বাবরি ধবংস থেকে রাম মন্দিরের উদ্বোধন : ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ 

রাম পুনিয়ানি
বিজেপি যত বেশি করে নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠল ততই নিয়মিতভাবে সাম্প্রদায়িক হিংসা বাড়তে শুরু করল, মুসলিম কমিউনিটিগুলিকে এক একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ করে ফেলা হল এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হল। আরএসএসের এই সম্মিলিত সাফল্যের উদযাপনের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ সংগৃহীত হল। আপাতত একটি বিশাল বড় মন্দির নির্মিত হয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। হিন্দু আচার ও রীতিনীতি মেনে তার উদ্বোধন করবেন এদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং।

ভারতবর্ষ যখন স্বাধীন হল সেই মুহূর্তে ভবিষ্যতে এই দেশ কোন পথে এগোবে তার মূল সুর বাঁধা হয়ে গিয়েছিল নেহরুর ‘নিয়তির সঙ্গে অভিসার’ বক্তৃতাটার মাধ্যমে। নেহরু শপথ গ্রহণ করেছিলেন যে, ‘ভারতবর্ষের সেবা করার অর্থ হল ভারতবর্ষের কোটি কোটি লাঞ্ছিত, নিপীড়িত মানুষের সেবা করা। এর অর্থ দারিদ্র্য, অজ্ঞতা অস্বাস্থ্য ও বৈষম্যের অবসান ঘটানো… আমাদের প্রজন্মে আমরা সবচাইতে মহৎ যে মানুষটিকে দেখেছি, প্রতিটি মানুষের চোখের জল মোছানোই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য। হয়তো এতখানি আমাদের সাধ্যে কুলোবে না কিন্তু যতদিন মানুষ চোখের জল ফেলবে আর কষ্ট পেতে থাকবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের কাজও চলতে থাকবে।’ ভাকরা নাঙ্গাল বাঁধের উদ্বোধনের সময়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ বিষয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব দর্শনকে তুলে ধরেছিলেন।

হিন্দুস্তান টাইমস আর্কাইভের একটি রিপোর্টে এইভাবে বিষয়টিকে বর্ণনা করা হয়েছে : ‘প্রধানমন্ত্রী খুব আবেগের সঙ্গে এইসব ‘স্থান’গুলিকে ‘মন্দির ও প্রার্থনার স্থান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন যেখানে হাজার হাজার মানুষ লক্ষ লক্ষ সহনাগরিকের উপকার ও হিতসাধনের জন্য একটি গঠনমূলক কাজে নিযুক্ত হয়েছেন।’

পাবলিক সেক্টর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান - যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চা করা হয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, উচ্চশিক্ষাক্ষেত্র যেখানে সংস্কৃতির প্রসার ঘটাবার চেষ্টা করা হয় ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলি গড়ে ওঠার আদর্শগত ভিত্তির কেন্দ্রে ছিল ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’-এর ধারণাটি। চার-পাঁচ দশকের মধ্যে এই গতিপথে হঠাৎ করে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদল হল ১৯৮০’র দশকে । একদিকে শাহ বানো মামলায় সংখ্যালঘুদের সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতায় বিভেদমূলক রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল এবং সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এক প্রকারের প্রচার-যুদ্ধে অবতীর্ণ হল। পাশাপাশি মন্ডল কমিশনের বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে ‘মন্দির নিয়ে রাজনীতি’র পালে হাওয়া লাগল যা আগাগোড়াই ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের রণকৌশল।   

নেহরুর দর্শনচিন্তা অর্থাৎ ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ – কে ঠিক বিপরীতে রেখে শুরু হল ‘মসজিদের নিচে চাপা পড়া মন্দির’ – খুঁজে বের করার অভিযান। এর ফলে নতুন করে আবার বাবরি মসজিদ বিতর্ক মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। ‘গান্ধিবাদী সমাজতন্ত্রের’ ছদ্মবেশে নিজেদের আড়াল করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ পরিবারের সন্তান ভারতীয় জনতা পার্টি গঠিত হল ১৯৮০ সালে। নেতৃত্বে ছিলেন মধ্যপন্থী অটল বিহারি বাজপেয়ী। মধ্যপন্থী ‘ইমেজ’ থাকলেও বাজপেয়ীর শিকড় প্রোথিত ছিল আরএসএসের মতাদর্শে।

তিনি হিন্দু তন মনহিন্দু জীবন (হিন্দু আত্মা ও শরীর – হিন্দু জীবন) বইটি লিখেছিলেন এবং নিজের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে ঢেকে রেখেছিলেন মুখোশের আড়ালে। পরবর্তীকালে বাজপেয়ী জায়গা করে দিলেন লালকৃষ্ণ আডবানীকে যাঁর স্লোগান ছিল মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে (যেখানে বাবরি মসজিদ ওখানেই আমরা মন্দির তৈরি করব)।

সমষ্টিগতভাবে আরএসএস এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল যে, মসজিদটি যেখানে রয়েছে প্রভু রামের জন্মস্থান ঠিক ঐখানেই। মন্ডল কমিশনের সুপারিশগুলির রূপায়ণের পরেই রাম রথযাত্রা শুরু হল। যাত্রাপথে জড়ো হতে শুরু করল একের পর এক হিংসামূলক ঘটনা। ১৯৯০ সাল নাগাদ এল কে আডবানীর রথযাত্রার ফলশ্রুতিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় মোট প্রায় ১৮০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। লালু যাদব আডবানীকে গ্রেপ্তার করার পরে যাত্রা থেমে গেল।  

১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলল করসেবকরা, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এই ধ্বংসকান্ডের পূর্ব পরিকল্পনা করেই রেখেছিল। যখন মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে আডবানী, মুরলি মনোহর যোশি এবং উমা ভারতীর মত নেতৃত্বরা মঞ্চে বসেছিলেন এবং মঞ্চ থেকে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল এক ধাক্কা ঔর দো, বাবরি মসজিদ তোড় দো এবং ইয়ে তো কেভল ঝাকি হ্যায় কাশি মথুরা বাকি হ্যায়

বাবরি ভেঙ্গে দেওয়ার পরে মুম্বাই, ভোপাল, সুরাট সহ অসংখ্য এলাকায় হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে এ দেশের আইন ‘বিশ্বাস’ -এর উপর ভিত্তি করে রায় ঘোষণা করল এবং যারা মসজিদটা ভেঙেছিল তাদের কোনও শাস্তিই দিল না। বরং বিচারশেষে এই রায়ের মাধ্যমে আমাদের আইনি ব্যবস্থা বাবরি মসজিদের আস্ত জমিটা পুরষ্কার হিসেবে তুলে দিল মন্দির নির্মাণ করবার জন্য।

বিজেপি যত বেশি করে নির্বাচনী রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠল ততই নিয়মিতভাবে সাম্প্রদায়িক হিংসা বাড়তে শুরু করল, মুসলিম কমিউনিটিগুলিকে এক একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ করে ফেলা হল এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রক্রিয়া আরও জোরদার হল। আরএসএসের এই সম্মিলিত সাফল্যের উদযাপনের মধ্য দিয়ে দেশ ও বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ সংগৃহীত হল। আপাতত একটি বিশাল বড় মন্দির নির্মিত হয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। হিন্দু আচার ও রীতিনীতি মেনে তার উদ্বোধন করবেন এদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। এই অনুষ্ঠানের অগ্রভাগে থাকবেন একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের প্রধান। ধ্বংস হওয়ার আগে অব্দি বাবরি ছিল নির্বাচনী সমুদ্র পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় একটি কাষ্ঠখণ্ড এবং ধ্বংসের পর থেকে এই বিশাল রাম মন্দির নির্মাণ আর‌এস‌এসের নির্বাচনী ইশতেহার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির রক্ষার একটি অংশ হয়ে উঠল।

মনিপুর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক এ. এম. সিং – এর মতে ‘ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি’র রাজনৈতিক ডিসকোর্স হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডও সেই পথেই চলেছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করা হয়েছে, ২০১৯ সালে পাশ হয়েছে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল (CAA) যার উদ্দেশ্য হল হিন্দুত্ব-এর শর্তাবলী মেনে নতুন করে ভারতীয় নাগরিকত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং তার পুনর্নির্মাণ। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে যেভাবে রক্ষা করা হয়েছে সেই ঐতিহ্য থেকে তাকে উপড়ে ফেলে দিয়েছে বিজেপি সরকার।’ বর্তমানে ‘ঘেটো’য় আবদ্ধ মুসলিম সম্প্রদায়কে এমনভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে যেন তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। 

আপাতত মন্দির উদ্বোধনের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে হিন্দুদের একটা বড় অংশকে সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশেও প্রবাসী ভারতীয়দের একটা বড় অংশ এই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির জন্য নানান কর্মসূচী আয়োজন করছেন। আর এখানে আরএসএসের সবকটি সহকারী দল হিন্দুদের এই অনুষ্ঠানে শামিল করাবার জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই নবনির্মিত মন্দির দর্শন করার জন্য তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে অথবা ওইদিন স্থানীয় মন্দিরগুলিতে পূজোআচ্চায় যোগ দিতে বলা হচ্ছে।   

কারা আমন্ত্রিত আর আমন্ত্রণ পেলেন না সে নিয়ে ছোটখাটো কিছু বিতর্ক রয়েছে। বাবরি ধ্বংসের প্রধান কারিগর আডবানি এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী যোশীকে প্রাথমিকভাবে মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল উদ্বোধনে না আসতে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল তাঁদের বয়স হয়েছে এবং অযোধ্যায় এই সময়ে তীব্র শীত। আবার পরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফে তাঁদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়।

বাবরি ধ্বংস হ‌ওয়ায় বিভেদমূলক রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। রাম মন্দির উদ্বোধন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নির্বাচনী ফায়দা লোটার আরেকটি কৌশল। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে অসংখ্য স্পেশাল ট্রেন ও বাসের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মন্দির নিয়ে রাজনীতি তার শীর্ষবিন্দুটি স্পর্শ করেছে।

নেহরুর ‘আধুনিক ভারতের মন্দির’ – এর ধারণাটি এখন নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। বিজ্ঞানচেতনা প্রসারিত হ‌ওয়া প্রয়োজন। এটা ধর্মোন্মাদনা আর অন্ধ বিশ্বাসের বাড়বাড়ন্তের সময়। ঔপনিবেশিকতার অন্ধকার থেকে ভারতবর্ষ যখন মুক্তি পেতে শুরু করল তখন তার অভিমুখ ও লক্ষ্য ছিল পিছিয়ে পড়া মানুষদের সামনের দিকে টেনে আনা। রাজনীতি যখন থেকে আবর্তিত হতে শুরু করলো মন্দিরকে কেন্দ্র করে তখন থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষের বঞ্চনা ও নেহেরুর ‘নিয়তির সঙ্গে অভিসার’ সংক্রান্ত অঙ্গীকারকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল। একই সঙ্গে দেশের যাবতীয় ব্যর্থতা ও ত্রুটির দায়ভারও চাপিয়ে দেওয়া হল তাঁর উপরেই।

সূত্র— দ্য ওয়্যার

ভাষান্তর: শিঞ্জিনী সরকার 


প্রকাশের তারিখ: ১৮-জানুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org