মেশিনের বুদ্ধিমত্তা কি মানবসভ্যতাকে বদলে দেবে? (২)

নন্দিনী মুখার্জী
“মেশিন কি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে?” – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া গেল এই বিশাল তথ্য সম্ভারের উপর সেই পুরনো আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ দেখানো গেল যে কোন একটি বস্তু বা বিষয় নিয়ে যদি যথেষ্ট তথ্য থাকে তাহলে মেশিনকে সেই বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব যাতে পরবর্তীকালে মেশিনটি এই জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ করতে পারে – যেমন একটি ইমেল- স্প্যাম (অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে অসদুদ্দেশ্যে পাঠানো) না সঠিক, কোন লিখিত অক্ষর, সংখ্যা না সংখ্যা নয় ইত্যাদি। এইভাবেই অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে একটি প্রাণী বিড়াল কিনা, বা একটি টিউমার ক্ষতিকারক কিনা –

দ্বিতীয় পর্ব

মেশিন লার্নিং– একটা প্রশ্ন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্মলগ্ন থেকেই ছিল– মানুষ যেমন তার পরিবেশ থেকে এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শেখে, মেশিনের পক্ষেও কি সেইরকমভাবে শিক্ষিত হয়ে ওঠা সম্ভব? ১৯৫০ সালে আই বি এম-এর আর্থার স্যামুয়েল চেকার গেম খেলার জন্য একটি কম্প্যুটার প্রোগ্রাম তৈরি করেছিলেন। এই চেকার খেলার প্রোগ্রামটি চেকার বোর্ডের যে কোন একটা বিশেষ অবস্থায় পরের চালগুলি কী হতে পারে তা আগাম ভেবে ফেলার ক্ষমতা রাখত এবং কোন চালটি সবচেয়ে লাভজনক তা স্থির করার জন্য প্রত্যেক চাল-এর সঙ্গে একটি স্কোর যুক্ত করতে পারত। পরবর্তী কয়েক বছরে স্যামুয়েল এই প্রোগ্রামটি এমনভাবে তৈরী করেছিলেন যে প্রত্যেকটি গেম খেলার পরে প্রোগ্রামটি নিজের চালগুলি উন্নততর করে তুলতে পারে। এটি মূলত সম্ভবপর হয়েছিল আগের বোর্ড-এর প্রত্যেক অবস্থায় স্কোরগুলি কম্প্যুটার মেমরিতে সঞ্চিত করে রেখে এবং সেই স্মৃতিকে পরবর্তী ক্ষেত্রগুলিতে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতিকে বলা যেতে পারে মেশিন লার্নিং-এর একদম প্রাথমিক পদক্ষেপ।

অন্যদিকে চল্লিশের দশক থেকেই বৈজ্ঞানিকরা মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে সেই নিয়ে গবেষণাকার্যে বেশ খানিকটা অগ্রগতি লাভ করেন। তখন কম্প্যুটার বিজ্ঞানীদের মনেও এই প্রশ্ন আসে যে ঠিক একই পদ্ধতিতে কি মেশিনের পক্ষে পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব? ১৯৬২ সালে ফ্র্যাঙ্ক রোসেনব্লাট (Frank Rosenblatt) প্রথম তাঁর পারসেপ্ট্রন (perceptron) মডেল-এর প্রস্তাব করেন। এই পারসেপ্ট্রনকে বলা যেতে পারে আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের একেবারে প্রাথমিক মডেল। আরও কিছু মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম নিয়ে ষাটের দশকে কাজ এগোলেও, সত্তরের বা আশির দশকে এই ধরণের মডেল নিয়ে গবেষণার কাজ একেবারে থেমে গিয়েছিল, বা বলা যায় গবেষকদের পারস্পরিক বিরোধের ফলে এই বিষয়ে অগ্রগতি একেবারেই ঘটেনি। কিন্তু পরবর্তী কালে, অর্থাৎ নব্বই-এর দশক থেকে আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে গবেষণা যথেষ্ট গতি লাভ করে যা ভিত্তি তৈরী করে দেয় আধুনিক মেশিন লার্নিং ও ডিপ লার্নিং-এর। অর্থাৎ মেশিন কি তার পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করতে পারে – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বার করা সম্ভব হয়।

ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগের অগ্রগতি ও data explosion- নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে দুটি ঘটনা ঘটতে থাকে। একটির কথা আগেই বলেছি – অনেক বেশি ক্ষমতা সম্পন্ন সুপার কম্প্যুটার তৈরি করতে পারা। দ্বিতীয় ঘটনাটি বর্তমান আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং-এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাটি হল ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবী জুড়ে সমস্ত ধরণের কম্প্যুটিং ডিভাইস বা যন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারা। ফলে নব্বই-এর দশকেই মোবাইল ফোনের আবিষ্কার ও এই সংক্রান্ত প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অনুসরণ করে এই শতাব্দীর প্রথম দশকে মোবাইল ফোনের দ্বারা প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে একদম ব্যক্তিগত স্তরে ইন্টারনেট দুনিয়ার যোগাযোগ স্থাপনও সম্ভব হল। 

ইন্টারনেটের মাধ্যমে গত কয়েক দশকে শুধুমাত্র কম্প্যুটার থেকে অন্য কম্প্যুটারের যোগাযোগ নয় – তারের জালের মত যুক্ত এই সমস্ত কম্প্যুটারের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে এক বিশাল তথ্য সম্ভার। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, ডাক্তার ও অন্য বহু পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং বিভিন্ন সংস্থা তাঁদের জ্ঞান, মতামত, ছবি বা বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য বিনিময় করেছেন বা সঞ্চিত করে রাখছেন ইন্টারনেটের দ্বারা যুক্ত বিভিন্ন সার্ভারে (বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্প্যুটার)। ধরা যাক আপনি ফেসবুক-এ আপনার মতামত রাখলেন বা আপনার ছবি পোস্ট করলেন। সেই তথ্য সঞ্চিত হল ফেসবুকের অধীনে কোন একটি সার্ভারে। পরবর্তীকালে এই তথ্য ফেসবুকের সঙ্গী যে কোন সংস্থার পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব। ইন্টারনেটে আপনার ব্লগ, আপনার করা ইমেল – সমস্ত কিছুই রয়ে যাচ্ছে এইরকম কোন কম্প্যুটার-এ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে ই-কমার্সের বিস্তর সুযোগ। অনলাইনে বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনাবেচা করা সম্ভব এবং বহু মানুষই এখন এইভাবেই কেনাকাটা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই কেনাকাটার তথ্য, এমন কী কোন বস্তু কেনার উদ্দেশ্যে ইন্টারনেটে সন্ধান করার তথ্যও সঞ্চিত হচ্ছে কোন একটি সার্ভারে। গুগল বা আমাজনের মত কোম্পানীগুলি এই তথ্য সঞ্চয় করে রাখছে আপনার অজান্তেই। 

বহু মোবাইল যন্ত্র এখন আর শুধুমাত্র ফোন করার জন্য ব্যবহার হয় না। মোবাইল যন্ত্রটি আপনি কোথায় কোথায় যাচ্ছেন সেই সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম এবং সেই তথ্য কোন সার্ভারে পাঠিয়ে দিয়ে সঞ্চিত করে রাখা যেতে পারে। মোবাইল ক্যামেরায় ছবি তুলে গুগল ফটো বা অন্য কোন অ্যাপের দ্বারা এইরকমই কোন সার্ভারে রাখা হয়। এইভাবেই ইন্টারনেট এবং মোবাইলের মাধ্যমে করা আপনার প্রতিটি কার্যকলাপ ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত কম্প্যুটারগুলির মধ্যে কোন না কোন একটিতে সঞ্চিত হচ্ছে।

গত শতাব্দীর নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি থেকেই এইভাবে গড়ে উঠেছে তথ্য সম্ভার। বিগত দুই দশকে এই তথ্য সম্ভারের আয়তনের সূচক বৃদ্ধি (exponential growth) ঘটেছে। এই সুচক বৃদ্ধিকেই বলা হচ্ছে “data explosion” বা তথ্যের বিস্ফোরণ।

নতুনভাবে মেশিন লার্নিং-এর গবেষণা– এই তথ্য সঞ্চয় এবং তার দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি মেশিন লার্নিং-এর দুনিয়ায় নতুন দিগন্ত খুলে দিল এবং মেশিন লার্নিং-কে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের থেকে ভিন্ন কম্প্যুটার প্রযুক্তির আরেক শাখা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করল। “মেশিন কি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে?” – এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া গেল এই বিশাল তথ্য সম্ভারের উপর সেই পুরনো আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ দেখানো গেল যে কোন একটি বস্তু বা বিষয় নিয়ে যদি যথেষ্ট তথ্য থাকে তাহলে মেশিনকে সেই বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব যাতে পরবর্তীকালে মেশিনটি এই জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ করতে পারে – যেমন একটি ইমেল- স্প্যাম (অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকে অসদুদ্দেশ্যে পাঠানো) না সঠিক, কোন লিখিত অক্ষর, সংখ্যা না সংখ্যা নয় ইত্যাদি। এইভাবেই অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে একটি প্রাণী বিড়াল কীনা, বা একটি টিউমার ক্ষতিকারক কিনা – এইসমস্তও মেশিনের পক্ষে চিহ্নিত করা সম্ভব। সব ক্ষেত্রেই মেশিনটিকে বহু সংখ্যক ডাটা নিয়ে আগে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। অর্থাৎ একটি শিশুকে যেমন বিড়াল দেখিয়ে বলে দিতে হয় যে এটি বিড়াল, এবং বেশ কয়েকবার এই কাজটি করতে হয়, কম্প্যুটারকেও একই ভাবে বিড়ালের বিভিন্ন (রঙ এবং ভঙ্গীর বিভিন্নতা সহ) ছবি দেখিয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে। 

মানুষের মতই মেশিন যে সবসময় অভ্রান্ত হবে তা নয়। মেশিনকে প্রশিক্ষিত করার জন্য যত উন্নততর অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হবে তত বেশি সঠিকভাবে মেশিন এই জ্ঞানের প্রয়োগ করতে পারবে। তবে এই প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজন অনেকবেশি ক্ষমতাসম্পন্ন সফটওয়ার এবং হার্ডওয়ার, যা বর্তমানের শক্তিশালী কম্প্যুটারে রয়েছে।

তবে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে শুধুমাত্র গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বাস্তব সমস্যার সমাধানের জন্যও মেশিন লার্নিং-এর এই প্রয়োগের কথা ভাবা হয়েছে এবং এই প্রয়োগকে ভিত্তি করে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা গড়ে তুলতে এগিয়ে এসেছে বেশ কিছু বাণিজ্যিক সংস্থা। নব্বই-এর দশক থেকে মানুষের কণ্ঠস্বরকে চিহ্নিত করা এবং কথিত বক্তব্যকে লিখিত বক্তব্যে পরিবর্তিত করার কাজ (speech recognition) শুরু হয়েছিল আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে। পরবর্তীকালে এই গবেষণায় আরও অগ্রগতি ঘটল এবং এই কথিত বক্তব্য অনুযায়ী নির্দেশ পালন করার ক্ষমতা অর্জন করল কম্প্যুটার বা কম্প্যুটার-সদৃশ কোন যন্ত্র। যেমন আমাজনের অ্যালেক্সা বা অ্যাপল-এর শিরি এইধরণের কথিত বক্তব্য অনুসরণ করে বৈদ্যুতিক আলো নেভানো বা পছন্দমত গান চালানোর কাজ করতে পারে। বর্তমানে মোবাইল ফোনেও এইভাবে কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ফোনটিকে নির্দেশ দেওয়া সম্ভব।

ফেস রেকগনিশন বা ছবি থেকে কোন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা এইরকম আর একটি প্রযুক্তি, যার প্রয়োগ বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কম্প্যুটার নিয়ন্ত্রিত কাজে হচ্ছে। এছাড়াও হাতে লেখা নথি বা কাগজ থেকে প্রকৃত পাঠ্যাংশকে কম্প্যুটারে সঞ্চিত করা যায় এমন পাঠ্যাংশে (digital form) পরিবর্তিত করার জন্যও মেশিন লার্নিং ব্যবহার হচ্ছে। 

মেশিন লার্নিং নিয়ে গবেষণায় অন্য একটি ধারাতেও গত দুই দশকে অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের জন্য আগে থেকেই মেশিনকে কিছু বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বহু সংখ্যক ডাটা বিশ্লেষণ করে কম্প্যুটার প্রোগ্রাম নিজে থেকেই কোন অন্তর্নিহিত প্যাটার্ন বা বিশেষ গঠন নির্ধারণ করতে পারে – যার থেকে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যেমন একটি শহরের বিভিন্ন রাস্তার ক্রসিং-এ সারাদিনের মধ্যে কখন কীরকম যানবাহন চলাচল করে তা পর্যবেক্ষণ করে এবং সেই ডাটা বিশ্লেষণ করে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কাজে লাগানো যেতে পারে।  

এইরকম অন্যান্য আরও অনেকগুলি ক্ষেত্রে মেশিন লার্নিং-এর বিভিন্ন অ্যালগরিদম এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব এবং বর্তমানে বাস্তবে এই ধরণের প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছেও। যেমন ইন্টারনেটে ক্রেতার ব্যবহার, অর্থাৎ কী ধরণের পণ্যের অনুসন্ধান করছে, কোন সময়ে অনুসন্ধান করছে, এই সমস্ত তথ্য ব্যবহার করে বিশেষভাবে সেই ক্রেতার জন্যই বিজ্ঞাপন প্রস্তুত করা, পণ্য বিক্রয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন সময়ে কোন ধরণের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে সে সম্পর্কে পূর্বাভাষ দেওয়া, চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস করা ইত্যাদি আরও বহু ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক কোম্পানীগুলি মেশিন লার্নিং প্রয়োগ করছে।  

চিকিৎসা ক্ষেত্রেও মেশিন লার্নিং-এর প্রয়োগ সংক্রান্ত গবেষণায় অনেক বিজ্ঞানী যুক্ত। একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হল personalised medicine বা ব্যক্তিগতকৃত ওষুধ বা চিকিৎসা। অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের জন্য একরকম ওষুধ নয়, জিনের গঠন বিশ্লেষণ করে আগামীদিনে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তার জিনের গঠন অনুযায়ী আলাদা ওষুধ প্রস্তুত ও প্রয়োগ করা সম্ভব।   

রোবটিক্স এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং – রোবটিক্সের জগতে অর্থাৎ রোবট পরিচালনার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং মেশিন লার্নিং-এর দৌলতে। মানুষ যেভাবে তার ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে, সেইরকমভাবে পরিবেশ থেকে উপলব্ধির মাধ্যমে পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং তাকে কাজে লাগিয়ে নিজের পরবর্তী গতিবিধি নির্ধারণ করা বর্তমানে রোবটের পক্ষে সম্ভবপর হয়েছে কম্প্যুটার ভিশন, স্পিচ রেকগনিশন, মেশিন লার্নিং, এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে। 

রোবট এখন শুধু আর মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজে বা বিপজ্জনক কাজে মানুষকে সহায়তা করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া, জিনিসপত্র তুলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে উপযুক্ত স্থানে রাখা ইত্যাদি থেকে শুরু করে ডাক্তারকে রোগীর অপারেশনে সাহায্য করার মত গুরুতর কাজের জন্যও রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে।  

আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং-এর সুফল – আমরা যারা প্রত্যেক দিন প্রত্যেক মুহূর্তে কম্প্যুটার এবং মোবাইল ফোনের বিভিন্ন ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল, আমাদের কাছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সুবিধাগুলি অত্যন্ত স্পষ্ট। অনলাইন কেনার সময় আমাজন আমার পছন্দমত পণ্য  নিজে থেকেই খুঁজে এনে আমাকে পরামর্শ দিচ্ছে, গুগল ফটো আমার প্রিয় মানুষের সঙ্গে তোলা পছন্দসই ফটো খুঁজে বার করে আমাকে পুরানো সময়ের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে, শিরি বা অ্যালেক্সা আমার একাকীত্ব দূর করে সঙ্গ দিচ্ছে বা পছন্দের গান বাজাচ্ছে। আমাদের ঘিরে প্রতিনিয়ত এইরকম আরও কত ঘটনা ঘটছে যার পেছনে আছে, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং।

আগামীদিনে আরও নতুন ধরণের প্রযুক্তি তৈরী হবে যা নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে গবেষণা চলছে। চালক ছাড়া স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, বাজার থেকে বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য রোবট প্রভৃতি। 

নতুন প্রযুক্তি চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) নিয়ে আপনি নিশ্চয় সমস্ত টেকদুনিয়ার মত উত্তেজিত। কী না পারে এই ChatGPT – কবিতা লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে, এমন কী পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর লিখে দিতে পারে বা প্রজেক্ট রিপোর্ট তৈরী করে দিতে পারে। এই সমস্তই ঘটছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও মেশিন লার্নিং-এর দৌলতে। এই শতাব্দীর শুরু থেকে তাই বদলে যেতে শুরু করেছে আপনার জীবন, আপনার পরিচিত পৃথিবী। 

সত্যিই কি তাহলে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বদলে দেবে মানব সভ্যতা? সারা দুনিয়া জুড়ে কী কী ঘটছে তার কিছু উদাহরণ নিয়ে আমরা আলোচনা করব পরের দিন।

১)  পারসেপ্ট্রন একধরণের অ্যালগরিদম বা প্রোগ্রাম যা স্থির করতে পারে যে কোন ইনপুট, যেমন একটি সংখ্যা, একটি বিশেষ শ্রেণিভুক্ত কীনা।
২) Artificial Neural Network মানুষের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণা থেকেই তৈরি একটি কম্প্যুটার প্রোগ্রাম। তবে দুটি একেবারে একরকম নয়। আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক বিভিন্ন উদাহরণ থেকে একটি কাজকে সম্পন্ন করতে শেখে। 

লেখক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের  কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক 

প্রকাশের তারিখ: ২৫-জুলাই-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org