিকাকে অনেক বেশি শক্তি (এনার্জি) উৎপাদনে মন দিতে হবে। ১৯৭০এর পর থেকে আমেরিকার শক্তি উৎপাদনে স্থিতাবস্থা তৈরি হয়েছে। অথচ চীন দ্রুত তাদের গ্রিড বাড়িয়ে গেছে। যদি এ আইয়ের জগতে আমেরিকার অধিপত্য বজায় রাখতে হয় তাহলে শক্তি ক্ষেত্রের এই বিপজ্জনক প্রবণতায় বদল আনতে হবে।’ (সূত্র: আমেরিকাজ এ আই অ্যাকশন প্ল্যান, হোয়াইট হাউজ, জুলাই, ২০২৫)। এখানে স্পষ্টতই আমেরিকার নিশানায় রয়েছে চীন। সম্মেলনে চীনের এআই নীতি আরও স্পষ্ট করেছেন জিনপিং। বলেছেন, ‘আমাদের উচিত এই বিরল, ঐতিহাসিক সুযোগকে আঁকড়ে ধরে ‘ওপেন সোর্স’, খোলামেলা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি ভাগ করে নেওয়ায় উৎসাহ দেওয়া। বৃহৎ দায়িত্বশীল দেশ হিসাবে এ আই সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক গণ পণ্য (পাবলিক গুডস) সবার কাছে পৌছে দিতে চীন দায়বদ্ধ।‘ চীনের প্রস্তাব, এই কাজের জন্য বিশ্বায়িত এ আই সহযোগিতার একটি সংগঠন গড়ে তুলতে হবে যার সদর দপ্তর হতে পারে শাংহাই। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে ওয়ার্লড আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেসন। এখনও পর্যন্ত এই সংগঠনের সদস্য হয়েছে ২৯টি দেশ যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়া ও ব্রাজিল। এই সংগঠনের লক্ষ্য দুটো। এক, চীনে এ আই গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করা। এবং দুই, সদস্য দেশগুলির এ আই গবেষণা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে সহায়তা করা। একই সঙ্গে চীন আগামী পাঁচ বছরে ৫০০০ এ আই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে চায় যাতে গ্লোবাল সাউথজুড়ে একটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা যায়। জিন পিংয়ের কথায়, এটা চীনের একটা বড় উদ্যোগ যার মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির সহযোগিতা গড়ে তোলা যায়। এবং এ আইয়ের উন্নতি ও প্রশাসনে একসঙ্গে কাজ করা যায়। উন্নয়নের ইতিহাসে এটা হবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একেই চীন বলছে এ আইয়ের জগতে সত্যিকারের বহুপাক্ষিকতা। এর বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক কী? ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য হল, “রাষ্ট্রসঙ্ঘ, ওইসিডি, জি৭, জি ২০, ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন ইউনিয়ন, ইন্টারনেট কর্পোরশেন ফর অ্যাসাইনড নেমস অ্যান্ড নাম্বারস সহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা এআই প্রশাসন পরিচালনার কাঠামো এবং এ আই উন্নয়নের স্ট্র্যাটেজি বিষয়ে নানা ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। এআইয়ের উন্নতির জন্য সমমনোভাবাপন্ন দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কাজ করতে চায়। তবে তাকে মিলতে হবে আমাদের নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে। তবে এ ধরনের অনেক প্রয়াসে অনেক ভারী ভারী নিয়মের কথা বলা হয়েছে, অস্পষ্ট আচরণ বিধি চালু করতে চাইছে অনেকে। এগুলো এমন সংস্কৃিতকে সামনে নিয়ে আসবে যার সঙ্গে মার্কিন মূল্যবোধ মেলে না। অথবা সেগুলো চীনা কোম্পানিগুলির দ্বারা প্রভাবিত। আসলে ওই কোম্পানিগুলি নজরদারির একটা মানদণ্ড তৈরি করতে চায় (সূত্র: আমেরিকাজ এ আই অ্যাকশন প্ল্যান, হোয়াইট হাউজ, জুলাই, ২০২৫)। এ আইএর জগতে মার্কিন মূল্যবোধ বলতে কী বোঝয়, তা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। সেটা মোটেই বহুপাক্ষিকতা নয়, বরং প্রযুক্তিকে কুক্ষিগত করে একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সেটাই একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির অস্তিত্বের শর্ত। এই লক্ষ্য পূরণে তাদের বাধা যে চীনের বহুপাক্ষিকতার নীতি, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এখন এই বিষয়টা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্রে দুই ভিন্ন মূল্যবোধের জগতে অবস্থান করছে চীন ও আমেরিকা। কৃত্রিম মেধার জগতে আমেরিকা এখনও এগিয়ে। তবে দিনে দিনে চীনের বিপরীত ধর্মী অবস্থানের সঙ্গে তাদের সঙ্ঘাত বাড়ছে। এবং আমেরিকা আশঙ্কা করছে, এ আইয়ের সর্বশেষ তথ্যগুলি যদি সামান্য খরচে কিংবা পাবলিক গুডস হওয়ার দৌলতে নিখরচায় সব দেশের কাছে চলে যায়, তাহলে এই প্রযুক্তির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ হারাবে তারা। এবং এই ক্ষেত্রে তাদের বিপুল বিনিয়োগ স্রেফ জলে যাবে। সেকারণে মার্কিন এ আই প্রযুক্তি ক্ষেত্রের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প ও তার হোয়াইট হাউজের সঙ্গীরা। এবং এটা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোতে আরও কোণঠাসা হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসবের পরিণামে এ আইকে ঘিরে আরও একটা ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ যে ভবিষ্যতে তৈরি হবে না, সে কথা আগাম বলা যায় না। তথ্যসূত্র: ১। আমেরিকাজ এ আই অ্যাকশন প্ল্যান, হোয়াইট হাউজ, জুলাই, ২০২৫ প্রকাশের তারিখ: ২৯-জুলাই-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |