|
মেশিনের বুদ্ধিমত্তা কি মানবসভ্যতাকে বদলে দেবে? (১)নন্দিনী মুখার্জী |
আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের সরাসরি বঙ্গানুবাদ ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দবর্গ যা আমরা ব্যবহার করছি, সেটা কি গ্রহণযোগ্য? অভিধান অনুযায়ী ‘Artificial’ শব্দের বাংলা অর্থ শুধুমাত্র ‘কৃত্রিম’ নয়, হতে পারে ‘শিল্পজাত’, ‘মনুষ্যনির্মিত’, ‘অর্জিত’ বা ‘আরোপিত’। এক্ষেত্রে ‘কৃত্রিম’ শব্দটির পরিবর্তে উপরোক্ত অন্য শব্দগুলির ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা বেশী। তবে যে পরিভাষাই ব্যবহার করি, প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি হল ‘artificial intelligence’ অর্থাৎ কম্প্যুটার বা অনুরূপ যন্ত্রের মধ্যে সঞ্চারিত বুদ্ধিমত্তা। |
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি পৃথিবীটাকে বদলে দিতে চলেছে? তবে এই প্রসঙ্গে আসার আগে আমাদের বোঝা প্রয়োজন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়টি কী এবং কেন বর্তমান সময়ে এই বিষয়টি এত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাক্কথন – তবে শুরুতে একটি কথা ভেবে নেওয়া প্রয়োজন। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দ দুটি কি সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়েছিল? অথবা তার বঙ্গানুবাদ হিসাবে যে শব্দ দুটি ব্যবহার হয় – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা – তা কি এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সঠিক প্রয়োগ? বুদ্ধিমত্তা – তা মানুষের হোক বা মেশিনের – কখনও কৃত্রিম হতে পারে না। প্রাণীজগতের বিবর্তনের সাথে সাথে বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উদ্ভূত হতে পারে – যেমন পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে প্রাণীর মধ্যে হয়েছে। আবার বুদ্ধিমত্তা কোনও পদ্ধতিতে আরোপিত বা সঞ্চারিতও হতে পারে। মানুষের আবিষ্কৃত যন্ত্রের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা সঞ্চার করা বা আরোপ করা এই সঞ্চারিত বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ। জন ভন নয়ম্যান (John von Neumann) বা অ্যালান টিউরিং (Alan Turing), যাঁরা প্রথম যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন, তাঁরা কিন্তু Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিভাষা ব্যবহার করেননি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে কম্প্যুটার তৈরির বিভিন্ন ধাপে কম্প্যুটার যন্ত্রের গঠন (Computer Architecture) এবং কর্মপদ্ধতি (working principles) নিয়ে এই দুই বিজ্ঞানী পথ প্রদর্শন করেছেন। পাশাপাশি কোন্ প্রযুক্তির সাহায্যে কম্প্যুটার যন্ত্র মানুষের কর্মপদ্ধতি অনুকরণ করতে পারে তা নিয়ে জনসমক্ষে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়ে অ্যালান টিউরিং-এর বিখ্যাত গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে, যার শিরোনাম ছিল ‘Computing Machinery and Intelligence’। সুতরাং যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা বা মেশিন ইন্টেলিজেন্স ছিল সেইসময়ে ব্যবহৃত পরিভাষা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দবর্গের জনক হলেন ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিট্যুট অফ টেকনোলজির জন ম্যাকার্থি (John McCarthy)। বর্তমানে এই দুই শব্দের ব্যবহার বেশী জনপ্রিয় হয়ে ওঠাতে এই পরিভাষার ব্যবহারই সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু তার সরাসরি বঙ্গানুবাদ ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ শব্দবর্গ যা আমরা ব্যবহার করছি, সেটা কি গ্রহণযোগ্য? অভিধান অনুযায়ী ‘Artificial’ শব্দের বাংলা অর্থ শুধুমাত্র ‘কৃত্রিম’ নয়, হতে পারে ‘শিল্পজাত’, ‘মনুষ্যনির্মিত’, ‘অর্জিত’ বা ‘আরোপিত’। এক্ষেত্রে ‘কৃত্রিম’ শব্দটির পরিবর্তে উপরোক্ত অন্য শব্দগুলির ব্যবহারের প্রাসঙ্গিকতা বেশী। তবে যে পরিভাষাই ব্যবহার করি, প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি হল ‘artificial intelligence’ অর্থাৎ কম্প্যুটার বা অনুরূপ যন্ত্রের মধ্যে সঞ্চারিত বুদ্ধিমত্তা। মানবসভ্যতা ও প্রযুক্তি – বাস্তবে মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ যখনই যন্ত্র আবিষ্কার করেছে, তার প্রাথমিক ধারণা সে ধার করেছে প্রকৃতির কাছ থেকে। সেই যন্ত্রকে উন্নততর করে তুলতে আবার সবসময়ই মানুষ চেয়েছে প্রাণীজগতের অনুকরণেই যন্ত্রের উপর বিভিন্ন ধরণের ক্ষমতা আরোপ করতে। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই সুদূর অতীতে মানব দেহের হাতের অনুকরণে উদ্ভাবন ঘটেছিল লিভার বা ভারোত্তোলন-দণ্ডের। আবার আধুনিক যুগে উড়ন্ত পাখিদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই তৈরি হয়েছে উড়োজাহাজ। এইভাবেই যন্ত্রের উদ্ভাবন যত এগিয়েছে, ততই কোনও এক সময় থেকে মানুষ ভাবতে শুরু করেছে ‘can machine think?’, যন্ত্র কি মানুষের মত চিন্তা করতে পারে? বা যন্ত্র কি মানুষের মত স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে? এই ভাবনা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে তাঁতযন্ত্রে সচ্ছিদ্র টেপ ব্যবহার করে যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের বস্ত্র তৈরি করাকে বলা যেতে পারে যন্ত্রের উপর বুদ্ধিমত্তা আরোপ করার প্রথম উদাহরণ। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি? – আগের প্রশ্নে ফিরে আসি। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি? বিভিন্ন বিজ্ঞানী আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। সংজ্ঞাগুলি এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট দুটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ব্যাখ্যা করে। প্রথম পর্যায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্য হল কম্প্যুটারকে মানুষের মত চিন্তা করার ক্ষমতা আরোপ করা বা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে, কোনও ঘটনা বা পরিস্থিতির যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ করতে পারার ক্ষমতা আরোপ করা। দ্বিতীয় ধারার সংজ্ঞাটি যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কিত। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির লক্ষ্য হল, মানুষ যে সমস্ত কাজগুলি করে থাকে অর্থাৎ যে সমস্ত কাজ করার দক্ষতা সভ্যতার সূচনাকাল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সময়কালে মানুষ অর্জন করেছে, সেই কাজগুলি একইভাবে বা আরও দক্ষতার সঙ্গে করতে পারার ক্ষমতা কম্প্যুটার বা সম পর্যায়ের যন্ত্রের উপর আরোপিত করা। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে বিগত সত্তর বছরে যে সমস্ত গবেষণার কাজ হয়েছে বা প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে, সেই সবগুলিই উপরোক্ত দুটি বিভিন্ন লক্ষ্যেই পৃথকভাবে সফল হয়েছে। আবার বিভিন্ন গবেষক গোষ্ঠী তাঁদের পারস্পরিক সহায়তার মধ্যে দিয়ে যন্ত্রের যুক্তিবিচার এবং যন্ত্রের কর্মক্ষমতা এই দুটি ক্ষেত্রেই সম্মিলিত ভাবে উন্নতি ঘটিয়ে নতুন ধারার প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। ফলে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলতে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনও প্রযুক্তিকে নির্দেশ করা সম্ভব নয়। বহু বছর ধরে বিভিন্ন গবেষণাকারী দলের বহু শাখা-প্রশাখায় পৃথকভাবে বিচরণের ফলে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এই বিষয়েরই আবার অনেকগুলি শাখা-প্রশাখার জন্ম দিয়েছে। টিউরিং টেস্ট – কম্প্যুটার যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা কেমন হবে ১৯৫০ সালে টিউরিং তার বর্ণনা করতে গিয়ে একটি পরীক্ষার প্রস্তাব রেখেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন ‘the imitation game’। টিউরিং এই প্রস্তাব রাখার সময়ে ‘can machine think?’ এই প্রশ্নটিকে পরিবর্তিত করে বলেছিলেন ‘Can a machine do what we as thinking entities can do?’, অর্থাৎ ‘চিন্তাশীল’ প্রাণী যে কাজগুলি করতে পারে, মেশিন কি সেই কাজগুলিই করতে পারে? তাঁর মতে এই পরীক্ষাটি – যেটি সাধারণ ভাবে পরিচিত ‘টিউরিং টেস্ট’ নামে – একজন মানুষ ও একটি কম্প্যুটারের মধ্যে কতটা প্রভেদ রয়েছে তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাপার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে একজন প্রশ্নকারী, যিনি অবশ্যই মানুষ, তিনি একটি আলাদা ঘরে থাকবেন এবং অন্য একটি ঘরে উত্তরদাতা একজন মানুষ ও একটি উত্তরদাতা কম্প্যুটার থাকবে। কম্প্যুটারটিতে পূর্ব থেকেই বুদ্ধিমত্তা সঞ্চারিত করা থাকবে তার হার্ডঅয়্যার ও সফটঅয়্যারের মাধ্যমে। প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য হল প্রশ্নের মাধ্যমে কে মানুষ এবং কে কম্প্যুটার সেটি চিহ্নিত করা। প্রশ্নকর্তা শুরুতে মানুষ এবং মেশিনকে শুধুমাত্র X এবং Y হিসাবেই চেনেন। তিনি বিভিন্ন প্রশ্ন করতে পারেন, যেমন ‘এক্স কি বলতে পারবে যে এক্স দাবা খেলতে পারে কিনা?’ ইত্যাদি। উত্তরদাতা মানুষ এবং কম্প্যুটার লিখিত উত্তরের মাধ্যমে (উভয় ক্ষেত্রেই একটি কিবোর্ড এবং কম্প্যুটার মনিটর ব্যবহার করে) প্রশ্নকর্তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে সে-ই আসলে মানুষ। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি প্রশ্নকর্তা বুঝতে না পারেন যে কে মানুষ এবং কে কম্প্যুটার, তাহলে কম্প্যুটারটিকে বুদ্ধিমান ধরে নেওয়া যাবে, বা অন্য কথায় বলা যায় যে, যতটা সময়ের মধ্যে প্রশ্নকর্তা কম্প্যুটারটিকে চিহ্নিত করতে পারবেন, কম্প্যুটারের বুদ্ধিমত্তা সেই সময়ের ভিত্তিতেই পরিমাপ করা যাবে। এখনও পর্যন্ত আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর বিভিন্ন প্রযুক্তির মূল্যায়ন টিউরিং টেস্ট-এর মাধ্যমে করা হয়। তবে বর্তমানে টেস্টের কিছু রদবদল ঘটেছে। কিন্তু এই পরীক্ষাটিতে যদি মেশিনকে মানুষের মতই ব্যবহার করতে হয়, তাহলে কয়েকটি বিষয়ে কম্প্যুটারের দক্ষতা অবশ্যই জরুরি। যেমন – ১) ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং (natural language processing), অর্থাৎ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে বা লেখে সেই স্বাভাবিক ভাষায় কথা বলতে পারা বা লিখতে পারার দক্ষতা কম্প্যুটারকে অর্জন করতে হবে; ২) নলেজ রিপ্রেজেন্টেশন (knowledge representation) বা লব্ধ জ্ঞানকে সঞ্চিত করে রাখার ক্ষমতা। মানুষ যেমন যা দেখে বা যা শোনে তাকে মস্তিষ্কে সঞ্চয় করে রাখতে পারে, সেইরকম কম্প্যুটারেও সেই দক্ষতা আরোপ করতে হবে; ৩) অটোমেটেড রিজনিং (automated reasoning) বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তিবিচার করার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষমতা – ঠিক যেমন মানুষ তার সঞ্চিত জ্ঞান ব্যবহার করে বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারে; 8) মেশিন লার্নিং (machine learning) অর্থাৎ অতীতের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং নতুন কিছুর সম্মুখীন হলে তাকে চিহ্নিত করতে পারা। পরবর্তীকালে উপরে উল্লিখিত এই চারটি বিষয়ই আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর চারটি শাখা রূপে চিহ্নিত হয় এবং সবকটি ক্ষেত্রেই গবেষণার কাজ প্রসার লাভ করে। ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং এবং মেশিন লার্নিং বর্তমানে কম্প্যুটার সায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে চিহ্নিত হয়। টিউরিং যে পরীক্ষার কথা বলেছিলেন তাতে প্রশ্নকর্তা এবং দুই উত্তরদাতার মধ্যে কোন শারীরিক যোগাযোগ বা মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তাছাড়া এই imitation game এর পরিধিও বিশেষ একটা বিস্তারিত ছিল না কারণ উপরে উল্লিখিত কাজগুলি ছাড়াও মানুষ আরও অনেক কাজ সম্পন্ন করে বা করতে পারে। টিউরিং প্রস্তাবিত পরীক্ষার অনেক বিরোধিতাও হয়েছে এই কারণে যে বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি শুধুমাত্র লিখিত প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে হতে পারে না। সত্তর বা আশির দশক থেকে তাই আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণায় আরও অনেকগুলি মাত্রা যুক্ত হয়। তার মধ্যে রয়েছে কম্প্যুটার ভিশন (computer vision) এবং রোবোটিক্স (robotics)। কম্প্যুটার ভিশন সম্পর্কিত গবেষণার উদ্দেশ্য হল, কম্প্যুটার কীভাবে যে কোনও বস্তুকে উপলব্ধি করতে পারে বা চিহ্নিত করতে পারে। অন্যদিকে রোবোটিক্স সংক্রান্ত গবেষণার উদ্দেশ্য হল, কম্প্যুটার বা সমপর্যায়ের মেশিনের, আরও নির্দিষ্ট ভাবে বললে রোবোটের, বাধাহীনভাবে চলাফেরা করার দক্ষতা এবং কোনও বস্তু ব্যবহার বা নাড়াচাড়া করার ক্ষমতা অর্জন করা। বিংশ শতাব্দীতে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অগ্রগতি – আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স শব্দ দুটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন জন ম্যাকার্থি। ১৯৫৬ সালে ডার্টমাউথ কলেজে ম্যাকার্থি তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর সাথে একটি ওয়ার্কশপ করেন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে চর্চা করার জন্য। এই ওয়ার্কশপের প্রস্তাবে এই শব্দ দুটি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। ম্যাকার্থির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আর এক গবেষক, মারভিন মিন্সকি (Marvin Minsky), যিনি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘the construction of computer programs that engage in tasks that are currently more satisfactorily performed by human beings because they require high-level mental processes such as: perceptual learning, memory organization and critical reasoning”। অর্থাৎ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে গবেষকদের এই সময়ে লক্ষ্য ছিল এমন কম্প্যুটার প্রোগ্রাম তৈরি করা যেগুলি মানুষের মতই উপলব্ধি থেকে শিক্ষালাভ করতে পারবে এবং যুক্তি বিচারের মাধ্যমে কোনও সমস্যার সমাধান করতে পারবে। প্রথম দিকে গবেষকরা তাই যে কম্প্যুটার প্রোগ্রামগুলি তৈরি করেন সেগুলি মূলত তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করার জন্য বা ‘problem solver’ হিসাবে অথবা কোনও বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করার জন্যও বা ‘expert system’ হিসাবে। এই প্রোগ্রামগুলি মোটামুটি সহজ কিছু সমস্যার সমাধান দ্রুততার সঙ্গে করতে পারত, যেমন ‘টাওয়ারস অফ হ্যানয়’১ সমস্যার সমাধান, জ্যামিতির উপপাদ্যগুলি দ্রুততার সঙ্গে প্রমাণ করা, চেকার (এক ধরণের বোর্ড গেম) খেলা ইত্যাদি। একই সঙ্গে অন্য কয়েকজন গবেষক আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর উন্নত প্রয়োগের জন্য সাধারণভাবে ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজের পরিবর্তে লজিক প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ (বাস্তবে যুক্তিনির্ভর প্রোগ্রামিং পদ্ধতি যা একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে, যেমন রোগ নির্ণয়, বিধি বা নিয়মগুলি ব্যাখ্যা করে) এবং বিভিন্ন গাণিতিক কাঠামো ব্যবহারের দিকে নজর দেন এবং তার ওপর ভিত্তি করেই তাঁরা দেখান যে কম্প্যুটার কীভাবে আরোপিত জ্ঞান তার স্মৃতিতে (মেমোরিতে) সঞ্চয় করে রাখতে পারে এবং সেই জ্ঞান কোনও কাজের পরিকল্পনায় ব্যবহার করতে পারে – যেমন বিমানবন্দর পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার জন্য পথ নির্দেশ করা। তবে সহজ সমস্যার সমাধানে প্রাথমিক সাফল্য সত্ত্বেও জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে খুব একটা সাফল্য আশির দশক পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। যেমন দাবা খেলার প্রোগ্রাম তৈরি হয়ে গেলেও দাবায় চ্যাম্পিয়নের কথা ছেড়েই দিলাম, একজন মোটামুটি দাবা খেলতে জানা ব্যক্তিও আশির দশকে কম্প্যুটারকে অতি সহজেই হারিয়ে দিতে পারতেন। অবশ্যই তার একটি কারণ হল সত্তরের দশক বা আশির দশকে কম্প্যুটারের হার্ডঅয়্যার খুব একটা উন্নত হয়নি। কম্প্যুটারের মূল মস্তিস্ক সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (CPU) এর কাজ করার ক্ষমতা বা স্পিড কম ছিল, স্মৃতিতে ধরে রাখার ক্ষমতাও (memory) ছিল কম। তাছাড়া কম্প্যুটার হার্ডঅয়্যারকে বুদ্ধিমান বানাতে যে সফটঅয়্যারগুলি আবশ্যিক, যেমন অপারেটিং সিস্টেম ইত্যাদি সফটঅয়্যারও ছিল দুর্বল। তাছাড়া তৎকালীন গবেষকরা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম তৈরি করার জন্য যে চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করছিলেন বা যে পথে এগোচ্ছিলেন, সেখানেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে প্রাথমিক উৎসাহে সত্তরের দশক পর্যন্ত আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জগতে বেশ খানিকটা অগ্রগতি ঘটলেও, আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে গবেষকদের উৎসাহে বেশ খানিকটা ঘাটতি আসে। তাছাড়া আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরকারের তরফ থেকে গবেষণায় যে আর্থিক সহায়তা পাওয়া যেত তাও অনেকাংশে কমে যায়। আশির দশকের শুরুতে বেশ কিছু কোম্পানিও আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন এক্সপার্ট সিস্টেম, রোবোট এবং এই বিষয়ক হার্ডঅয়্যার ও সফটঅয়্যার বানিয়ে বাজারে নিয়ে আসে। আশির দশকের শেষভাগে এই সংক্রান্ত ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠলেও, খুব কম দিনের মধ্যেই এই ব্যবসাতেও ঘাটতি আসে এবং কোম্পানিগুলি তাদের প্রতিশ্রুতি মত দক্ষ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সফটঅয়্যার ক্রেতাদের না দিতে পারায় ব্যবসা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আশির দশকের শেষভাগ থেকে থেকে নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘AI Winter’ (মেশিন বুদ্ধিমত্তার শৈত্যকাল)। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই কম্প্যুটার হার্ডঅয়্যার এবং অপারেটিং সিস্টেম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সফটঅয়্যারের প্রভূত উন্নতি ঘটে। বিশেষ করে প্যারালাল কম্প্যুটিং-এর (অনেকগুলি সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিটের একটি কাজকে ভাগ করে নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করার ক্ষমতা) ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগতি হওয়ায় অত্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন সুপার কম্প্যুটারও তৈরি করা সম্ভব হয়। যেমন দাবা খেলার জন্য উন্নততর কম্প্যুটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে ডিপ ব্লু (Deep Blue) নামক আই বি এম-এর সুপার কম্প্যুটার বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকেও ১৯৯৭ সালে পরাজিত করতে পারে। আসলে প্যারালাল কম্প্যুটিং এবং উন্নততর কম্প্যুটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করতে পারার ফলে ডিপ ব্লু নামক সুপার কম্প্যুটারটি দাবা খেলার যে কোনও পরিস্থিতিতে অতি দ্রুততার সঙ্গে পরবর্তী সমস্ত চালগুলি ভেবে ফেলতে সক্ষম ছিল। এই দ্রুততার সঙ্গে দাবার অসংখ্য সম্ভাব্য চাল ভেবে ফেলা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সুতরাং এই ধরণের কাজে সুপার কম্প্যুটার এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটঅয়্যার ব্যবহার করে যে মেশিন মানুষের চেয়ে এগিয়ে যেতে পারে ১৯৯৭ সালে কাসপারভের পরাজয় সেইদিকেই নির্দেশ করে। এই সময় থেকেই কম্প্যুটার সফটঅয়্যার তৈরির জন্য উন্নত গাণিতিক পদ্ধতির প্রয়োগ, নতুন ধরণের অ্যালগরিদম-এর (কোনও পদ্ধতিকে কম্প্যুটারকে নির্দেশ দেওয়ার উপযুক্ত করে লেখা) উদ্ভব এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অগ্রগতি ও প্রয়োগের ফলে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভিন্ন শাখাতেই যথেষ্ট উন্নতি ঘটে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং, স্পিচ রেকগনিশন (কথিত বক্তব্য অনুধাবন করার ক্ষমতা), কম্প্যুটার ভিশন, রোবোটিক্স ইত্যাদি। একই সঙ্গে সূত্রপাত ঘটে মেশিন লার্নিং-এর। আগামী দিনে আমরা মেশিন লার্নিং নিয়ে আলোচনা করব। ১। ‘টাওয়ারস অফ হ্যানয়’ হল এক ধরনের বুদ্ধির খেলা। এ খেলায় তিনটি দণ্ড খাড়াভাবে পাশাপাশি রাখা থাকে। এবং ছোটবড় কিছু ডিস্ক বা চাকতি দণ্ডের ভিতরে প্রবেশ করানো থাকে। এ খেলায় প্রথম দণ্ড থেকে তৃতীয় দণ্ডে সবগুলো চাকতি আনতে হয়। তবে কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। নিয়মগুলো হল: লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যাণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক প্রকাশের তারিখ: ২৪-জুলাই-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |