[‘মৃত্যু পর্যন্ত আমি ফিদেলিস্তা!’ ফিদেলপন্থী। কোনও রাখঢাক না করে বলতেন প্রকাশ্যে। তিনি দিয়োগো মারাদোনা। ‘ফুটবলার না হলে এই লোকটা নিঃসন্দেহে হতেন একজন বিপ্লবী!’ মারাদোনার সঙ্গে পরিচয়ের মিনিট পাঁচেক পরেই এমনই মনে হয়েছিল সার্বিয়ান বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এমির কুস্তুরিকার। লাতিন আমেরিকার বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক এদুয়ার্দো গালেয়ানো যেমন বলেছেন: ‘বিশ্বজোড়া ক্ষমতাবান ও শোষকদের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন অপ্রিয় সব প্রশ্ন, আর এভাবেই মারাদোনার কণ্ঠ সাহস জুগিয়েছে অনেককে।’ ঠিকই, তিনি ফুটবলে বামপন্থী, রাজনীতিতেও। ২০১৬-তে প্রয়াত হন ফিদেল। মারাদোনা তখন বলেছিলেন, ‘আমার কাছে উনি ছিলেন দ্বিতীয় বাবার মতো। আর্জেন্টিনায় যখন আমার সামনে দরজাগুলো বন্ধ হচ্ছিল, তখন উনি খুলে দিয়েছিলেন কিউবার দরজা।‘ চারবছর বাদে ফুটবলের ‘রাজপুত্র’র বিদায়। শতবর্ষে ফিদেল। কী আশ্চর্য, ফিদেল আর মারাদোনা দু’জনেরই জীবনাবসান একই দিনে। আত্মজীবনী এল-দিয়োগো-তে মারাদোনার ফিদেলকে স্মরণ।— মার্কসবাদী পথ]
খেলাধুলোর জগতের সঙ্গে জড়িত নন, এমন অনেক সেলিব্রিটি, বহু গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গেই আমার দেখা করার সুযোগ হয়েছে। তাঁদের সবার মধ্যে থেকে আমি বেছে নেব একজনকেই। যিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছেন, যাকে ছাপিয়ে যেতে আমি কাউকে দেখিনি, এটা বলতে কোনও সন্দেহ নেই, তিনি ফিদেল।
যখনই আমি তাঁকে দেখি, কেমন যেন নার্ভাস হয়ে যাই, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা। মনে আছে সবকিছু। দিনটা ছিল মঙ্গলবার। জুলাইয়ের ২৮তারিখ। ১৯৮৭। রেভেলিউশান স্কোয়ারের সামনে তাঁর দপ্তরে এল কমানদান্তে আমাদের স্বাগত-শুভেচ্ছা জানালেন। তখন প্রায় মধ্য-রাত। আমি এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে কোনও কথা বলতে পারছিলাম না।
 [জুলাই, ১৯৮৭: হাভানায় প্রথম সাক্ষাৎ]
ঈশ্বর সহায়, ক্লাউদিয়া ছিল আমার সঙ্গে, কোলে আমাদের তিন মাসের মেয়ে দালমাকে নিয়ে। আমাদের সঙ্গে ছিল ফার্নান্দো সিগনোরিনি (মারাদোনার ব্যক্তিগত ট্রেনার)। আমরা পুরোনা কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিলাম। আলোচনার শুরুতেই ক্লাউদিয়ার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, দালমাকে খাওয়ানোর জন্য কোনও আলাদা ঘরের দরকার আছে কি না। আমি বলে উঠি, না, না! চিন্তা করবেন না, কমানদান্তে। আমরা একে-অপরকে দ্রুত পড়ে ফেলেছিলাম।
 [জুলাই, ২০১১: হাভানায় ফিদেল ও হুগো সাভেজের সাথে]
তিনি বললেন: ‘আমাকে বলো, বল লাথি মারলে বা হেড করলে কি ব্যথা লাগে?’
‘না।’
‘কিন্তু, ছেলেবেলায় খেললে আমার এত ব্যথা হতো কেন?’
‘কারণ, তখন অন্য ধরনের বল ব্যবহার করা হতো, যেগুলি ছিল অনেক ভারী।’
‘ওহ্! এখন বলো, পেনাল্টি বাঁচাতে হলে একজন গোলরক্ষককে ঠিক কী করতে হয়?’
‘তাকে দাঁড়াতে হবে গোলের ঠিক মাঝখানে, আর অনুমান করতে হবে সামনের লোকটি কোন দিকে শট নেবে।’
‘কিন্তু এটা তো বড় কঠিন, কমরেড।’
‘খুবই কঠিন। এজন্যই তো আমরা বলি পেনাল্টি একটি গোল।’
‘ওহ্! তাহলে বলো, তুমি পেনাল্টি কীভাবে নাও?’
‘আমি দু’মিটার রান-আপ নিই, আমি কেবল তখনই গোলের দিকে তাকাই, যখন আমি আমার ডান পা-কে মাটিতে রেখে বা পায়ে শট নেওয়ার জন্য তৈরি হই। আর ঠিক ওই মুহূর্তেই আমি বেছে নিই কোন কোন্ দিয়ে জালে বল ঢোকাব।’
‘কিন্তু, এ তুমি কি বলছো! তুমি বলের দিকে না তাকিয়েই শট করো?’
‘হ্যাঁ’।
‘কমরেড, ঠিকই বলেছ, মানুষের মন যা করতে পারে তার কোনও সীমা নেই। অসীম। আমি সবসময় নিজেকে জিজ্ঞাসা করি এটি শরীরের সঙ্গে কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে। খেলাধুলোর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অবিশ্বাস্য। এখন আমাকে বলো, এটা কি সত্যি, যে তুমি খুব কমই পেনাল্টি মিস করেছ?’
‘না, আমি অনেক মিস করেছি।’
 [বাঁ পায়ের উল্কিতে ফিদেল]
এক সময় তিনি আচমকাই উঠে দাঁড়ান, তাঁর চেহারা যতই বিশাল হোক না কেন, নিজেকে নিয়ে রান্নাঘরের ভিতরে মিলিয়ে যান। ফিরে আসেন হাতে কয়েকটা দুরন্ত ঝিনুক নিয়ে। এবার উনি নানারকমের রান্না নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। আমি বারপাঁচেক ধাক্কা খেলাম। এমনকি রান্নার রেসিপি পর্যন্ত বলছিলেন।
... আমরা ফিরে এলাম ফুটবলে। হঠাৎই আমাকে হতবাক করে দিয়ে বললেন, যখন তিনি খেলতেন, তখন খেলতেন রাইট উইংয়ে।
আমি তাঁকে বিব্রত করতে বলে উঠলাম: ‘কীইইই? আপনি ডানপন্থী ছিলেন! আপনার তো বামপন্থী হওয়া উচিত ছিল।
তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিউবার ফুটবলের জন্য আমি কিছু করতে পারি কি না। জবাব যেন আমার ঠোঁটের আগায় ছিল। বলি অনেক কিছুই করতে পারি। কারণ, গরম ছাড়া ওদের সবকিছুই আছে। আছে সহজাত ক্ষিপ্রতা, হালকা-পাতলা শরীর, শারীরিক শক্তি এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তি।
সেদিন আমরা যখন ফিরে আসছি, আমি ওঁর টুপির দিকে তাকাই।
ভ্রূ কপালে তুলে তিনি যেন তুরন্ত পড়ে ফেলেন আমার মনের কথা। যেন শুনেছিলেন আমার অনুচ্চারিত কথা— ‘কমানদান্তে, দুঃখিত, আমি কি পেতে পারি আপনার টুপিটা?’
মাথা থেকে নিমেষে টুপিটা খুলে সটান পরিয়ে দিতে চাইলেন আমার মাথায়।
আমি সরে আসি। সবিনয়ে বলি, ‘দয়া করে যদি সই করে দিন, না হলে এটা মনে হতে পারে যে কারো।’
এটা কমানদান্তের টুপি, তাই টুপিটা আমি তুলে রাখি সযত্নে।
তিনি একে একে আমাদের গোটা পরিবারকে বিদায় জানালেন। আমরা পরস্পরকে উষ্ণ আলিঙ্গন করলাম এবং বেরিয়ে এলাম। বিদায় জানানোর সময় মনে হলো আমি যেন এতক্ষন এনসাইক্লোপিডিয়ার সঙ্গে কথা বললাম।
 [এপ্রিল, ২০১৩: শেষবারের মতো দেখা]
তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল যেন আমার দু’হাতে আমি আকাশ ছুঁয়েছি!
এক অবিশ্বাস্য মানুষ, যাঁর কাছে অজানা কিছু নেই। জানেন সবকিছু। এবং এতটাই প্রত্যয়ী, যে একবার তাকালেই যথেষ্ট। তাঁর উপস্থিতিই সবকিছুকে বুঝতে সাহায্য করে, কেবল তাঁকে দেখলেই বোঝা যায় জনাদশকে যোদ্ধা এবং সাকুল্যে তিনটি রাইফেল দিয়ে কীভাবে তিনি কী করেছেন। আমি সেদিন থেকেই বলে আসছি: তাঁর সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন, কিন্তু অনুগ্রহ করে, মানুষটিকে শান্তিতে কাজ করতে দিন! আমি কিউবাকে নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই দেখতে চাই, দেখি তারপর কী হয়!
📲 এখন এক ক্লিকেই আপনার হোয়াটস অ্যাপে মার্কসবাদী পথ
দ্বিতীয়বার আমাদের দেখা ১৯৯৪ সালের ক্রিসমাসে। সেদিন তিনি আমাকে আরেকটি টুপি উপহার দেন। আমি আমার একটা দশ নম্বরের জার্সি দিতে চাই। ... কয়েকমাস বাদে কিউবার সরকারের কাছ থেকে একটি ‘সিল’ করা চিঠি পাই। সিল খুলতেই আমি হতবাক। ফিদেলের লেখা চিঠি। ব্যক্তিগত চিঠি। আমাকে। একেবারে নিজের হাতে লেখা। ওই চিঠিতে তিনি আমার জার্সিটি কিউবার স্পোর্টস মিউজিয়ামে রাখার জন্য সম্মতি চাইছেন।
অবিশ্বাস্য!
উনি আমার জন্য কী করছেন, তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই।
আজ আমি বেঁচে আছি দু’জনের জন্য: ঈশ্বর এবং ফিদেল!
প্রকাশের তারিখ: ২৫-নভেম্বর-২০২৫ |